ল্যাম্পপোস্ট!

রাতের অন্ধকারে ধীরে ধীরে হাঁটা আমি খুব উপভোগ করি। শহরের কোথাও কোথাও ল্যাম্পলাইটগুলো নিরবে দাঁড়িয়ে থেকে আলো ছড়াচ্ছে। তাই হাঁটতে হাঁটতে কখনো অন্ধকার থেকে আলোয় বেরিয়ে আসি, আবার হাঁটতে হাঁটতেই আলো থেকে অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিশে যাই।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় অনেকটাই বাসার কাছাকাছি এসে পড়েছি …


রাতের অন্ধকারে ধীরে ধীরে হাঁটা আমি খুব উপভোগ করি। শহরের কোথাও কোথাও ল্যাম্পলাইটগুলো নিরবে দাঁড়িয়ে থেকে আলো ছড়াচ্ছে। তাই হাঁটতে হাঁটতে কখনো অন্ধকার থেকে আলোয় বেরিয়ে আসি, আবার হাঁটতে হাঁটতেই আলো থেকে অন্ধকারে ধীরে ধীরে মিশে যাই।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় অনেকটাই বাসার কাছাকাছি এসে পড়েছি …

আমার বাসার সামনে যে ল্যাম্পপোস্টটা আছে, তার লাইটটা নতুন লাগানো। দূর থেকে যখন আলোটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকি, তখন বড় অদ্ভুত লাগে। প্রতিদিনই নতুন করে অবাক হই দেখে, ল্যাম্পপোস্টটার নিচে এসে দাঁড়াই। হাতটা তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি, নিচে দাঁড়িয়ে থাকি। রাস্তায় আমার ছায়া পড়ে , অদ্ভুত তন্ময় হয়ে নিজের ছায়াটাকেই দেখি। মাঝেমাঝে দু তিনজন পথিক হেঁটে যায়। দেখে যায় এক যুবকের অবাক করা কার্যকলাপ, কিন্তু কিছুই বলে না। আমি ল্যাম্পপোস্টার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়াটাই দেখতে থাকি…

বাসার চার দেয়ালে ঢুকতে ইচ্ছে করে না … যে আর্কষণে বাসার পথে হাঁটতাম সে আগেই উবে গেছে … এখন বিছানায় পিঠ ঠেকালেও দুচোখে ঘুম আসে না, আসতে চায় না।
পকেটে ভাঁজ করে রাখা এক শক্ত কার্ডের অস্তিত্ব রয়েছে, বারবার জানান দিচ্ছে। কার্ডটা এক বিয়ের দাওয়াতের। এটা কোনো বড় বিষয় নয় বটে, বিষয় কার্ডে দেয়া কনের নামটি। যে নামটি দেয়া সে আমার অতি পরিচিত, অতি আপন বলবো কি? নাহ্, এটা নাইবা বললাম।
তবে বুকের মাঝে জেগে থাকা কোনো অস্তিত্ব অনুভব করছি , পীড়াদায়ক! এটা কি কষ্ট? গত দু বছরে কষ্টানুভূতি সহ প্রায় সকল অনুভূতিই হারিয়ে গেছে আমার কাছ হতে। তাই এই ক্ষীণ জেগে থাকা অনুভূতির সঠিক নামকরণ আমি করতে পারছি না।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান আমি, তাই মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও বাবা মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত হই নি, স্নেহের আড়ালেই ডুবে ছিলাম সবসময় , বাড়ির সব তখন আর্কষণীয় লাগতো , ফিরে যেতে মন চাইতো বাবা মার সাথে সময় কাটাবো বলে ..! ছোট্ট আমার পৃথিবীর আমার সবচেয়ে আপন, আমার সবচেয়ে ভালোবাসার দুজন মানুষকে হারিয়েছি গত দুবছরে , একে একে!! এ দুজনকে হারিয়ে যে অর্বণনীয় শূন্যতায় , বেদনায় ভরে গিয়েছিল আমার পৃথিবী , তার সাথে বুঝি কোনো কিছুরই তুলনা হয় না!! মেরুদন্ড যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল আমার, নিয়ন্ত্রণহীন এক গাড়ির ন্যায় বিধ্বস্ত হয়েছিলাম! এক হতভাগা হয়ে এদিকসেদিক ঘুরে ফিরেছি, এ বাস্তবতা মেনে নিতে খুব কষ্ট হতো প্রথম প্রথম …কিন্তু ধীরে ধীরে সে অভাব ও শূন্যতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি বেশ!! হয়েছি নির্বাক আর বেশ শান্ত, চুপচাপ। অনুভূতিগুলোও বির্সজন দিয়ে দিয়েছিলাম, বিরহে মেতেছিলাম শান্ততায়। আজ এক নতুন , এক অন্যরকম বিরহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে বুকে …

মেয়েটার রাতে বিবাহ, আজ রাতেই হবে। রাতে ঘটিত বিবাহের সাথে পরিচিত নই, তাই ভাবছি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করি গিয়ে … কিন্তু সত্যিই যাবো কি?

কার্ডটা পকেট থেকে বের করে আবার খুললাম। কনের নামটা আর স্থান দেখলাম ভালো করে, সব ঠিকই আছে!! জায়গা ঠিক আছে তো বটেই, কনের নামটাও মিল … রিহা ..। আমার অন্য অধ্যায় ..

পাশ দিয়ে একটি রিকশা যাচ্ছিল, হাত নেড়ে দাঁড় করালাম …

→ কই যাইবেন ভাই?
: ২নম্বর গেট

রিকশাওয়ালা অবাক হয়ে না করতে যাচ্ছিল , আমি পকেট হতে দুইশত টাকা বের করে দিলাম ..

→ উঠেন ভাই।

রিকশায় উঠে বসলাম। প্যাডেল চাপতে শুরু করলো লোকটা ..
লোকটা প্যাডেল চাপা দেখছি। রাতে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথেও আরেকটু বাড়তি রোজগারের উপায় দেখলে এরা নিষ্ঠার সাথে কাজ করে।
আমিও নিষ্ঠার সাথে কাজ করি এখন একটা, সেটা হচ্ছে হাঁটাহাঁটি।
রিহা আমাকে বলেছে আমি অনেকটা হিমু টাইপ। কিন্তু আমি হিমু নই। হিমু সর্বদা জায়গা বদলায়, আমি একই স্থান আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকি। হিমুরা সারাদিন হাঁটে আর আমি হাটি রাতে। হাঁটতে হাঁটতে ভোর হয়ে গেলে বাসায় ফিরি, ঘুমিয়ে যাই।

আমি হিমু না, আমি নতুন কেউ??

– ভাই থামেন

রিকশা দাঁড় করাল চালক। ” জ্বী ভাই? ”
– এই নেন টাকা। আপনি বাসায় চলে যান।
– ক্যান ভাই? যাইবেন না?
– না।
– তাইলে এতটাকা দিলেন ক্যান? কম দেন ভাই।
– না, ধরেন এইটা আমার কাছ থেকে একটা উপহার। বাসায় বাচ্চারা থাকলে কিছু উপহার দেবেন। যান।

রিকশাওয়ালা চুপচাপ রিকশা ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। আমি আবার রাস্তায় নামলাম।

দাঁড়িয়ে দেখছি রিকশা চলে যাচ্ছে। বৃষ্টির ফোটা পড়ছে রাস্তায়।

আচ্ছা, যে চলে যাচ্ছে তাকে যেতে দেওয়া উচিত। তাকে নতুন করে স্মরণ করে মায়া বাঁধানো ঠিক না।

রিহা? ও আর আমি মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ছিলাম একসময়। আবার নতুন করে ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না। গল্প যেভাবে হঠাৎ শুরু হয় তেমনি হঠাৎ শেষও হয়।
ঐদিকের যাত্রাটাও হঠাৎ শেষ করে দিলাম।

আমি আবার ল্যাম্পপোস্ট দেখে হাঁটতে শুরু করেছি। আসলে ভালোই লাগছে , তবে একটা কথা, আমি কিন্তু হিমু না।

আমি নতুন কেউ …

৯ thoughts on “ল্যাম্পপোস্ট!

Leave a Reply to আফ্রাসিয়াব Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *