নিঃসঙ্গতা

একটা সময় আমি একা থাকতে চাইতাম। সেই চাওয়াটা এতই প্রবল ছিল আজ আমি সত্যি একা থাকি। আমার আশেপাশে কোন আপন মানুষ নেই। যারা আছে তাদের আমি পরিচিত বলতে পারি, আপন নয়। নিজেকে সবকিছু থেকে এতই গুটিয়ে নিয়েছি যে আজ আমার বন্ধু বলেও কেউ নেই। আমার যে বন্ধু ছিল না তাও কিন্তু না, এক সময় সবই ছিল, বন্ধু আড্ডা, উচ্ছলতা প্রানবন্ততা সজীবতা উদ্যমতা আবেগ ভালোবাসা । খুব সাধারণ ছিল না চিন্তা ভাবনা। আট দশ জন থেকে আলাদাই ছিলাম। বাকিরা যা চায় আমি তা খুব কমই চাইতাম। সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল স্বাধীনতা। মুক্ত হতে চেয়েছিলাম, উড়তে চেয়েছিলাম, দূরে যেতে চেয়েছিলাম, আবার কাছেও আসতে চেয়েছিলাম। কাছে আসা ছাড়া বাকি সবই করতে পেরেছি।

একটা সময় আমি একা থাকতে চাইতাম। সেই চাওয়াটা এতই প্রবল ছিল আজ আমি সত্যি একা থাকি। আমার আশেপাশে কোন আপন মানুষ নেই। যারা আছে তাদের আমি পরিচিত বলতে পারি, আপন নয়। নিজেকে সবকিছু থেকে এতই গুটিয়ে নিয়েছি যে আজ আমার বন্ধু বলেও কেউ নেই। আমার যে বন্ধু ছিল না তাও কিন্তু না, এক সময় সবই ছিল, বন্ধু আড্ডা, উচ্ছলতা প্রানবন্ততা সজীবতা উদ্যমতা আবেগ ভালোবাসা । খুব সাধারণ ছিল না চিন্তা ভাবনা। আট দশ জন থেকে আলাদাই ছিলাম। বাকিরা যা চায় আমি তা খুব কমই চাইতাম। সবচেয়ে বড় চাওয়া ছিল স্বাধীনতা। মুক্ত হতে চেয়েছিলাম, উড়তে চেয়েছিলাম, দূরে যেতে চেয়েছিলাম, আবার কাছেও আসতে চেয়েছিলাম। কাছে আসা ছাড়া বাকি সবই করতে পেরেছি।
সব দিক থেকেই আমাকে স্বাধীন বলা যায়। অর্থনৈতিক পারিবারিক মানসিক সামাজিক। শেষেরটি মাঝে মাঝে সমস্যা করে। কিন্তু সেটার সমাধানের জন্য অর্থনৈতিকটা এগিয়ে আসে। এই অবস্থানে আসতে যে পথটি পারি দিতে হয়েছে তা কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। চিরচেনা সবকিছু, সব মানুষের সাথে মোটামুটি একটি যুদ্ধ করে এই অবস্থানে এসেছি। এসে আজ আমি থেমে গিয়েছি। ঠিক কতদিন ধরে নিজেকে গতিহীন মনে হচ্ছে জানি না। তবে ইদানিং একটু বেশি হাহাকার জাগছে। কিসের জন্য হাহাকার , তন্ন তন্ন করে খুঁজছি। কিন্তু খোঁজার মধ্যেও কোথাও একটা অলসতা টের পাচ্ছি। কীভাবে এই অলসতা দূর করবো জানি না। প্রশ্নহীন উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছি। হয়তো উত্তরটি জানা কিন্তু প্রশ্ন অজানা। আমি শুধু এটুকুই বুঝতে পারি আমি থেমে আছি। একাকীত্ব ভীত করছে।

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা অনেকদিনের অভ্যাস। কিন্তু কয়েকদিন ধরে চোখ খুলতে আমার ভয় লাগে। বস্তু ছাড়া আমি কোন প্রাণী দেখতে পাই না। অথচ মানুষহীন এই বাসায় আমি সাত বছর কাটিয়েছি। বাসার কাজের জন্য একজনকে রাখা হয়েছে। তাকে প্রয়োজন ছাড়া কখন দেখি না। দিন শুরু হয় ট্রেডমিলে এক ঘণ্টা দৌড়িয়ে। তারপর গোসল , নাস্তা এরপর অফিস। আজ না দৌড়িয়ে সোজা বারান্দায় চা নিয়ে বসলাম। কয়েকটি ছন্নছাড়া গাছ কিছু মানুষ কয়েকটি বিল্ডিং দেখলাম। আমি অলস ভাবে কিছু খুঁজতে থাকি। চোখে পড়ে এক দম্পতি। পুরুষটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে আছে। নারীটি চা খাচ্ছে। আমি আমার পাশের খালি চেয়ারে তাকাই। এখানে এখন কেউ থাকলে কি আমি সুখি বোধ করতাম? কেউ যদি আমার পাশে বসে জিজ্ঞেস করতো কেমন আছি, ভালো লাগতো আমার? নাকি কেউ আমার দিকে না তাকিয়ে নিচে তাকিয়ে থাকতো আমার কোন অনুভূতিই হতো না? এখন যে আমি একা চেয়ারে বসে আছি এতে আমার এতো নিঃসঙ্গ লাগছে কেন? এই নিঃসঙ্গতার সাথে আমি বছরের পর বছর বসবাস করছি। এই নিঃসঙ্গতা আমার চিরচেনা। এই নিঃসঙ্গের চেয়ে কারো উপস্থিতি বেশি উপভোগদায়ক হতো? আমি বুঝতে পারি না। আমি প্রশ্ন খুঁজতে থাকি।
আমি উঠে গোসল করি অনেক সময় নিয়ে। নাস্তার টেবিলে মরিয়মকে ডাকি। গত সাত বছর ধরে ওই আমার সব কাজ করে দেয়।

“তোমার বাচ্চারা কেমন আছে?
“ভালো আছে আপা। ছোটটার জ্বর ভালো হইছে।
“বড়টা স্কুলে যায় ঠিক মতো ?
“ জি আপা, ভালোই পড়াশুনা করতাছে”
“ ভালো , কিছু লাগলে চেয়ে নিয়ো।

আমি তৈরি হয়ে অফিসের উদ্দেশে গাড়ি বের করি। ড্রাইভার আমি তেমন একটা সাথে নেই না। অনেকটা বিনা কাজেই সে মাস শেষে বেতন নিয়ে যায়। ড্রাইভার রাখা মার জন্য। সে কিছুতেই ড্রাইভার বিদায় করবে না। যখনই কানাডা থেকে ফোন করে তখনই জিজ্ঞেস করে ড্রাইভার আছে কিনা, নিজে যাতে না চালাই। আমি হাসি। গাড়ি চালানো আমার শখ। সেটা মাকে বুঝানো যায় না। বাকি মা’দের মতো উনারও ইচ্ছে ছিল আমাকে স্বামী সহ দেখবে। এই ইচ্ছে যেহেতু পূরণ করি নি তাই বাকি ইচ্ছে গুলো সবই পূরণ করার চেষ্টা করি। থাক না একটি ড্রাইভার। অসুবিধা কি। আছে আমার দেওয়ার মতো। নিয়ে যাক মাস শেষে।

পুরো পথ আমি মরিয়মের কথা ভাবি। ওর একটি স্বামী আছে, দু’টি সন্তান আছে। স্বামীটি তাকে মারধোরও করে না। যখনই তাকে দেখি মুখে হাসি লেগে থাকে। দেখতে আমার ভালো লাগে। সুখি মানুষ আমাকে সুখি করে। নিজেকে আমি মরিয়মের জায়গায় কল্পনা করি। আমারও যদি একটি স্বামী থাকতো দুটি সন্তান থাকতো তবে কি আমিও মরিয়মের মতো সুখি হতাম? আমার মুখেও এমন হাসি লেগে থাকতো? এই নিঃসঙ্গতা তখন কি থাকতো না? এখন যেমন আছি, যখন যা খুশি করতে পারি , যেখানে খুশি যেতে পারি , কোন বাধা নেই, কোন পিছুটান নেই। সেটা কি স্বামী সন্তান দিয়ে পূরণ হয়ে যেতো?

আমি কি একটি স্বামীর অভাব বোধ করছি? সন্তানের অভাব বোধ করছি? মা হওয়ার সাধ জেগেছে? নয় মাস পেটের ভেতরে কোন মানুষের অস্তিত্ব অনুভব করতে ইচ্ছে করছে? যে নিঃসঙ্গতাকে আমি এতো বছর ধরে সঙ্গী করে রেখেছি তাকে কি এখন আর ভালো লাগে না? পুরনো হয়ে গেছে ? নতুন কিছু চাই? আমি বুঝতে পারি না। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকি।

অফিসেও আমি অলস ভাবে সময় কাটাতে থাকি। ইদানীং কোন কাজেই মন দিচ্ছি না। অনেকেই এসে জানতে চায় শরীর খারাপ কিনা। যতটা না জানতে চায় তার চেয়ে বেশি দেখতে আসে আমাকে। যাদের কারো কারো দিনে একবার আমাকে না দেখলে রাতে ঘুম হয় না। আমি ভেতরে ভেতরে হাসি। তাদের জন্য হাসি ছাড়া আমার দেওয়ার কিছু থাকে না। তাদের সঙ্গ আমার ভালো লাগে না। যতটুকু কাজের জন্য দেওয়া প্রয়োজন সেটা ছাড়া আমি খুব কৌশলে তাদের এড়িয়ে যাই। তাদের আমাকে নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ। কেন আমি বিয়ে করি নি? কেন আমি একা থাকি ইত্যাদি ইত্যাদি। সব প্রশ্নের একটাই উত্তর। হাসি। যা পেয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এদের মধ্যে সবাই যে ওই একটি চিরাচরিত উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কাছে আসে তা কিন্তু না। কেউ আসে যাদের চোখে আমি সত্যি আমার জন্য অনুভূতি দেখি। মাঝে মাঝে আমার এটা ভালো লাগে। ইছে করে আমারও ভেতরে কোন অনুভূতি জেগে উঠুক। কারো জন্য একটু উন্মাদ হই। রক্তে হাহাকার দেখা দিক। কাউকে দেখে বুকের কম্পন বেড়ে যাক। কাউকে খুব কাছে পাওয়ার জন্য শরীরে আগুন জ্বলুক। কিন্তু আমি পারি না। সাত বছর ধরে আমি কারো জন্য অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারি নি। কারো জন্য আমার ভেতরে অস্থিরতা জাগে নি। তবে মাঝে মাঝে শরীরে অস্থিরতা জেগেছে। তবে সেটা নির্দিষ্ট কোন পুরুষের জন্য না। সহজাত প্রবৃত্তির অংশ হিসেবে আমার শরীরেও কামনা জাগে। অনেকবার ভেবেছি এই কামনা কোন পুরুষ দিয়েই নিবারন করবো। কিন্তু প্রতিবারই আমি ব্যর্থ হয়েছি। কোন পুরুষের কাছে আমি পা বাড়াতে পারি নি। মনের অনুভূতি জাগাতে পারি নি বলে শরীরটাকে কাউকে দিতে পারি নি। অগত্য নিজেকে দিয়েই নিবারন করেছি।

অফিসের একটি ফোন করতে গিয়ে হঠাৎ একটি নাম্বারে চোখ আঁটকে যায়। কিছুক্ষণের জন্য বুক আমার থেমে যায়। এখনো এই নামটি দেখলে আমি অস্বাভাবিক হই? আশ্চর্য, এতো বছর আমি তাঁকে নিয়ে ভাবি নি। কখনো তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করি নি। পরিপূর্ণ ভাবে তাঁকে আমি ত্যাগ করেছিলাম। কখনো এও ভাবি নি সে থাকলে আমি সুখি হতাম, সে থাকলে জীবন পূর্ণ হতো। সে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তাঁকে নিয়ে কখনো আক্ষেপ করবো না। এই জীবন আমার। সম্পূর্ণ ভাবে আমার। একে আমি আমার নিজের ইচ্ছের মতো সাজাব, গড়বো, পরিবর্তন করবো। এই প্রতিজ্ঞার একদিনও নড়চড় হয় নি।

শুধু প্রথম এক মাস আমি মৃত ছিলাম। রক্ত মাংসের শরীরে আমি জীবন্ত লাশ ছিলাম। আমার স্বাভাবিক কোন অনুভূতি কাজ করতো না। শুধু বুকে এক তীব্র ব্যথা অনুভব করতাম। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হতো। স্থির হয়ে থাকা কাকে বলে ভুলে গিয়েছিলাম। অবিরত তার ফিরে আসার অপেক্ষায় আমি ভয়ংকর রকমের অস্থির হয়ে থাকতাম। রাতে আমি ঘুমাতে পারতাম না। একটু তন্দ্রা আসলেই আহত পশুর মতো গোঙাতে থাকতাম। বুক ফেটে যেতো । সন্ধ্যা বেলায় নিঃশব্দে নির্মম আর্তনাদ করতাম।

অবশেষে আমি নিজেই উঠে দাঁড়াই। কারো সাহায্য আমি নেই নি। শুধু নিজেকে একটি প্রশ্নই করি, “ যে আমাকে কোন কারণ ছাড়া কিছু না বলে চলে যেতে পারে তার ফিরে আসার জন্য কেন অপেক্ষা ? যে আমাকে কোন অপরাধ ছাড়াই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তার জন্য কেন হাহাকার?
সেই থেকে আমি নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করি। সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে আমার চাকরিতে। উঠে পড়ে রাত দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমি এমন অবস্থান তৈরি করি যেখানে আমার একটি শক্ত পরিচয় থাকে, সাথে থাকে কিছু ক্ষমতা। আমি চেয়েছিলাম সম্পূর্ণ একা থাকতে। কারো কোন রকমের সঙ্গ ছাড়া। যেখানে আমার স্বাধীনতায় কেউ কখনো কোন রকমের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কাউকে আমার জীবনের অংশ বানাবো না। আমি শুধু নিজেকে নিয়েই বাঁচবো। আমি করেছি। এর জন্য সবচেয়ে কষ্ট দেই আমার মাকে। তার কোন কান্না কোন অনুনয় আমাকে গলাতে পারে নি। আমার একটাই জবাব ছিল তাঁকে দেওয়ার মতো “ আমার জীবনে এমন কোন অভাব নেই যা পূরণের জন্য আমাকে বিয়ে করতে হবে”

সমাজের ভয়ংকর দৃষ্টিও ছিল আমার উপর। নারী শব্দটির সাথে স্বাধীনতা যে যায় না। নারী কখনো একা থাকতে পারে না। তার স্বামী লাগে, সন্তান লাগে। একটি সংসার লাগে। এসব ছাড়া নারী অপ্রয়োজনীয়। এসব ছাড়া নারী অসম্পূর্ণ। এসব ছাড়া নারী মূল্যহীন। কিন্তু আমি জানতাম আমি মানুষ। আমার একটি আলাদা স্বতন্ত্র সত্ত্বা আছে। যে সত্ত্বার জন্য স্বামী সংসার সন্তান মুখ্য নয়। এসব ছাড়াও জীবন সম্ভব, সুন্দর, উপভোগ্য।

সমাজের প্রতিটি স্তরে আমার জন্য প্রশ্ন ছিল। চেনা জানা সুসম্পর্কীয় দূসম্পর্কীয় কাছের দূরের আত্মীয়,পাশের বাসার বৃদ্ধ বৃদ্ধা, নিচের তলার আঙ্কেল, মুদির দোকানদার, মুরগিওয়ালা, মাছওয়ালা, বাসার দারোয়ান সবার একই প্রশ্ন। আমারও দুটি উত্তর। এক আমার হাসি, দুই আমার পেশাগত পরিচয়। দ্বিতীয়টার জন্যই আমি এদের সবাইকে অতিক্রম করতে পেরেছি। অতিক্রম আমাকে এখনো করতে হয়। আমৃত্যু হয়তো আমাকে অতিক্রম করেই যেতে হবে।
বিভিন্ন বাক্যবাণ যখন আমাকে জর্জরিত করতে পারে নি তখন আমার মাকে জর্জরিত করেছে। মাকে এসব থেকে মুক্তি দিতেই অনেকটা জোর করেই ভাইয়ার কাছে কানাডায় পাঠিয়ে দিলাম। আমি রয়ে গেলাম একা। সম্পূর্ণ একা। যেমনটা থাকতে চেয়েছি।

কিন্তু আজ বহুদিন পর নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছে। সেদিন বিকেলে একটি শপিং মলে হঠাৎ আমি থমকে যাই। আমার সামনে অন্যজনও থমকে যায়। জয় এগিয়ে এসে প্রথম কথা বলে। এত বছর পর সে আমাকে চিনতে পেরেছে, আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। তার আওয়াজ শুনতে পেরে আমার ভেতরে ঝড় বয়ে যায়। আমি ভেতরে ভাঙতে থাকি। অনেক কষ্ট করে নিজেকে খুব শক্ত রাখি।

“কেমন আছো”
“তুমি চিনতে পেরেছ আমাকে?
“তুমিও চিনতে পেরেছ”
“আমার চিনা উচিত হয় নি, কিন্তু চিনেই ফেললাম”
এ কথা শুনে জয়ের চেহারা মলিন দেখায়। তার মলিন চেহারা দেখে আমি খুশি হই।
নিস্তব্ধতা ভেঙে জয় বলে “ চলো কোথাও বসি। বসবে?
আমি অবাক হই। জয়ের আহ্বানে আমার সাড়া দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বলি উল্টোটা, “ যেতে হবে, কাজ আছে”
জয়কে আমি ভাঙতে দেখি। যা আমাকে সুখ দেয়।
“ফোন নাম্বার রাখো, যদি কখনো ইচ্ছে করে ফোন দিয়ো”
আমি ফোন নাম্বার নেই। কিন্তু আমারটি দেই না। আমার ইচ্ছের উপরে নির্ভর করবে তাঁকে ফোন দেওয়া।

সেখান থেকে চলে আসি। এরপর আজ চোখে পড়লো তার নাম্বারটি। আমার ইচ্ছে করে তাঁকে ফোন দিতে। আমি ইচ্ছেটি পূরণ করি। অপর পাশে আমি তীব্র খুশি অনুভব করি। সে হয়তো ভেবেছিল আমি তাঁকে ফোন করবো না। কথা বলার সময় আমার বুক কাঁপতে থাকে। নিজের হৃৎস্পন্দন নিজেই শুনতে থাকি। তাঁকে আমার দেখতে ইচ্ছে করে। আমার বাসায় তাঁকে নিমন্ত্রন জানাই।

একটি নীল শাড়ি পরি। নীল তাঁর পছন্দের রঙ। সন্ধ্যার পর মরিয়ম চলে যায়। সম্পূর্ণ ফাঁকা বাসায় আমি জয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। বহুদিন পর আমি এমন উত্তেজনা অনুভব করি। আমার ভালো লাগে।
জয়কে দেখে আমি আগের মতই মুগ্ধ হচ্ছি, যেমনটা আগে তাঁকে দেখলেই প্রতিবারই হতাম। আমার সাত বছর পুরনো অনুভূতি আবার আগের মতো নাড়া দিচ্ছে আমাকে, আমি এতেই বিহ্বল হয়ে পরি। যতটা সম্ভব আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। এই সময়কে আমার সাত বছর আগের সময় বলে মনে হয়। যেখানে আমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে শুধু জয়ই ছিল।
খাওয়া শেষে তাঁকে আমি আমার বেডরুমে নিয়ে যাই। আমি আর স্থির থাকতে পারি না। জড়িয়ে ধরি তীব্র আবেগ দিয়ে। আমার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। এতো জোরে বুকে কম্পন বেড়ে যায় যে মনে হচ্ছে এখনই বন্ধ হয়ে যাবে। তাঁকে আমার সব শক্তি দিয়ে ঝাপটে ধরি। আমার গাল বেয়ে জল গড়াতে থাকে। আমি বাধা দেই না। অনেকদিন আমার চোখ শুকনো ছিল। আজ ভেজাতে ইচ্ছে করছে। এতো বছরের জল আজ সব বের হয়ে যাক।

জয়ের বাহুবন্ধনে আমি যখন মুষড়ে ছিলাম তখনই সে বলে উঠে
“আমার তোমাকে কিছু কথা বলা উচিত”
“আমার শোনা উচিত না”
“প্লীজ আমাকে বলতে দাও, কেন আমি চলে গিয়েছিলাম”
“আমি এখন শুনতে চাই না, সেই সময় আমি পার করে এসেছি”
“আমি এক সাপ্তাহ পর জাপান চলে যাবো, ওখানেই থাকি আমি। দেশে এসেছি তিন মাস। প্লীজ আমাকে বলতে দাও কেন এমন করেছিলাম। ক্ষমা চাইতে দাও”
“আমি অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছি”
“তবুও……

আমি তড়িৎ বেগে জয়ের ঠোঁটে চুমু বসিয়ে দেই। দুজনের নিঃশ্বাসের ভারী আওয়াজ ছাড়া পুরো রুম জুড়ে আর কিছু থাকে না। আমরা উন্মাদ হয়ে যাই। আদিম উন্মাদনায় একে অপরের ভেতরে ডুবে যাই।
অনেকদিন পর একটি সকাল আমি পাই যখন আমি চোখ খুলে ভয় পাই না। আগের মতো সব কিছু পরিচিত মনে হয়। আমি ভেতরে সুখ অনুভব করতে থাকি। চঞ্চল হতে থাকি। জয় ঘুম ভেঙে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকভাবেই কিছু বলতে চায়। আমি কোন সুযোগ দেই নি তাঁকে। আমার কিছু শুনার দরকার নেই। কোন কারণ জানার প্রয়োজন নেই । কেন ছেড়ে গেছে সে, বিয়ে করেছে কিনা বাচ্চা আছে কিনা, কিছুই আমার জানার যোগ্য না। কোন কারণ আমার জীবনকে পরিবর্তন করতে পারবে না আর। যে রূপে একে সাজিয়েছি সেই রূপ থেকে বের হতে চাই না। জয়কেও আমি সব সময়ের জন্য চাই না। সে এসেছিলো কিছু মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্ত উপভোগ্য ছিল, আনন্দদায়ক ছিল, সুখকর ছিল, অকল্পনীয় ছিল। জীবনে কিছু স্মৃতি দরকার যা বহন করতে ইচ্ছে করবে আজীবন। গতরাতে আমি তেমনি একটি স্মৃতি পেয়েছি। এর চেয়ে বেশি আমি চাই না।

জয়কে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসের জন্য রওনা দেই। ওর চেহারা দেখে বুঝছি ও ভেতরে বিধ্বস্ত । হাহাকার করছে, কিছু একটা ভেঙে গেছে তাঁর। কীসের আঘাতে যেন সে কষ্ট পাচ্ছে। তাঁর করুণ মলিন অপরাধীর মতো চেহারা দেখে আমি কষ্ট পাই। কিন্তু আমার করার কিছুই থাকে না। আমি গাড়ি চালিয়ে দূরে সরে যাই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভেতরটা আমার হীম হয়ে মুষড়ে যায়।

পরবর্তী ছয় দিনে জয় অনেকবার ফোন করেছে আমাকে। ধরি নি। সপ্তম দিনে সে একটি এসএমএস পাঠায়। চলে যাচ্ছে সে। আমি ফোন করি তাঁকে।

“ভালো থেকো। তোমার প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার”
“তোমাকে আমি এখনো ভালোবাসি”
“আমিও বাসি। রাখি”

চোখের কোণে একটু জল উঁকি দেয়। মুছে ফেলি। চোখের জল , সে যতই ধীরে পড়ুক আর দ্রুত পড়ুক, তাঁকে মুছে ফেলতেই হয়।

১৮ thoughts on “নিঃসঙ্গতা

  1. আপু শেষ পর্যন্ত আমারই নাম!!
    আপু শেষ পর্যন্ত আমারই নাম!! ইস্টিশনের যাত্রীদের নাম ব্যবহারের অভ্যাস টা আমর ছিল আপনিও আমার নাম টা ব্যবহার করে ফেললেন???

    যাই হোক গল্প সেইরকম হয়েছে। এক কথায় অসাধারণ। অসাধারণ । অসাধারণ ।

    1. হাহাহাহা… লেখার সময় এই
      হাহাহাহা… লেখার সময় এই নামটাই মাথায় আসছে তাই লিখছি। তোমার সাথে মিল নাই। অনিচ্ছাকৃত ভুল।
      আর লেখা ভালো লাগার জন্য :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *