নাচোলের গৃহ অলঙ্করণ শৈলী

ঢাকাতে তখনও শীত নামেনি- নভেম্বরের শুরুর সময়ের কথা বলছি। কথায় কথায় হরতাল অবরোধ তখনও শুরু হয়নি। সময়ের বাস অসময়ে গিয়ে পৌঁছায়না গন্তব্যে। এমন সময়ে চাপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে নামলাম ভোর সকালে চারজন। ঘোরাঘুরির কাজ নয় ঠিক, আবার ঘোরাঘুরিরও। এই এলাকার গৃহ অলঙ্করণ শৈলীর সুনাম নাকি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও আছে। আর এই গৃহ অলঙ্করণ শৈলীর প্রথাকে সম্মাননা দিতে চায় জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ। আমার কাজ মূলত ছবি তোলা আর সাক্ষাৎকার নেয়া। দুইজন ভিডিও ক্যামেরা সামলানোর দায়িত্বে, আর আরো একজন- আমাদের দলনেতা দুনিয়ার সবকিছুতেই তার বিরক্তি।


ঢাকাতে তখনও শীত নামেনি- নভেম্বরের শুরুর সময়ের কথা বলছি। কথায় কথায় হরতাল অবরোধ তখনও শুরু হয়নি। সময়ের বাস অসময়ে গিয়ে পৌঁছায়না গন্তব্যে। এমন সময়ে চাপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে নামলাম ভোর সকালে চারজন। ঘোরাঘুরির কাজ নয় ঠিক, আবার ঘোরাঘুরিরও। এই এলাকার গৃহ অলঙ্করণ শৈলীর সুনাম নাকি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও আছে। আর এই গৃহ অলঙ্করণ শৈলীর প্রথাকে সম্মাননা দিতে চায় জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ। আমার কাজ মূলত ছবি তোলা আর সাক্ষাৎকার নেয়া। দুইজন ভিডিও ক্যামেরা সামলানোর দায়িত্বে, আর আরো একজন- আমাদের দলনেতা দুনিয়ার সবকিছুতেই তার বিরক্তি।

আমাদের গন্তব্য নাচোল- চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। প্রায় ২৩৯ বর্গ কিলোমিটার ব্যপ্তির এই উপজেলা বাংলার আদি ভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৯ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল নাচোল। নাচোলের কৃষক- বিশেষত সাঁওতালরা ছিল এই আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তি। বরেন্দ্র এলাকার আদি বাসিন্দা এই সাঁওতাল।
তাদের বিভিন্ন উৎসবে, সামাজিক পরবে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গৃহ অলঙ্করণের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। আদিকাল থেকে চলে আসা এই প্রথার ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে এই প্রথা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে- এটা বলা যায় নির্দ্বিধায়।


ভোর সকালে চাপাই নবাবগঞ্জের ঠান্ডা বাতাস আমাদের কাপিয়ে দিল। কোন রকমে বাস স্ট্যান্ডে চা খেয়ে মাইক্রো বাসে চেপে চিকইল গ্রাম। দেখতে দেখতে চলে এল চিকইল গ্রাম। এই গ্রামে ঢোকার পথেই বেশ কিছু নমুনা পাওয়া গেল গৃহ অলঙ্করণ শৈলীর। এই গ্রামটি সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের- সাঁওতালদের নয়। এই গ্রামে এই প্রথা চলছে বড়জোর ১৫-১৬ বছর ধরে। গ্রামের এই শিল্পীদের কাছে জিজ্ঞাসা করে এটাই জানা গেল। গৃহ অলঙ্করণের এই কাজ মূলত ঘরের নারীরাই করেন। অবসর সময়ে করলেও এই কাজ নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানালেন টুনটুনি বর্মণ। প্রায় তরুণী এই অলঙ্করণের কাজ শিখেছেন মায়ের কাছে। এই অলঙ্করণের বিশেষ কোন অর্থ নেই, নির্দিষ্ট কোন নক্সার ধরণ নেই বলে জানালেন তিনি। যখন যেরকম দেখতে ভাল লাগে, সেটাই আঁকেন তিনি। বিয়ে, নতুন ধানের উৎসবে, বিভিন্ন পূজার সময়ে এই অলঙ্করণ করা হয়। আর প্রতিবার মাটির ঘর লেপার পর নতুন অলঙ্করণ তো হয়ই। তবে এই শিল্পকর্ম তারা টাকার বিনিময়ে করেন না। নিজের ঘর, অথবা অপটু প্রতিবেশীকে সাহায্য করার মধ্যেই এই শিল্পের গন্ডি।
কামনী বর্মন জানালেন, ‘ঘর লেপার রঙের কাজ’-এর বয়স ১৫-২০ বছরের বেশি আগের নয়। আশেপাশের গ্রামের সাঁওতালরাও তো তাদের ঘরে এমন আঁকাআঁকি করে, তাদের কাছ থেকে শিখেছেন নাকি- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বেশ বিব্রত হয়ে বললেন- না তা হবে কেন? এটা আমাদের নিজেদের- হিন্দুদের প্রথা। (রাজশাহীর কিছু কিছু এলাকায় এখনো সাঁওতালসহ অন্য আদিবাসীদের নিচু চোখে দেখা হয়, তাই গৃহ অলঙ্করণ প্রথা তাদের কাছ থেকে ধার করেছে- এমন প্রশ্নে সম্ভবত তিনি বিব্রত হয়েছেন)। আশ্বিন মাসের পূজা, জৈষ্ঠ্য মাসে হরিবাসরেই মূলত তাদের ঘরে নতুন নতুন নক্সা আঁকা হয়। মূলত ফুল লতাপাতার মোটিফ ফুটিয়ে তোলা হয় লালমটি, খড়িমাটি আর রঙের মাধ্যমে।

বাঙালিদের নকশা। যার মনে যত প্যাঁচ, তার নকশা তত সুন্দর!!!!

বিনয় চন্দ্র বর্মন. গ্রামের সর্দার। তিনি জানালেন, আগে দু’একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এই গৃহ অলঙ্করণের কাজ। এখন তো প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ঘর লেপার পর এই আঁকানোর কাজ হয়। তিনিও এই প্রথা সাঁওতালদের কাছ থেকে ধার করা কীনা এমন প্রশ্নে সরাসরি অস্বীকার করলেন। বড় পূজা, শ্যামাপূজা, হরিবাসরের মত ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিয়ে বা অন্যান্য সামাজিক উৎসবেও এই অলঙ্করণ করা হয় বলে জানালেন। মূলত নারীরা আঁকলেও, পুরুষরা এ ব্যাপারকে সমর্থন করছেন। কারণ এতে ঘরগুলো দেখতে সুন্দর হয়। তবে, যার ঘর সেই এই কাজ করে, কেউ টাকার বিনিময়ে এই গৃহ অলঙ্করণের কাজ করে না।
পূর্ণিমা বর্মন এই গৃহ অলঙ্করণের কাজ করছেন ৫-৬ বছর ধরে। কেন করেন, জানতে চাইলে বলেন, আমাদেও তো আর দালান কোঠা নেই, এই মাটির ঘরই আমাদের সব। তাই এই ঘরকে যত সুন্দর করে সাজানো সম্ভব, আমাদের সীমিত সামর্থ্যে তাই করার চেষ্টা করি।
রঞ্জনা বর্মনের ঘরে দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধের ছবি, শহীদ মিনার আর পশু পাখির ছবি। আবার অনিতা বর্মন এঁকেছেন ডাইনোসর, স্মৃতিসৌধ। কারণ হিসেবে জানা গেল তারা দু’জনেই কিছুদিন গ্রামের স্কুলে গিয়েছেন। তাই বইয়ে দেখা ছবিগুলোকে আঁকার চেষ্টা করেছেন।

উপকরণ

উপকরণের নাম জানতে চাইলে সবাই একই উপকরণের নাম নিয়েছেন। রং হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়ি মাটি, আতপ চাল, বরেন্দ্র এলাকার বিখ্যাত লালমাটি আর রং। সাদা রং তৈরি করতে খড়িমাটির গুড়ো পানিতে মেশানো হয়, খড়িমাটির বদলে আতপ চাল গুড়ো করেও পানিতে মেশানো যায়। খড়িমাটির চাইতে আতপ চালের রঙের স্থায়িত্ব বেশি হয়। বাজারে পাওয়া যায় এই খড়িমাটি। আর লালমাটি বিক্রি হয় ফেরি করে।
এরপরের গন্তব্য বাবুডাং গ্রাম। পথে সকালের নাস্তা হয়ে গিয়েছে- বেগুন ভর্তা, কলাইয়ের ডাল দিয়ে তৈরি রুটি, সাথে ফ্রেশ পেঁয়াজ। আহা- এই নাস্তার বর্ণনা কেন যে কোরআনে নেই- কে জানে! বেহেশতি খানায় যদি এই খাবার না থাকে- তাহলে দোযখই সই!

বাবুডাং গ্রাম সাঁওতালদের। এখানে আদি ধর্মের অনুসারীরা যেমন আছে, তেমন আছে ধর্মান্তরিত কয়েকঘর খ্রিষ্টান সাঁওতাল। কিছু অলঙ্করণ এখানে দেখা গেল- একটি বাড়ির দরজায়। বাড়ির পুরুষ জানালো, সামনে বড়দিনের উৎসবে আবার পুরো ঘর রং করা হবে।



সাঁওতালদের নকশা, সহজসরল মানুষের সহজ সরল নকশা।

এভাবে ঘুরে ঘুরে আরো বেশ কিছু ঘরে পাওয়া গেল অলঙ্করণ। তবে কোনটাই আগের গ্রামের মত জৌলুসময় নয়। এর কারণ হিসেবে গ্রামের এক বৃদ্ধা জানালেন, আগে গ্রামে সুখ ছিল। এখন আর সেটা তো নেই। (সুখ বলতে তিনি আর্থিব সঙ্গতি বুঝিয়েছেন)। প্রমাণ মিলল ঘরগুলোর দিকে তাকিয়েই। মাটির ঘর, অনিয়মিত লেপার কারণে কিছু কিছু জায়গায় ভাঙন। ঘরগুলোতে ফুল লতা পাতার মোটিফ ছাড়াও সেখানে ছিল পাখির কিছু মোটিফ। নক্সাগুলো অনেক সরল, চিকইল গ্রামের তুলনায়। তবে সেখানেও লেগেছে আধুনিকতার ছাপ- লালমাটি, খড়িমাটির সাথে রংও ব্যবহার করছে তারা।

গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেল, বোঙ্গা (দেবতা) পুজার সময় তারা আগে নিয়মিত এই গৃহ অলঙ্করণ করতো। আর্থিক অসঙ্গতির কারণে ধীরে ধীরে এটি হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকী আমরা যে গৃহ অলঙ্করণ দেখেছি, সেটাও কিছুদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকার দেওয়া টাকায় আঁকা। এই গ্রাম ছাড়াও আরো অনেক সাঁওতাল গ্রাম রয়েছে উত্তরবঙ্গে। তারাও এই চর্চা কমবেশি ধরে রেখেছে।
এরপর একটানে শহরে। বিকেল চারটায় ফুরসত মিলল খাওয়ার। আমাদের দলনেতা ভাত ছাড়া অন্য কিছু খান না। ফলে আমাদেরও ভাতের পিছনে দৌড়তে হলো। কোন এক সরকারি ছুটির কারণে শহরের দোকান পাট বন্ধ। তাই খাবারের দোকানও খোলেনি অনেকগুলো। কোন রকমে এক দোকানে বসে খাওয়া দাওয়া করে জানলাম আমাদের মাইক্রোর ড্রাইভারের আসল পরিচয়। আলমাস সাহেবের একখানা দোকান আছে শহরে। ছোট্ট সাজানো গোছানো কফি কাম আইসক্রিম পার্লার। রাজনৈতিক ভাবেও কোন এক দলের সাথে জড়িত। তার আতিথেয়তায় বিকেল কাটিয়ে সন্ধ্যায় আবারো ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা। মি. বিরক্ত এবার আমাদের বিরক্ত করলেন! আমাদের ট্রিপ ছিলো দু’দিনের! হঠাৎ তার স্বেচ্ছাচারিতায় এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন! তাই সন্ধ্যায় মাদল বাজিয়ে সাঁওতালদের গান শোনা হলো না। চেখে দেখা হলো না মহুয়া!


মাস্তান চাঁদিঠোঁট মুনিয়া (Indian Silverbill) তার জোর দখলের বাড়িতে।

(কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, আমারো ব্যপারটা সেরকম। ঢাকার বাইরে গিয়েছি আর পাখির দিকে চোখ থাকবে না, তা কি হয়! চাঁদিঠোঁট মুনিয়া পাখি পেলাম, তাও ভিন্নভাবে- বাবুই পাখির বাসা দখল করেছে এই ছোট্ট পাখিগুলো। মুনিয়া সাধারণত নিজের বাসা নিজেই করে। কিন্তু বাবুই পাখির বাসা দখলের ঘটনা এই নিয়ে তৃতীয়বার চোখে পড়ল বাংলাদেশে। এর আগে ভারতের এক পাখি বিজ্ঞানী এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন একটি জার্নালে। আর দেখা পেলাম পাকড়া ঝাড়ফিদ্দার। উত্তরাঞ্চলে এই পাখির রেকর্ড এই প্রথম। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় বিচরণ করে এই পাখিগুলো।)

পাকড়া ঝাড়ফিদ্দা (Pied Bushchat) ‘

১৩ thoughts on “নাচোলের গৃহ অলঙ্করণ শৈলী

  1. দারুণ। আমাদের দিনাজপুরে আগে
    দারুণ। আমাদের দিনাজপুরে আগে প্রচুর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল। উনাদের ঘরবাড়ি মাটির তৈরি, কিন্তু দেখার মতো। একটা সুঁই মেঝেতে পড়ে গেলেও খুঁজে পেতে কষ্ট হবেনা। এতোটাই ঝকঝকে করে রাখে।

    1. হমম, এখন আর সেই সুদিন নেই,
      হমম, এখন আর সেই সুদিন নেই, বাঙালিদের বঞ্চনা আর প্রতারণায় অনেকটাই একঘরে হয়ে গেছে তারা। এমনকী ঐ এলাকায় যে লোক আমাদের ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন (কোন এক শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের লোকাল করেসপন্ডেন্ট) তিনি যখন শুনলেন, সাঁওতাল গ্রামে যাব, নাক সিটকে বললেন, ছোটলোকদের ওখােনে গিয়ে কী করবেন!

  2. চাপাইনবাবগঞ্জের গৃহ অলঙ্করণ
    চাপাইনবাবগঞ্জের গৃহ অলঙ্করণ শৈলীর সুনাম দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও আছে == হায়রে কপাল ! আর আমি জানলাম আজকে! ধন্যবাদ ভাইজান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *