কষ্ট ছোঁয়া সুখ

মানিব্যাগটা অনেক মোটাসোটা।সুমন হাতে নিয়ে দেখল। কিন্তু টাকায় না, একগাদা কাগজ আর একটা পলিথিনে। এতো টাকা কখনও সুমনের মানিব্যাগে থাকেও না ,যে তা ফুলিয়ে দিবে। পলিথিন রাখার কারণ, বৃষ্টি নামলে নিজের কম দামি মোবাইলটা রক্ষা করা।পানি ঢুকলে মোবাইল এর জীবনী শেষ। তাছাড়া মাঝে মাঝেই সুমনের বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করে। ঝুম বৃষ্টিতে। বৃষ্টিতে ভিজলে নিজেকে অনেক সুখী লাগে।মনে হয় কষ্টের সব বৃষ্টি নিজের বুকে নিয়ে নিচ্ছে, ধুয়ে ধুয়ে, চুইয়ে চুইয়ে।অন্য সব সময় অসুখী মনে হয়।বৃষ্টিতে ভিজলে সুমনের অনেক বন্ধুই ওকে বলে, মেয়েলি আবেগ।সুমন সে কথা কানে নেয় না। সবার সব কথা কানে নিতে হয় না, গায়ে লাগাতে হয় না। শুনতে হয়, শুনে হাওয়া করে অপ্রয়োজনীয় ভেবে উড়িয়ে দিতে হয়।মানিব্যাগটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ২৯ টাকা পেল।ভেবেছিল আজ টিউশনির টাকাটা পেয়ে যাবে।কিন্তু আজও দিল না। মাসের ১২ তারিখ,এখনও যদি টাকা না দেয়।আম্মু প্রতিদিন কল করছে, ১ তারিখ থেকে।কল করে বলে, টাকা পেলি, বাবা?
প্রতিদিনই সুমন বলে, না মা,এখনও দেয় নি।
পড়ান শেষ হলে প্রতিদিন ভাবে হয়ত টাকাটা দিয়ে দিবে।কিন্তু সেরকম কোন সম্ভাবনা না দেখে, পড়িয়েই চলে আসে।আর কখনও মুখ ফুটে টাকাটাও চাইতে পারে না।মাসের যেদিন দেয় টাকা, সেদিনই নেয়।টাকা পাবার পর অর্ধেক টাকা বাসায় পাঠায়, মায়ের কাছে।আর বাকি টাকা দিয়ে নিজে চলে। মেস ভাড়া, নিজের খাওয়া, খুব টানাটানি হয়ে যায়। কিন্তু বাসায় না পাঠালেও হয় না।মা নয়ত চলবে কি করে? বাবা মারা গেলেন ৩ মাস হল। তারপর থেকে সংসারটা অনেক এলোমেলো হয়ে গেছে।কাছের কিছু হারালে আশেপাশের সব তার টানে অগোছালো হয় ই। সুমনের অনেক হিসেব করে চলতে হয়।এই ২৯ টাকায় আজ রাতের খাওয়া শেষ করতে হবে,কাল সকালে না খেয়ে থাকতে হবে। আর কাল দুপুরের দিকে পড়াতে যাবে।কাল সাহস করে টাকা চাইবেই। যদি না দেয়, বলে দিবে স্টুডেন্ট এর মাকে,আন্টি, আজ থেকে আমি আপনাদের বাসায় থাকব। ঊর্মিকে পড়াব। দরকার হলে ঊষাকেও। আর ৩ বেলা খাব।এই মুহূর্তে আমার পকেটে এক টাকাও নেই।
তারপর আন্টিকে পলিথিন আর কাগজ ভরা মানিব্যাগ দেখাবে। মানিব্যাগের প্রতিটা কোণা দেখাবে, কাগজ খুলে দেখাবে, পলিথিন খুলে দেখাবে, কোন টাকা নেই। এরপরও টাকা না দিলে কিছু করার নেই।
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ একটা ইটের সাথে বারি গেল। পায়ের বুড়ো আঙ্গুল জ্বলে যাচ্ছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোতে দেখল, পা দিয়ে রক্ত পড়ছে।ধূসর কালো রক্ত। রক্তের রঙ দেখে সুমন একটু থমকে গেল। খানিক সময়ের জন্য ব্যথা অনুভব বন্ধ হয়ে গেছে। রক্ত কেন কালো দেখাবে? কষ্টে কষ্টে শরীরের রক্ত কালো হয়ে গেল নাকি? কি আবল তাবল ভাবছে।সামনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকের দিকে তাকিয়ে দেখল, তাকেও ধূসর কালো দেখাচ্ছে। এই রক্তের মত। এতক্ষণে ল্যাম্পপোস্টের দিকে চোখ গেল। সোডিয়াম বাতি। এই আলোতে সবই ধূসর দেখায়। একই রঙের দেখায়। হঠাৎ করেই ব্যথাটা বেড়ে গেল। সোডিয়াম বাতির দিকে তাকাল সুমন আবার। জীবনটা সোডিয়াম বাতির নিচে থাকলে ভাল হত। সবার জীবন একরকম হত।সবাই একইরকম থাকত। কারও কষ্ট কারও সুখ থাকত না। সুখী হলে সবাই সুখী, দুঃখী হলে সবাই দুঃখী।কারও অভাবে ,কারও বিলাসিতায় কাটতো না। একই রকম কাটত। কিন্তু তা তো সম্ভব না। তাই এই মুহূর্তে এই সোডিয়াম বাতিটাকে অনেক অসহ্য লাগছে।মিথ্যে কিছু স্বপ্ন দেখাবার জন্য। ট্র্যাফিক পুলিশ না থাকলে সোডিয়াম বাতিটায় একটা ইট মেরে দৌড় দিত সুমন। এখন দৌড়াতেও পারবে না। পায়ে খুব ব্যথা করছে।উঠে দাঁড়িয়ে দেখল হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।মেস পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া এই অবস্থায় অসম্ভব।টাকা বাঁচাবার জন্য হেঁটে হেঁটেই টিউশনিতে যায় আসে সুমন।একটু হেঁটেই একটা রিকশা দেখল।ডাক দিল রিকশা। ডাক দিয়েই মনে হল, বিশাল ভুল করে ফেলেছে।রিকশাতে ভাড়া ৩০-৩৫ টাকা নিবে। সুমনের কাছে আছে ২৯ টাকা।তারপর আবার এই টাকায় রাতে খেতে হবে। রিকশা চালককে বলল, না মামা যান, লাগবে না।
– কই যাবেন মামা?
– বললাম তো লাগবে না।
– ডাকলেন, অখন কন লাগবো না। কই যাবেন শুনি।
– বশিরের মেস।
– এই যে ঠিক আছে।হ, যামু তো।
– ভাড়া কত?
– ৪০ টাকা দিয়েন।
– যান যাব না।
– ৩৫ টাকায় যাইবেন?
-না।
– কত দিবেন তাইলে?
– ৫ টাকায় যাবেন?
– কত?
– পাঁচ পাঁচ, প এ চন্দ্রবিন্দু আ কারে পাঁ চ, পাঁচ টাকা।
– দূর মিয়া ফাইজলামি করেন।

রিকশা টান দিয়ে চলে গেল। আর সুমন আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল।সামনেই লেগুনা দেখা যাচ্ছে।লেগুনায় যাওয়া যায়, ৮ টাকা ভাড়া। হেঁটে যাওয়া যাবে না।একটা ফাঁকা লেগুনায় চরল। বসে আছে। এক পিচ্চি লোকজন ডেকে ডেকে লেগুনায় তুলছে। পিচ্চি মানে একেবারেই পিচ্চি। এত পিচ্চি একটা ছেলে পেটের দায়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেগুনার হেল্পারি করছে।জীবন আসলেই কত রকম। কত রঙের। কারও কাছে কত সুখের, কারও কাছে খুবই দুঃখের। একটু পর পুরো লেগুনা ভরে গেল। আর একজন উঠলেই হল।এক অতি রূপসী মেয়ে এসে লেগুনায় উঠল। একটা সিট খালি আছে তা একেবারেই ভিতরে। মেয়ে অত ভিতরে বসতে পারবে না। তাই সুমনকে বলল, আপনি একটু ঐদিকে চাপুন তো। আমি এই জায়গায় বসি।

মেয়েটার দুর্দশার কথা ভেবে, একবারে বাহিরের দিকের কোণার সিট ছেড়ে দিল সুমন। মেয়েটা সুমনের গাঁ ঘেঁষে বসল। এতটুকু জায়গায় ১২ জন বসা যায় না। তাও চাপাচাপি করে বসায়। গায়ের সাথে গা ঘেঁষবেই। তবুও সুমন একটু একটু দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করছে।কিন্তু রাস্তার দুরবস্থায় বার বার ধাক্কায়, মেয়েটার শরীরের সাথে ধাক্কা লাগছে। কাজটা সুমন ইচ্ছা করে করছে না। তবুও মেয়ে যদি ভাবে ও ইচ্ছা করে করছে, তাই একটু একটু ভয় লাগছে। সুমন শক্ত করে লেগুনার ভিতরের হাতল ধরে আছে।মেয়েটার থেকে দূরে থাকবার জন্য। মেয়েটার শরীর থেকে একটা মিষ্টি ঘ্রান ভেসে আসছে। অনেক দামী পারফিউম ব্যবহার করে মনে হয়।এতো মিষ্টি একটা ঘ্রান থাকার পরও , মেয়েটা রুমাল দিয়ে নাক চেপে রেখেছে। মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে আশেপাশে অনেক দুর্গন্ধ। কিন্তু সুমন কিছু পাচ্ছে না। লেগুনার অন্য কেউ ও না। একটু পর মেয়েটা ব্যাগ থেকে কি যেন বের করল।সুমনের দিকে ফিরেই ফুছ ফুছ শব্দ করে সুমনের গায়ে পারফিউম দিয়ে দিল।সুমন অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা বলল,
– খুব বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে। আমি ঘামের গন্ধ সইতে পারি না। আর হাত টা নিচে নামান। ঐ হাতল ধরে থাকতে হবে না। এতে কারও বেশি পাচ্ছি গন্ধ।

বলেই আরও একটু পারফিউম সুমনের গায়ে দিয়ে দিল। তারপর নাক থেকে রুমাল নামিয়ে বসে বসে বাহিরে দেখতে লাগল। আর সুমন গুটিসুটি মেরে বসে রইল। এখন ওর শরীর থেকেও সুন্দর একটা ঘ্রান আসছে।
পিচ্চি ছেলেটা ঝুলে ঝুলে ড্রাইভার কে বলে যাচ্ছে অনর্গল নানা কথা।লেগুনায় থাপ্পড় দিয়ে দিয়ে লোক নামাচ্ছে, উঠাচ্ছে।ভাড়া তুলছে। লেগুনার সাথে যেভাবে ঝুলে আছে, যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে।ওসব ভাবলে পিচ্চিটার চলবে না। পেট বাঁচাতে হবে,তারপর অন্য কথা। এই মায়াময় মুখ দিয়ে কিছুই হবে না, পেটে খাবার না পড়লে।
হঠাৎ পিচ্চিটা অনেক শব্দ করে জোরে একটা থাপ্পড় দিয়ে লেগুনা থামাল।আর বলল, টাকা পড়ছে টাকা পড়ছে। থামান ওস্তাদ।
লেগুনা থামাল। পিচ্চিটা তারাতারি নেমে গাড়ি ভর্তি রাস্তার মধ্যে দিয়ে দৌড়াতে লাগল, টাকার খোঁজে। এই টাকা না পেলে কাজ থাকবে না। ড্রাইভার ওকে বাদ দিয়ে দিবে। অনেক খুঁজল রাস্তার মধ্যে, চলন্ত গাড়ি উপেক্ষা করে। পেল না। না পেয়ে চলে আসল। এই দিকে যাত্রীদের চেঁচামেচিতে ড্রাইভার লেগুনা ছেড়ে দিয়েছে। পিচ্চিটা কোনমতে দৌড়ে এসে উঠল।মুখ ভার করে ঝুলে আছে। চোখে মুখে অনেক ভয়। এই মায়াময় মুখে এটা মানাচ্ছে না। মায়া আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বেশি কোন কিছুই ভাল না।এর মুখের মায়া বেশিটাও তাই ভাল লাগছে না। হয়ত ভাবছে, কাজটা বোধহয় আর থাকবে না।
সুমনের পাশের মেয়েটা পিচ্চিটাকে জিজ্ঞেস করল, কয় টাকা হারাইছে রে?
– ২০ টেকা।
– তোরে প্রতিদিন কয় টাকা দেয় তোর ওস্তাদ?
– ১৫০ টেকা।
– তুই যে টাকা হারাইলি তোরে কি তোর ওস্তাদ মারবে?
– না।
– বকা দিবে?
– হ।
– আর কি করবে?
– টেকা কাইটা রাখব। আর কাজে নিব না।
– আহারে।

মেয়েটা আর কিছু বলল না। হেল্পার পিচ্চিটাও না। বশিরের মেস এসে পরেছে। সুমন নেমে যাবে। পিচ্চি জোরে একটা থাপ্পড় দিল লেগুনায়।সুমন নেমে পড়ল। ভাড়াটা দেয়া হয়নি এখনও।পিচ্চি সুমনের থেকে ভাড়া নিচ্ছে, ৮ টাকা ভাড়া। সুমন পিচ্চির হাতে ৮ টাকা দিল। সাথে আরও ২০ টাকা। পিচ্চির মাথায় একটা হাত দিয়ে বলল, তুই কাজ না করতে পারলে কি খাবি বল? টাকাটা রাখ। ওস্তাদকে বলবি পাইছিস টাকা। ঠিক আছে?

পিচ্চিটার চোখ ছল ছল করছে। আরও মায়াময় লাগছে মুখটা।কিছু বলতে চাচ্ছিল সুমনকে। কিন্তু লেগুনা ছেড়ে দিয়েছে। পিচ্চি দৌড়ে গিয়ে লেগুনায় ঝুলে পড়ল। সুমন লেগুনা চলে যেতে দেখছে, সাথে ঝুলে থাকা পিচ্চিকে।মেসের সামনে একটা চা রুটির দোকান। মানিব্যাগটার দিকে তাকাল। এক কোণায় একটা এক টাকার পয়সা। এক গ্লাস পানি খেল। এক গ্লাস পানি এক টাকা। আর এক গ্লাস খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু টাকা নেই।থাক সব ইচ্ছা পূরণ হতে নেই। সব ইচ্ছা পূরণ হয়ে গেলে, বেঁচে থাকার সাধ মিটে যায়। অপূর্ণতা আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি, কিছু পূর্ণতার আশায়। মেসে রুমে গিয়ে ফ্যান ছেড়ে শুয়ে পড়ল সুমন। মা ফোন করেছে। একই কথা বলল, টাকা পেল নাকি? সুমন বলল কাল দিবে।মা বলল, রাতে খেয়েছে কিনা। সুমন বলল, হ্যাঁ।
যদিও খায় নি। এক রাত না খেলে কিছু হয় না। কিন্তু ঐ পিচ্চির কাজটা চলে গেলে অনেক কিছু হয়। একটা পরিবার হয়ত এই পিচ্চির দিকে তাকিয়ে আছে। যেমন সুমনের মা, সুমনের দিকে। এক রাত না খেলে সুমনের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না।কিন্তু ঐ ২০ টাকা না পেলে পিচ্চিটার উপার্জন বন্ধ হয়ে যেত।অনেক ভাললাগার একটা অনুভুতি হচ্ছে সুমনের। এই অনুভূতি বুকের ভিতর শান্তি দেয়। সুমন ভাবতে পারছে, এতো কষ্টে থেকেও সুমন এখনও মানুষ আছে।মানুষেরই অন্য মানুষের কষ্টে মন কাঁদে। সুমনের যেমন পিচ্চিটার জন্য কেঁদেছে। মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা অনেক কিছু।হাত পা থাকলেই মানুষ হয় না।মানুষ হতে অন্য কিছু লাগে। মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবতেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠছে সুমনের। চোখ লেগে আসছে ।খুব ঘুম পাচ্ছে। কাল টাকাটা নিতে হবে টিউশনি থেকে। অনেক মিষ্টি একটা সুভাস আসছে। অনেক দামী পারফিউমের। মনে হচ্ছে ঐ মেয়েটা, লেগুনায় পাশে বসা মেয়েটা, গা ঘেঁষে বসে আছে। আর ফুছ ফুছ শব্দ করে পারফিউম দিয়ে দিচ্ছে। মিষ্টি সুভাসের পারফিউম।

– রিয়াদুল ইসলাম (শেষ রাতের আঁধার)

৪ thoughts on “কষ্ট ছোঁয়া সুখ

  1. অনেক ভাল লেখেছেন ভাই। প্রথমে
    অনেক ভাল লেখেছেন ভাই। প্রথমে ভেবেছিলাম অনেক কিছু বলব কিন্তু লেখার সাহস পাচ্ছি না।

    শুধু নববর্ষের শুভেচ্ছা। আর আরো একটা বছর মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার শুভ কামনা রইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *