মায়া মৃগ!

-স্যার, আমার একটু আর্লি ছুটি দরকার।
-কেন? আর্লি ছুটি লাগবে কেন?
-স্যার, বাবার সাথে দেখা করতে যাব।
-বাবার সাথে দেখা করতে যাবে মানে? কোথায় উনি?
-স্যার আমি বলতে পারব না কোথায় উনি। তবে আমার দেখা করতে যেতে হবে।
-তোমার বাবা কোথায় সেটাই জানো না, কিন্তু ছুটি চাইছ! এ কেমন কথা?
-স্যার প্লিজ, আমি না গেলে বাবা খুব কষ্ট পাবে। আমাকে অফিস ছুটি হওয়ার ২ ঘন্টা আগে ছুটি দেন।
-আই কান্ট ডু ইট। ইউ মে গো নাও।
-স্যার আপনের পায়ে পড়ি। আমার ছুটি দরকার।
-এই কি করছ? পা ছাড়? পা ছাড় বলছি?



-স্যার, আমার একটু আর্লি ছুটি দরকার।
-কেন? আর্লি ছুটি লাগবে কেন?
-স্যার, বাবার সাথে দেখা করতে যাব।
-বাবার সাথে দেখা করতে যাবে মানে? কোথায় উনি?
-স্যার আমি বলতে পারব না কোথায় উনি। তবে আমার দেখা করতে যেতে হবে।
-তোমার বাবা কোথায় সেটাই জানো না, কিন্তু ছুটি চাইছ! এ কেমন কথা?
-স্যার প্লিজ, আমি না গেলে বাবা খুব কষ্ট পাবে। আমাকে অফিস ছুটি হওয়ার ২ ঘন্টা আগে ছুটি দেন।
-আই কান্ট ডু ইট। ইউ মে গো নাও।
-স্যার আপনের পায়ে পড়ি। আমার ছুটি দরকার।
-এই কি করছ? পা ছাড়? পা ছাড় বলছি?
-না স্যার, পা ছড়ব না। আগে ছুটি মঞ্জুর করেন!
-আচ্ছা, ওকে ওকে। যাও যাও।
থ্যাঙ্ক ইয়ু স্যার বলে কায়সার ফ্লোর ইনচার্জের রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
 
কায়সার ঢাকায় একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরী তে সুপার ভাইজার এর কাজ করে। ৮০০০ টাকা বেতন। উত্তরার দিকে একটা বস্তি মত টিন শেডের বাসায় থাকে। সাথে স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকে। ২ রুমের বাসা। একটা শোবার ঘর। আরেকটা রান্না ঘর। স্ত্রী রেহানা, ৫ বছরের মেয়ে ইশমি এবং ২ বছরের ছেলে ইশানকে নিয়ে এই বাসায় থাকতে তাদের খুব কষ্ট হয়।
তার উপর তাঁর বাবা তাদের সাথে অনেক কষ্ট করে গত আট মাস ধরে ছিল। রান্না ঘরের সামনে একটা ছোট মত জায়গায় উনি অনেক কষ্ট করে মেঝেতে থাকতেন।
বাবাকে খাটে শোয়ানোর মত সামর্থ্য নাই কায়সারের। তাঁর বাবার এজমার সমস্যা। সারা রাত অনেক শব্দ করে কাশেন ও। আর এই কষ্ট কায়সারের সহ্য হয় না। ৮০০০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি দিয়ে এর চাইতে ভালো বাসা নেওয়ার সামর্থ্যও নাই। থাকলে হয়ত তাঁর বাবার জন্যে হলেও একটা ভালো বাসায় উঠে যেত সে।
বাবার সাথে বসে বসে কত রাত কায়সার কেঁদেছে। সুখে দুঃখের গল্প করেছে।
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা ছিল তাঁরা এক কালে। তাঁর বাবার কত জায়গা জমি ছিল। কত মানুষ তাঁর বাবার আশে পাশে ঘুর ঘুর করেছে। আর তাঁর এই বাবা আজ বড় অসহায়। নদীর ভাঙনে তাদের সর্বশেষ ভিটে বাড়ি নদী গর্ভে চলে গেছে গত বৎসর। এখন তাদের জায়গা জমি কিছুই নাই।
কায়সারের দূর্ভাগ্য। জন্মের সময়ই তাঁর মাকে হারিয়েছে। কায়সারকে মানুষ করার জন্যে তাঁর বাবা আর বিয়ে করেন নি।
 
কায়সার তাঁর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
কান্নায় আশে পাশের বাতাস ভারী হয়ে গেছে।
কান্নার কারন কায়সার আজ তাঁর বাবাকে “মায়া মৃগ” নামের একটা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাচ্ছে।
কোন এক সহৃদয়বান মানুষ “মায়া-মৃগ” চালু করেছেন। নাম মাত্র খরচে অসহায় বৃদ্ধদের উনি থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। 
কায়সার কোন ভাবেই বিষয়টা মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু এ ছাড়া তাঁর কিছুই করার ছিল না। সে চায় এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর বাবা একটু ভালো থাকুক। শেষ নিঃশ্বাসটা যেন তিনি ভালো ভাবে ত্যাগ করতে পারেন সেই ব্যবস্থাই করে দিয়ে যাচ্ছে সে।
অন্ততঃ তাঁর বাসায় মেঝেতে শুয়ে ধুঁকার চেয়ে এই বৃদ্ধাশ্রমে কিছুটা দিন ভালোভাবে কাটাতে পারবেন।
-আব্বা, আঁরে আন্নে মাফ করি দিয়েন। আঁই আন্নের কুলাঙ্গার হোলা। আন্নের লাই কিচ্ছু কইত্তাম ফারি ন।
-তুই এগাইন কিয়া কস?? আঁইয়েনা তোর লাই কিছু কইত্তাম হারি ন। আঁর মত বাফ যাতে আর কোন হোলাইনের ন থাকে।
-আব্বা, আন্নে চুপ করেন, আন্নে চুপ করেন। আঁই আন্নেরে কতা দিয়ের, ভালা এককান চাকরি হাইলে আঁই আন্নেরে ইয়ান্তুন লই যামু। খালি আঁর লাই দোয়া করিয়েন।
বাবা ছেলের কান্নায় আশে পাশের মানুষ ও কেঁদে ফেলেছে।
কেউ কেউ এসে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
-আব্বা, আঁই বেক ব্যবস্থা করি গেছি ইয়ানো। আন্নের কোন অসুবিধা অইতো ন।
বুকের ভিতর বিশাল একটা পাথর নিয়ে কায়সার চলে গেল।
 
এক সপ্তাহে আগে যে বাবাকে কায়সার বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছিল আজ ওঁনাকে দেখতে যাচ্ছে সে। আর এই জন্যেই সে বসের কাছ থেকে ২ ঘন্টা আগে ছুটি নিয়েছে। বাবাকে ঢাকা শহরটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবে। টং দোকানে বসে চা খাবে। তাঁরপর রাতে বাসায় গিয়ে সবাই মিলে একসাথে খাবে। গল্প করবে।
বিষয় গুলো ভেবে কয়সারের মনে এক অচেনা সুখ কাজ করছে। রিক্সায় বসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে সে। মনে হচ্ছে রিক্সাটা খুব আস্তে আস্তে চলছে।
-মামা, রিক্সা থামান।
-কেন, কি হইছে?
-আপনে রিক্সায় বসেন। আইজ রিক্সা আঁই চালাইয়ুম।
রিক্সাওয়ালাকে রিক্সায় বসিয়ে কায়সার নিজেই রিক্সা চালানো শুরু করেছে। আর গলা ছেড়ে ক্ষনে ক্ষনে একটা চিৎকার দিচ্ছে।
আব্বা, আঁই আইতেছি………

১১ thoughts on “মায়া মৃগ!

  1. ভালোই লাগলো। একটা অসঙ্গতি
    ভালোই লাগলো। একটা অসঙ্গতি চোখে পড়ল। ভাষা দেখে মনে হচ্ছে কায়সাররা নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ। তাইলে তাদের বাড়ি পদ্মাপাড়ে কেমনে হয়। মেঘনা হইলে ঠিক ছিল না? :ভাবতেছি:

    1. নোয়াখালীর পাশে লক্ষীপুর
      নোয়াখালীর পাশে লক্ষীপুর জেলার কথা চিন্তা করে গল্পটা করেছিলাম। আমি নিজেই ২বার লক্ষীপুরের মেঘনা নদীর পাশে থেকে ঘুরে আসছিলাম। গল্পটাতে মেঘনা নদীর নামই ব্যবহার করতে চেয়েছি। কিন্তু বেশ কয়েকবার স্ক্রুটিনি করার পরেও এই ভুলটা আমার চোখেই পড়ে নি। ডাঃ আতিক ভাই আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই অনাকাঙ্খিত ভুলটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে। কি করব বলেন, আমি তো মানুষই। আর ভুল করা মানুষেরই সাজে। 🙂

  2. নোয়াখালী অঞ্চলের কথ্য ভাষার
    নোয়াখালী অঞ্চলের কথ্য ভাষার ব্যবহার একদম পারফেক্ট হয়েছে ! গল্পের বেইজ এ উইকনেস নোটিস করলাম । ফিনিশিং টা আর নাটকীয় এক্সপেক্ট করেছিলাম । ফাইনালি বলবো, লেখাটি খুব সচ্ছন্দ হয়েছে । দ্যাটস হুয়াই পড়তে ভালো লেগেছে ।

    1. নীর্বাচিতা নীরা আপু,
      নীর্বাচিতা নীরা আপু, ধন্যবাদ।
      আমি নিজেই বুঝতে পারি যে আমার গল্প করার ক্ষমতা অতীব দূর্বল। কারনটা আমি নিজেই সবাইকে বলি। গল্প করার জন্যে প্রচুর পড়তে হয়, জানতে হয়। কিন্তু টেক্সট বইয়ের বাইরে আমি ১০ কি ১২টা বই ছাড়া অদ্যবধি কোন বই পড়ি নি। আর এই জন্যেই আমার জ্ঞানের পরিধি খুবই ক্ষীন। অনেকেই বলে গল্পে টুইস্ট দেওয়ার জন্যে। কিন্তু টুইস্ট মানে মোঁচড়, এইটা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝি না, তাই গল্পে নাটকীয়তা আনতে পারি না…

  3. সুন্দর লিখেছেন একটা ব্যাপার
    সুন্দর লিখেছেন একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম সরাসরি নোয়াখালী কিংবা সিলেটি ভাষা বুঝতে কিছুটা কষ্ট হলেও আপনার লেখার মাঝে আঞ্চলিক ভাষা পরতে এবং বুঝতে কোন সমস্যা হলনা ।। ব্যাপারটা খুব ইন্টেরেসটিং লাগলো …… চালিয়ে যান :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *