আমার যাপিত জীবন-৩ [ফোনালাপ কাব্য]

আমার সিক্সথ সেন্স খুব একটা প্রখর না। আবার একেবারে খারাপও না! মাঝামাঝি ধরনের। তবে ইদানিং ফোনের ব্যাপারে আমার সিক্সথ সেন্সগুলো কিভাবে যেন লেগে যাচ্ছে! বিশেষ করে বিরক্তিকর কলগুলোতে। রিং শুনেই কিভাবে যেন বুঝে ফেলি- এই ফোনটা আকাইম্যা! যে ফোন করেছে সে বেহুদা বকবক করবে। জানা সত্যেও ফোন ধরি। এবং ধরেই বুঝতে পারি- অনুমান সঠিক!

আমার সিক্সথ সেন্স খুব একটা প্রখর না। আবার একেবারে খারাপও না! মাঝামাঝি ধরনের। তবে ইদানিং ফোনের ব্যাপারে আমার সিক্সথ সেন্সগুলো কিভাবে যেন লেগে যাচ্ছে! বিশেষ করে বিরক্তিকর কলগুলোতে। রিং শুনেই কিভাবে যেন বুঝে ফেলি- এই ফোনটা আকাইম্যা! যে ফোন করেছে সে বেহুদা বকবক করবে। জানা সত্যেও ফোন ধরি। এবং ধরেই বুঝতে পারি- অনুমান সঠিক!

এই ফোনগুলোও আসেও অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে। যেমন, আজ দুপুরে… সাধারণতঃ দুপুরে আমি বাসায় থাকি না। তবে আজ কোন কারণে ছিলাম। দুপুরে ভরপেট খাবার পর স্বভাবতই একটু আলস্য আসে। আজ একটু বেশি পরিমানে এলো। ভর দুপুরে শীত পুরোদমে পড়ে না। তবে আবহাওয়া একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। আমি দক্ষিণের জানালা খোলায় এক চিলতে মিষ্টি রোদ আমার বিছানায় এসে পড়ল। আমি তার মধ্যে কাঁথা গায়ে দিয়ে আয়েসি ভঙ্গিতে শুয়ে ল্যাপটপে ঠাণ্ডা ধরনের গান ছেড়ে পিডিএফ ফাইলে একটা গল্পের বই পড়তে লাগলাম। পড়তে পড়তে কেবল একটু চোখ লেগে এসেছে। ঠিক তখন টেবিলের ওপর চার্জে বসানো মোবাইলটা বেজে উঠলো। আমি বিরক্তি নিয়ে টেবিলের দিকে তাকালাম। সিক্সথ্‌ সেন্স বলছে- এটা একটা বিরক্তিকর কল। কিন্তু না ধরা পর্যন্ত বাজতেই থাকবে- এটা আরেক যন্ত্রণা! বাধ্য হয়ে কাঁথার নিচ থেকে উঠে গিয়ে মোবাইল হাতে নিলাম। অপরিচিত নাম্বার।
– হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম!
– (ওপাশ থেকে একটা নারী কণ্ঠ!) ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছেন?
– জ্বি- ভাল। আলহামদুলিল্লাহ্‌…
– বলুন তো আমি কে?
আমার মেজাজ খারাপ হতে শুরু করলো। বিরক্তিকর কলগুলো এভাবেই শুরু হয়। তবে আমার একটা ব্যাপার হলো- আমি মোবাইলে পরিচিত-অপরিচিত কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করি না। যত বিরক্তি বা মেজাজ খারাপই লাগুক ফোনে বেশ কিছু শিষ্ঠাচার আমি সব সময় মেনে চলি। যেমনঃ কেউ ফোন করলে ওপাশ থেকে লাইন না কাটা পর্যন্ত আমি কখনও লাইন কাটি না। কথার মাঝখানে শত ব্যস্ততা থাকলেও বলতে পারি না- “এখন রাখছি”! আর আমি কখনোই মোবাইল বন্ধ বা সাইলেন্ট করে ঘুমাই না… এগুলোর কারণে প্রায়ই নানা রমক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। যেমন কলেজ লাইফে… (থাক এই গল্পটা একটু পরে বলি! যেটা বলছিলাম সেটা বলে নিই)

তো আমার এই ফোনালাপ আচরণ বিধি/শিষ্ঠাচারের কারণে আজ যখন আরামের ঝিমুনিটার বারটা বাজিয়ে অপরিচিত নাম্বার থেকে নারীকণ্ঠ প্রশ্ন করলো “বলুন তো আমি কে?” তখনও আমি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম। এধরনের প্রশ্ন শুনলে বুঝতে হয় প্রশ্নকারী অনেকক্ষণ বকবক করবে। শুধু “আমি কে?” এই রহস্যের জট খুলতেই লাগিয়ে দেবে কয়েক মিনিট! (এতো এনার্জি কই পায় কে জানে? খুব সম্ভবত ফ্রি মিনিট পেয়েছে কিংবা বাবার টাকায় ফ্লেক্সি করে!) এজন্য আমিও একটা ট্রিকস্‌ করলাম। উল্লাসিত ভঙ্গিতে বললাম- ও! জেরিন??? কী খবর তোর? আঙ্কেল-আন্টি কেমন আছে? তোর টেষ্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে…?
ওপাশ থাকে বিব্রত জবাব এলো- আমি জেরিন না, আমি মিতা! তুই আমার গলার স্বর চিনিস না?!
আমি মনে মনে হেসে বললামঃ অঁ! তুই? কী খবর বল?
– কী করছিলি?
– এই তো, শুয়েছিলাম একটু…
– ও! তার মানে ফ্রি আছিস?
আমি মনে মনে ভাবলাম- মানুষ ফ্রি না থাকলে শুয়ে থাকে না শুয়ে শুয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়? “শুয়েছিলাম” এটাই কি যথেষ্ট ব্যস্ততা না!
আমতা আমতা করে বললামঃ ফ্রি মানে… এই আরকি!
মিতা বললঃ একটু টিভি চালু কর।
– কেন?
– কর না!
– কি হয়েছে বলবি তো! তোকে টিভিতে দেখাচ্ছে?
– আগে চালু কর তারপর বলছি…
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ড্রয়িংরুমে গিয়ে টিভি চালু করলাম। মিতা বললঃ চ্যানেল আই-এ দে।
আমি দিলাম।
– দেখ, “দিপু নাম্বার টু” হচ্ছে!
– তো?
– তো, বসে বসে ছবি দেখ!
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কত আজাইরাই না মানুষ থাকে! “দিপু নাম্বার টু” কম করে হলেও দশবার দেখা ছবি। এর জন্য ফোন করে ঘুম থেকে উঠিয়ে…!
আমি নির্বিকারভাবে বললামঃ আচ্ছা। আর কিছু?
মিতা নির্মল একটা হাসি দিয়ে বললঃ না, আর কিছু না। বলেই লাইন কেটে দিলো। আমি বিমর্ষ হয়ে টিভির সামনে বসে রইলাম।

এই হলো আমার ফোনালাপ শিষ্ঠাচারের প্রতিদান! এমনটা যে একবারই ঘটেছে এমন না। মিতা সহ আরো অনেকেই এধরনের কাজ আরো অনেক বারই করেছে! আমি সেসব বিনা প্রতিবাদে মেনে নিই।
আমার ফোনালাপ শিষ্ঠাচারের আরো কিছু নমুনা দেয়া যাক-
• কেউ যদি পর পর ২টা মিসকল দেয় (বিশেষ করে পরিচিত নাম্বার থেকে) তাহলে আমি সব সময় চেষ্টা করি কল ব্যাক করতে… (বিঃদ্রঃ আমার মোবাইলে কখনোই ব্যালেন্স “জিরো” হতে দিই না!)
• কখনোই (বিশেষ কোন পূর্বঘোষিত কারণ ছাড়া) কাউকে মিসকল দেই না। ফোন করলে যদি কেউ ফোন না ধরে তাহলে পর পর ২টা কল দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। মিনিমাম ৫ মিনিট পর আবার চেষ্টা করি। ২য় দফায়ও পর পর ২বার ফোন দেবার পরও রিসিভ না করলে মিনিমাম আধা ঘণ্টা পর ৩য় দফায় ফোন করি অথবা বেশি জরুরি হলে একটা মেসেজ দিয়ে রাখি।
(অনেকেই কাউকে বেশি দরকার হলে রিং-এর পর রিং করতেই থাকে। আমি একবার একটা মিটিং থেকে বের হয়ে দেখি এক ফ্রেন্ড ৫৩টা মিসকল দিয়েছে! সাইলেন্ট করা ছিল বলে টের পাইনি… কিন্তু এক ঘণ্টায় যে কেউ ৫৩টা মিসকল দিতে পারে এটা আমার কল্পনায় ছিল না। এটা ঠিক না। যত দরকারই হোক বোঝা উচিৎ যে অপর পাশের লোকটাও ব্যস্ত থাকতে পারে!)
• কেউ ফোন করলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজ থেকে ফোন কেটে দেয়াটা অভদ্রতা। আমি এটা কখনোই করি না। খুব জরুরি হলে বিনীত ভাবে তাকে অনুরোধ করি পরে কথা বলার জন্য…।

এরকম আরো কিছু ব্যাপার আছে… আমার সাথে যারা ফোনে কথা বলে তারা জানে ব্যাপারগুলো। এগুলো আমি মোবাইল ব্যবহারের প্রথমদিক থেকেই মেনে চলি। যেমন কলেজ লাইফের ঘটনাটা (সে সময় যেটা বলতে শুরু করেছিলাম…)।
তখনও ফেসবুক এতোটা জনপ্রিয় হয়নি। টীনেজাররা কম্পিউটার কেনা শুরু করেছে কিন্তু নেট-চালানো শুরু করেনি। কাজেই তখন রাত ১২টা মানে অনেক রাত! তো সেদিন রাত আড়াইটায় একটা ফোন এলো। ফোন করেছে এক ক্লাসমেট- পারভেজ। সেসময় ও খুব একটা ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল না (এখন অবশ্য খুব ক্লোজ!) তবে আমার সাথে সব ক্লাসমেটেরই ভাল সম্পর্ক। কারণ, গ্রুপিং জিনিসটা আমার একদমই পছন্দ ছিল না। যাহোক, আমি ঢুলু ঢুলু চোখে পারভেজের ফোন রিসিভ করলাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বেশ প্রফুল্ল আওয়াজ এলো- ঐ সফিক! কী খবর? কেমন আছো?
আমি দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম। সারাদিন একসাথে ক্লাস করলাম… আর রাত আড়াইটায় ফোন করে সে কুশল জিজ্ঞেস করছে!
লম্বা হামি দিয়ে বললামঃ আলহামদুলিল্লাহ্‌! ভাল, তুমি কেমন আছো?
– হুমম… ভালো। আচ্ছা, তুমি জাফর ইকবাল-এর “ক্যাম্প” বইটা পড়ছো?
– হুম, পড়ছি।
– জানতাম তুমি পড়ে থাকবা! আমিও বইটা পড়েই ভাবলাম কাকে ফোন দেয়া যায়? চট করে মনে পড়লো- সফিক তো অনেক বই-টই পড়ে! তাই তোমাকে ফোন দিলাম। আসলে কারো সাথে ডিসকাস না করা পর্যন্ত ঘুম আসতেছিল না!
– অঁ! কখন পড়ছো?
– মাত্রই পড়ে শেষ করলাম। অসাধারণ না?
– হুম! জাফর ইকবালের যুদ্ধের গল্পগুলো এরকমই…
– তা ঠিক, তবে এইটা এক্কেবারে আলাদা! ঈশ! শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলল ছেলেটাকে… আমার এত্তো খারাপ লাগতেছে জানো!
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল… ওপাশ থেকে পারভেজ বললঃ হ্যালো! শুনতেছো?
– হুম… বল, শুনতেছি!
– রাজাকারটার কথা শুনছো? আমার তো রাগে গা জ্বলতেছে… হারামজাদাটাকে জ্যান্ত পুতে ফেলতে ইচ্ছে করতেছে…!
– হুম… জাফর ইকবাল সবসময়ই রাজাকার ক্যারেক্টারগুলোকে খুব নিশংসভাবে ফুটিয়ে তোলেন।

পারভেজ বইটার ওপর আরো কিছুক্ষণ লেকচার দিল। প্রায় সাত মিনিট পর বলল- আচ্ছা, তোমার সাথে ডিসকাস করে খুব ভাল লাগলো। তুমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ছিলা- না?
– হ্যাঁ… ঐ আরকি!
– আচ্ছা, সরি। তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম! আসলে এতো রাত হইছে খেয়াল করি নাই…
আমি “আরে না না… সমস্যা নেই” জাতীয় সকল সৌজন্যতা শেষ করে যখন ফোন রাখলাম ততক্ষণে ঘুম চলে গেছে! বেশ কিছুক্ষণ মোবাইল টিপাটিপি করে আবার ঘুম আনতে হয়েছিল…!

এই হচ্ছি আমি, আর এই হচ্ছে আমার ফোনালাপ শিষ্ঠাচার! 😛

(১২ জানুয়ারি ২০১৩ইং)

*** *** *** ***
অতি সাম্প্রতি আমার এক ফ্রেন্ড সকালে আমার ঘুম ভাংগানোর দায়িত্ব নিয়েছে। প্রতিদিন সকালে সে আমাকে ফোন করে ঘুম থেকে ডেকে দেয়। মোবাইলে এমনিতেও এলার্ম দেয়া থাকে। একটা না, পরপর তিনটা! কিন্তু সবগুলোই একে একে বন্ধ করে দেবার পর আমি আবারও ঘুমিয়ে পড়ি এবং যথারিতি অফিসে দেরি হয়ে যায়!
একারনেই বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এই ফোন-এলার্মের আয়োজন। কথা হলো- এলার্মের মত ফোনও তো কেটে দেয়া যায়। কিন্তু যেহুতু আমি তা কখনোই করি না সুতরাং আমার “ফোন আচরণ বিধি” এই প্রথমবারের মত আমি একটা ভাল উপকার দিয়েছে। সে না কাটা পর্যন্ত আমিও লাইন কাটি না। ফলে পূর্ণাংগভাবে ঘুম ভাঙ্গাতে এটা খুব কাজে দিচ্ছে…!

তার এই অসামান্য কৃতকর্মের জন্য আমি তার নাম দিয়েছি “এলার্ম পাখি”!
(বিঃদ্রঃ তার ফেসবুক আইডির নাম “… পাখি”। বলাই বাহুল্য, প্রাইভেসির খাতিরে “…” এর অংশটুকু উহ্য রাখা হলো।)
তো আমার এই “এলার্ম পাখি” এখনও পর্যন্ত বিনা স্বার্থে (কিংবা বলা ভাল বিনা পারিশ্রমিকে) তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে সততার সাথে! কিন্তু দর্শন বলে- বিনা স্বার্থে নাকি কেউই কিছু করে না! সেক্ষেত্রে এলার্ম পাখির নিশ্চয়ই কোন স্বার্থ আছে। স্বার্থটা এখনও স্পষ্ট নয়!
তবে কিছুটা সন্দেহ করা যাচ্ছে…! যা সন্দেহ করা হচ্ছে সেটা আবার বলা যাবে না।

আমার ব্যক্তিগত “ফোনালাপ কাব্য”-এর তাই আপাতত এখানেই ইতি…।

(৪ জানুয়ারি ২০১৪ইং)

১৩ thoughts on “আমার যাপিত জীবন-৩ [ফোনালাপ কাব্য]

  1. ফোনকারী যদি অপরিচিত মেয়ে হয়।
    ফোনকারী যদি অপরিচিত মেয়ে হয়। আমি কখনোই বিরক্ত হই না। :নৃত্য: তাদের একাকিত্বে সঙ্গ দেয়া একান্ত কর্তব্য। :হাহাপগে:

  2. আপনার এলার্মা পাখি কিছু দিন
    আপনার এলার্মা পাখি কিছু দিন পর অন্য পাখি হইবে!!! হুম আপনি আপনার আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেন তবে বুঝতে পারলাম আপনি আমাকে ফোন করতে নিষেধ করছেন। যান কাইল থেকে আপনারে বেশি কইরা ফোন দিমু। 😉 ।

    আরেক টা আছে কেটে ফোন ব্যাক করা। যেটা আরও অনেকেই করে।

    ভাই প্রথমে পড়ে মনে হচ্ছিল আমাকে বললেন । আমি ফোন করেও এটাই বলেছিলাম , বলেন তো আমি কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *