নীল কষ্ট

ঘুমের ঘোরে হঠাৎ করেই ধরফর করে লাফিয়ে ওঠে নীল। ইস! ৬ টা বেঁজে গেছে আর মাত্র ১ ঘন্টা বাকী। কাল রাতেই আমেরিকা থেকে ফিরেছে নীল, দীর্ঘ সাড়ে সাত টি বছর পর দেশে ফিরল সে। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় ঢাকা – বরিশালের কোন গাড়ি পায় নি সে। ঢাকা টু বরিশালের লাস্ট গাড়ি ছেড়ে গেছে রাত এগার টার সময়। তাই বাধ্য হয়েই একটা বোডিং এ উঠেছিল সে, রাত টা পার করার উদ্দেশ্যে।


ঘুমের ঘোরে হঠাৎ করেই ধরফর করে লাফিয়ে ওঠে নীল। ইস! ৬ টা বেঁজে গেছে আর মাত্র ১ ঘন্টা বাকী। কাল রাতেই আমেরিকা থেকে ফিরেছে নীল, দীর্ঘ সাড়ে সাত টি বছর পর দেশে ফিরল সে। অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় ঢাকা – বরিশালের কোন গাড়ি পায় নি সে। ঢাকা টু বরিশালের লাস্ট গাড়ি ছেড়ে গেছে রাত এগার টার সময়। তাই বাধ্য হয়েই একটা বোডিং এ উঠেছিল সে, রাত টা পার করার উদ্দেশ্যে।

জলদি বিছানা ছেড়ে ঝটপট রেডি হয়ে নেয় নীল। বোডিং এর বিল মিটিয়ে দিয়ে গাবতলীর উদ্দেশ্যে রওনা হয় সে। তার উদ্দেশ্য ভোর ৭.০০ টার গাড়ি ধরে দেশে (বরিশাল) যাবে সে। আজকাল দেশের জন্য বড্ড বেশি মনটা কেমন করে তার। অনেকদিন পরিচিত মুখ গুলো দেখে নি সে। তাইতো হটাৎ করেই সে আমেরিকা থেকে দেশে চলে আসল।

গাবতলীতে নেমেই সে আগে টিকিট বুক করে। সিট টা একটু পিছনের দিকে পড়েছে কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। কোন রকম বাড়ি পৌছাতে পারলেই হবে। গাড়ির ব্যাংকারে তার মাল পত্র উঠিয়ে দিল নীল, হাতে এখনও প্রায় ১৫ মিনিটের মত সময় আছে। তাই ছোট একটা হোটেলে ঢোকে নীল সকালের নাস্তা করার উদ্দেশ্যে। নাস্তা শেষ করে বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরায় নীল, কিঞ্চিত চিন্তিত মনে সিগারেট টানছে সে আর অবাক দৃষ্টিতে সিগারেটের ধোঁয়া গুলো উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে।

এরই মধ্যে গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে, সিগারেট টা শেষ করে সিটে গিয়ে বসল নীল। কিছুক্ষনের মধ্যেই বাস ছেড়ে দিল এবার সে তার হেড ফোনটি বের করে কানে লাগিয়ে “ও আমার দেশের মাটি, তোমায় পরে ঠেকাই মাথা….” গানটি ছাড়ল। কেন যেন গানটি তার অসম্ভব ভাল লাগে, গানটি যেন তার প্রত্যেকটি স্নায়ুকে ছুয়ে যায়। জানালা থেকে ফুরফুরে হাওয়া আসছে, বাসের দুলুনিতে তার বেশ ঘুম পাচ্ছে। গতকালই সে এতটা পথ জার্নি করেছে তার উপর আবার রাতে ভাল ঘুম হয়নি তার। গান শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।

ঘুম যখন ভাংল তখন সে পাটুরিয়া ফেরী ঘাট। ফেরীর জন্য ওয়েট করছে বাস। চা – সিগারেট খাওয়ার উদ্দেশ্যে বাস থেকে নামল নীল। অদূরেই একটি টং দোকানে যায় সে। চা – সিগারেট খেয়ে বাসের সাথে সাথে সে ও ফেরীতে ওঠে।

ফেরীর এক কোনায় দাড়িয়ে নদীর দিকে এক মনে চেয়ে থাকে নীল। সূর্যের আলো নদীর বুকে পড়ায় নদীর পানি যেন সোনালি আভা ধারন করে চিকচিক করছে। ছোট বেলা থেকেই নদী বেশ ভাল লাগে তার। দেশে থাকা অবস্থায় প্রায় সন্ধ্যা বেলা সে তার বাড়ির অদূরে নদীর তীরে ঘুরতে যেত। নদীকে ভাল লাগার পিছনে আজও কোন রহস্য খুঁজে পায়নি সে।

নদীর দৃশ্য দেখতে দেখতেই আরেকটি সিগারেট ধরাল নীল। সিগারেট টানতে টানতেই হঠাৎ করে কালো রং এর বোরখা পড়া একটা মেয়ের দিকে দৃষ্টি গেল তার। মেয়েটিকে দেখার সাথে সাথে এক দৌড়ে মেয়েটির সামনে গিয়ে হাজির হয় সে। মেয়েটির দিকে কিছুক্ষন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মেয়েটিকে অবাক করে দিয়ে কোন কিছু না বলেই ফিরে আসে নীল।

তার এই রোগটি হয়েছে নীলাঞ্জনার সাথে ব্রেকাপ এর পর। এখন সে যে কোন কালো বোরখা পড়ুয়া মেয়ে দেখলেই নীলাঞ্জনা ভেবে ছুটে যায় তার কাছে, নীলাঞ্জনাকে অন্তত একটি বার দেখার উদ্দেশ্যে কিন্তু প্রত্যেক বারই মেয়েটির কাছে যাওয়ার পর অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই সে অন্য কাউকে দেখতে পায় এবং প্রতিবারই ব্যাথাতুর হৃদয়ে ফিরে আসে। তবুও সে থেমে থাকে না, নীলাঞ্জনাকে অন্তত একটিবার দেখার ব্যর্থ প্রয়াসে সে বারবার পাগলের মত ছুটে যায়। কিন্তু………….।

নীলাঞ্জনা হচ্ছে নীলের প্রতিবেশি। তাদের দু’জনার বাড়ি একেবারেই পাশাপাশি। বিশেষ করে নীল এবং নীলাঞ্জনার ঘরটা অবাস্তবভাবে এমন এংগেলে তৈরী করা যে, নীলের জানালা থেকে নীলাঞ্জনার ঘরে কি হচ্ছে সব দেখা যেত এবং নীল যখন রাতে বাসায় ফিরে তার ঘরে লাইট জ্বালাত তখন ঐ লাইটের আলো নীলাঞ্জনার জানালা ভেদ করে সরাসরি নীলাঞ্জনার রুমে গিয়ে পড়ত তখন নীলাঞ্জনা টের পেত যে নীল ঘরে ফিরেছে।

নীলাঞ্জনা নীলের থেকে বছর তিনেক এর ছোট হবে। নীল প্রায় প্রতিদিনই বিকেল বেলা নীলাঞ্জনাদের বাড়ির সামনের মাঠটাতে ক্রিকেট খেলতে যেত সেই সুবাদে নীলাঞ্জনার সাথে একদিন একাকি কথা হয় নীলের, ফোন নম্বর আদান-প্রদান ও হয়।

ফোনে কথা বলতে বলতে তাদের সম্পর্ক টা প্রেমের দিকে মোড় নেয়। নীল যদি রাতে কখনো বাড়ি ফিরতে দেরী করত তাহলে নীলাঞ্জনা তাকে ফোন দিয়ে অভিমানের সুরে বলত, “কি হল? এখনো বাসায় আস না কেন?” নীল ও তখন হাজারটা অজুহাত দিয়ে তার অভিমান ভাঙ্গানোর চেষ্টা করত।

একই কলেজে পড়ার সুবাদে তাদের এই সম্পর্ক টা আরও ঘনিষ্ঠ হয়। নীলাঞ্জনা বরাবরই নীলকে একটু শাসন করত। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, সিগারেট খাওয়া যাবে না, পলিটিক্স করা যাবে না আরও হাজারটা উপদেশ। নীলও তার উপদেশ মানত তবে শুধু নীলাঞ্জনার সামনে। সুযোগ পেলে বানরামির সীমা থাকত না নীলের।

দ’জনের দু’জনকে নিয়ে ছিল বুকভরা স্বপ্ন। তারা স্বপ্ন দেখত তাদের বিয়ে হবে, ছোট্ট একটা সংসার হবে, মিষ্টি একটা বাচ্চা হবে। নীলাঞ্জনা প্রায়ই বলত, “জান, আমাদের না খুব মিষ্টি একটা বাচ্চা হবে। নাম রাখব মূন।” নীল মনে মনে তার দেওয়া নামটা পছন্দ করলেও দুষ্টু হাসি দিয়ে নীলাঞ্জনাকে বলত, “কি একটা নাম দিলা? কেমন যেন গাইয়া গাইয়া লাগে।” এই শুনে নীলাঞ্জনা যখন গাল ফুলাত তখন নীল তার মাথায় পরম যত্নে বিলি কেটে দিয়ে রাগ ভাঙ্গাত।

তাদের এমন মিষ্টি সম্পর্কে কার যেন নজর লাগল। তাদের সম্পর্কের কথা বাসায় নালিশ গেল। নীলের বাবা বরাবরই কড়া মেজাজের মানুষ। পুরনো পারবারিক দ্বন্দ থাকার কারনে দুপক্ষের অবিভাবক ই প্রচন্ড রাগ করলেন। নীলের বাবা নীলকে আমেরিকা যাবার কথা বলল। নীল প্রথমে রাজি না হওয়ায় তাকে মাথার দিব্যি দিয়ে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

নীল অবশ্য আমেরিকা গিয়েও বহুবার নীলাঞ্জনার সাথে কন্ট্যাক করার চেষ্টা করেছে কিন্তু নীলাঞ্জনা বা তার পরিবারের কারও নম্বরই সে আর কোন দিন খোলা পায় নি। নীল ফেসবুকেও বহুবার নীলাঞ্জনার নাম লিখে সার্চ দিয়েছে তার একটা একাউন্ট পাবার আশায় কিন্তু বারবারই ব্যর্থ হয়েছে সে।

বাস বরিশাল পৌঁছে গেছে। বাস থেকে নেমে নীল তার ছোট ভাইকে দেখতে পায়। এখান থেকে নীলের বাসা বেশি দূরে নয়, মিনিট দশেক এর পথ। তাই নীল তার মাল পত্র গুলো ছোট ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘তুই যা, আমি একটু পরে আসছি।’

নীলের উদ্দেশ্য একটা সিগারেট খাওয়া। ছোট ভাই চলে গেলে কিছুক্ষন পর একটা সিগারেট ধরায় নীল। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে তাই দেরী না করে সিগারেট টানতে টানতেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় নীল। বাড়ির কাছাকাছি আসার পরই নীলের বুকের ভিতরটায় অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হয়েছে। অজানা ভয় তাকে গ্রাস করছে। কারন তার বাসায় যেতে হলে নীলাঞ্জনার বাসার সামনে দিয়ে যেতে হবে।

নীলাঞ্জনার বাড়িটা ক্রস করবে এমন সময় কোত্থেকে ছোট চার পাঁচ বছরের একটা ফুটফুটে মেয়ে আব্বু আব্বু করতে করতে নীলের কোলে লাফিয়ে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিছন থেকে কে যেন মুন বলে ডেকে উঠল। মুন নামটা এবং ডাকিনীর কন্ঠস্বর শুনে চমকে পিছনে তাকাল নীল। পিছনে তাকিয়ে নীল দেখল, এ আর কেউ নয়; সাড়ে সাত বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তার সেই নীলাঞ্জনা। ছোট্ট মেয়েটি মা বলে একটা ডাক দিয়ে এক লাফে নীলের কোল থেকে নীলাঞ্জনার কোলে চলে গেল। আর কিছু বুঝতে বাকী নেই নীলের। নীল কেমন যেন নিস্তব্ধ, ভাষাহীন হয়ে গেছে।

সমস্ত নীরবতার ইতি টেনে নীলাঞ্জনা কাঁপা কাঁপা সুরে বলে উঠল, ‘কিছু মনে করবেন না, ছোট বাচ্চা তো তাই কাল ব্লেজার পড়া দেখে আপনাকেই ওর বাবা মনে করে ভূল করেছে।’ কথাটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলে নীলাঞ্জনা। নীল ও কথাটা স্বাভাবিক ভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে।

দু’জনেই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও কখন যে তাদের চোঁখের দু কোন বেয়ে ক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তা হয়ত তারা কেউ ই টের পেল না।

৫ thoughts on “নীল কষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *