ফেরা

“মডার্ন শাড়ি বিতান” এর সামনে অনেকক্ষণ ধরে একটা লোক ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হবে লোকটা খুব বিরক্ত আর কিছু একটা নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছে। আধাঘন্টা আগেও একবার এই লোক এই দোকানের সামনে দিয়ে ঘুরে গেছে। তখনও মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানদার হায়দার হোসেন হাত কচলাতে কচলাতে বাইরে এসে জিজ্ঞেস করেছিল,
“স্যার কিছু লাগবে?”
“না, দেখছি। বিরক্ত করবেন না যান।”

“মডার্ন শাড়ি বিতান” এর সামনে অনেকক্ষণ ধরে একটা লোক ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হবে লোকটা খুব বিরক্ত আর কিছু একটা নিয়ে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় আছে। আধাঘন্টা আগেও একবার এই লোক এই দোকানের সামনে দিয়ে ঘুরে গেছে। তখনও মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে ছিল। দোকানদার হায়দার হোসেন হাত কচলাতে কচলাতে বাইরে এসে জিজ্ঞেস করেছিল,
“স্যার কিছু লাগবে?”
“না, দেখছি। বিরক্ত করবেন না যান।”
ধমক খেয়ে হায়দার সাহেব পিছিয়ে এলো। লোকটার চেহারা একবার দেখে আবার দোকানে গিয়ে বসলো। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় হায়দার সাহেব জানেন – এই ধরনের কাস্টোমারদের খামাখা খেপিয়ে লাভ নেই। পছন্দ হলে এরা নিলে ঠিকই নেবে, না নিলে জোরাজুরি করে লাভ নেই। শাড়ি পছন্দ হলে তখন ধমকের বদলা নেয়া যাবে।
শাড়ির দোকানের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কায়েস। বনানীতে একটা মোটামুটি ভালো মানের অফিসে মার্কেটিং অফিসার পদে চাকরী করছে। সমস্যা হল, কায়েসের শাড়ি কেনার অভ্যাস নেই। শেষ কবে সে শাড়ি কিনেছে তা সে মনে করতে পারলো না। সম্ভবত সায়েমের বিয়েতে। কায়েসকে সাথে করে নিয়ে গেলেও, দোকানে গিয়ে দেখা গেল কেনাকাটার ব্যাপারে কায়েসের চাইতে সায়েম দুই ধাপ এগিয়ে। হাজার হাজার শাড়ি উল্টে পাল্টে শাড়ি পছন্দ করে সেটা নিয়ে দামাদামি করে হুলুস্থুল করে ফেলল সেবার।
সায়েমকে আজকে নিয়ে আসা দরকার ছিল। কেন যেন মনে হচ্ছে শাড়ি কিনে আজ সে একটা বিশাল ধরা খেতে যাচ্ছে। হাতে টাকা পয়সা একেবারেই নেই, তার ওপর যদি ঠক খেতে হয়ে তাহলে কেমন লাগে? ব্যাপারটা নিয়ে তার নিজের ওপর খুবই বিরক্ত লাগছে। তবে আপাত দৃষ্টিতে তাকে বিরক্ত মনে হলেও মনে মনে সে কিন্তু আজ বেশ খোশ মেজাজে আছে। খোশ মেজাজে থাকার জন্য তার কাছে বেশ কয়টা কারণ আছে। কিন্তু যে ঘটনাটার জন্য তার সবচেয়ে বেশী আনন্দ লাগছে তা হল – তার সাড়ে সাত মাসের ছেলে আজ তাকে প্রথমবারের মতো আব্বু বলে ডেকেছে।
আজ দিনটাই অন্যরকমভাবে শুরু হয়েছে। হরতাল চলছে বলে রাস্তাঘাট ফাঁকা। হরতালের ঝামেলা এড়াতে সে সকাল সকাল অফিসে চলে আসে। অবশ্য অফিসে সে সবসময়ই সবার আগে পৌছায়। ফাঁকা অফিসে বসে দিনের শুরুতেই সে এককাপ চা আর একটা সিগারেট খেতে খেতে পেপারটা পড়বে। তাকে অফিসে ঢুকতে দেখা মাত্র অফিসের পিয়ন ফিরোজ তার জন্য এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর একটা সিগারেট নিয়ে আসবে।
অফিসে একমাত্র বড় স্যার আর কায়েস ছাড়া ফিরোজ অন্য কারো জন্য কখনো একটা সুতাও এনে দেয়নি। কায়েসের প্রতি ফিরোজের এই পক্ষপাতিত্ব কেন জন্মাল কে জানে? কায়েস প্রতি ঈদে ওকে ভালো বকসিস দেয়। সেটা অবশ্য অন্যরাও দেয়। তবে মাঝে মাঝে কায়েস সকালবেলা ফিরোজের সাথে সুখ দুঃখের কথা বলে, মাঝে মাঝে টাকা পয়সা ধার-টারও নেয়। ফিরোজকে হাত করার জন্য অনেকে টাকা সেধেছে। কিন্তু সে অন্য কারো কাছে হাত পাতেনি।
এসব ছাড়াও ফিরোজের দেমাগি আচরণের জন্য অফিসের বাকি স্টাফরা ফিরোজকে দু’চোখে দেখতে পারে না। কিন্তু তারা যে ফিরোজের ক্ষতি করবে সে উপায়ও নেই। ফিরোজ এমডি স্যারের বাসাতেও কাজ করে। আর বড় স্যারের বাসার পিওনের সাথে ঝামেলা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ না।
সিগারেটটা ধরিয়ে চায়ের কাপে সে মাত্র চুমুক দিয়েছে এমন সময় তার ফোনটা বেজে উঠলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সে একটু অবাক হয়ে গেল, খানিকটা দুশ্চিন্তাও ভর করলো। সীমা ফোন করেছে। এতো সকালে সীমা সাধারণত ঘুম থেকে ওঠে না, আর উঠলেও খুব প্রয়োজন ছাড়া অফিস টাইমে ফোনও করে না। কারণ ছেলে ফারহান গভীর রাত পর্যন্ত মায়ের সাথে নানা রকম অদ্ভুত আর দুর্বোধ্য শব্দ করে কথা বলে। কায়েস বেশী রাত জাগতে পারে না। মা-ছেলের কথাবার্তা শুনতে শুনতে প্রতিরাতে সে ঘুমিয়ে যায়। আবার ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে কাউকে জাগায় না। গোসল করে হালকা নাস্তা করে তার কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা তালা দিয়ে বের হয়ে আসে। সীমা ধীরেসুস্থে উঠে সংসারের হাল ধরে। গত ছয় মাস ধরে এভাবেই চলছে। মাঝে তিন মাস সীমার ছোট বোন নীরা এসে ওদের বাসায় ছিল। পরীক্ষা চলছে বলে এখন হলে গিয়ে উঠেছে। পরীক্ষা শেষ হলে আবার ফিরে আসবে।
কায়েস চিন্তিত মুখে ফোন রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে সীমার উচ্ছল কণ্ঠ ভেসে এলো,
“এই, কি হয়েছে জানো?”
কায়েস বিরক্তির সুরে বলল, “কি হয়েছে আমি কিভাবে জানবো?”
“তোমার ছেলে সকাল থেকে আব্বু আব্বু করছে!”
কথাটা শুনে কায়েস একটু নড়ে চড়ে বসলো। সীমা এই কথা বলে আগেও তাকে একবার বোকা বানিয়েছে। সেবার “আব্বু” ডাক শোনার জন্য সে সারারাত জেগে বসে ছিল। এমনিতে তার ছেলে নানারকম শব্দ করলেও সেদিন সে একদম চুপ মেরে গেল। সারারাত জেগে থেকে পরদিন তার অফিস করতে খবর হয়ে গেছে। সারাটা দিন চোখে ঘুম ঘুম নিয়ে ঘুরতে হয়েছে। এবার আর সেই ভুল করা যাবে না। কায়েস সাবধানী গলায় বলল,
““আব্বু” কি তোমার ছেলে বলছে, না তুমি শুনছো?”
কায়েসের কথা শুনে সীমা আহত হলায় বলল, “তুমি আমার কথা একটুও বিশ্বাস কর না, তাই না?”
“না, তা বলছি না।”
সীমা ঝামটা মেরে বলল, “এই নাও ফোন লাউড স্পীকারে দিচ্ছি, নিজের কানেই শোন।”
ফোন লাউড স্পীকারে দেয়ার পর কায়েস সত্যি সত্যি শুনল ফারহান আধো আধো বুলিতে বলেই চলেছে,
“আব্বুউউউ…আব্বুউউউ…”
অদ্ভুত এক সুখে তার বুকটা ভেসে গেল সাত সকালে। আরো কিছুক্ষণ তার ছেলের “আব্বু” ডাক শোনার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তার আগেই সীমা ফোন সরিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“অনেক শুনেছো। কপাল ভালো থাকলে, বাকিটা বাসায় এসে নিজের কানেই শুনো। আমার কথা যখন বিশ্বাস করই না, আমার ফোন দিয়ে ছেলের মুখে ‘আব্বু’ ডাক শোনার তোমার দরকার নেই। রাখলাম।” বলে, কায়েস কিছু বলার আগেই ও ফোন রেখে দিল।
ফোনটা হাতে নিয়ে কায়েস আনমনে খানিকক্ষণ হাসল। সীমা মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত আচরণ করে। ব্যাপারটা তার কাছে ভালোই লাগে। মনে হয় জীবনটা খারাপ না তো!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আজ ডিসেম্বরের দুই তারিখ। সীমার সাথে চার বছর আগে এই দিনটাতেই ওর দেখা হয়েছিল তার এক বন্ধুর বিয়েতে। সেখান থেকেই পরিচয়। তারপর প্রেম এবং অবশেষে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে।
গত দু’মাসে অনেক কষ্টে সে কিছু টাকা জমিয়েছে আজকের দিনটার জন্য। বিয়ের পর সীমাকে সে তেমন কিছুই দিতে পারেনি। ফ্যামিলির অমতে বিয়ে করায় ওদের কোন বিয়ের অনুষ্ঠানও হয় নি। তাই তার বহুদিনের শখ সীমাকে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি কিনে দেবে। সেই শাড়ি পড়ে ওরা তিনজন সাজগোজ করে একটা রিকশায় করে সারাদিন পুরো ঢাকা ঘুরে বেড়াবে।
সীমিত বাজেটের মধ্যে সে একটা শাড়িও পছন্দ করেছিল। অফিসের পর বাবুর জন্য একটা খেলনা কিনে সে সোজা সেই দোকানে চলে এসেছিল। সেই দোকানের সামনেই সে এখন ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ দোকানের সামনে ডিসপ্লেতে তার পছন্দ করা শাড়িটা নেই। সেখানে নতুন একটা শাড়ি ঝোলানো। তবে যে কমলা-হলুদ রঙের শাড়িটা এখন দেখা যাচ্ছে এখন তার কাছে সেই শাড়িটাই বেশী ভালো লাগছে। শাড়িটার দাম ওর পছন্দ করা শাড়িটার চাইতে প্রায় দুই হাজার টাকা বেশী। এক্সট্রা দুই হাজার টাকা খরচ করতে তার সামর্থ্য আটকে যাচ্ছে। কিন্তু সে কিছুতেই শাড়ির ওপর থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না।
আর মিনিট খানেক দেখে সে মনঃস্থির করলো – এই শাড়িটাই সে আজ কিনবে। পরেরটা পরে দেখা যাবে। এতো ভেবে লাভ নেই – “আজকে মরলে কালকে দুইদিন।”
শাড়িটা কিনে সে আর দেরী করলো না। একটা সিগারেট ধরিয়ে দ্রুত একটা রিকশায় উঠে পড়লো। দিনকাল ভালো না। হরতালের মধ্যে বেশীক্ষণ বাইরে থাকা ঠিক না। সন্ধ্যার পর ইতিমধ্যে রাস্তায় লোকজন কমে গেছে। ছাড়াছাড়া দু’একটা লোকাল বাস চলছে। কেমন যেন একটা থমথমে অবস্থা চারিদিকে।
ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই বেশ ভালো শীত পড়ে গেছে। হাতের প্যাকেট গুলো দু’পায়ের মাঝে আটকে রেখে বাঁ হাতে সে সিগারেটটা ধরল। বাসায় একটা ফোন করা দরকার, অনেক দেরী গেছে। ডান হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতেই সে সামনে একটা হুড়োহুড়ি শুনলো।
রাস্তার পাশে একটা গলি থেকে দশ-বারোজনের একটা মিছিল হুট করেই রাস্তায় উদয় হয়েছে। স্লোগান দিতে দিতে ওরা এদিকেই এগিয়ে আসছে। ওদের দিকে তাকিয়ে অত্যান্ত অশুভ একটা অনুভূতি হল কায়েসের। খুব খারাপ একটা কিছু হতে চলেছে।

==================================================================
অনেক রাত হয়ে গেল। কায়েস এখনো এলো না। ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। কি করছে কে জানে? অফিসের মিটিং সম্ভবত। আজ তাদের একটা স্পেশাল ডে আর কোন স্পেশাল ডে-তে কায়েস ঝামেলা করবে না, তা হয় না।
ফারহান অনেকক্ষণ ধরে “আব্বু” “আব্বু” করে কাঁদছে। সীমা অনেক চেষ্টা করেও তাকে থামাতে পারছে না। মাঝে মাঝে ছেলেটার যে কি হয়!

৮ thoughts on “ফেরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *