অপেক্ষা…

এক…
:হ্যালো, স্লামালেকুম, তিনাফ বলছি…
-কি ব্যাপার, আপনি এখনো অফিসে?
:কে বলছেন, প্লিজ?
-আগে বলুন আপনার অফিস আওয়ার শেষ হয়নি? নাকি ওভারডিউটি করছেন? বউ-বাচ্চা কেউতো নেই! এতো টাকা দিয়ে কি করবেন বলেন তো?
:তুমি! এত্তদিন পরে? কোথায় আছো এখন? তিনাফের কন্ঠে বিষ্ময়।
-চিনতে পেরেছেন তাহলে? মৃন্ময়ী হেসে উঠে। চারপাশে দেয়াল ঘেরা ও উপরে ছাত দেয়া যে স্পেস কে আমরা ঘর বলি, এখন তেমনি একটি ঘরে আছি।
:আপনি আর বদলাবেন না কখনো! তারপর বলুন, কেমন আছেন?
-শুনুন, আপনি না তুমি কোনটি বলবেন, সেইটা আগে ঠিক করুনতো!
:হুম… কেমন আছেন?
-আপনি যেমন দোয়া করছেন! এখন বলেন, আপনি আমার জন্য কি দোয়া করছেন?

এক…
:হ্যালো, স্লামালেকুম, তিনাফ বলছি…
-কি ব্যাপার, আপনি এখনো অফিসে?
:কে বলছেন, প্লিজ?
-আগে বলুন আপনার অফিস আওয়ার শেষ হয়নি? নাকি ওভারডিউটি করছেন? বউ-বাচ্চা কেউতো নেই! এতো টাকা দিয়ে কি করবেন বলেন তো?
:তুমি! এত্তদিন পরে? কোথায় আছো এখন? তিনাফের কন্ঠে বিষ্ময়।
-চিনতে পেরেছেন তাহলে? মৃন্ময়ী হেসে উঠে। চারপাশে দেয়াল ঘেরা ও উপরে ছাত দেয়া যে স্পেস কে আমরা ঘর বলি, এখন তেমনি একটি ঘরে আছি।
:আপনি আর বদলাবেন না কখনো! তারপর বলুন, কেমন আছেন?
-শুনুন, আপনি না তুমি কোনটি বলবেন, সেইটা আগে ঠিক করুনতো!
:হুম… কেমন আছেন?
-আপনি যেমন দোয়া করছেন! এখন বলেন, আপনি আমার জন্য কি দোয়া করছেন?
:শিট্‌ ম্যান! ফর গড’স সেইক, কখনো সিরিয়াস হোন না আপনি!!
-হইতো, মৃন্ময়ী মিষ্টি করে হাসে। কিন্তু সবাই সেইটা ফান মনে করে। আচ্ছা, এবার আমি আপনাকে সিরিয়াসলি কিছু প্রশ্ন করব। আপনি ঠিক ঠিক আন্সার করবেন, ওকে?
:বলুন
-বিয়ে করেছেন আপনি?
:এইটা আবার কেমন প্রশ্ন?
-যা বলি উত্তর করেন।
:না…
_কাউকে বিয়ে করবেন বলে কথা দিয়েছেন?
:আরে নাহ্‌, আমি তো বিয়েই করবোনা!
-তো কি করবেন? সারা জীবন ঘোড়ার ঘাস কাটবেন বলে ঠিক করেছেন?
:মানে?!
_মানে হলো গত দুই বছর থেকে আপনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি আমি। আপনি একজন বিশিষ্ট গাধা হওয়ায় ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি। তাই লাজ-শরমের মাথা খেয়ে মেয়ে হয়েও কথাটা আমাকেই বলতে হচ্ছে।
:কি বলছো তুমি?!
-যা শুনছেন আপনি। বেশি পার্ট নিয়েন না। আপনার প্রেমে পরছি বলে ভাববেননা যে এখন থেকে আপনার সঙ্গে পুতুপুতু করে রোম্যান্টিক সুরে কথা বলব! আমার এত্ত সময় নাই। তাছাড়া আই জাস্ট হেইট দ্যাট!
:কি…
-জ্বী। আপনিতো জানেনই আমি জীবন ধ্বংসাত্বক প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। যেখানে ১৮মাসে বছর হয়। এখন সেকেন্ড ইয়ারে আছি, ফাইনাল দিতে আরো ৩বছর লাগবে। তারপর মাস্টার্স এর ১বছর আর জব খুঁজতে খুঁজতে ১বছর, এই মোট ৫বছর। তারপর আমরা বিয়ে করবো। বিয়ের পর ইচ্ছেমত প্রেম… তা হবু বউ কে কোন প্রশ্ন করতে চান?
:কি প্রশ্ন করব?!
-সেইটাও কি বলে দিতে হবে? বাঙ্গালী ছেলেরা যেসব প্রশ্ন করে! আপনি প্রশ্ন শুরু করার আগেই জানিয়ে রাখি, আমাকে তো হাজার বার দেখেছেন, কাজেই জানেন আমি আহামরি সুন্দরী নই…
:আমার চেহারাও তো খারা……
-আরি! আমি কখন বললাম আপনি পারস্যের রাজপুত্র? আর কথার মাঝদিয়ে সাইকেল চালান কেন? আগে আমার কথা শেষ করতে দিন।
:সরি… হ্যাঁ, তোমার কথা বলো।
-যা বলছিলাম, আমার মাঝে কিন্তু কোন গুণই নেই। যেমন, আমি রাধতে জানিনা, পড়ালেখায় ফাঁকিবাজ, আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো যা আপনি নিজেও ভালো ভাবে জানেন, আমি অতি দ্রুত রেগে যাই। তবে মন্দের ভালো দুইটা দিক আছে। যতদ্রুত রেগে যাই, তার দ্বিগুণ বেগে রাগ নাই হয়ে যায়; আর যেকোন সময় ও পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ্‌ বলে হাসিমুখে থাকতে পারি। আমার কথা শেষ, এবার আপনি আপনার কথা বলতে পারেন।
:আমিও নিজের কোন কাজই পারিনা। এই যে অফিসে যাই প্রতিদিন আম্মু ঠিক করে দেয় কোন শার্ট পরবো। আর তুমিতো জানোই আমি কেমন ভুলমন, কিচ্ছু মনে রাখতে পারিনা। এভাবে কোন মেয়ের রেস্পন্সিবিলিটি নেয়ার অর্থ সেই মেয়েকে অড সিচুয়েইশান এ ফেলা। আম্মুই বিরক্ত হয়ে যায় মাঝে মাঝে। তুমি কি এসব মানিয়ে নিতে পারবে? আর কেনোই বা আমাকে বিয়ে করবে?
-আপনি যদি বলেন দাঁত ব্রাশ করানো, হাত-পার নোখ কেটে দেয়া, চুল চিরুনি করে দিতে হবে তো সেইটাও পারবো! বেবী সিটিং এর অভ্যেস আছে আমার। আর আপনি হলেন একজন ইউনিক পারসন, এই পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গাধামানব। আপনার কপালেতো কোনো বউ জুটবেনা, তাই আপনার উপকার করতে নিজেই নিজের সর্বনাশ করবো।
:মৃন্ময়ী, তুমি সিরিয়াসলি বলছো নাকি মজা করছো, এখনো বুঝতে পারছি না!!
-যেইটা আপনার মনে হয়। জোর করে বোঝার দরকার নেই। অনেক বকবক করেছি। ১২টা পার হয়েছে, কাল আপনার অফিস নেই? ঘুমিয়ে পরুন।
:তোমার কি ঘুম পেয়েছে?
-এই যে, ফ্লার্ট করা শুরু করছেন না? এইটা কবে থেকে শিখলেন? আমার ঘুম পায়নি, কিন্তু কাল এক্সাম আছে। সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল এক্সাম চলছে, খবর রাখেন? মাথাটা এক্তু ফ্রেশ করার দরকার ছিল, তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটু কথা বলে নেই। তাছাড়া দেখলামতো, আমি না মনে করলে আপনি কখনো মনে করবেন না। তাই আমিই করলাম।
:আসলে করতে চাইতো, কেন জানি করা হয় না…
-এই জন্যই তো আপনি গাধামানব- তিনাফ। আচ্ছা, আজ রাখি তাহলে।
:ভালো ভাবে পরীক্ষা দাও।
-আমার জন্য দোয়া করবেন। আর শুনুন, আমি ১২বছরের কিশোরী না, ২১ বছরের তরুণী। আমাকে আপনি করে বলবেন বুঝলেন? ভালো থাকবেন, বাই।

দুই.
ফোনটা রেখে দেয়ার পর তিনাফ ভাবতে থাকে মৃন্ময়ীর কথা। প্রায় চার বছর আগে অনেকটা হঠাত করেই এই আধ-বুনো মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় হয়। বয়সে ওর থেকে ৫/৬ বছরের ছোট হলেও বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয় এই মেয়েটিকে কখনো মন খারাপ করতে দেখেনি সে। সবার প্রতি সচেতন! কার কি লাগবে, কে কোন বিপদে আছে, চেনা-অচেনা নির্বিশেষে সবখানেই হাজির সে। নিজে যেমন হাসতে পারে,তেমনি সবাইকে হাসাতে পারে। যেকোন আড্ডাতে প্রাণ এনে দেয়! আস্তে আস্তে সে মৃন্ময়ীর প্রতি এক অন্যরকম টান অনুভব করতে শুরু করে, যেটা বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু। বহুবার সে ভেবেছে মৃন্ময়ী কে তার ভালোলাগার কথাটা জানাতে, কিন্তু পারেনি। মৃন্ময়ী এইটা যে কিভাবে নিবে, তা সে বুঝতে পারেনা। শেষে না তাদের বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে যায়! মাঝে মাঝে বোঝার চেষ্টা করেছে মৃন্ময়ীও কি তাকে পছন্দ করে কি না। কিন্তু এ মেয়ে প্রেম-ভালবাসার উর্ধ্বে! শিশুসুলভ ভাব এখনো যায়নি তার মাঝে থেকে। অথবা বন্ধুত্বের বাহিরেও যে কোন সম্পর্ক থাকে, তা এর জানা নেই। নিজে থেকেই দুরত্ব বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় তিনাফ। ধীরে ধীরে সে ওদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া কমিয়ে দেয়। এরমাঝে অফিসের কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ফোনেও কথা হয়না তেমন একটা। আজ প্রায় এক বছর পরে কথা হলো।
এইমুহুর্ত্বে তিনাফের খুব ইচ্ছে করছে মৃন্ময়ী কে বলতে, “তোমার কথা গুলো কি পাঁচ বছর পরে সত্যি হতে পারেনা মৃন্ময়ী?” সেলফোনের দিকে হাত বাড়ালো তিনাফ।

তিন.
কল কেটে দেয়ার পরে ফোনটা আলতো করে বিছানায় রাখে মৃন্ময়ী। মনে মনে নিজেকেই বলে, ভালবাসা কাকে বলে, কিভাবে ভালবাসতে হয়, কিছুই আমার জানা নেই। আমার খুব ইচ্ছে করে তোমাকে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে, হিম-হিম শীতের ভোরে তোমার হাত ধরে শিশির ভেজা ঘাসের উপর হাঁটতে, আঙ্গুল দিয়ে তোমার চুল গুলো এলো-মেলো করে দিতে, যখন মুখটা হুতুমপেঁচার মত করে রাখো, তখন তোমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে, “তোমার কষ্ট গুলো সব আমি নিলাম। বিনিময়ে মিষ্টি করে একটু হাসো তো! তুমি জানো, হাসলে তোমার টোল পরে?” তোমাকে বলা কথা গুলো সত্যিই আমার মনের কথা ছিলো তিনাফ। তুমি আসলেই একটা গাধা, তাই কিছুই বোঝনা।
দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায় মৃন্ময়ী। ও বাবা, ১২:৪৫ বাজে! কাল সকালে না HRM এক্সাম আছে, এখনো দুই চ্যাপ্টার পড়া বাকি! এক্ষুণি বই হাতে না নিলে তো কাল সকালে কিছুই লিখতে পারবোনা। গাধাটার জন্য শুধু শুধু এতগুলো সময় নষ্ট করলাম। হঠাত চোখ যায় সেলফোনে। সব রাগ এসে জমা হয় ফোনের উপর। “সব দোষ তোমার! তুমি না থাকলেই তো আমার আর কথা বলতে ইচ্ছা করতো না। এখন আমার এক্সাম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে বন্ধ করে রাখবো, বুঝলে?” ফোনের দিকে হাত বাড়ায় মৃন্ময়ী।

১৬ thoughts on “অপেক্ষা…

  1. এটা কি সিকুয়েলি আসবে নাকি
    এটা কি সিকুয়েলি আসবে নাকি শুধুমাত্র এই একটা পার্ট যদি একটা পার্ট হয়ে থাকে তাহলে আপনি খুব খারাপ একজন মানুষ আর যদি সিকুয়েলি আসে তাহলে অপেক্ষায় থাকলাম …… :অপেক্ষায়আছি:

  2. পড়লাম, খুব ভাল লাগল। এ
    পড়লাম, খুব ভাল লাগল। এ শ্রেণির আরো লেখার প্রত্যাশায় থাকলাম। সময় হলে আপনার অন্য লেখাও পড়বো।

  3. ছোট ছোট গল্প গুলোতে পরিবেশ
    ছোট ছোট গল্প গুলোতে পরিবেশ তৈরি করা, চরিত্রদের পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার কাজটা খুবই কঠিন। আর গল্পের বর্ণনা ফ্লুয়েন্ট না হলে সেটা পড়তেও ভালো লাগে না।
    গল্প ভালো লাগলো।

    1. ছোট ছোট গল্প গুলোতে পরিবেশ

      ছোট ছোট গল্প গুলোতে পরিবেশ তৈরি করা, চরিত্রদের পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া……

      কিছুটা হলেও যে নিজের মতো করে ভাবতে পেরেছেন, এইটাই “অপেক্ষা”র সারথকতা!!
      অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে! 😀

  4. ভাল হয়েছে অনেক, এটার দ্বিতীয়
    ভাল হয়েছে অনেক, এটার দ্বিতীয় অংশ লিখেছেন কিনা জানিনা, যদি না লিখে থাকেন তবে একটা কথাই বলা, ‘শেষ হইয়াও হইলনা শেষ’…

  5. চমৎকার… বেশ ভালো লাগল।
    চমৎকার… বেশ ভালো লাগল। সম্পুর্ন পড়তে একটুও বিরক্তি বোধ করি নাই। একটা লাইন পড়ার পড় আরেকটা লাইন পড়ার আগ্রহ নিজে নিজেই তৈরী হয়ে যেত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *