‘সংখ্যালঘু সিন্ড্রোম’

এই মুহূর্তে ফেসবুক আর ব্লগ ভাসছে ‘সংখ্যালঘু সিন্ড্রোমে’। ধিক্কার আর ধিক্কার। ভদ্র ভাষা থেকে শুরু করে নির্জলা খিস্তি। আক্রমণকারীদের বিভিন্ন বিশেষণে ভুষিত করা হচ্ছে। হতাশা থেকে শুরু করে ‘শাস্তি দাবী’ সব ধরনের লেখাই আছে। ‘সংখ্যা লঘু’ শব্দটির অ্যানালাইসিস থেকে শুরু করে এসব ঘটনার পরে করণীয় নিয়ে। কেউ নিজ উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করছেন কেউ দোষীদের দলীয় পরিচয় ঘোষণা করছেন। এদিকে একটি প্রথম সারির পত্রিকার এবং এর সম্পাদকের মুন্ডুপাত চলছে। প্রথমে শুরু হয়েছিল ভোট গ্রহণের ছবি হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ছবি প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। কালক্রমে আলোচনা গড়ায়, ছবিটি ফটোশপের মাধ্যমে পরিবর্তিত করা হয়েছিল, এই অভিযোগে। গালি গালাজ থেকে শুরু করে পত্রিকা নিষিদ্ধের দাবী, কি নেই এখন এই ভার্চুয়াল জগতে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এমন প্রতিক্রিয়া, এধরনের প্রত্যেকটি ঘটনার পরে, একই ভাবে ঘটে। এবং যথারীতি এক সময়ে তা থেমেও যায়। তারচেয়েও মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোনবারই কেউ শাস্তি পায় না। আর এই ‘শাস্তি না পাওয়া’ নিয়ে কেউ তখন আর কেউ চিৎকারও করে না। কারো বিবেক দংশন হয় না, হতাশা হয় না, ফেসবুক আর ব্লগে লেখালেখি হয় না।
এধরনের ঘটনার রিপোর্টিং এর সময় প্রতিবারই কোন না কোন একটি ঘটনাকে ‘উস্কানি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ‘অমুক’ ঘটনার পরে এই আক্রমণের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ সেই প্রথম ঘটনাটা না ঘটলে দাঙ্গা হত না। তাই প্রথম ঘটনাটারই আসল দোষ। পরের আক্রমণের ঘটনাটি গুরুতর কিছু না। এরপরে একটি আলোচনা চলে যায়, সেই উস্কানির পেছনে। কে এই উস্কানি দিয়েছিল, কেন দিয়েছিল, সে কোন দল করে, তার বাপ দাদা কোন দল করে ইত্যাদি। কখনও হয়তো সেই উস্কানির ‘মাধ্যম’ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। ফলে দেখা যায় একসময় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ‘ইলেকট্রনিক’ কিংবা ‘প্রিন্ট’ মিডিয়া। তাঁদের দ্বায়িত্বশীলতা। তাঁদের চিন্তা করা উচিত কোন রিপোর্টিং এর জন্য কোন ছবি ব্যবহার করা সমীচীন। কোন ছবি ব্যবহার করলে ‘উস্কানি’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। কখনও রিপোর্টিং এর শিরোনাম কিংবা তথ্যও উস্কানি হতে পারে। ফলে এসব চিন্তা করেই সম্পাদক সাহেব খবর ছাপবেন। সারাংশ, সব দোষ সম্পাদকের, দাঙ্গাকারীরা পরিস্থিতির শিকার।
ইন্টারনেটের যুগে নতুন আরও কিছু ‘উস্কানি’ মাধ্যমের উন্মেষ ঘটেছে। তাই কখনও দোষ চাপে ‘ফেসবুক’ ‘ইউটিউব’ কিংবা ‘ব্লগ’ এর ঘাড়ে। কখনও একটি ‘ছবি’ কখনও একটি ‘ভিডিও’। আলোচনার ডালপালা গজাতে থাকে। শুরু হয় এইসব সোশ্যাল মিডিয়ার অত্যাধিক ব্যবহারের কুফল নিয়ে আলোচনা। একটি ছবি কিংবা একটি ভিডিও কিভাবে একটি ছবি দাঙ্গা শুরু করাতে পারে, তার উদাহরণ জমা দেয়া শুরু হয়। এরপর চলে বিচার বিশ্লেষণ। ‘এসব সোশ্যাল মিডিয়ার কি করা যায়’। কখনও পরিস্থিতি শান্ত করতে ‘ইউটিউব’ বন্ধ হয় কখনও ফেসবুক ব্যবহারকারী আত্মগোপন করে নিজেকে রক্ষা করে। ‘রামু’র ক্ষেত্রে দাঙ্গাকারীদের চেয়ে অনেকের কাছে আলচনার বিষয় ছিল, ফেসবুকের কুফল। এবারও আলোচনার অন্যতম উপাদান হয়েছে পত্রিকার দ্বায়িত্ব এবং কর্তব্য। ছবি ছাপাবার ব্যাপারে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা, ইত্যাদি।
ঘটনা এখন পর্যন্ত যেভাবে এগোচ্ছে, ‘অভয়নগর’ এর একই দশা হলে খুব অবাক হব না। দুঃখ, হতাশা, ধিক্কার এসব যথারীতি শুরু হয়ে গেছে। সংখ্যা লঘুদের মানসিক অবস্থা নিয়ে নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ, টকশো এসবও চলছে। ত্রাণ থেকে শুরু করে দোষীদের শাস্তি দেয়ার অঙ্গীকার সবই রুটিন মাফিক চলছে। ইন্টারভিউ কিংবা আক্রান্ত মানুষজনের বাণী কোট করে বিভিন্ন ফেসবুক স্টাটাস আর ব্লগে দেয়ার কাজও পুরোদমে চলছে। এরপর কি হবে জানেন? ঠিক ধরেছেন। এবার তদন্ত কমিশন গঠন হবে। সেই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট কোনোদিন প্রকাশিতও হবে না। গ্রেফতারও হবেনা। শাস্তির তো প্রশ্নই ওঠে না। তবে একেবারে হারিয়ে যাবে না। আবার আলোচনায় ফিরে আসবে। পরবর্তী ঘটনার পরে। এখন যেমন অনেকে ‘সাথিয়া’ র কথা বলছেন। রামুর কথা বলছেন। তেমনি এর পরের ঘটনার পরে ‘অভয়নগর’ এর কথা বলবেন।
দিল্লীর ‘রেপ বিক্ষোভ’ এর পরে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের একটি টক শো র আলোচনা শুনছিলাম। ‘রেপ’ এর শাস্তি নিয়ে বিতর্ক চলছিল। বেশ অনেকেই উৎসাহী হয়ে বলছিলেন, এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। যথারীতি একদল ছিলেন মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। এই আলোচনায় দুটি কথা শুনে খুব হোঁচট খেলাম। প্রথম কথাটি ছিল একটি পরিসঙ্খ্যান। যে অপরাধের শাস্তি যত কঠিন হয়, সেই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার তত কম। অর্থাৎ যখনই কেউ এমন কোন অপরাধ করে যার ‘কঠিন শাস্তি’ তখনই সে তার সমস্ত শক্তি লাগিয়ে দেয়, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। আর দ্বিতীয়টি ছিল, যেদেশে আইনি প্রক্রিয়া এতো ছিদ্রযুক্ত সেখানে আইন যত কঠিনই তৈরি করেন, কোন লাভ নেই। অপরাধ থামবে না।
কেউ তো আর ‘আধা’ রেপ বা আধা ‘খুন’ করতে পারে না। হয় সে অপরাধ করেছে আর নয়তো করে নি। তাই অপরাধীর হাতে দুটো রাস্তাই খোলা থাকে। নিজেকে ‘পরিস্থিতির শিকার’ প্রমাণ করা আর নয়তো ‘অপরাধ করে নি’ প্রমাণ করা। ‘দাঙ্গা’ কিংবা কোন সম্প্রদায়কে আক্রমণ কে যেহেতু ‘পরিস্থিতির শিকার’ বলে চালানো সম্ভব না। তাই চেষ্টা চলে ‘অপরাধ করে নি’ ফর্মুলার। এই ফর্মুলার সবচেয়ে উপকারি অস্ত্র হচ্ছে হুমকি। ‘সাক্ষী দিয়েছো কি খবর আছে’। প্রথমে সাক্ষীকেই শেষ করে দেয়ার হুমকি। এতে কাজ না হলে পরিবার কিংবা প্রিয়জনকে শেষ করার হুমকি। আর এই হুমকি ফর্মুলা বেশি কাজে দেয়, খবরটা শিরোনাম থেকে সরে যাওয়ার পরে। ফলে খবরটি টাটকা থাকাকালীন সাক্ষ্য প্রমাণ দেয়ার জন্য কিছু লোক সাহস দেখালেও অচিরেই তার পরিণাম তাঁরা টের পান। খবরটি শিরোনাম থেকে সরলে সেই সাক্ষীটির দুর্দশা জানতে আর কেউ সেখানে যায় না।
একের পর এক দাঙ্গা কিংবা আক্রমণ হওয়া এবং সবক্ষেত্রেই কেউ শাস্তি না পাওয়ার পরও কারো মনে এই প্রশ্ন জাগছে না, এর বিহিত জরুরী। কেউ কেন ভাবছেন না একজন দাঙ্গাকারী বাড়ী জ্বালাতে যাওয়ার সাহস এই কারনেই পাচ্ছে, কারণ সে জানে তার কিছু হবে না। তাঁকে কেউ ধরতেও আসবে না। আর একান্তই যদি ধরা পরার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তার গড ফাদার রা আগে থেকেই জানিয়ে দিবে, ‘গা ঢাকা দাও’। এরপরে একে একে পুলিশ, প্রশাসন, নেতা এসে এলাকা পরিদর্শন করবে আর দোষী ব্যক্তির জন্য কিছু হুমকি বাণী শোনাবেন, ‘দোষী যেই হোক তাঁকে শাস্তি পেতেই হবে’। ঘটনা এখানেই শেষ হবে না। মজার ব্যাপারটা ঘটবে মাস খানেক পরে। পুরনো হওয়ার সাথে সাথেই এই আলোচনা একেবারেই গায়েব হয়ে যাবে। পত্রিকার ভেতরের পাতায় ও না। এবং তখন এই ‘গা ঢাকা’ দেয়া বীর পুরুষরা যে ফেরত এসেছেন এবং বহাল তবিয়তে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন, এই তথ্য কোন পত্রিকা, ফেসবুক কিংবা ব্লগে আর পাওয়া যাবে না। পরিসমাপ্তি হবে ‘সংখ্যালঘু সিন্ড্রোম’ এর।

২ thoughts on “‘সংখ্যালঘু সিন্ড্রোম’

  1. এই ‘শাস্তি না পাওয়া’ নিয়ে কেউ

    এই ‘শাস্তি না পাওয়া’ নিয়ে কেউ তখন আর কেউ চিৎকারও করে না। কারো বিবেক দংশন হয় না, হতাশা হয় না, ফেসবুক আর ব্লগে লেখালেখি হয় না।

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :তালিয়া: :তালিয়া: :তালিয়া:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *