সুশীল সমাজের ভূমিকা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সমাজ মূলত দুইটি রাজনৈতিক ভাগে বিভক্ত। এর ভিতর থেকে পৃথক নিরপেক্ষ সমাজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রে এক ধরণের সমাজ থাকে যারা নিজেদেরকে নিরপেক্ষ ও অ-লাভজনক বলে দাবি করে। তাদেরকে আমরা বলি “সুশীল সমাজ”। এখন কথা হচ্ছে এ সুশীল সমাজ জিনিসটা কি ? তাদের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য কি ?


বাংলাদেশের সমাজ মূলত দুইটি রাজনৈতিক ভাগে বিভক্ত। এর ভিতর থেকে পৃথক নিরপেক্ষ সমাজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রে এক ধরণের সমাজ থাকে যারা নিজেদেরকে নিরপেক্ষ ও অ-লাভজনক বলে দাবি করে। তাদেরকে আমরা বলি “সুশীল সমাজ”। এখন কথা হচ্ছে এ সুশীল সমাজ জিনিসটা কি ? তাদের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য কি ?

“সুশীল সমাজ” টার্মটার ব্যাখ্যা বিভিন্ন রাষ্ট্রে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম। অর্থাৎ সুশীল সমাজের রূপ-লাবণ্য নির্ভর করে আপনাপন সমাজের উপর। ইংরেজী ‘civil society’-যার বাংলা করা হয়েছে সুশীল সমাজ কিন্তু হওয়া উচিত ছিল ‘নাগরিক সমাজ’ (কিছু মিডিয়াতে নাগরিক সমাজ ব্যবহৃত হলেও অধিকাংশতে সুশীল সমাজ ব্যবহৃত হয় )। এ নামকরণের পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে ,এটা পরে দেখব ।

‘সুশীল সমাজ’ হলো সমাজের তৃতীয় স্তর যা সরকার নিরপেক্ষ- সরকার হতে আলাদা । অর্থাৎ তারা সরকারের অধীন নয় । সমাজের বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি, এনজিও অথবা অন্যান্য সংস্থা সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্ত তবে তাদের অবশ্যই জনগনের কথা বলতে হবে এবং সরকার থেকে আলাদা থাকতে হবে । সুশীল সমাজ নিয়ে প্রাচীন গ্রিসেই বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে । সেগুলো তত্ত্বীয় আলোচনা, সেদিকে আমরা যাব না ।

রাজনৈতিক সমাজের সাথে সুশীল সমাজের পার্থক্য হলো সুশীল সমাজকে জবাবদিহি করতে হয় না। রাজনীতিকরা যতই খারাপ হোক তাদেরকে পাঁচ বছর পর পর ভোটারদের কাছে যেতে হয়, ভোট চাইতে হয়। সুশীল সমাজের এই কাজটা করতে হয় না । তবুও সমাজের তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তদের মতামত জনগনকে প্রভাবিত করে এবং জনগণের সিদ্ধান্তের উপর তাদের প্রভাব থাকে ।

তত্ত্বীয়ভাবে সুশীল সমাজ বলতে আমরা যাদেরকে বুঝি বাংলাদেশে তাদের দেখা যায় কিনা তা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে আমাদের দেশে যারা নিজেদেরকে সুশীল সমাজ বলে দাবি করে থাকেন তারা রাজনৈতিক সমাজের মত বিভক্ত। ফলে অনেক সময় জনগনের বক্তব্য তাদের মাধ্যমে উঠে আসে না । যেমন- ইদানিং সুশীল সমাজের একটা অংশ আগামী নির্বাচনে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে এবং এই অংশটাই গনতন্ত্রের চেয়ে ‘সুশাসন’র কথা বেশি বলেন। তারা সকল দোষ রাজনীতিবিদদের উপর চাপান এবং বিরাজনীতিকরণকে উৎসাহ দেন। দেশের অগনতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পিছনে এসব সুশীলদের উসকানি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

আমাদের ফেসবুক ও ব্লগে ‘সুশীল’ শব্দটি এখন ‘গালি’ হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটা ভদ্র গালি। অনলাইনে অন্যান্য গালির চেয়ে এ গালির(সুশীল) ব্যবহার ভদ্রতার পরিচায়ক। ‘সিভিল সোসাইটি’র বাংলা হিসেবে ‘সুশীল সমাজ’ ব্যবহারের কারণ বোধ হয় এটাই- ‘নাগরিক সমাজ’ বললে তো আর নাগরিকদের গালি দেওয়া যায় না ।

আমাদের ব্যর্থতা হলো স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা একটা গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরি করতে পারি নাই, বর্তমান সংকটটা তত্ত্বাবধায়কের সংকট না, সংকট হলো একটি গণতান্ত্রিক সমাজ না থাকার সংকট। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করাতে না পারার ব্যর্থতা তো আছেই। গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয় । আমাদের দেশে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন তারা নিজেদেরকে এত বেশি অপকর্মে জড়িত করে ফেলেন যে তাদের প্রশংসা থেকে সমালোচনাই বেশি করতে হয় । আর সমালোচনা করলেই- সেটা নিরপেক্ষ দিক থেকে হলেও- আপনি সুশীল বলে সরকারী দলের কাছে বিবেচিত হবেন । তবে, সুশীলদের সমালোচনার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। আগে দেখতাম সরকারী দল সুশীলদের সমালোচনা করতো, এখন বিরোধী দলও সুশীলদের সমালোচনা করে। দুই পক্ষই যখন সুশীলকে গালি দিচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে তারা অনেকটা নিরপেক্ষ, তবে সব সুশীল নিরপেক্ষ একথা বলা যাবে না। প্রধান দুই দলের বাইরেও আরো কিছু পক্ষ আছে, দেশে এবং বিদেশে।

প্রত্যেক সমাজে কিছু দ্বন্দ থাকে, সক্রেটিসের মতে সেগুলোর নিরসন হওয়া উচিত পাবলিক আর্গুমেন্টের মাধ্যমে। আমাদের সুশীল সমাজের উচিৎ নানানিধ মতবাদকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ, রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখা ।

৬ thoughts on “সুশীল সমাজের ভূমিকা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

  1. …….বাংলাদেশে সুশীল নামক
    …….বাংলাদেশে সুশীল নামক কোন মানুষ নাই, যা আছে তা হলো চুতিয়াশীল নামক কিছু আজব প্রাণী।

    …..যাদের কাজ হচ্ছে খেয়ে-না-খেয়ে সরকারের বিরোধিতা করে লাইম-লাইটে থাকা।আর ঠগশো নামক টিভি প্রোগ্রামে গিয়ে সাধারন মানুষকে বিভ্রান্ত করা।

    1. সরকার দোষ করলে সমালোচনা করতেই
      সরকার দোষ করলে সমালোচনা করতেই পারে, তাতে দোষের কিছু নাই। কিন্তু সমালোচনা করতে করতে যখন তারা অরাজনৈতিক শক্তির দালালি করে তখন সমস্যা দেখা যায়।

  2. আমাদের সমাজে সুশিলের সংখ্যা
    আমাদের সমাজে সুশিলের সংখ্যা অনেক, তার মধ্যে নিরেপেক্ষ আছে খুব কম।
    সবাই নিরেপক্ষ পরিচয় দিয়ে যে কোন একটি দলের দালালি করে।

  3. Civil society বা নাগরিক সমাজ
    Civil society বা নাগরিক সমাজ কিংবা তথাকথিত সুশীল সমাজের লোকজনদের যে বাধ্যতামূলক নিরপেক্ষ হতেই হবে এমনটা আমি ভাবিনা। তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাধারণ জাতীয় ইস্যুতে বা জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোতে তাদের অবশ্যই দলীয় গণ্ডির বাইরে এসে কার্যকর ভুমিকা বা দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারা তখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা বলবেন। সমস্যা হল জন্মগতভাবেই আমাদের সরকারগুলো সমালোচনা হজমে অভ্যস্ত না, সেই ৭১থেকে আজ অবধি। কারণ আমরা মানসিকভাবে গণতান্ত্রিক নই। একটি জাতির সরকার সেই জাতির মানসিকতার পরিচায়ক। জনগণ গণতান্ত্রিক নই বলেই আমাদের সরকারও গণতান্ত্রিক না। আমাদের সমাজ এতো প্রকটভাবে রাজনীতিকরণ হয়েছে যে এখন আর বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের কার্যকর ভূমিকা প্রায়ই অসম্ভব। কারণ এখন যারা দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা প্রায়ই সকলেই কোন না কোন আমলে সুবিধাভোগী, সে কারণে তাদের ব্যক্তিগত ইমেজও প্রশ্নবিদ্ধ।
    …………………………………………

    1. কিন্তু সাধারণ জাতীয় ইস্যুতে
      কিন্তু সাধারণ জাতীয় ইস্যুতে বা জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোতে তাদের অবশ্যই দলীয় গণ্ডির বাইরে এসে কার্যকর ভুমিকা বা দায়িত্ব পালন করতে হয়।

      সহমত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *