একজন বিহারীর গল্প… পার্ট-১ (সত্য ঘটনা অবলম্বনে )

আজিজ – একজন বিহারী। বিহারী মানে বিহারে বাড়ি এমন বিহারী নয়। যুদ্ধের পর বাংলাদেশে আটকে পড়া উর্দুভাষী বলা চলে। যুদ্ধের সময় নিজেও ছিলেন পাকিস্তানিদের অত্যাচার অনাচার এর বিরুদ্ধে তাই যুদ্ধ শেষে ভেবেছিলেন এখানেই থেকে যাবেন। অবশিষ্ট ধ্বংসস্তূপের সবাইকে সাথে নিয়ে বাচতে চেয়েছেন। নিজের যা ছিল তা নিয়ে পাশেও দাঁড়িয়েছেন অনেকের। কিন্তু কিছুদিন পরেই দেখা গেলো বিপত্তি। উর্দুভাষী হবার কারণে তাকে ধীরে ধীরে সবাই আলাদা করে দিল। নিজের জায়গা হলো রিফুজী ক্যাম্পে। বিহারী ক্যাম্প ও বলে অনেকে। এইখানে থাকা সুত্রে নাম পেয়েছেন বিহারী। কিন্তু কিছুতেই মন টেকে না এখানে তার। কেনো জানি নিপীড়িত বাঙ্গালির সাথে,পাশে চলতেই বেশী সাচ্ছন্দ বোধ করেন তিনি। ভালো লাগেনা তার এই গন্ডীর ক্যাম্প। এইখানে প্রতিরাতেই চলে আবার পাকিস্তান হয়ে গেলে তারা কি কি সুবিধা পেতো-না পেতো তার হিসাব নিকাশ। আজিজের এসব আলচনা ও ভালো লাগেনা। অনেকবার বলতে গেছে সে এমন আলোচনার মাঝে যে পাকিস্তানীদের বাঙ্গালির উপর এমন অত্যাচার করা উচিত হয়নি। জবাবে বারবার ই তাকে গালি দিয়েছে বাকি সবাই, তাই একসময় ক্যাম্পের আড্ডা আর চায়ের দোকানেও বসা বন্ধ হলো তার। মন পড়ে থাকে তার বাঙালীপাড়ায়।

শবনম নামের একটা মেয়েকে পছন্দ করে সে। এসবের মাঝেও একটু কমেনি তার ভালোবাসা। যুদ্ধের আগে আজিজ আর শবনম বেশ দুরেই থাকতো।আজিজ সময় করে প্রায়ই গিয়ে দেখে আসতো শবনম কে। সাথে নিয়ে যেতো রেশমি চুড়ী।যুদ্ধের পর শবনমের আর তার মায়ের জায়গা হয়েছে বিহারী ক্যাম্পে আজিজের পাশের ঘরেই। সে এই যুদ্ধ-বাঙ্গালী-বিহারী এতসব তালগোলেও নিজের ভালোবাসার মেয়েটিকে নজর ছাড়া হতে দেয়নি। আজিজের বাবা মা যুদ্ধের সময় এক ধর্ষিতাকে থাকার জায়গা দেয়। খোজ পেয়ে ছুটে আসে মিলিটারীরা। অনেক কাকুতী মিনতি আর উর্দুভাষী বলেও মাফ পায়নি তারা। তাদেরকেও আজিজের সামনেই মাথায় বুলেট বসিয়ে হত্যা করে ওরা। আজিজ দূর থেকে সব দেখেছে। পাশের বাড়ির চাচা আজিজকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় না দিলে আজিজও ওইদিন ই শেষ হয়ে যেত।

এই ক্যাম্পের পরিবেশ-মানুশ-চালচলন কিছুই ভালো লাগেনা তার। বন্ধী পাখির মত মন ডুকরে কাদে আজিজের। আজিজ শুরু করে বাংলা শেখা-বলা। শবনমকেও শেখায় বাংলা বলতে। দুজন মিলে বুদ্ধি আটে পালিয়ে যাবে কোথাও যেখানে এরকম বন্ধী-অপরাধীর মত করে কাটাতে হবেনা আর। ধীরে ধীরে ভালো বাংলা বলতে শুরু করে দুজনেই।

এরই মাঝে আজিজ কিছু টাকা জোগাড় করে ক্যাম্পের হোটেলে কাজ করে। ভর্তি হয় ড্রাইভিং স্কুলে। কয়েকমাসেই রপ্ত করে ফেলে গাড়ী চালানো। এই সময়টুকু অনেক কষ্টে কেটেছে আজিজের। জীবনের মানে কি তা কঠিন শব্দে বুঝেছে সে। না খেয়ে শুধু নিজের আশার আলোর পিছে ছুটে গেছে আজিজ। নিজের আর নিজের ভালোবাসা কে নিয়ে ভালো জীবন গড়তে অবশ্য এছাড়া কোনো উপায় ও ছিলো না তার। এদিকে ক্যাম্পের বেশ প্রভাবশালী একজনের নজরে আসে শবনম। তাকে বিয়ে করতে নানা রকম ভাবে লোভ-লালসা আর অসম্মতি তে নানান হয়রানী করতে থাকে ওরা। শেষে নিরুপায় হয়েই বের হয়ে আসে দুজন দুজনের হাত ধরে । পেছনে ফেলে আসে বিহারী ক্যাম্প। (চলবে)

৬ thoughts on “একজন বিহারীর গল্প… পার্ট-১ (সত্য ঘটনা অবলম্বনে )

    1. পড়ে আমাকে ফিডব্যাক দেবার
      পড়ে আমাকে ফিডব্যাক দেবার জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আসলে ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার কারনে বাকিটা লিখতে সময় করতে পারছিনা। আশা করি পরবর্তীটুকুও প্রকাশ হলে পড়ে জানাবেন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *