বাড়ি থেকে পালিয়ে

All art expressions should be geared towards the betterment of man- for man. আমি গল্প লিখেছিলাম, তখন দেখলাম গল্পতে কাজ হচ্ছে না। কটা লোক পড়ছে? নাটকে Immediate hit – আরো বেশি লোককে convert করা যায়। I am out to convert. তারপর দেখলাম নাটকের থেকেও ভালো কাজ হচ্ছে সিনেমায়। অনেক বেশি লোককে Approach করা convert করা যায় এতে।So, cinema is important.


All art expressions should be geared towards the betterment of man- for man. আমি গল্প লিখেছিলাম, তখন দেখলাম গল্পতে কাজ হচ্ছে না। কটা লোক পড়ছে? নাটকে Immediate hit – আরো বেশি লোককে convert করা যায়। I am out to convert. তারপর দেখলাম নাটকের থেকেও ভালো কাজ হচ্ছে সিনেমায়। অনেক বেশি লোককে Approach করা convert করা যায় এতে।So, cinema is important.

কথাগুলো মুহম্মদ খসরুর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ঋত্বিক। ঋত্বিক ঘটকের কাজ মূল্যায়ন করতে গেলে তার এই বক্তব্য মাথায় রাখা প্রয়োজন। শিল্পের জন্য শিল্প তত্ত্বে বিশ্বাস ছিল না ঋত্বিকের, তার কিছু বক্তব্য ছিল- সিনেমা করাটাও তার বক্তব্য প্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র। ঋত্বিক ঘটকের সকল কাজে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় বারবার এসেছে আর তা হল দেশ বিভাগজনিত (মূলত বাংলা ভাগ হওয়া) তীব্র বেদনাবোধ এবং আত্মপরিচয় বা শিকড়ের সন্ধান।

আমরা ঋত্বিক ঘটকের তৃতীয় চলচ্চিত্র বাড়ি থেকে পালিয়ে নিয়ে আলোচনা করব এখন। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৫৯ সালে। শিবরাম চক্রবর্তীর গল্প অবলম্বনে এটির চিত্রনাট্য করেন ঋত্বিক। শিবরামের হালকা মেজাজে লেখা গল্পকে ঋত্বিক সিরিয়াস মেজাজেই এঁকেছেন সেলুলয়েডে, চিত্রনাট্যে শিবরামের গল্প হুবহু অনুসরণ করেননি, অনেক সংযোজন-বিয়োজন করেছেন। যেমন হরিদাস চরিত্রটি, এটি গল্পে নেই কিন্তু ঋত্বিক অনেকটা সিম্বলিক ক্যারেক্টার হিসেবে হরিদাসকে হাজির করেছেন ছবিতে। তাছাড়া মূলগল্পে কাঞ্চন বাড়ি ফিরে লটারিতে টাকা জিতে এবং মায়ের জন্য প্রভূত উপহার সামগ্রী নিয়ে কিন্তু ঋত্বিক এই চাকচিক্যের পুরোটায় বাদ দেন। ছবিতে কাঞ্চন বাড়ি ফিরে মায়ের টানে, মাটির টানে বলা ভালো শিকড়ের টানে। তার হাতে থাকে কেবল হরিদাসের মুখোশ, আসছি সে প্রসঙ্গে।

কাঞ্চন একজন দুরন্ত, চটপটে, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় কিশোর। তার পাঠ্য বাইয়ের আড়ালে লুকিয়ে গল্পের বই পড়া, সমস্থ দুরন্তপনা সস্নেহে মেনে নেয় মা। কিন্তু বাবা ভীষণ কড়া অনেকটা সামন্ত প্রভুদের মতই। একদিন বাবার শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা চলে আসে কাঞ্চন। শুরু হয় তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন, স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের বাঁধনহারা যাত্রা। এই যাত্রাপথে তার সাথে পরিচয় হয় বিচিত্র সব মানুষের সাথে, অর্জিত হয় অভিনব অভিজ্ঞতা। একে একে তার সাথে পরিচয় হয় ভাজাওয়ালা হরিদাস, ম্যাজিশিয়ান, পরিচারিকা মা, কনক নামে এক বালিকা এবং তার পরিবার, বোবা সাজা ছেলে, চোর এবং আরো অনেক নিন্ম-আয়ের বেঁচে থাকার যুদ্ধে লিপ্ত মানুষদের সাথে। দেখা যাচ্ছে তাদের প্রায় সকলেই দেশভাগের ফলে গৃহ এবং পরিচয় হারিয়ে ফেলা সর্বহারা উদ্বাস্তু। একদিকে গগনচুম্বী ইমারত, হাওড়া ব্রিজ অন্যদিকে গৃহহারাদের মিছিল, একদিকে অনিয়ন্ত্রিত পান-ভোজন অন্যদিকে খাবার নিয়ে কুকুর মানুষের লড়াই। ধীরে ধীরে স্বপ্ন ভঙ্গ হতে থাকে কাঞ্চনের, রুঢ় বাস্তবতার আঘাতে তার কল্পচারী মনের মোহ ভাঙ্গতে থাকে মৃত চিলের মোটিফে যা দারুণভাবে দেখান ঋত্বিক। এদিকে ছেলের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন কাঞ্চনের মা, তার বাবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন, কাঞ্চনও সিধান্ত নেয় বাড়ি ফিরে যাওয়ার। অবসান হয় তার সাহসী অভিযানের।

কাঞ্চনের সাথে সাথে অভিযান শেষ হয় দর্শকদেরও। কিন্তু বাড়ি থেকে পালিয়ে অটুকুতেই শেষ হয় না, বস্তুত ওইখানেই শেষ হলে এই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ঋত্বিক কুমারের দরকার হত না, হেজি পেজি যে কেউ তা বানাতে পারত। ঋত্বিক একটি দায়িত্ববোধ থেকে শিল্প নির্মাণ করেন, সে দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে কনভার্ট করা, মানুষের মধ্যে বোধের উন্মেষ ঘটানো, তার বক্তব্যকে কনভে করা, দর্শকদের মধ্যে। এই চলচ্চিত্রে সেটা করেন ভাজাওয়ালা হরিদাস চরিত্রটির মাধ্যমে। হরিদাস তার ভাজা বিক্রির সময় মুখোশ পড়েন কেননা বুড়ো সাজলে বাচ্চারা দ্রুত কাছে আসেন আর তার বিক্রিবাট্টাও বেশি হয়। ঋত্বিক যেন বলতে চান এই কলকাতা নগরে আসলে সবাই মুখোশধারী, কোন না কোন স্বার্থ হাশিলের জন্য, মুখোসের আড়ালে ঢাকা পরে আছে মুখগুলো। শেষদিকে হরিদাস যখন বুঝিয়ে সুঝিয়ে কাঞ্চনকে রাজি করান বাড়ি ফিরে যেতে তখন তার মুখোশ দিয়ে দেন কাঞ্চনকে। কাঞ্চন ফিরে যাক মায়ের কাছে, তার প্রকৃত শিকড়ে, হরিদাসেরও আর মুখোশ দরকার নেই। দুজনেরই আত্মপরিচয় সন্ধানের মীমাংসা হয় যেন। আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বটি আরও একটি দৃশ্যে আছে। স্মরণ করুন পার্কে বসে একজন গান গাচ্ছিল ‘নতুন গাছে নতুন নতুন ফুল ফুটিছে’ কিন্তু তার গানে সুর তাল কোনটিই নেই, বুস্তুত শিকড়হীন সুর অসম্ভব।

ঋত্বিকের ট্রিলজি মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধার, সুবর্ণরেখায় যে অর্থে এবং মাত্রায় দেশ বিভাগ এসেছে বাড়ি থেকে পালিয়ে-তে সে মাত্রায় না থাকলেও দেশ বিভাগজনিত হতাশা এবং ক্ষোভ এখানেও আছে। কলকাতায় কাঞ্চনের যে সব মানুষের সাথে পরিচয় হয় তারা কোন না কোনভাবে দেশবিভাগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এবং উদ্বাস্তু। হোটেলে কিছু তরুণের মধ্যে আলোচনাতেও এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখি। যদিও এসব আলোচনা, দৃশ্যাবলীর সংযোজন আরোপিত মনে হতে পারে- পূর্বেই বলেছি নিখাদ শিল্প সৃষ্টি করার চেয়ে ঋত্বিকের ঝোঁক মানুষকে সচেতন এবং শিক্ষিত করার দিকেই।

বাড়ি থেকে পালিয়ে-তে অন্য একটি টেক্সটও আছে, তা হল শিশুর মনস্তত্ত্ব বোঝার প্রতি গুরুত্বারোপ। শাসন নয়, কেবলমাত্র স্নেহ এবং ভালবাসাই একটি সুখি এবং সমৃদ্ধ পরিবার তথা সমাজ গঠনের হাতিয়ার। কাঞ্চন তার মাটি থেকে ছিটকে গিয়ে অনাত্মীয় বৈরি কলকাতা নগরে তার স্বজন খুঁজেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে অনুধাবন করে ‘বাড়িই ভালো’।

৯ thoughts on “বাড়ি থেকে পালিয়ে

  1. ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র দেখি
    ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র দেখি আর ভাবি, উনি কতোটা এগিয়ে ছিলেন চিন্তায় চেতনায় আর চলচ্চিত্র ভাবনায়। বিশ্বের বাঘা বাঘা চলচ্চিত্রকারদেরও টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে উনার চলচ্চিত্রের ভাষা। অথচ আমার মনে হয় সেইভাবে মূল্যায়ন হয়নি উনার। “বাড়ি থেকে পালিয়ে” দেখা হয়নি। দেখতে হবে।

    1. সহমত, তাঁর কাজ সে অর্থে
      সহমত, তাঁর কাজ সে অর্থে মুল্যায়িত হয়নি। টেলিভিশন কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র তেমন প্রদর্শনও করা হয় না। আমি নিশ্চিত বাড়ি থেকে পালিয়ে আপনার ভালো লাগবে। ঋত্বিকের সমগ্র কাজ নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে- এটা অনেকটা সে কাজের নোট হিসেবেই লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *