বড়দিন ও কিছু তালপাতার মুফতি

ফেসবুকের কিছু পাবলিক এবং কিছু পেইজ বড় দিনের সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা জানানোর মাঝেও সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। তারা দাবী করছেন, কোন মুসলমান মেরী ক্রিসমাস বা বড় দিনের শুভেচ্ছা জানালে সে কাফের হয়ে যাবে, শেরেক করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদেরকে বলছি, আপনাদের কথা মতো, মেরী ক্রিসমাস বল্লে যদি শেরেকী গুনাহ হয়, তাইলে নন-মুসলিমরা যখন আমাদের ঈদ মোবারক বলে শুভেচ্ছা জানায়, তখন তো তাদেরও মুসলমান হয়ে যাবার কথা। আর তা হলে তো কাটাকাটি হয়ে গেলো!! তো, সমস্যা কই?


ফেসবুকের কিছু পাবলিক এবং কিছু পেইজ বড় দিনের সৌজন্যমূলক শুভেচ্ছা জানানোর মাঝেও সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। তারা দাবী করছেন, কোন মুসলমান মেরী ক্রিসমাস বা বড় দিনের শুভেচ্ছা জানালে সে কাফের হয়ে যাবে, শেরেক করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদেরকে বলছি, আপনাদের কথা মতো, মেরী ক্রিসমাস বল্লে যদি শেরেকী গুনাহ হয়, তাইলে নন-মুসলিমরা যখন আমাদের ঈদ মোবারক বলে শুভেচ্ছা জানায়, তখন তো তাদেরও মুসলমান হয়ে যাবার কথা। আর তা হলে তো কাটাকাটি হয়ে গেলো!! তো, সমস্যা কই?

দেশের বাইরে যারা আছেন, তারা জানেন, বড় দিনের এই দিনটাকে বাইরে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কতটা আনন্দময় করে উদযাপন করা হয়। সেখানে উৎসব আর ধমের্র মাঝে কোন সীমারেখা টানার চেষ্টা করা হয় না। তারা পারলে আমরা কেন পারবো না? আমার বস, আমার ফেসবুক এডিকশন নিয়ে যার দু:শ্চিন্তার শেষ নেই; যে বেচারাকে নিয়ে কিছুদিন আগে প্রথমালোর রসালোতে রম্য বিষোদগার করেছিলাম, সে লোক প্রতি বছরের মতো গত ক্রিসমাস পার্টিতেও আমাকে স্ববান্ধব দাওয়াত করেছিলো, [আমার গাড়ি গ্যারেজে ছিলো বলে নিজের গাড়ীতে করে আমাকে পিক আপ করে আবার পার্টির পর নিজে ড্রাইভ করে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গিয়েছে।] ইটালিয়ান পাস্তা, সি ফুড, সালাদ আর একটা আস্ত টার্কির রোষ্ট দিয়ে ডিনার সারার পর, আমি মদ খাই না জেনেও একটা দামী শ্যাম্পেইনের বোতল গিফট পেপারে র‍্যাপ করে অফিসের সবার সাথে সাথে আমাকেও উপহার দেয়া হয়েছিলো। ভীনদেশী একজন নন-খ্রিষ্টানের প্রতি এই আন্তরিক আচরন দেখে প্রথম প্রথম খুব অভিভূত হতাম, পরে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা আমাদের দেশে, আমাদের ধর্মের উৎসবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরকে অংশগ্রহন করতে কতটা সুযোগ দিই? এই চর্চাটা আমাদের দেশেও কবে চালু হবে?

লেবানিজ ইয়াং কিছু ইসলামিক স্কলারদের দেখেছি, তাদেরকে মেরী ক্রিসমাস বল্লে হাসিমুখে তারা উত্তর দেয় – সেইম টু ইউ। কয়েকজনকে দেখেছি আগ বাড়িয়ে বলতে – মেরী ক্রিসমাস। লেবানিজ একজন ফল বিক্রেতা প্রতিবছর বড় দিনে সে তার দোকানের খ্রিষ্টান কর্মচারীদের বিভিন্ন উপহার দেন। এবং উপহার দেবার সময় হাসিমুখে তাদেরকে ‘মেরী ক্রিসমাস’ বলেন। তাদের এই আচরনের কারন কি? কারন হিসেব প্রথমেই তারা বলেছেন – মুসলমানরা যে রেসিষ্ট নয়, এক্সট্রিমিষ্ট নয়, বরং মুসলমানরা যে ফ্রেন্ডলি, এটা নন-মুসলিমদের কাছে তুলে ধরা। কি চমৎকার ভাবনা!

আর এ ব্যাপারে ইসলাম কি বলে? মিশরের একজন নামকরা মুফতি আমাকে জানিয়েছেন, কেউ যদি মেরী ক্রিসমাস জানায়, তবে প্রত্যুত্তরে তাকে সেইম টু ইউ বলা বা তাকেও মেরী ক্রিসমাস বলা যেতে পারে। তবে মুসলমানদের এভাবে নিজ থেকে মেরী ক্রিসমাস বলাটা শরিয়তে “নট রিকোমেন্ডেড”। মানে বিনা প্রয়োজনে না বলাই ভালো। কিন্তু মুফতি সাহেব এরপর আমাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, “মেরী ক্রিসমাস” বলার কারনে কোন মুসলামন কাফের বা মুরতাদ হয়ে গেলো কিংবা কবিরা গুনাহ বা শেরেকী গুনাহ করলো – এরকম কোন ফতোয়া দেয়ার অধিকার কারো নেই। এই ধরনের ফতোয়া খুবই সেনসিটিভ। এই কারনে শুধুমাত্র মুফতিরা এক জোট হয়ে কিয়াস করে (আলোচনা করে) এ ধরনের ফতোয়া জারী করতে পারে এবং এতে অভ্যস্ত হবার জন্য মুসলিমদেরকে সময় দিয়ে থাকেন। [যেমন: কয়েক বছর আগে সাউথ আফ্রিকাতে মুফতিদের এক বিশ্ব সম্মেলনে নিয়মিত ‘সিগারেট খাওয়াকে’ মাকরুহ তাহরীমি বলে ঘোষনা দেয়া হয়েছে। মাকরুহে তাহরীমি অনেকটা হারামর কাছাকাছি] যেহেতু এটা এখনো কোথাও হয়নি, সেহেতু এ ধরনের কথা বলার অধিকার কোন মাওলানা বা সাধারন মুসলমান তো দূরের কথা, এককভাবে কোন মুফতিরও নাই। [উল্লেখ্য, ফতোয়া দেবার অধিকার একমাত্র মুফতিদের। ইসলামিক শরিয়তে মুফতি ছাড়া আর কারো কোন ফতোয়া দেয়ার অধিকার নাই, তা সে যত বড় বুজুর্গ-মাওলানা-মুহাদ্দিসই হোক না কেন]। বরং কেউ যদি আলগা মাতবরি করে এ ধরনের ফতোয়া দেবার চেষ্টা করে, উল্টো সে-ই কবিরা গুনাহ করলো।

আর ফেসবুকে তো এইসব সাম্প্রদায়িক প্রপাগান্ডা ছড়ানোর মতো “গায়ে মানে না আপনি মুফতি” – এর কোন অভাব নাই। সেইসব ‘তালপাতার মুফতিদেরকে’ বলছি, দয়াকরে এইবেলা অফ যান। আপনারা যতদিন এইরূপ ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতাকে জিইয়ে রাখবেন, ততদিন বির্ধমীদের হাতে আপনাদেরকে অপমান-অপদস্ত হতে হবে। আপনাদেরকে বুঝতে হবে যে, শুভেচ্ছা জানানোয় কারো জাত যায় না, ধর্ম যায় না বরং এর মাধ্যমে সৌহার্দ্য সম্প্রীতির মেলবন্ধন ঘটে।
আপনারা স্মরন করুন বিদায় হজ্বের সময় আমাদের শেষ নবীর (সা:) বাণী – “……আর তোমরা দ্বীন অর্থাৎ ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। কারন তোমাদের অনেক পূর্বেসূরীকে ধর্মের বাড়াবাড়ির কারনে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।” (কম-বেশী অর্থ/ বুখারী, ইবনে মাজাহ, কুরতুবী)

একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের লোকজন বাস করে। তাই আমি বিশ্বাস করি, ধর্মীয় উৎসব কোন একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার ভেতর থাকতে পারে না। ইনফ্যাক্ট, কোন উৎসব যদি কোন সীমারেখার ভেতর থাকে, সেটা আদতে কোন উৎসবই না। পূজোর আয়োজন, ঈদের আনন্দ, বড় দিনের শুভেচ্ছা, বৌদ্ধ পূর্ণিমার ঘনঘটা – এসব কোন নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্র বা ধর্মের উৎসব নয়, এগুলো আমাদের দেশের সবার; ১৬ কোটি মানুষের উৎসব।

সবাইকে বড় দিনের বিলেটেড শুভেচ্ছা।

৫ thoughts on “বড়দিন ও কিছু তালপাতার মুফতি

  1. একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের
    একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের লোকজন বাস করে। তাই আমি বিশ্বাস করি, ধর্মীয় উৎসব কোন একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার ভেতর থাকতে পারে না।

  2. পূজোর আয়োজন, ঈদের আনন্দ, বড়
    পূজোর আয়োজন, ঈদের আনন্দ, বড় দিনের
    শুভেচ্ছা, বৌদ্ধ পূর্ণিমার ঘনঘটা – এসব
    কোন নির্দিষ্ট জাতি বা গোত্র
    বা ধর্মের উৎসব নয়, এগুলো আমাদের
    দেশের সবার; ১৬ কোটি মানুষের উৎসব। 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *