পেরেগ্রিন শাহীন দেখার গল্প

পাখি দেখার জন্য কেরানীগঞ্জের বিকল্প নেই। প্রায়ই তাই কেরানীগঞ্জ, ইকুরিয়া, আড়াকুল এলাকায় ঢুঁ মারা হয়। শহরতলীর এসব এলাকা এখনো পুরোপুরি গ্রামের আমেজ ছাড়তে পারেনি। হাউজিং কোম্পানিগুলোর সাইনবোর্ড, প্লট ছাড়াও রয়েছে প্রচুর পড়ে থাকা ঘেসো জমির প্রান্তর। বালি, ঘাস, কাশ দিয়ে ঘেরা এইসব এলাকা পরিযায়ী পাখির জন্য আদর্শ স্থান। এখানেই এমন কিছু পাখি দেখার রেকর্ড আছে, যা পুরো বাংলাদেশ ঘুরে এলেও দেখার সম্ভাবনা খুব কম।

পাখি দেখার জন্য কেরানীগঞ্জের বিকল্প নেই। প্রায়ই তাই কেরানীগঞ্জ, ইকুরিয়া, আড়াকুল এলাকায় ঢুঁ মারা হয়। শহরতলীর এসব এলাকা এখনো পুরোপুরি গ্রামের আমেজ ছাড়তে পারেনি। হাউজিং কোম্পানিগুলোর সাইনবোর্ড, প্লট ছাড়াও রয়েছে প্রচুর পড়ে থাকা ঘেসো জমির প্রান্তর। বালি, ঘাস, কাশ দিয়ে ঘেরা এইসব এলাকা পরিযায়ী পাখির জন্য আদর্শ স্থান। এখানেই এমন কিছু পাখি দেখার রেকর্ড আছে, যা পুরো বাংলাদেশ ঘুরে এলেও দেখার সম্ভাবনা খুব কম।
এমনই এক পাখি হলো পেরেগ্রিন শাহীন। পেরেগ্রিন শাহীন সম্পর্কে কিছু বলার আগে শিকারী এই পাখির মূল বৈশিষ্ট্য জানা জরুরি। এই পাখি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত গতির পাখি। রেকর্ড বলছে, এই পাখি শিকারের দিকে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৩৮৯ কিলোমিটার বেগে ছুটে যেতে পারে! এই পেরেগ্রিন পাখি বাংলার বিরল পরিযায়ী পাখির একটি। শীতকালে এদের আনাগোণা বেশি হয়।

প্রথমবারের ছবি:

ডিসেম্বরের পয়লা দিনে এই পাখির সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় কেরানীগঞ্জের এক টাওয়ারে। ঢাকা এবং এর আশেপাশে বড় গাছ নেই। তাই মহীরুহের বদলে এই টাওয়ার ব্যবহার করে এই পাখি। আমাদের নিয়মিত পাখি দেখার জায়গাগুলো আস্তে আস্তে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো দখল করতে শুরু করেছে। বালুর ট্রাক, বুলডোজার নিয়ে আশেপাশের প্লাবনভূমির পানি নেমে যেতেই বালি ফেলতে শুরু করেছে তারা। কাশফুল আর হাতিঘাসের জায়গায় এখন ধু ধূ বালি। তাই এবারে হাঁঁটতে হাঁঁটতে বেশ দূরে এসে পড়লাম। হঠাৎ সঙ্গীর ইশারায় দাঁড়িয়ে গেলাম। সামনে ৫০-৬০ ফুট দূরে এক টাওয়ারে, মাটি থেকে অন্তত ১২০ ফুট উঁচুতে বসে আছে শিকারী এক পখি। ডানার কালচে ভাব দেখেই বুঝলাম, এই পাখি এর আগে দেখা হয়নি। পাশের হাতিঘাসের ঝোপে এবার আড়াল নিলাম। ভালোমত দেখতেই বুঝলাম এই পাখির নাম পেরেগ্রিন ফ্যালকন- বাংলায় পেরেগ্রিন শাহীন। ঝটপট কয়েকটা ক্লিক পড়লো ক্যামেরায়। ভালো ছবি পেলাম না- কারণ টাওয়ারের একখানা রড আড়াআড়ি ভাবে পাখির পেটটাকে আড়াল করেছে। তারপরও এই ক্লিক করা, কারণ- এই পাখির দৃষ্টিশক্তির প্রশংসা শুনেছি অনেক। আর সেই সুবাদেই জানা আছে সন্দেহজনক কিছু তার চোখে পড়লেই উড়াল দেবে এই পাখি। প্রায় ২০ মিনিট ধরে এগোতে থাকলাম- হাতিঘাসেবর ঝোপ ধরে। ভালো একটা অবস্থান খুঁজে নিয়ে ভালো একটা ছবি তোলাই ছিল উদ্দেশ্য। পিছন থেকে আরেক দল নবীন পাখি আলোকচিত্রীর হৈ চৈ এর শব্দে গায়েব হলো পাখিটা। তারা পাখিটা দেখেই অতি উৎসাহে দৌঁড়ে আমার দিকে আসছিল। ফলে আমার ২০ মিনিটের ক্রলিং, গায়ে ধুলো মাখা, হাতিঘাসের খোঁচা খাওয়া- কোনটাই কাজে আসলো না। ভালো ছবি না পাওয়ার আফসোসে পুড়তে হলো প্রথমবার।
ডিসেম্বরের ১৯ তারিখ সন্ধ্যায় সোনাদিয়া থেকে ফিরছি, সাথে মোহাম্মদ ফয়সাল ভাই। তিনি আবার ফ্যালকন ফয়সাল নামেই বেশি পরিচিত। গত ৭-৮ বছর ধরে তিনি ফ্যালকন নিয়েই গবেষণা করছেন। ৬ নম্বর ঘাট থেকে ইজি বাইকে ফিরছিলাম কলাতলীর হোটেলের উদ্দেশ্যে। কলাতলীতেই হঠাৎ এক টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে বেশ নির্লিপ্তভাবেই বললেন, টাওয়ারে একটা পেরেগ্রিন বসা! তার নির্লিপ্ত থাকার কারণ- তিনি এই পাখি নিয়েই কাজ করেন, তাই তার মতো আমার নির্লিপ্ত থাকার কোন কারণ নেই। অটোরিকশা থামিয়ে তাই দৌঁড় দিলাম টাওয়ারের দিকে। মাটি থেকে খবি একটা ভালো ছবি পেলাম না, তাই উঠতে থাকলাম হোটেলের ছাদে। অবরোধের কক্সবাজারে মানুষ নেই। তাই হোটেল কর্তৃপক্ষ ২-১ জন মানুষের জন্য লিফট ছাড়ার বিলাসিতা করেন না। অনুমতি নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ৬ তলার ছাদে গেলাম। প্রথম ক্লিকটা করতেই পিছন থেকে কে যেন চিৎকার শুরু করল- ছাদে উঠছেন কারে বইল্যা- নামেন, নামেন! চিৎকারে পাখি হাওয়ায় ভর করে হারিয়ে গেল সন্ধ্যার আকাশে। চিৎকারকারীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানলাম- কলিযুগ বলে বেঁচে গেল বেচারা; সত্যযুগ হলে চোখের আগুনেই ছাই হতো সে। ছাদে ঝামেলা মিটিয়ে হোটেলে গিয়ে আবারো এক দফা দীর্ঘশ্বাস- সন্ধ্যার আলোয় কী আর ভালো ছবি হয় সস্তা ক্যামেরা আর লেন্সে!
কক্সবাজারে দ্বিতীয় দফা মোলাকাত:

উড়াল দেওয়ার পর:

এ বছরের জানুয়ারির ২ তারিখ, ঘড়ির দুই কাঁটা জানান দিচ্ছে তখন বিকেল ৫ টা বেজে ১৬ মিনিট পেরিয়ে গিয়েছে। এই শীতে এই সময়টাকে বিকেল না বলে সন্ধ্যা বলাই ভালো। আজিজ মার্কেটের পিছনের দোকানে গিয়ে মাত্র বসেছি কফি খাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। মোবাইলে রিং বাজলো। ওপার থেকে রওশন ভাইয়ের আওয়াজ- আশেপাশে থাকলে ক্যামেরাসহ এখনই আমার অফিসের দিকে আসো। খুব সম্ভবত একটা পেরেগ্রিন ফ্যালকন আমার অফিসের সামনে বসে আছে। কফির অর্ডার বাতিল করেই ১৬ মিনিটের মধ্যে শাহবাগ থেকে ধানমন্ডি গিয়ে হাজির হলাম। আকাশ তখন প্রায় অন্ধকার- চোখের সামনে পাখিটা একটা চামচিকা শিকার করলো- তারপর অন্ধকারের ঢাকায় উড়াল দেওয়ার আগে শেষ চেষ্টা হিসেবে বড় বাদুড়কে শিকার করার বৃথা চেষ্টা চালালো। ছাদে দাঁড়িয়ে আমরা তখন কেবল দর্শক। অতি অন্ধকারের জন্য ছবি হয়নি। আর ঠিকমতো নিশ্চিত হতে পারছিলাম না- এটা কী পেরেগ্রিন ফ্যালকন, নাকি ইউরেশিয়ান হবি (ইউরেশীয় টিকাশাহীন)। খুব ভালোমতন খেয়াল না করলে এই দু’টো পাখিকে একই বলে মনে হতে পারে।
শিল্পীর চোখে ইউরেশিয়ান হবি (ইউরেশীয় টিকাশাহীন):

শিল্পীর চোখে পেরেগ্রিন ফ্যালকন:

পরদিন- ৩ তারিখ, শুক্রবার। বিকেল ৪টা থেকে পাশের ছাদে বসে আছি, পাখিটাকে দেখার আশায়। শুক্রবার এই পাখির কোন দেখা নেই। আশেপাশের টাওয়ারগুলোতে দূরবীণ আর ক্যামেরার লেন্স দিয়ে খোঁজা হলো- ভূবন চিল আর কাকের ছড়াছড়ি পুরো আকাশ আর টাওয়ার জুড়ে। মাঝে মাঝে চামচিকা উড়ছিল। শেষ পর্যন্ত সেদিন আর আসেনি পাখিটা। বিকেল ৫.৩০ টায় আলো পুরো নেই হয়ে গেলে নেমে এলাম। শনিবার, ৪ জানুয়ারি আবারো ৪টায় ছাদে গিয়ে বসে থাকলাম। নেই- পুরো টাওয়ার খালি। এদিক- ওদিকের টাওয়ারগুলোও খালি। মনে আবারো এক টুকরো কালো মেঘ জমতে শুরু করলো, আজও কী তবে আসবে না এই পাখি! এদিকে ছাদে অবস্থানরত নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে এক পশলা বাক বিতন্ডা হয়ে গেছে। ইলেকশনের আগের দিন- ছাদে এমন বড় কামানসদৃশ বস্তু দেখে তাদের এমন মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। পরে অবশ্য আমাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তারা আর ঝামেলা করেনি।
হঠাৎ ৪ টা ১৩ মিনিটে এসে হাজির হলো পাখিটা। চমৎকার আলো। পশ্চিমমুখো হয়ে বসেছে পাখিটা। ফলে শেষ বিকেলের আলো পড়েছে পাখিটার মুখে, বুকে। নিশ্চিত হলাম এবারে, পাখিটা পেরেগ্রিন ফ্যালকন। এই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম ফ্যালকো পেরেগ্রিনাস। ল্যাটিন ফ্যালকো এর বাংলা শাহীন (ইংরেজি ফ্যালকন) আর পেরেগ্রিনাস অর্থ পর্যটক (ট্রাভেলার) বা ভবঘুরে (ওয়ান্ডারার)। যদিও এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খন্ড ২৬: পাখি জানাচ্ছে, পেরেগ্রিনাস অর্থ অচেনা। তবে ওয়েবসাইট ঘেটে ফ্যালকো পেরেগ্রিনাস শব্দের ব্যুৎপত্তি ঘেটে বের করলাম পর্যটক বা ভবঘুরে শব্দটাই বেশি মানানসই। পাখিটার পিঠের রং কালচে ধূসর , শরীরের নিচের দিকে লালচে রঙ। মাথায় কালো আবরণ, পেট ও রানে কালো ডোরা। হলদে ঠোঁটের মাথার রং কালচে, চোখ আর মুখ যেখানে মিশেছে সেখানের রং উজ্জ্বল হলুদ। চোখ গাঢ় বাদামি, পা আর পায়ের পাতা হলুদ। সব মিলে অদ্ভুত এক রাজকীয় পাখি বসে আছে সামনের টাওয়ারে। আর এদিকে ক্যামেরায় ক্লিক চলছে সমানে।ছবি খুব সুবিধার হচ্ছে না দূরত্বের কারণে। তারপরও তাই সই!! এর মধ্যেই অফিস থেকে চলে এসেছেন রওশন ভাই, আর পাখি দেখতে ইশরাত। আর আমার সামনে আগে থেকেই ছিল মিরন।
প্রত্যাশার কাছাকাছি ছবি:

হঠাৎ পাখিটা নড়ে চড়ে বসল। অনেকক্ষণ থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক- ওদিক দেখছিলো। মূলত ভোর আর গোধূলীটাই তাদের শিকার ধরার সময়। তাই আশপাশ জরিপ করে নিচ্ছিলো বারবার। হঠাৎ লেজটা উঁচু করে ডাইভ দিয়ে অনেকখানি নিচে নেমে বাড়িঘরের আড়াল হয়ে গেল। ২ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলো। খালি পায়ে- শিকার জোটেনি। মিনিট দশেক পর আবারো ডাইভ- এক লাফে অনেকটা নেমে হাওয়ায় ডানা ভাসিয়ে ছুটে চলল। এক মিনিটের মধ্যেই আবার ফিরে এলো পায়ে একখানা চড়–ই নিয়ে। চিতা পযববঃধয (চিতাবাঘ/ খবড়ঢ়ধৎফ নয়) পৃথিবীর দ্রুততম স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার রেকর্ড ঘন্টায় ১১২ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে দৌড়ানোর! পেরেগ্রিন ফ্যালকনের গতির কাছে সে নস্যি। কারণ শিকারের সময় কমবেশি এই পাখির গতি থাকে ঘন্টায় ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৭৯ কিলোমিটার। পৃথিবীর দ্রুততম শিকার দেখার সৌভাগ্যই ক’জনের হয়, তাও আবার ঢাকা শহরে বসে?
চড়–ইটি শেষ করতে ফ্যালকনের চার মিনিটের কিছু কম সময় লাগলো। পালক পরিষ্কার করে শুধুমাত্র মাংসল অংশটাই পেরেগ্রিনের খাবার। প্রথমে ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে খানিকক্ষণ খাওয়ার পর শেষ অংশটা গিলে ফেলল মাথা উপরের দিকে তুলে। তারপর আরো মিনিট দশেক বিশ্রমি নিয়ে সন্ধ্যার আঁধাওে ডানা মেলে হারিয়ে গেলো এই পাখি। কোন এক বাড়ির সানশেড বা ছাদে, কিম্বা এসির উপরে বসে রাত কাটিয়ে দেবে পাখিটা।

ঢাকা শহরের জনবহুল এলাকায় পেরেগ্রিন ফ্যালকন দেখা যেমন বিস্ময়ের, তেমনি আশা জাগানিয়া। এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি ঢাকার। কংক্রিটের সাথেও রাতকে ভাগ করে নিতে আপত্তি নেই এই পাখির। তার মানে এখন থেকে যদি আমরা বেশি করে গাছ লাগাতে শুরু করি, ঢাকাতে অন্তত কিছু পাখির আশ্রয় তৈরি করে দিতে পারি, তাহলে আরো অনেক বেশি পাখির বৈচিত্র্য ঢাকায় বসেই দেখা সম্ভব। আর বাড়তি লাভ- আরো কিছু অক্সিজেন ফ্যাক্টরি, আরো সবুজ, আরো সীসামুক্ত বাতাস।

৩ thoughts on “পেরেগ্রিন শাহীন দেখার গল্প

  1. আপনার পোস্টের অপেক্ষায় থাকি
    আপনার পোস্টের অপেক্ষায় থাকি বস। ফোন নাম্বার তো আছেই নেক্সট টাইম পাখি দেখতে গেলে মনে করে আওয়াজ দিয়েন। পোস্টের কথা আর কি কমু। ডাইরেক্ট প্রিয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *