গ্রামপ্রেম ও একটি গণধর্ষণ

কুসংস্কার প্রবনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অজ্ঞানতা ও অসচেতনতার মানদন্ডে আমাদের গ্রামে স্থায়িভাবে বসবাস করা প্রায় সকল মানুষের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি। তাদের চিন্তা-চেতনার মধ্যেও তেমন কোন হেরফের সচারচর লক্ষ্য করা যায় না। অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা উঁচু-নিচু হলেও আর অন্যান্য সকল দিক থেকে সকলেই প্রায় একই মাপের। পড়াশুনা বা চাকুরীর সুবাদে যারা ঢাকা কিংবা অন্যান্য শহরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে তাদের মধ্যে হাতে গোনা দুই-একজন বাদে আর সকলের সাথে- ঈদ, পূজা-পার্বন উপলক্ষে ছুটি কাটাতে গ্রামে আসলে লক্ষ্য করা যায়- গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করা লোকজনের সাথে কথা-বার্তার ভঙ্গী, আচার-আচরণ ও পোশাক-পরিচ্ছদের ধরণ বাদে চিন্তা-ভাবনা ও অন্যান্য বিষয়ে তাদের মধ্যে তেমন কোন ধরনের পার্থক্য দেখা যায় না। কোন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরী হওয়া প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, অন্যান্যদের সাথে তাদের মতামত একই স্রোতে একই দিকে সমান তালে প্রবাহিত হচ্ছে।

আমাদের সকল গ্রামবাসীর মধ্যেই “গ্রামপ্রেম” নামক এক অদ্ভুত অনুভূতি তীব্র আকারে বিদ্যমান। তাদের এই “গ্রামপ্রেম” শুধুমাত্র গ্রামের মান-সন্মান সংক্রান্ত ব্যাপারে একান্তভাবে জড়িত। অন্যকোন দিকে গ্রামের উন্নতি-অবনতির ব্যাপারে “গ্রামপ্রেমে”র তেমন কোনধরনের সম্পৃক্ততা নেই। কিছু কিছু ঘটনার কারনে গ্রামের মান-সন্মান হঠাৎ বেড়ে উঠে বা অনেক নীচে নেমে যায়ঃ গ্রামের কোন লোক যদি আশেপাশের গ্রামের কাউকে আচ্ছামত মারধোর করতে পারে তাহলে গ্রামের মান-ইজ্জ্বত যায় বেড়ে। গ্রামের সকলে মিলে পিঠ চাপড়িয়ে লোকটিকে বাহবা দিতে থাকে, গ্রামে সে পায় বীরের মর্যাদা। বিপরীতক্ষেত্রে আমাদের গ্রামের কেউ যদি অন্যগ্রামের কোন লোকের কাছ থেকে পিটুনি খেয়ে আসে তাহলে গ্রামের মান-ইজ্জ্বত সব যায় নষ্ট হয়ে। পিটুনী খাওয়া লোকটিকে সবাই নানা ধরনের কটুক্তি ও গালিগালাজ করতে শুরু করে। এবং সেই ঘটনার কোন কারন খুঁজে বের করার বা শালিশী বৈঠকের মাধ্যমে তা মীমাংসা করে ফেলার কোনরকম চেষ্টা না করে গ্রামের মান-ইজ্জ্বত পুনুরুদ্ধারকল্পে সেই গ্রামের কোন লোককে(যদিও লোকটি ঐ মারধোরের ঘটনার সাথে কোনভাবেই জড়িত নয়, এমনকি হয়তো ঘটনাটি সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও কিছু জানে না) হাতের নাগালে পেলে তাকে ধরে আচ্ছামত প্রহার করে, গ্রামের সকল মানুষকে একত্রিত করে পাশের গ্রামটির উপর আক্রমনের পরিকল্পনা করে বা সাথে সাথেই সবাই মিলে গ্রামটির উপর আক্রমণ করে বসে। কোন লোক যদি তাদের ডাকে না আসে তাহলে তাকে চিহ্নিত করা হয় বেঈমান হিসেবে। গ্রামের লোকের কথা হল- আগে পাল্টা আক্রমন হবে, হারানো মান-সন্মান পুনরুদ্ধার করব তারপর শালিশী বৈঠক- তার আগে নয়। প্রেম, বিয়ে সংক্রান্ত ঝামেলায় ও কোন ধরনের যৌনহয়রানি বা যৌননির্যাতনের ঘটনায় শিকার-মেয়েটি যদি হয় আমাদের গ্রামের তাহলে আমাদের গ্রামের মান-সন্মান অনেক নীচে নেমে যায়। গ্রামের লোক মার খেয়ে ফিরলে যে পরিমাণ নিচে নামে, এক্ষেত্রে তার থেকেও আরো অনেক পরিমাণ নীচে নামে যায়। এক্ষেত্রে মেয়েটি ও তার পরিবারের উপর গ্রামের মানুষজন রোষান্বিত হয়ে উঠে। মেয়েটির পরিবারকে আটক রাখার বা তাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিতে না পারলেও শালিশী বৈঠক ডেকে আটক রাখে। এই আটক রাখা মানে হচ্ছে, গ্রামের মানুষ এই পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলা থেকে শুরু করে অন্যান সকল ধরনের যোগাযোগ ছিন্ন করে ফেলবে, পরিবারটির লোকজনের যেকোন ধরনের সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। আটককৃত পরিবারের মানুষের মানসিক অবস্থা এমন বিপর্যস্ত হয়ে যায় যে, তারা মনে করে এর বাড়িঘর ভেঙ্গে গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ায় এর চেয়ে ঢের ভালো ছিল।

অনেকদিন আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার ব্যাপারে মাঝে মাঝে শুধুমাত্র পক্বকেশ বৃদ্ধলোকদের প্রচন্ড গর্ভ ভরে কথা বলতে দেখা যায়, সেই ঘটনাটি হল- বেশ পূর্বে নাকি একবার(এখন জীবিত থাকা অনেকেই নাকি তখন জন্মগ্রহনই করেনি) এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ছোট নদীটির ওপারে অবস্থিত গ্রামের মানুষের সাথে এক ঐতিহাসিক ঝগড়া হয়। পাশের গ্রামের লোকজন নদী ডিঙ্গিয়ে গ্রামে আক্রমন করতে এলে লোকজন নিজেদের মধ্যকার সকল বিবাদ ভুলে একসাথ হয়ে নানা ধরনের হাতে বানানো অস্ত্র-পাতি নিয়ে লড়াই করে তাদেরকে পরাজিত করে, তাদেরকে নদী ঝাপিয়ে গ্রাম ছাড়া করে। তখনকার দিনে আশেপাশের সকল গ্রাম আমাদের গ্রামের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকত। গ্রামের লোকজনদেরকে আশে-পাশের গ্রামের মানুষজন সালাম দিয়ে চলত, বাজারে গিয়ে গ্রামের নাম উচ্চারণ করলে খাজনা পর্যন্ত মাফ। গ্রামের মেয়েদের দিকে পাশের গ্রামের কোন লোক চোখ তুলে তাকানোরও সাহস পেত না। অথচ আমাদের গ্রামের লোকেরা আশে-পাশের গ্রামের মেয়েদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে চলে আসতে পারত নির্বিঘ্নে। পুরাতনরা আফসোস করে, এখন আর সেই গ্রাম নেই, সেই মানুষ নেই, নেই সেই প্রভাব-প্রতিপত্তিও। গ্রামটি আবার কবে তার হারানো মান-সন্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি ফিরে পাবে, এমন কোন ঘটনা ঘটবে যা ইতিহাস হয়ে থাকবে, আশেপাশের সকল গ্রামের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে- এই ধরনের চিন্তা আবালবৃদ্ধবনিতা সকলের সার্বক্ষণিক। গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের মানুষজন মনে করে, অনেক কষ্টে তারা গ্রামের মান-ইজ্জ্বত কিছুটা হলেও বজায় রাখতে পেরেছে বলেই এখনও এখানে বসবাস করা যাচ্ছে, তা নাহলে কবেই তাদেরকে গ্রাম ছেড়ে উঠে যেতে হত। গ্রামের প্রভাব-প্রতিপত্তি যেদিন পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে সেদিন পাশের গ্রামের লোকজন তাদেরকে গ্রামে ঢুকে পিটিয়ে যাবে। গ্রামের মান-ইজ্জ্বত ও প্রভাব-প্রতিপত্তি শুধুমাত্র তাই “গ্রামপ্রেমে”র ব্যাপার মাত্র নয় অস্তিত্বের প্রশ্নও বটে। তাই গ্রামের এখনও যতটুকু ইজ্জ্বত আচ্ছে- তা বাঁচানোর জন্য তারা মরণপণ সংগ্রাম করতে প্রস্তুত। গ্রামের মান-সন্মান রক্ষার ব্যাপারে ভবিষ্যত প্রজন্মের দিকে তারা খুব সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকায়। বর্তমান প্রজন্ম মনে করে তারা মারা যাবার পর গ্রামটি আর বসবাসের উপযুক্ত থাকবে না।

আমাদের গ্রামের একটি মেয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে- এরকম একটি খবর যখন পুরোগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে তখন দেখা দেয় প্রায় একমুখী ধরনের একটি প্রতিক্রিয়া। গ্রামের বেকার যুবকদের মুখ দিয়েই কেবলমাত্র প্রতিক্রিয়াটি তীব্রভাবে ফুটে উঠে আর বাদ-বাকী সকলের মধ্যে প্রতিক্রিয়াটি দেখা দেয় বেকার যুবক ছেলেদের দিকে তাদের প্রশ্রয়মূলক অবস্থানের মধ্য দিয়ে। বেকার যুবক ছেলেদের প্রতি বাদ-বাকী সকলের মনোভাবটা এরকমঃ গ্রামের মান-সন্মানও প্রভাব-প্রতিপত্তি এতদিন ধরে আমরা রক্ষা করে আসছি, এখন তোমাদের পালা তোমরা রক্ষা কর- আমরা আছি তোমাদের পাশে। তবে যেহেতু আমাদেরকে কাজ-কর্মে সর্বদা ব্যাস্ত থাকতে হয়, সংসার ছেলে-মেয়ে আছে তাই সরাসরি এখন আর কোন ধরনের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে পারবো না। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তাদের প্রতিক্রিয়া কেবলমাত্র কাছের লোকজনের সাথে আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়, বা এ ধরনের মান-ইজ্জ্বত হানিকর কোন ঘটনা ঘটার ফলে ভেতরে জমা হওয়া পুঞ্জীভূত ক্ষোভের তাড়নায় স্বগতোক্তি করে উঠে। বেকার যুবক ছেলেদের প্রতি সমালোচনায় মুখর হতেও তাদের দেখা যায়ঃ না, আজকালকার ছেলেগুলো কোন কাজের না। কই আমাদের সময় তো এ ধরনের কোন ঘটনার জন্ম হতে পারেনি কখনও। আর তখন যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটত তাহলে কখন এদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে গ্রাম ছাড়া করে দিতাম! আর ওদিকে বেকার যুবকেরা গ্রামের পাশে নদীর ধারে কিছু দোকান-পাট হয়ে সামান্য একটু বাজারের মত গড়ে উঠা জায়গায় বসে বসে সিগারেট খায়, নিজেরা বসে আড্ডা দেয়, এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়। “গ্রামপ্রেম” সবসময় তাদেরকে তাড়িত করে বেড়ায় ও গ্রামের অবস্থান নিচে নেমে যাওয়ার দুঃশ্চিন্তায় তারা সবসময় অস্থির হয়ে থাকে। তারা তাদের মুখের ভাবটি সবসময় এমন করে রাখে যেন গ্রামের মান-ইজ্জ্বত ও প্রভাব-প্রতিপত্তি রক্ষাকল্পে যেকোন ধরনের যুদ্ধে নামতে তারা সর্বদা প্রস্তুত। বড়দের সমালোচনায় এরাও মুখর হয়- ওদের সময়ই তো গ্রামের ভেতরে এ ধরনের অসামাজিক কর্মকান্ড শুরু হয়েছে। তখন কিছুই করতে পারেনি আর এখন শুধু মুখে বড় বড় কথা বলে।

গ্রামের একটা মেয়ে যৌননির্যাতনের শিকার হয়েছে- এই খবরটি যখন এই বেকার যুবকদের কানে পৌঁছে তখন সন্ধ্যা নেমেছে কেবল। তারা তখন নদীর ধারের বাজার এলাকায় বসে আড্ডা দিচ্ছিল এবং নেশা জাতীয় দ্রব্য গ্রহন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, খবরটি শোনামাত্র তারা লাফিয়ে উঠে, আলাদা-আলাদা রাজনৈতিক দল সমর্থন করার করনে তাদের মধ্যে যে বিভাজন তৈরী হয়েছিল সেগুলোর কথা মুহূর্তে ভুলে গিয়ে একত্রিত হয়ে উঠে, “গ্রামপ্রেম”এর তীব্র তাড়নায়। মেয়েটিকে লক্ষ্য করে শুরু হয়ে যায় নানা ধরনের যৌনউদ্দীপনামূলক অশালীন-মন্তব্য। তারা তারস্বরে চিৎকার করতে আরম্ভ করে। না, না আর সহ্য করা যায় না- এর একটা বিহিত এখনই করতে হবে। গ্রামের যুব সমাজ এ ধরনের ঘটনা কখনই মেনে নেবে না। গ্রামের মাতাব্বররা ঠিক মত বিচার-শালিশ করতে পারেনা বিধায় গ্রামটি ধীরে ধীরে উচ্ছন্নে যাচ্ছে। তখনই যদি পরিবারটিকে আটক রাখা হত তাহলে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি কখনই হতে পারত না। এই ঘটনার বিচার গ্রামের যুব সমাজ করবে, হা মোক্ষম বিচার করে সকল গ্রামবাসীকে দেখিয়ে দেবে- তারা কি করতে পারে। গ্রামের নষ্ট হয়ে যাওয়া মান-সম্ভ্রম আবার তারা ফিরিয়ে আনবে। এই ব্যাপারটা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে যায়। তারা খুব স্বাভাবিক প্রবণতা-বশত এই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এখনই মেয়েটির বাড়ি-ঘর ভেঙ্গেচুরে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে তাদের “গ্রামপ্রেম”এর জ্বলন্ত প্রমাণ দিতে হবে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে তারা মোটামুটি নিশ্চিত- এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রামবাসী তেমন কোন বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া না দেখালেও মেয়েটির ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিলে সকলে তাদেরকে সমর্থন জানাবে, কেউ সামান্যতম বিরোধীতা করবে না বা দু-একজন করতে চাইলেও সাহস পাবেনা। কারন গ্রামবাসীরা সকলেই জানে এই মেয়েটি ও তার পরিবারের কারনেই গ্রামের মানসন্মান যতটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও নষ্ট হয়ে গেল! এদেরকে গ্রামছাড়া করতে না পারলে এধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। বেকার যুবক ছেলেগুলো ভেবে নিল, এই মেয়েটি নিশ্চয় দেহব্যাবসার সাথে জড়িত, নইলে সে যৌননির্যাতনের শিকার হতে যাবে কেন! তারা তাদের নেশাদ্রব্য পকেটে পুরে সদলবলে মেয়েটির বাড়ির দিকে রওনা হল। নেশাদ্রব্য গ্রহন করার জন্য কিছুক্ষণ পরে অবশ্য ঐদিকেই রওনা হত।

আমাদের গ্রামের মূলখন্ড থেকে কিছুটা দূরে দক্ষিন দিকের নদীর ধারে বাড়িঘর তুলে গ্রামের সবচেয়ে গরীব মানুষগুলো বসবাস করে। পূর্বে তারা সকলেই গ্রামের মূলখন্ডের ভেতরেই বাস করত। গ্রামের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে ঐ মূলখন্ডের মধ্যে সকলের বাস করা অসম্ভব হয়ে উঠে। আর শিক্ষার ব্যায়ভার কুলিয়ে উঠতে না পারার কারনে, বা অর্থ উপার্জনের তাগিদে তাদেরকে নানা ধরনের শারিরীক শ্রমের কাজকর্মে জড়িত হতে হয় বলে গরীবরা সাধারনত শিক্ষাগ্রহনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিক্ষাগ্রহন না করার ফলে অজ্ঞানতা, অসচেতনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার প্রবনতা তাদেরকে আরো বেশী করে চেপে ধরে। ফলে তাদের ছেলে-মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়, জন্মনিয়ন্ত্রন সম্পর্কে সচেতনতা না থাকার কারনে তাদের পরিবারে সন্তানের জন্ম হয় বেশী। আর অনেকবেশী বেশী সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহন করাটা তাদের কাছে অনেকটা আশীর্বাদের মতই কারন এরা কিছুটা বড় হলেই বিভিন্ন শারিরীক শ্রমে নিয়োজিত হয়ে অর্থ উপার্জন শুরু করে দিবে। এই গরীব পরিবারগুলোতে অনেকবেশী সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহন করার ফলে গ্রামের মূলখন্ডের ভেতরে তাদের ছোট ভিটাটা অনেক লোকের বসবাসের জন্য অপর্যাপ্ত হয়ে উঠে। তখন তারা তাদের ভিটাটিকে পাশের ধনী পরিবারের কাছে বিক্রি করে দিয়ে দক্ষিন দিকে নদীর ধারে বাড়ি তৈরী করে বসবাস করতে শুরু করে-বেশ কিছু পরিবার এখানে এসে বসবাস শুরু করার ফলে, এখন এটাকে একটা মহল্লা বলা যায়। যৌননির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েটির পরিবারটিও গ্রামের মূলখন্ডের বাইরে নদীর পাড়ের মহল্লায় বসবাস করতে থাকা পরিবারগুলোর একটি। আমাদের গ্রামের মূলখন্ডে বসবাস করা মানুষজনেরা বলে থাকে- নানা ধরনের খারাপ কাজ, বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ড ও সকল ধরনের নষ্টামী সব ঐ নদীর পাড়ের মহল্লাতে ঘটে থাকে। তাদের কথা পুরোপুরি সত্য- একবিন্দুও বাড়িয়ে বলা নয়। তবে এই সত্যের পিছনে আরেকটা সত্য আছে, তা হল- গ্রামের মূলখন্ডের মানুষরাই ঐ মহল্লায় গিয়ে জুয়া খেলে, নেশা-জাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে, কোন একটি মেয়ে বেড়ে উঠতে শুরু করলে- পরিপূর্ণ যৌবনে পদার্পন করার আগেই- তার উপর হামলে পড়ে। রাতের বেলায় গ্রামের মূলখন্ডের লোকজন নদীর পাড়ের মহল্লায় অবস্থিত একটি চায়ের স্টল ও মনোহারী দোকানকে কেন্দ্র করে জড়ো হয়ে নানা তৎপরতায় আনাগোনা শুরু করে। নদীর পাড়ের মহল্লায় আনাগোনা করা লোকজনদের মধ্যে কেউ কেউ মহল্লার কোন অধিবাসীর ঘরে বসে জুয়া খেলতে বসে যায়, আর কেউ বসে যায় নেশা-দ্রব্য গ্রহণ করতে। মূলখন্ডের ভেতরে এখনও টিকে থাকা কোন গরীব মানুষের ঘরেও অবশ্য জুয়া খেলার আসর বসে। আর কেউ কেউ আসে শুধু মাত্র এই মহল্লার উঠতি মেয়েদেরকে শারিরীকভাবে পাওয়ার আশায়, এটা ভিন্ন তাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। তবে এদের প্রত্যকেই টাকা-পয়সা, সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড়, ভালো ভালো খাবার ও বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসার লোভ ও নানা ধরনের ভয়-ভীতি দেখিয়ে বেড়ে উঠতে থাকা এই কিশোরী মেয়েদের শারিরীক ভাবে পেতে চায়। তাদেরকে শারিরীক ভাবে পাওয়া হয়ে গেলে গরীবের যুবতী মেয়েদের প্রতি ধনী মানুষদের চিরাচিরত আচরণ অনুযায়ী তার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে কাউকে কোন কিছু বলতে কড়াভাবে নিষেধ করে দেয়। ঐ মহল্লার যে সমস্ত মেয়ে এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয় তারা সকলে নিতান্ত গরীব, দু-বেলা দু-মুঠো খাবার জোটেনা, তাদের বড় বোনের ব্যাবহার করা পুরনো জরাজীর্ন জামা-কাপড় পরিধান করে। গরীব পরিবারের কিশোরী মেয়েগুলো সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড়, ভালো ভালো খাবার-দাবার ও ধনী বাড়ির বউ হয়ে একটু ভালো থাকা, ভালোভাবে চলা ইত্যাদির লোভ সামলাতে ব্যার্থ হয়। অল্প বয়সের অপরিপক্ক বুদ্ধির ফলে-এগুলো পাওয়ার আশা যে তার একধরনের আষাঢ়ে কল্পনা ও ঐ ধরনের লোকজনের প্রেমপূর্ণ কথা-বার্তা যে চরম মাত্রার ভন্ডামী তা তারা সবসময় বুঝে উঠতে সমর্থ হয় না। যদিও তারা নিজের চোখে এর পূর্বে অনেক মেয়েকে এরকম প্রতারণার শিকার হতে দেখেছে বা তাদের মহল্লার লোকজনের কাছ থেকে এ ধরনের ঘটনার বিবরণ শুনেছে। লোভে পড়ে, ভন্ডামীর শিকার হয়ে তারা নিজেদের দেহটিকে নির্বোধের মত সমর্পন করে বসে। দিনের পর দিন শারিরীকভাবে ভোগের পর তাদেরকে যখন রসহীন আখের ছোবড়ার মত ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় তখন আরো অন্যান্য লোকের কাছে শরীর সমর্পন করাটাকেই একটা ব্যাবসা হিসেবে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোন গতন্ত্যর থাকে না। দেখতে ভালো এবং শরীরের গড়ন সুন্দর এরকম দু-একজন কেবল কিছুদিনের জন্য এই ব্যাবসায় পসার জমাতে পারে। কারন নতুন নতুন অনেক মেয়ে বেড়ে উঠছে ধীরে ধীরে, দেহে যৌবনের রেখা ফুটে উঠতে শুরু করেছে এবং তারা তখনও কুমারী। লোকজনের নজর চলে যায়- বেড়ে উঠতে থাকা কিশোরী কুমারী মেয়েদের দিকে- যাদের বয়স হয়তো কেবল তের পেরিয়ে চৌদ্দয় পড়েছে। গ্রামের মাতাব্বর শ্রেণীর লোকেরাও মহল্লাটিতে আসে তবে তা গভীর রাত্রে- তারা কাউকে তেমন কিছুর লোভ দেখায় না; বরঞ্চ আটক রাখা, ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে দেওয়া ও পুলিশে খবর দেওয়া সহ ইত্যাদি নানা ধরনের হুমকি প্রদান করে ইতমধ্যেই দেহব্যাবসায় জড়িত হয়ে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের সাথে টাকা দেওয়া ব্যাতীত শারিরীকভাবে মিলিত হয় এবং জুয়ার আসর থেকে টাকা-পয়সা(বখরা) নিয়ে চলে যায়।

গ্রামের যুবকদল প্রচণ্ডমাত্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে নদীর পাড়ের মহল্লার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পথের ধারে দেখা হওয়া বিভিন্ন লোকজনের নিকট থেকে মেয়েটির উপর চালানো যৌননির্যাতন সম্পর্কিত আরো নানা ধরনের তথ্য পায়। তারা শোনে যে, ঘটনাটি ঘটেছে গ্রাম থেকে বিশ মাইল দূরে জেলা সদরে এবং একজন নয় বেশ কয়েকজন মিলে মেয়েটির উপর ভয়াবহ মাত্রায় নির্যাতন চালিয়েছে। এসময় আশে-পাশের লোকজন টের পেয়ে এগিয়ে এলে নির্যাতকরা ভয় পেয়ে মেয়েটিকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এগিয়ে আসা লোকজন অচেতন মেয়েটিকে হাসপাতালে এনে ভর্তি করিয়ে দেয়। বেশ কয়েকজন মানুষের কাছে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও মেয়েটির প্রতি তাদের কোন সহানুভূতি জন্ম নিতে দেখা যায় না। তাদের ধারনা হয়ঃ মেয়েটি নিশ্চয় জেলা সদরে গিয়েছিল তার দেহকে ভাড়া খাটাতে, যারা তাকে ভাড়া করেছে তারা আরো বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে- একটি পতিতা ভাড়া করে নিয়ে আসার কথা বলে- টাকা তুলেছে। এত মানুষ আসবে তা হয়তো মেয়েটা আগে থেকে ধারণা করতে পারেনি। মেয়েটি প্রথমে কয়েকজনকে নেওয়ার পর বাকীলোকগুলোকে আর স্বেচ্ছায় নিতে সক্ষম হয়নি। বাকীরাও যেহেতু টাকা দিয়েছে, তাহলে তারা আবার বঞ্চিত হবে কেন! বাকীরা তখন বাধ্য হয়েই মেয়েটার উপর উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। যুবক ছেলেরা সামনের দিকে চলতে চলতে কোলাহল করে উঠে, ঠিকই তো আছে, এমনই তো হওয়ার কথা। টাকা দেওয়ার পর আমরাই কি ছেড়ে দিতাম নাকি! আমাদের গ্রামের মান-সন্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে অন্য জায়গায় ভাড়া খাটতে গিয়েছে, এতবড় সাহস মেয়েটার! মেয়েটার উপযুক্ত শিক্ষাই হয়েছে, কে বলেছিল এত দূরে ভাড়া খাটতে যেতে। আমরা গিয়ে সারাদিন বসে থাকি, তখন তো আমাদের ডাকে না, কাছে ঘেঁষে না, ভাড়া খাটতে গেছে বিশ মাইল দূরে- এখন বুঝুক মজা! আর মেয়েটার বাপও নিশ্চয় খুব খারাপ- সেই নিশ্চয় তার মেয়েটাকে টাকার লোভে ভাড়া খাটতে পাঠিয়েছিল। মানুষ কি পরিমাণ খারাপ হলে নিজের মেয়েকে কয়েকটা টাকার লোভে ভাড়া খাটতে পাঠায়! চল সবাই, লোকটিকেও উচিত শিক্ষা দিতে হবে। এর কারনে পুরো জেলায় গ্রামের কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে, লোকজন বলাবলি করবে অমুক গ্রামের একটি মেয়ে ভাড়া খাটতে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এতে করে গ্রামের মানসন্মান আর তিল পরিমানও বাকী থাকবে না। গ্রামের মান-ইজ্জ্বত একেবারে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে- এরকমটা ভেবে তারা আরো ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে, নির্যাতিতা মেয়েটির বাড়িঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে নদীর পাড়ের মহল্লার দিকে তাদের চলার বেগ যায় আরো বেড়ে।

নদীর পাড়ের মহল্লার মেয়েদের প্রতি তাদের রাগের আরো একটা কারন আছে তা হল, গ্রামের মাতাব্বর শ্রেণীর লোকের মত তারাও চায় টাকা ছাড়াই নানা ধরনের হুমকি দিয়ে দেহ ব্যাবসার সাথে নিজেদেরকে জড়িত করে ফেলা মেয়েদের সাথে মিলিত হতে। তবে তাদের হুমকিতে কেউ খুব একটা বেশী ভয় না পাওয়ার কারনে তারা এই সুযোগটি থেকে বরাবরই বঞ্চিত। আরেকটি কারন হচ্ছে উঠতি মেয়েদের নানা কিছুর লোভ দেখিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদেরকে শারিরীকভাবে পেতেও তারা সফল হয় না। কারন বেকার ছেলেদের সাথে প্রেম করতে এই মহল্লার কোন মেয়েরই তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় না। তারা যখন বুঝতে পারে উপার্জনক্ষম বা ধনী ঘরের কোন ছেলে এই মহল্লার উঠতি কোন মেয়ের সাথে প্রেম করছে, বা দেহব্যাবসায় জড়িত হয়ে যাওয়া কোন মেয়ের সাথে মিলিত হচ্ছে তখন তারা প্রচন্ড রাগে ভেতরে ভেতরে গজগজ করতে থাকে। এই ছেলেগুলো যদি পাশের গ্রামের হয় তাহলে এদের উপর তাদের রাগ প্রচন্ডরকম বেড়ে উঠে। জুটিদেরকে হাতে নাতে ধরার জন্য নানা ধরনের পরিকল্পনা করে এবং চুপিসারে তাদের কাজ চালিয়ে যায়।

বেকার যুবক ছেলেরা নদীর পাড়ের মহল্লায় গিয়ে মেয়েটির বাড়িতে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারের উপস্থিতি লক্ষ্য করে। মহল্লার নারী-পুরুষ ও ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের দল মেম্বার সাহেবকে ঘিরে জটলা পাকিয়েছে। মেম্বার সাহেব এই মাত্র জেলা সদর থেকে ফিরে এসে তাদের কাছে ঘটনার বিবরণ খুলে বলছে। এখানে এসে মেম্বার সাহেবকে দেখতে পাবে-এমনটি তারা ভাবেনি, তাকে দেখতে পেয়ে তাদের ক্রোধ সাথে সাথে ক্ষোভে পরিণত হয়ে বাহির থেকে বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে পুঞ্জীভূত হয়ে যায়। তারা ঘটনাটির ব্যাপারে আরো তথ্য জানতে জটলার কাছে ভিড় করে দাঁড়ায়। হম্বিতম্বি করতে করতে এগিয়ে আসা যুবক ছেলেরা এগিয়ে গিয়ে জটলাটাকে বাড়িয়ে তোলা ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে সক্ষম হয় না। মেম্বার সাহেবের কাছ থেকে তারা সকলে শুনতে পায়- হাসপাতালে মেয়েটির সাথে কথা বলতে বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল থেকে সাংবাদিক এসেছে। তারা মেয়েটির সাক্ষাৎকার নিয়েছে- আগামীকালকেই হয়তো ঘটনাটি সারাদেশেব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। শহরের মানুষ নারী নির্যাতনের ব্যাপারে এখন অনেক বেশী সচেতন, তারা দোষীদের শাস্তির দাবীতে দরকার হলে আন্দোলনে নামতেও পিছপা হবে না- এবং এধরনের ঘটনা নিয়ে তারা পূর্বেও বেশ কয়েকবার আন্দোলন করেছে। আগামীকালই মেয়েটির বাবা থানায় গিয়ে মামলা দাখিল করবে আসবে। নারী নির্যাতনের মামলায় খুব তাড়াতাড়ি ওয়ারেন্ট বের হয়। মামলা চলে যায় দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে- মামলা বছরের পর বছর ঝুলে না থেকে খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যায়- এই ধরনের নারী নির্যাতনের মামলায় দোষীদের শাস্তি কেউ আটকাতে পারে না। জটলার মধ্যকার দুই-একজন কিছু মাত্রায় সচেতন লোক নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকে, এধরনের মামলায় নাকি জামিন নাই। আসামীদের নাকি ফাঁসি আদেশও হয়ে যেতে পারে। মেম্বার সাহেব বলতে থাকে, আসামীপক্ষ থেকে কেউ যদি মেয়েটির বাব-মা বা আত্মীয়-স্বজনকে হুমকি দিতে আসে তাহলে তাদের নামেও মামলা হয়ে যেতে পারে। এই কথাগুলো শোনার পর- মেয়েটির বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে তীব্রবেগে ফুড়ে আসা যুবক ছেলেরা ভেতরে ভেতরে বেশ একটু দমে যায়। মেয়েটি ও মেয়েটির পরিবারের উপর তাদের ক্ষোভ কিন্তু একটুও না কমে বরঞ্চ বাঁধা পেয়ে তা যেন আরো বেড়ে উঠে তাদের বুকের ভেতরটা হয়ে থাকে বোমা ফেটে যাওয়ার আগের মুহূর্তের মত।

গ্রামাঞ্চলে আগেকার দিনে সমাজের ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য, সমাজের কথাই ছিল শেষ কথা, সমাজের প্রথা ও সংস্কার অনুযায়ী মাতাব্বররা যে সিদ্ধান্ত দিত সকলেই তা নত মুখে মেনে নিতে বাধ্য হত। আজকের দিনে সমাজের আধিপত্য থাকলেও ধীরে ধীরে রাষ্ট্র তার ডাল-পালা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও মেলতে শুরু করেছে। এবং কিছু কিছু ব্যাপারে রাষ্ট্র তার একাধিপত্য অর্জন করে ফেলেছে, রাষ্ট্র যতক্ষন আছে ততক্ষন সেখানে সমাজের বড় ধরনের কোন প্রবেশাধিকার নেই। রাষ্ট্র সেখান থেকে চলে যাওয়া মাত্রই সমাজ সেখানে পুনরায় জাঁকিয়ে বসে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার সাধারণত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করলেও এখন সে রাষ্ট্রের দূত হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

যুবক ছেলেগুলো বুঝতে পারে, মেয়েটির ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেওয়ার কাজে সমাজের সমর্থন পেলেও রাষ্ট্রের সমর্থন তারা কখনই পাবেনা। এমন কাজ এই মুহুর্তে করলে রাষ্ট্র তাদের ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। তবে তারা আশা করে থাকে, রাষ্ট্র যখন এই ব্যাপারে তার কাজ শেষ করে বা না করেই হাত গুটিয়ে চলে যাবে তখন তারা পুরো সমাজের সমর্থন নিয়ে আবার আগ্রাসী হবে। বুকের ভেতর প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে যুবক ছেলেরা জটলা থেকে নতমুখে ধীরে ধীরে সরে আসে। একটা খোলা জায়গায় গিয়ে নিজেরা গোল হয়ে বসে বিরস মুখে নিজদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে, এখন পরিস্থিতি খুব একটা ভাল নয়- মেয়েটির পরিবারকে এখন কিছু বলা যাচ্ছে না, তাহলে তাদের নিজদেরও বিপদে পড়ে যাবার আশঙ্কা আছে। তাই তাদের এখন একটু ধৈর্য ধরে, বুঝে-শুনে কাজ করতে হবে। তবে তারা এই এই সিদ্ধান্তে অটল হয়ে রইল যে আজ-হোক কাল হোক মেয়েটির পরিবারকে তারা গ্রাম ছাড়া করবেই। এই মহল্লার অন্য মেয়েদের প্রতি তাদের ক্ষোভের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে তারা মনস্থির করে ফেলল শুধু এই মেয়েটির পরিবারকে নয়- এই সুযোগে এই ধরনের ঘটনার জন্য এখানে বসবাসকারী সকলকে দায়ী করে পুরো মহল্লাটিকে পুড়িয়ে দিতে হবে। তারা সকলে গুঞ্জন করে উঠে, শধু মামলাটি আগে শেষ হোক। এই মহল্লাটির জন্যই গ্রামের এত বদনাম, গ্রামের মান-সন্মান সব ধুলোয় মিশে যেতে শুরু করেছে। এদের অপকর্ম অনেক সহ্য করা হয়েছে, আর সহ্য করা হবে না। পুলিশ এসে এদেরকে কতদিন পাহারা দিয়ে রাখতে পারবে!

কারা এই ধরনের ঘটনাটা ঘটিয়েছে তা জানার জন্য এবার এরা উৎসুক হয়। এই মহল্লারই একজনকে ডাক দিয়ে নিয়ে এসে তারা শুনতে পেল- পাশের গ্রামের সেই ছেলেটির নেতৃত্বে আরো কয়েকটি গ্রামের কয়েকজন ছেলে মিলে নির্যাতনের ঘটনাটা ঘটিয়েছে। এই গ্রামেরই একটা ছেলে- মেয়েটির চাচাতো ভাই- তাদেরকে সহযোগীতা করছে। এবার যুবক ছেলেগুলো ঘটনাটির কারন আঁচ করতে পারে। মেয়েটির ভাড়া খাটতে যাওয়া সমন্ধে তারা যে ধারনা করেছিল সেটিও যায় ভেঙ্গে। মেয়েটির প্রতি ক্ষোভের সাথে সাথে এই ছেলেগুলোর উপরও তাদের নতুন একটি ক্ষোভ তৈরী হয়, এর মূল কারন হচ্ছে ছেলেগুলো পাশের গ্রামের-পাশের গ্রামের লোক তাদের গ্রামের কাউকে মারধোর করলে যেমন ক্ষোভ তৈরী হয় এ ক্ষোভটা তার চেয়েও অনেক ভয়ংকর। এই ঘটনাটি যার নেতৃত্বে ঘটেছে সেই ছেলেটির উপর এবং মেয়েটির চাচাতো ভাইয়ের প্রতি তাদের ক্ষোভ নতুন নয়-তবে এবার এই ঘটনার কারনে পুরাতন ক্ষোভটি ভয়ানক মাত্রায় বেড়ে উঠে। কয়েকমাস আগে থেকেই তাদের এই ক্ষোভ তৈরী হয়েছে। এখন তারা বলতে শুরু করে ছেলেগুলো ধরা পড়ুক এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। এই কাজে তারা পুলিশ এবং আইন-আদালতকে যেকোন ধরনের সাহায্য করতেও প্রস্তুত। দরকার হলে তারা মানবাধিকার সংগঠনের কাছেও যাবে যাতে দোষীরা তাদের শাস্তি এড়াতে না পারে।

আশে-পাশের গ্রামের দোষী ছেলেদের প্রতি এই গ্রামের যুবক ছেলেগুলোর পুরাতন ক্ষোভের কথা বলতে হলে এই ঘটনার কয়েকমাস পূর্বে ফিরে যেতে হবেঃ সেই সময়ে গ্রামের যুবক ছেলেগুলো হঠাৎ করে একসময় লক্ষ্য করে পাশের গ্রামের মাতাব্বরের যুবক ছেলেটি নদীর পাড়ের চৌদ্দ বছরের একটি কিশোরী মেয়েকে প্রায় প্রত্যেকদিন অটোরিক্সাতে উঠিয়ে কোথায় যেন নিয়ে যায় আবার সন্ধার পর মহল্লাটির আশে-পাশে কোথাও নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। তারা ছেলে-মেয়ে দুজনকে একসাথে হাতে-নাতে ধরার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অবিলম্বে শুরু হয়ে যায় কাজ- একদিন মেয়েটি বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে শোনার পর তারা সেদিন সন্ধ্যার সময় ভ্যান, রিক্সা, ও অটোরিক্সা চলাচলকারী রাস্তাটিতে টহল বসায়। তারা প্রত্যেকটা অটোরিক্সা থামিয়ে খুঁজে খুঁজে দেখে- ছেলেটিকে আর মেয়েটিকে একসাথে পাওয়া যায় কিনা। বেশ কয়েকটা অটোরিক্সা খুঁজে দেখার পর তারা যখন প্রায় নিরাশ হয়ে গেছে তখন দেখতে পেল, মেয়েটি হেঁটে হেঁটে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। এর পরবর্তীতে যে অটোরিক্সাটি আসে সেটাকে থামাতেই দেখা গেল, সেই নির্দিষ্ট ছেলেটি অটোরিক্সাতে বসে আছে। গ্রামের যুবক ছেলেগুলো সাথে সাথে ছেলেটিকে পাকড়াও করে মহল্লায় নিয়ে গিয়ে একটি ঘরে আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানতে পারল-তাদের ধারণা পুরোপুরি সত্য, ছেলেটি প্রায়-প্রায়ই মেয়েটিকে কোন নির্জন জায়গাতে নিয়ে গিয়ে একান্তভাবে কিছু সময় কাটিয়ে মেয়েটিকে আবার মহল্লার কাছাকাছি কোন জায়গায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। ছেলেটাকে মারধোরের ভয় দেখিয়ে তারা সব সত্য বের করে নিয়ে আসে। ছেলেটি মেয়েটিকে নানা ধরনের উপহার সামগ্রী দিয়ে, ভালো ভালো হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করিয়ে এবং বিয়ে করে ঘরের বউ বানাবার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে বশে এনেছে। এর মধ্যেই গ্রামের মাতব্বর শ্রেনীর লোকদেরকে খবর দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। মাতাব্বররা মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য ছেলেটির উপর চাপ দিলে সে জানায়, সে বিবাহিত এবং একটি সন্তানও আছে এবং এ কথাটি সে গোপন রেখেছিল মেয়েটির কাছ থেকে । এই মেয়েটিকে সে কোনমতেই বিয়ে করতে পারবে না। ছেলেটির সাথে মেয়েটির একান্তে সময় কাটানোর কারনে মেয়েটি তার ইজ্জ্বত খুইয়েছে, এখন হয় মেয়েটিকে তার বিয়ে করতে হবে নইলে মেয়েটির হারানো ইজ্জ্বতের ক্ষতিপূরন স্বরূপ চল্লিশ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। ছেলেটি জরিমানা দিয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করার হাত থেকে রেহাই পেতে খুব সহজেই রাজী হয়ে যাওয়ায় ছেলেটির বাবা-মাকে ঘটনার বিবরন ও জরিমানার কথা জানিয়ে ফোন দেওয়া হয়। ছেলের বাবা ধনী মানুষ, সে তৎক্ষণাৎ এসে চল্লিশ হাজার টাকার বিনিময়ে তার ছেলেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। ছেলেটি গ্রামের একটি মেয়ের ইজ্জ্বত ও সাথে গ্রামের সন্মান নষ্ট করে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকায় মাফ পেয়ে যাওয়াতে গ্রামের যুবক ছেলেগুলোর এই ছেলেটির প্রতি ক্ষোভ থেকেই যায়। আর মেয়েটির চাচাতো ভাইয়ের প্রতি তাদের ক্ষোভ এই কারনে যে, মেয়েটির সাথে তাদেরকে প্রেম করতে সহযোগীতা না করে সে সহযোগীতা করেছে পাশের গ্রামের একটি ছেলেকে। মেয়েটির চাচাতো ভাইয়ের সহযোগীতার কারন হল, এই ছেলেটির অটোরিক্সাটি সে ভাড়ায় চালায়। সহযোগীতা না করলে ছেলেটি হয়তো তার কাছ থেকে অটোরিক্সা কেড়ে নেবে, তখন অন্য একটি অটোরিক্সা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তাকে অর্থনৈতিকভাবে প্রচন্ডরকম সমস্যায় পড়তে হবে। এই ঘটনার কারনে অন্যকিছু মানুষের ক্ষোভ আবার মেয়েটি ও তার বাবার প্রতি। তাদের বক্তব্য এরকমঃ মেয়েটি নাকি তার বাবার ষড়যন্ত্রে বিভিন্ন ধনী মানুষের ছেলেকে প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে জরিমানা আদায় করে-এটাই ওদের পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদিকে অন্য কারো প্রতি নয় জরিমানা দেওয়া ছেলেটির ক্ষোভ জন্ম নিল তার কাছেই প্রতারণার শিকার হওয়া এই নির্বোধ মেয়েটার প্রতি- এই কারনে যে তার গ্রামের লোকজন তার কাছ থেকে জরিমানা আদায় করেছে, ছেলেটির ধারণা মেয়েটির উপর প্রতিশোধ নিতে পারলে তার পরিবার ও গ্রামের লোকজনের প্রতি প্রতিশোধ নেয়া হয়ে যাবে কারন এ ঘটনার কারনে মেয়েটির পরিবার ও তার গ্রামের মান-সন্মান নষ্ট হয়ে যাবে। ছেলেটি হয়তো তখনই পরিকল্পনা করে ফেলেছে- এই ঘটনার সে শোধ নেবে। মোক্ষম প্রতিশোধ নেবে সে। ছেলেটির ঐ প্রতিশোধ নেওয়ার তাড়না থেকেই মেয়েটির প্রতি এই নির্মম যৌন নির্যাতনের ঘটনাটির জন্ম।

ছেলেটি জরিমানা দেওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই মেয়েটির প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনাটিকে বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করে দেয়। এর ঠিক তিনমাস পর সে সফল হয়। এই ঘটনাটিকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে নিলে যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত যে সত্যটি বের হয়ে আসে তা হল, শুধুমাত্র যৌনসুখ লাভের প্রত্যাশায় কোন পুরুষ কোন মেয়ের উপর যৌন নির্যাতন চালায় না। প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধপরায়নতাই এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে। নারীর উপর নানা ধরনের যৌন নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা সুচারুরুপে পরীক্ষা করে দেখলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের কারনই খুঁজে পাওয়া যায়।

এই মহল্লার অন্যান্য লোকের ধারণা, মেয়েটির চাচাতো ভাইয়ের সহায়তায় সেই ছেলেটি আবার মেয়েটির সাথে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করে দেয়। তার বউ আছে এই সত্য মেয়েটির কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ায়, ছেলেটি তাকে বলে দরকার হলে ঘরের বউকে তালাক দিয়ে সে তাকে বিয়ে করবে। ছেলেটি আরো নানা ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে, আবেগঘন প্রেমপূর্ণ কথাবার্তা বলে এবং নানা কিছুর লোভ দেখিয়ে এবারও সেই চৌদ্দ বচ্ছরের অপরিপক্ক বুদ্ধির ও প্রতিনয়ত ক্ষুধায় জর্জর মেয়েটিকে আবারো বশ করে ফেলে। তাকে বিয়ে করার কথা বলে নিয়ে যায়-জেলা সদরে। ঘটনার দিন দুপুরে মেয়েটি তার বোনের শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ বাড়ি থেকে বের হয় এবং তারপর সন্ধ্যা রাত্রিতে তাকে পুরো শরীর ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এই ঘটনা উপলক্ষে সর্বদা ঝামেলা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করা ও মেয়েটির ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া গ্রামের কিছু সহানুভূতিশীল লোকের মতামতটা এরকম- এই ধরনের ঘটনার পরে অন্যকোন ছেলে তো আর মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজী হবে না। ফলে নির্যাতনকারী ছেলেটিকে যদি বুঝিয়ে-সুজিয়ে মেয়েটিকে বিয়ে করতে রাজি করানো যায় তাহলে, এই শর্তে মেয়েটির বাবার উচিত মামলা তুলে নিয়ে আপোষ করে ফেলা।
মেয়েটির শরীরে কিছু কিছু অংশ ও দুটি স্তন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে, মেয়েটির যৌনাঙ্গে কয়েকটি সেলাই দিতে হয়েছে- এই খবরটি শুনতে পেয়ে আমাদের গ্রামের একটি যুবক ছেলে মন্তব্য করে, ছেড়ার জিনিস ছিড়েছে- খাওয়ার জিনিস খেয়েছে। এতে এত দুঃখ করার কি আছে।

৯ thoughts on “গ্রামপ্রেম ও একটি গণধর্ষণ

  1. লেখাটি ‘ব্যাক্তিগত কথা’ বা
    লেখাটি ‘ব্যাক্তিগত কথা’ বা ‘প্রবন্ধ’ ক্যাটাগরিতে পড়বে হয়তো। গল্প কেমনে, বুঝতেছি না ভাই। :কনফিউজড: :কনফিউজড: যাই হোক, আমার অনুর্বর মস্তিষ্কের বেশি কিছু বুঝার ক্ষমতাও নাই। তবে লেখাটা ভালো হয়েছে। :তালিয়া: :খুশি:

  2. হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আমি আসলে
    হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। আমি আসলে এটাকে গদ্য ক্যাটাগরির মনে করেছি, তবে এরকম কোন ক্যাটাগরি খুজে পাইনি তাই গল্প ক্যাটাগরিতে দিয়েছিলাম। এখন পরিবর্তন করে ব্যাক্তিগত কথাকাব্য ক্যাটাগরিতে দিয়েছি। আর লেখাটি আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। অনেক ধন্যবাদ।

  3. ভালো একটা টপিক নিয়ে লিখছেন।
    ভালো একটা টপিক নিয়ে লিখছেন। গ্রাম্য পলিটিক্স অদ্ভুত। সবার মধ্যে একটা ধারণা আছে যে গ্রামের মানুষ খুব সহজ সরল। সেটা এক দিক দিয়ে ঠিক আছে। শহরের মানুষের সামনে এরা সহজ সরল আচরণ করে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের মধ্যে খুবই নোংরা পলিটিক্স খেলে। যাই হোক, এটাও একটা গ্রাম্য কালচার। লেখাটা ভালো লাগলো।

    1. ধন্যবাদ- ডাক্তার আতিক।
      ধন্যবাদ- ডাক্তার আতিক। গ্রাম্য রাজনীতি ও মানসিকতার একটা বা দুইটা দিক এখানে তুলে আনার চেষ্টা করছি- আরো নানা ধরনের দিক আছে বাঁকেরও অভাব নেই। গ্রাম সমন্ধীয় পরবর্তি লেখায় সেগুলোকে এক এক করে আনার চেষ্টা থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *