ল্যাম্পপোস্ট (২)

অন্ধকারে শরীর মিশিয়ে হাটতে আমার খুব ভাল লাগে। ব্যাপারটার মাঝে অদ্ভুত একটা রহস্যময়তা আছে। ঢাকা শহরে রাত মানেই অন্ধকার নয়। ল্যাম্পপোস্টগুলো তার আশেপাশের একটু জায়গা আলোকিত করে রাখে। ফুটপাতের
উপরটা অন্ধকারেই ঢাকা পরে থাকে।

অন্ধকারে হাটতে হাটতে যখন আর ভাল লাগে না, আলোতে বের হয়ে আসি। আবার একটু পর অন্ধকারে সেধিয়ে যাই! হাটতে হাটতে প্রায় বাসার কাছে এসে পরেছি। বাসার সামনের ল্যাম্পপোস্টটায় নতুন লাইট লাগিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। সোডিয়াম আলোর
জায়গাটা দখল করে নিয়েছে সাদা রঙ। সোডিয়াম আলোর সুবিধাটা ছিল, আমার গায়ের রঙ, পরনের

অন্ধকারে শরীর মিশিয়ে হাটতে আমার খুব ভাল লাগে। ব্যাপারটার মাঝে অদ্ভুত একটা রহস্যময়তা আছে। ঢাকা শহরে রাত মানেই অন্ধকার নয়। ল্যাম্পপোস্টগুলো তার আশেপাশের একটু জায়গা আলোকিত করে রাখে। ফুটপাতের
উপরটা অন্ধকারেই ঢাকা পরে থাকে।

অন্ধকারে হাটতে হাটতে যখন আর ভাল লাগে না, আলোতে বের হয়ে আসি। আবার একটু পর অন্ধকারে সেধিয়ে যাই! হাটতে হাটতে প্রায় বাসার কাছে এসে পরেছি। বাসার সামনের ল্যাম্পপোস্টটায় নতুন লাইট লাগিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। সোডিয়াম আলোর
জায়গাটা দখল করে নিয়েছে সাদা রঙ। সোডিয়াম আলোর সুবিধাটা ছিল, আমার গায়ের রঙ, পরনের
টিশার্টটার রঙ, সব বদলে যেতো! আমি অবাক হয়ে বদলে যাওয়া আমাকে দেখতাম। এই দুধ সাদা লাইটটার সুবিধাও কম না! অনেক
বেশি জায়গা আলোকিত করে রাখে। আমি আমার ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। খুব আস্তে আস্তে এক কদম এক কদম করে এগিয়ে যাই। অপেক্ষায় থাকি, ছায়াটা আমার উচ্চতার দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যাবে!

নিজেকে এভাবে বড় করতে আমার খুব ভাল লাগে। পাশ দিয়ে যাওয়া একদুইজন পথচারী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। রাতের এই আরএক রহস্য। কেউ
কাউকে এই সময় বিশ্বাস করে না। ওদের ভয় ভয় চোখ দেখে আমার খুব মায়া হয়। আমি মুখে অভয় দানের হাসি ফুটাই। ওদের ভয় বাড়ে!

প্যান্টের পকেটে শক্ত একটা কিছুর খোচা অনুভব করছি। একটা বিয়ের কার্ড। দুইদিন ধরেই চাচ্ছি, এটা থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু ফেলে দিতে পারছি না। বড় কোন বিষয় নয় এটা__ বিয়েটা। কনের নামটাও হয়তো এখন আর বড় কোন বিষয় নয়। মেয়েটা আমার খুব পরিচিত। খুব আপন বলবো কি? উহু! বলা উচিত হবে না। “অধিকার” শব্দটা ধ্রুব নয় মনে হয়। দুইদিন আগেও অবলীলায় ওকে আপন বলতে পারতাম। বলার অধিকার ছিল। আজ বলতে গিয়ে গলায় আটকে আসছে! কেমন উতলে উঠা কি যেন একটা কষ্ট অনুভব করছি বুকের একটা পাশে।

ক্ষীণ আনন্দে ঠোঁট প্রসারিত করা, একটু কষ্টে ঠোঁট বাঁকানো, একশোটা আবদার—গত দুই বছরে প্রায় সব অনুভূতিই গিলে ফেলতে পেরেছি।

হঠাৎ করেই জেগে উঠা এই অনুভূতিটার সঠিক নাম দিতে পারছি না তাই।

বাসায় যেতে ইচ্ছা করে না আর।
চারদেয়ালটাকে খুব ভয় লাগে আজ। কেমন যেন হাফ ধরে যায়! অথচ একটা সময় এই চারদেয়ালটাকেই খুব ভালবাসতাম। ফিরে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকতাম। মধ্যবিত্ত
একটা সংসারে জন্মেছিলাম। একমাত্র ছেলে হওয়ার জন্যই কি না, বাবা মা মুদ্রার উল্টো পিঠটা কখনও দেখতে দেন নি। অদ্ভুত একটা স্নেহের মাঝে মুখ ডুবিয়ে রাখতাম সব সময়। সব কিছুকেই মনে হতো খুব আকর্ষণীয়! কিন্তু খুব সুখের এই দুটি উৎস একে একে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হল।
প্রথমে বাবা, তারপর মা। মেরুদণ্ড
ভেঙে গিয়েছিল। একটা মানুষ অবলম্বন ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। আমিও কখনও ভাবিনি, আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবো! কিন্তু, কী আশ্চর্য!

মানব চরিত্র খুব অদ্ভুত! সোজা হয়ে দাঁড়ালাম আবার। এই কষ্টটাও গিলে ফেলতে পারলাম। মানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। খুব ভরসার একটা হাত আমার হাতে হাত রেখেছিল। সব ভুলে গিয়েছিলাম।
কষ্ট, বিরহ! হুম, কোত্থেকে যেন
উড়ে আসা একটা বিরহ আবার ঘর বাঁধতে চাইছে বুকে।

বিয়ের কার্ডটা পকেট থেকে বের করলাম। কনের নামে কোন ভুল নেই তো? কাল থেকে কতবার চেক
করেছি, হাতে গুনে বলা যাবে না বোধহয়। উহু! নাম তো ঠিকই আছে! নাফিসা আত্তিরা রিহা। আজ রাতেই বিয়ে। রাতের বিয়ে সম্পর্কে কোন ধারনা নেই আমার। নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে যাবো কি না, ভাবছি। যাওয়া উচিত। বউ সাজে ওকে দেখতে কেমন লাগে, খুব ইচ্ছা করছে দেখতে! ওর দ্বিতীয় অধ্যায়কে।

পাশ দিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছিল। হাত নেড়ে দাড় করালাম। হাটতে খুব ক্লান্তি লাগছে।

-“কই যাইবেন?”
-“দুই নাম্বার গেট।”

রিকশাওয়ালা না করতে যাচ্ছিল। আমি পকেট থেকে পাঁচশো টাকা বের করে হাতে ধরিয়ে দিলাম।
এই একটা নোটই ছিল আমার কাছে।

খালি হাতে যাওয়া উচিত হবে না,
এটা ভেবে সাথে নিয়েছিলাম। হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল রিকশাওয়ালা। তারপর বলল,
“উঠেন।”

আমি রিকশাওয়ালার ক্লান্ত পায়ের
দিকে তাকিয়ে আছি। প্যাডেলে ওর পা কেমন যেন বিভ্রান্ত! খুব চেষ্টা করছে ও টাকাগুলো উসুল
করে নিতে। এরা ক্ষেত্রবিশেষে খুব সৎ হয়। কিন্তু ক্লান্ত পা কথা শুনছে না। গতি খুব একটা বাড়ছে না। খুব মায়া হচ্ছে ওর জন্য।

রিহা প্রায়ই বলতো, আমি নাকি অনেকটাই হিমুর মত। হিমু অনেক হাটাহাটি করে। আমিও করি। এই একটাই মিল। হিমুদের শিকড় গজায় না। আমার গজিয়েছে।
আমি পরে আছি এক জায়গাতেই। সবচেয়ে বড় পার্থক্য, হিমুদের জন্য রূপারা অপেক্ষা করে। আর আমার জন্য?

হিসেব মিলছে না। আমি কোনদিন হিসেব মেলাতে পারি না।
-“ভাই, থামেন।”

রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে ক্লান্ত চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি নেমে পড়লাম। অবাক হয়ে রিকশাওয়ালা বলল, “ভাই, আর যাইবেন না?”
-“উহু!”
-“তাইলে এতো ট্যাকা দিলেন ক্যান? ট্যাকা কম দেন।”

আমি খুব মিষ্টি করে হাসলাম। বললাম,
“ছেলেমেয়ে আছে না? ওদের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাবেন আজ। ওদের জন্য এটা আমার উপহার, কেমন? বাসায় যান, ভাই।”

রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার রাস্তায় নামলাম। ছোট ছোট বৃষ্টির
ফোঁটা পরছে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে।
আমি উল্টো দিকে হাটা শুরু করলাম। যে চলে যাচ্ছে, তার যাওয়ার পথটা মসৃণ রাখাই উচিত।

রিহা?

মায়া?

কি লাভ, শুধু শুধু মায়া বাড়িয়ে?

গল্পগুলো এমনই। হুটহাট শুরু, হুটহাট শেষ। না হয় ভাববো, রিহাও আমার একটা গল্প ছিল!

সামনের ল্যাম্পপোস্টটার দিকে হাটছি। খুব আস্তে ধীরে। এক কদম এক কদম করে! দেখতে ইচ্ছা করছে, কখন আমার ছায়াটা আমাকে ছাড়িয়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়!
নিজেকে এভাবে বড় করতে আমার খুব ভাল লাগে!

না। আমি হিমু নই। আমি অন্য কেউ! হিমুরা কখনও নিজেদের বড় করে না। আমি করি।…

উৎসর্গঃ প্রিয় ঋদ্ধদাকে..!!

৯ thoughts on “ল্যাম্পপোস্ট (২)

  1. আগেরটার মত হয়ে গেলো না?
    একটু

    আগেরটার মত হয়ে গেলো না?
    একটু ভিন্নতা দরকার। পড়ে যদি মনে হয় আগের পর্ব পড়ছি তাহলে তো আর জমবে না।
    শুভ কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *