ক্রুশবিদ্ধ ৪-দ্রোহী : স্পাটাকাস, মুজিব, কর্নেল তাহের আর হুমায়ুন আজাদ

খ্রী. পূর্ব প্রথম শতাব্দীতে ইতালীর শোসিত আর বঞ্চিত দাসগণ মানবাধিকার, অনাচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড সাহস, শক্তি আর বুদ্ধিমত্তাসহ বলকান অঞ্চলে বিদ্রোহ করে। এদের নেতৃত্ব দেন দ্রোহ ও সাহসিকতার বিশ্বপ্রতীক দাস ‘স্পাটাকাস’। মুক্তি আর স্বাধীনতার জন্যে ‘স্পাটাকাস’-এর নেতৃত্বে দাসরা উচুঁ আর বিশাল খাড়া পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে বিশাল রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ও প্রাথমিকভাবে রোমকদের পরাজিত করে। জলপ্রণালী পার হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়াতে ‘স্পাটাকাস’ বাহিনী ইতালীয় ভাড়াটে ‘রাজাকার’ কর্তৃক প্রতারণার শিকার হলে অসীম সাহসী ও মুক্তিপাগল এই বাহিনী দাসনেতা ‘স্পাটাকাস’-এর অনুপ্রেরণায় কেবল হাতে তৈরী ‘ভেলা’ নিয়ে ‘সিসিলি’ পৌঁছার পরিকল্পনা করে।



১. স্পাটাকাস :

খ্রী. পূর্ব প্রথম শতাব্দীতে ইতালীর শোসিত আর বঞ্চিত দাসগণ মানবাধিকার, অনাচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড সাহস, শক্তি আর বুদ্ধিমত্তাসহ বলকান অঞ্চলে বিদ্রোহ করে। এদের নেতৃত্ব দেন দ্রোহ ও সাহসিকতার বিশ্বপ্রতীক দাস ‘স্পাটাকাস’। মুক্তি আর স্বাধীনতার জন্যে ‘স্পাটাকাস’-এর নেতৃত্বে দাসরা উচুঁ আর বিশাল খাড়া পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে বিশাল রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ও প্রাথমিকভাবে রোমকদের পরাজিত করে। জলপ্রণালী পার হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়াতে ‘স্পাটাকাস’ বাহিনী ইতালীয় ভাড়াটে ‘রাজাকার’ কর্তৃক প্রতারণার শিকার হলে অসীম সাহসী ও মুক্তিপাগল এই বাহিনী দাসনেতা ‘স্পাটাকাস’-এর অনুপ্রেরণায় কেবল হাতে তৈরী ‘ভেলা’ নিয়ে ‘সিসিলি’ পৌঁছার পরিকল্পনা করে। কিন্তু বৈরী পরিবেশ আর বিশ্বাসঘাতক ইতালীয় ‘রাজাকার’দের কারণে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে বিশাল ও সম্মিলিত রোমান বাহিনীর হাতে তারা ধরা পড়ে এবং মুক্তিযোদ্ধা ‘স্পাটাকাস’-এর ছয় হাজার অনুসারীকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। যুদ্ধে ‘স্পাটাকাস’-এর শরীরকে অগণিত টুকরা করা হয় বিধায় তাঁর লাশকে চিহ্নিত করা যায়নি। কিন্তু মৃত্যুর আগে ‘স্পাটাকাস’ তার সস্তানসম্ভাবা স্ত্রীকেদৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘অবশ্যই তোমার পেট থেকে আরেক নতুন ‘স্পাটাকাস’ জন্ম নেবে’। নিয়েছিল কিংবা নেয়নি তার খোঁজ আমরা আর রাখিনি কিন্তু ‘স্পাটাকাস’-এর দাসরা এখনো মুক্তি পায়নি এ বিশ্বে। ভূমিদাস, জলদাস, শ্রমদাস এখনো বিশ্বসহ এদেশের ঘরে ঘরে দৃশ্যমান।

২. বঙ্গবন্ধু :

আমাদের বঙ্গবন্ধু! বাংলাদেশ আর বাঙালিকে ভালবাসা ছিল যার আরাধ্য সাধনা। আজীবন একটি পরাধীন, ভীরু, বিদেশী প্রভূদের বশ্যতাস্বীকারকারী, স্বাধীনতার চেতনাহীন, নানা প্রপঞ্চে বিভক্ত একটি জাতিকে একাত্তরে অত্যন্ত কৌশলী ভূমিকা নিয়ে, ৭ মার্চের ‘অর্ফিয়াসের অনন্ত বাঁশি’ শুনিয়ে, মাত্র ন’মাসের মরণজয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। আর মাতৃভূমি আর স্বাধীনতার প্রতি আসক্ত এই মানুষটিকেও ‘স্পাটাকাস’-এর মত পচাত্তরে ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করলো রাজাকার আর তাদের একাত্তরে পরাজিত অনুসারীরারা। আর কত কুৎসা-ই না রটালো তাঁর এ জাতি ও বিশ্বের সামনে! ‘স্পাটাকাস’-এর অনুসারীদের মত তার অনুসারী চার মহান বীর নেতাকেও ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করে হত্যা করলো জেল অভ্যন্তরে। অগণিত সৈনিককে হত্যা করা হলো নানা ঘটনা পরম্পরায়। আর ‘কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ’ করতে করতে কত শাসকগণই (!!) ‘দেশপ্রেমিক সেজে’ এদেশকে কত কিছুই না উপহার দিল দীর্ঘ শাসনে! এদেশের ঘরহীন, ভূমিহীন, অধিকারহীন ‘দাস’রা দেখলো যা প্রায় চল্লিশ বছর।

৩. কর্নেল আবু তাহের :

কর্নেল আবু তাহের বীরউত্তম। যিনি ‘স্পাটাকাস’-এর মত স্বাধীনতা যুদ্ধে পা হারান একটি। ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতেন। সেনা সদস্য হিসেবে একটি উৎপাদনশীল, নির্লোভ, গণমুখী সেনাবাহিনী চাইতেন, যারা এদেশের বঞ্চিত মানুষের পাশে এসে তাদের জন্যে কাজ করবে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মত ‘ব্যারাক আর্মির’ পরিবর্তে উৎপাদনশীল আর্মি ভালবাসতেন তিনি, তাই কুমিল্লা সেনানিবাসে একবার ফলিয়েছিলেন ‘সেনা-কৃষক’ দিয়ে আনারস ফসল। শোষণমুক্ত, গণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে লুটেরা, ধর্মাশ্রয়ী, পুঁজিবাদের ধ্বজাধারীদের বিরুদ্ধে দেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলে তিনি। জাসদের রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুর সরকারের সঙ্গে যদিও তাঁর রাজনৈতিক বৈরিতা ছিল কিন্তু দেশপ্রেমে ঘাটতি ছিলনা তাঁর। মৃত্যুর আগে ব্যাংক হিসাবে রক্ষিত দু’শ টাকার মালিক এ দেশপ্রেমিক মানুষটিকে জিয়াউর রহমানের সামরিক ট্রাইবুনাল অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ‘স্পাটাকাস’-এর মত ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করে হত্যা করলো। অপরাধ দেশপ্রেম!

৪. ড. হুমায়ুন আজাদ :

এবং ড. হুমায়ুন আজাদ। এক সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এখন মৃত এক অতি ‘সাধারণ মানুষ’ হিসেবে যিনি শুয়ে আছেন নিজ গ্রাম রাড়িখালে। কিন্তু এই আজাদ ছিলেন এক অসাধারণ চিস্তাধারী কিংবদন্তীদেশপ্রেমিক পুরুষ, যাকে এদেশের মানুষ চিনতে পারেনি। আর পারলেও চিনেছে খুব কম মানুষেই। এ জন্যে তিনি নিজেই আক্ষেপ করে বলে গেছেন, ‘‘আমি বেঁছে ছিলাম, বেড়ে উঠেছিলাম, জন্মেছিলাম অন্যদের সময়ে’’ অর্থাৎ যারা তাকে চিনতে পারেনি তাদের মাঝে জন্মেছিলেন তিনি। আবার বলেছিলেন, ‘‘তোমরা কখনো আমায় এ বাংলাদেশের কথা জিজ্ঞেস কর না, জানতে চেয়োনা তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের কথা’’। এদেশের বিষ্ময়কর এ প্রতিভা একাধারে কবি, ভাষা বিজ্ঞানী, প্রাবন্ধিক, গল্পকার আর অসাধারণ নির্ভেজাল সৎ সমালোচনা ছাড়াও সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করেছিলেন তিনি। ১২ আগস্ট ২০০৪ এ মিউনিখে নিসঙ্গ শেরপা হিসেবে যার মৃত্যু ‘স্পাটাকাস’-এর মতই। তার রচনার নাম দেখলেই বোঝা যায় এই মানুষটি কতটা প্রথাবিরোধী, সত্যনিষ্ঠ, বহুমাত্রিক আর দেশপ্রেমিক ছিলেন। জ্বলো চিতাবাঘ, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, সব কিছু ভেঙে পড়ে, মানুষ হিসেবে আমার অপরাধ সমূহ, কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ, ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ, নরকে অনন্ত ঋতু, আমার অবিশ্বাস, ধর্মানুভূতির উপকথা ও অন্যান্য ভাষাবিজ্ঞান, বুক পকেটে জোনাকিপোকা -এর ভেতরেই খুঁজে পাওয়া যাবে এদেশের অনন্ত প্রতিভা হুমায়ুন আজাদকে। মৌলবাদীরা তাঁকে এদেশে থাকতে দেয়নি। নিজ প্রিয় মাতৃভূমি থেকে তাঁকে বিতারণ করে নিয়ে গেছে জার্মানীতে, যেখানে তাকে নিসঙ্গ এক হোটেলে অত্যন্ত সঙ্গোপনে ‘ক্রশবিদ্ধ’ করে যাবে ‘স্পাটাকাস’, ‘বঙ্গবন্ধু’ আর ‘তাহের’এর মত।

দেশপ্রেমিক দ্রোহী এ মানুষগুলো চিরদিন কি ‘ক্রুশবিদ্ধ’ই হবে, এদের অনুসারী ‘দাস’রা কি আদৌ মুক্তি পাবে না? মধ্যযুগীর রোমক বাহিনী কি এ যুগেও ‘রাজাকার-হেফাজত’ নাম ধারণ করে স্বাধীনতাকামীদের ‘ক্রুশবিদ্ধ’ করতেই থাকবে?

লেখকের ফেসবুক ঠিকানা [ধর্মান্ধতামুক্ত যুক্তিবাদিদের ফ্রেন্ডভুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাই ] : https://www.facebook.com/logicalbengali

২৩ thoughts on “ক্রুশবিদ্ধ ৪-দ্রোহী : স্পাটাকাস, মুজিব, কর্নেল তাহের আর হুমায়ুন আজাদ

  1. স্পাটাকাস :নিয়ে একটা মুভি আছে
    স্পাটাকাস :নিয়ে একটা মুভি আছে “স্পাটাকাস ” ছবির নাম প্রায় ৩৬ পর্বের মনে হয় ।। কাহিনী অনেকটা আপনার লেখার মত আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা ডকুমেন্ট্রি টাইপের ছবি আছে ” পলাশী থেকে ধানমন্ডি” ২ টায় দেখা আছে আমার …… আপনিও যদি না দেখে থাকেন দেখে নিতে পারেন …… সুন্দর লেখা …… :মুগ্ধৈছি:

    1. ধন্যবাদ, দুটো ছবিই দেখার
      ধন্যবাদ, দুটো ছবিই দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। মানুষ মাত্রই ভাল-মন্দের মিশ্রণ। কেউ স্বার্থের জন্য মানুষ হত্যা করে (এমনকি নিজের মা-বাবা পর্যন্ত) আবার কেউ মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে। সত্যিই বিচিত্র মানুষের জীবন ও ভাবনা।

    1. আমি বাঙ্গালী । আমি অনন্য ।
      আমি বাঙ্গালী । আমি অনন্য । আমি অজেয় । আমি কালোওীর্ণ । জয় বাংলা ।।

      আবেগময়ী উপর্যুক্ত ৪টি মন্তব্যের মূল্য আবেগ ছাড়া আর কিছু আছে কিনা আমার সন্দেহ! এ বিষয়ক পোস্ট দিলে আপনার বাঙালি সম্পর্কে চিন্তন পাল্টাবে!

  2. ভাল লাগল…চমৎকার বিশ্লেষণ!!
    ভাল লাগল…চমৎকার বিশ্লেষণ!! তবে এতো পূর্বের ইতিহাসের সাথে তুলনা না করে চে’র সাথে তুলনা করলে ভাল হত। তাহলে মনেহয় পটভূমির মিল আরও বেশী থাকতো…
    নিয়মিত লিখুন :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি: :অপেক্ষায়আছি:

    1. হ্যা চেকেও দিতে পারতাম,
      হ্যা চেকেও দিতে পারতাম, তারপরো লিখে ফেললাম ঐ ৪জনকে নিয়ে। আমি লিখবেো আপনাদের এখানে নিয়মিত, পড়ার অনুরোধ জানাই, আমার ফেবুকে আসলে খুশি হবো

    2. হ্যা চেকেও দিতে পারতাম,
      হ্যা চেকেও দিতে পারতাম, তারপরো লিখে ফেললাম ঐ ৪জনকে নিয়ে। আমি লিখবেো আপনাদের এখানে নিয়মিত, পড়ার অনুরোধ জানাই, আমার ফেবুকে আসলে খুশি হবো

    1. ধন্যবাদ। জয় বাংলা। আমি লিখবেো
      ধন্যবাদ। জয় বাংলা। আমি লিখবেো আপনাদের এখানে নিয়মিত, পড়ার অনুরোধ জানাই, আমার ফেবুকে আসলে খুশি হবো

    1. অবাস্তব স্বপ্নচারীকে আন্তরিক
      অবাস্তব স্বপ্নচারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ভাল থাকুন। :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

  3. চমৎকার বিশ্লেষণ… আপনার
    চমৎকার বিশ্লেষণ… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: আপনার পোস্টগুলো একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে… :ধইন্যাপাতা: :বুখেআয়বাবুল:

  4. ধন্যবাদ মাইকেলকে
    ধন্যবাদ মাইকেলকে অনুপ্রেরণাদায়ক বাক্যের জন্য। আপনি কি বাঙালি? নাম বিভ্রান্তিতে পড়েছি। ভাল থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *