অপারেশন জ্যাকপট- মুক্তিযুদ্ধের নৌ কমান্ডোদের দুঃসাহসিক অভিজানের গল্প

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সারা দেশের কয়েকটি নৌবন্দরে একযোগে হামলা চালিয়েছিলেন বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোরা। অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’। উদ্দেশ্য পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরগুলো অচল করে দেওয়া, যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সমুদ্র ও নদীপথে খাদ্য ও অস্ত্র আসতে না পারে। অন্য অনেকের সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন সাজেদুল হক চুন্নু নামের এক দুঃসাহসী কিশোর। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশনে। তার মুখে শোনা একটি দুঃসাহসী অভিজানের গল্প।


১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সারা দেশের কয়েকটি নৌবন্দরে একযোগে হামলা চালিয়েছিলেন বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোরা। অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’। উদ্দেশ্য পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরগুলো অচল করে দেওয়া, যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সমুদ্র ও নদীপথে খাদ্য ও অস্ত্র আসতে না পারে। অন্য অনেকের সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন সাজেদুল হক চুন্নু নামের এক দুঃসাহসী কিশোর। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশনে। তার মুখে শোনা একটি দুঃসাহসী অভিজানের গল্প।

১৪ আগস্ট ১৯৭১, রাত ১০টা। অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনা করতে ৩৯ জনের একটি কমান্ডো দল লিমপেট মাইন নিয়ে কর্নফুলী নদীর তীরে জড়ো হয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে উপস্থিত কমান্ডোরা যার যার মাইন গামছা দিয়ে পেটের সঙ্গে বেঁধে নদীতে নেমে পড়বেন। এর আগে বিকেলে দুজন কমান্ডো জেলে সেজে মাছ ধরার ভান করে বন্দরে জাহাজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন। ফিরে এসে তাঁরা অন্যদের ধারণা দিয়েছেন, সেখানে কয়টি জাহাজ আছে এবং সেগুলো বন্দরের কোন জায়গায় অবস্থান করছে।

ওদিকে আজ সকালেই রেডিওতে গোপন সংকেতের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে অপারেশনের নির্দেশ। আগেই বলা হয়েছিল আকাশবাণী কলকাতা ‘খ’ কেন্দ্র থেকে ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি’ গানটি বাজানো হলে অপারেশনে নেমে পড়তে হবে। রেডিওতে সেই নির্দেশ পেয়ে আমরা এখানে হাজির হয়েছি।

রাত সাড়ে ১১টায় দলনেতা ওয়াহিদ চৌধুরী কমান্ডোদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করলেন। একটি জাহাজে তিনটি করে মাইন লাগাতে হবে। কারণ অনেক জাহাজের ইঞ্জিন থাকে পেছনে, আবার অনেক জাহাজের সামনে। ইঞ্জিন বরাবর মাইন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে জাহাজের ক্ষতি বেশি হয়। সে কারণে প্রতিটা জাহাজে তিনটি করে মাইন বিস্ফোরণ করতে তিনজন করে কমান্ডো নিয়োগ দেওয়া হলো। রাত সাড়ে ১২টায় আমরা ৩৯জন কমান্ডো যার যার মাইন নিয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম। দলনেতা সবার উদ্দেশে বললেন, ‘শোনো কমান্ডোরা, বন্দরের দিক থেকে কর্ণফুলীর পানিতে মাঝেমধ্যেই সার্চলাইট ফেলে সতর্কতামূলক গুলি করা হয়। কারো শরীরে সেই গুলি লাগলে চিৎকার না করে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে যাবে। এখনো সময় আছে, কারো ভয় লাগলে অপারেশন থেকে সরে দাঁড়াও।’ দলনেতার কথা শুনে আটজন কমান্ডো সরে দাঁড়ালেন।

রাত গভীর হতে হতে ১৫ আগষ্ট চলে এলো। আট কমান্ডোকে রেখে আমরা বন্দর থেকে এক কিলোমিটার উজানে হেঁটে গেলাম। কারণ বন্দরের সোজাসুজি পানিতে নামলে স্রোত আমাদের ভাসিয়ে জাহাজ থেকে দূরে নিয়ে যাবে। নির্দিষ্ট স্থানে পেঁৗছে এক লাইনে তিনজন করে কমান্ডো পানিতে নেমে পড়লাম। আগে থেকেই বলা ছিল, তিনজন হাত ধরাধরি করে স্রোতের সহায়তায় সাঁতরে জাহাজের কাছে যেতে হবে, যাতে একই জাহাজে তিনজন তিনটি মাইন স্থাপন করতে পারেন। পানিতে নামার সময় মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, আর হয়তো মায়ের সঙ্গে দেখা হবে না।

নদীর পানি ছিল খুবই ঠাণ্ডা। ৬০ থেকে ৭০ হাত যাওয়ার পরই আমাদের তিন জনের হাত ছুটে গেল। একা হয়ে গেলাম আমি। শব্দ না করে সাঁতরানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল বলে নিরাপদেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। আরো কিছুক্ষণ সাঁতরানোর পর পায়ে মাটি ঠেকল, দাঁড়িয়ে গেলাম। উপরে তাকিয়ে জেটি দেখতে পেলাম। সেখান থেকে লোকজনের কথার শব্দ আসছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এদিক ওদিক তাকিয়ে কোনো জাহাজ দেখতে পেলাম না। সামনের দিকে এগোবো কি না ভাবছি, এমন সময় নদীর মধ্যে নোঙর করা একটা বড় বার্জ দেখতে পেলাম। প্রশিক্ষণের সময় আমাদের বলা হয়েছিল, যদি বন্দরের নদীর মধ্যে কোনো জাহাজ ডোবানো যায়, তাহলে বন্দরে জাহাজ চলাচলে অসুবিধে হবে। এমনকি বন্দরের নদীপথ বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

দেরি না করে আমি সোজা বার্জের কাছে চলে এলাম। আমি জানতাম, বার্জের ইঞ্জিন পেছনে থাকে। তাই পেছন দিকে লিমপেট মাইনটি লাগালাম। খুব শক্তিশালী বিস্ফোরক। দেখতে অনেকটা মাঝারি সাইজের গোল মিষ্টি কুমড়ার মতো। তবে কিছুটা চ্যাপ্টা। এটি তিন চার ইঞ্চি পুরু স্টিলের পাতে তিন-চার ফুট জুড়ে গর্ত করতে পারে।

আমার মাইনটি স্থাপন করার পরপরই বন্দরের দিকে একটি জাহাজে মাইন বিস্ফোরিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে জেটির সার্চলাইট জ্বলে উঠল। সেই সঙ্গে শুরু হলো বৃষ্টির মতো গুলি। অন্ধকারে পানিতে ডুবে থাকার কারণে তারা আমাদের কাউকেই দেখতে পারছিল না বলে এলোমেলো গুলি ছুঁড়ছিল। সেই গুলির হাত থেকে বাঁচতে আমি ডুব দিয়ে বার্জের উল্টোদিকে এসে ভেসে রইলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, আমার লাগানো মাইন বিস্ফোরণের সময় হয়ে এসেছে। দ্রুত সরে না পড়লে মাইন বিস্ফোরণে আমিও মারা যাব। অগত্যা ডুব দিয়ে দিয়ে তীরের দিকে সরে যেতে লাগলাম। যখনই মাথা পানির উপরে তুলি, দেখি বৃষ্টির মতো গুলি যাচ্ছে। পেছনে বার্জ থাকায় আমার সুবিধে হলো। আমি সেটাকে আড়াল করে তীরের দিকে এগোতে লাগলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে তীরে চলে এলাম। তারপর শুয়ে পড়লাম কাদার মধ্যে। দুইবার সার্চ লাইটের আলো আমার ওপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু শীরের কাদা লেগে থাকায় ওরা আমাকে দেখতে পেল না। ওদিকে একটার পর একটা মাইন বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে জেটি থেকে গুলির পরিমাণ। ক্রলিং করে আমি যতটা সম্ভব এগিয়ে গেলাম। তারপর আবার শুয়ে বিশ্রাম নিলাম। বসতে সাহস হচ্ছে না। মাথার ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ করে গুলি ছুটছে। আরো কিছুক্ষণ ক্রলিং করার পর একটা ছনের ঝাড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। অপারেশনের পর যেখানে মেলার কথা, আস্তে আস্তে সেদিকে এগোতে লাগলাম। ছনের ধারাল পাতায় আমার মুখ ও বুকের অনেক জায়গায় কেটে গেল। রক্ত ঝরতে লাগল। ব্যথাও করছিল বেশ, কিন্তু জাহাজ ডোবানোর আনন্দে সেই ব্যথার কথা ভুলে গেলাম।

মিনিট দশেক পর নির্দিষ্ট জায়গায় পেঁৗছালাম। সেখানে এসে দেখি আমাদের গাইড এবং যারা শেষ মুহূর্তে অপারেশনে যায়নি, তারা মাটিতে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের দলনেতাসহ আরো সাত আটজন কমান্ডো ফিরে এলো। শুয়ে শুয়েই আমরা ঠিক করলাম, এখানে আর থাকা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনারা মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু করবে। শেলের হাত থেকে বাঁচতে হলে আরো দূরে গ্রামের দিকে সরে পড়তে হবে। তখনো আমাদের হাতে অব্যবহৃত কয়েকটি মাইন ছিল। সেগুলোকে নালার মধ্যে ফেলে দিলাম। তারপর সবাই হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে দিয়ে সরে পড়তে লাগলাম। মাইল দুয়েক যাওয়ার পর পা সোজা করে চলার সাহস হলো। আরো ঘণ্টা দেড়েক দৌড়ানোর পর একটা গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম আমরা। গ্রামটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। অপারেশন জ্যাকপট সফলভাবে সমাপ্ত করতে পেরেছি বলে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিরোধের পরও অভিযানে অংশ নেওয়া সবাই অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছিলাম।

তোমরা শুনে অবাক হবে, আমরা যখন চট্টগ্রাম বন্দরে হামলা করছি, ঠিক একই সময়ে মংলা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চাঁদপুরসহ আরো বেশ কয়েকটি জায়গায় নৌ-কমান্ডোরা একই ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করে। ফলে দেশব্যাপী অসংখ্য জাহাজ ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিদেশি জাহাজ ছিল বলে অপারেশন জ্যাকপট সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।

পুর্বের কথাঃ

মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। সেই ৪১ জন সাবমেরিনারদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তারা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা শুনে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে ৮ জন ৩০ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ তারা দিল্লিতে এসে পৌছান। এখানে তাদের নাম উল্লেখ করা হলোঃ

১। মোঃ রহমতউল্লাহ।
২। মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন।
৩। মোঃ শেখ আমানউল্লাহ।
৪। মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
৫। মোঃ আহসানউল্লাহ।
৬। মোঃ আবদুর রকিব মিয়া।
৭। মো আবদুর রহমান আবেদ।
৮। মোঃ বদিউল আলম।

তারপর উক্ত ৮জনের সাথে আরো কয়েকজনকে একত্র করে ২০ জনের একটি গেরিলা দল গঠন করে তাদের ভারতে বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। তারপর তারা দেশে আসলে তাদের সাথে কর্নেল ওসমানীর দেখা করানো হয়। তখন ওসমানী নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

ওসমানীর সিদ্ধান্তে নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে ২৩ মে ১৯৭১ তারিখে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-২ পি (C-2 P)। এখানে ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে অন্যান্য সেক্টরসমূহের বিভিন্ন শিবির থেকে মে মাসের শুরুর দিকে প্রায় ৩০০ জন বাছাইকৃত যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়। ট্রেনিং ক্যাম্পে এদের কি ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টি এতই গোপনীয় ছিল যে, সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যেও শুধুমাত্র যার এলাকায় অপারেশন চালানো হবে তিনি ব্যাতিত আর কেউ এই সম্পর্কে জানতেন না

ট্রেনিং শুরু হবার আগেই বাছাইকৃত যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয় যে এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্মঘাতী যুদ্ধ হবে। তাই অপারেশনের সময় যেকোন মূল্যে অপারেশন সফল করারা উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে তাদের প্রাণ দিতে হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীদের ছবি সহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হতো।ফর্মে লেখা থাকতো যে, আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।

নৌ-কমান্ডোদের ঐ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার কমানডার এম,এন,সামানত,এম,ভি,সি ও ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন লেঃ কমান্ডার জি এম মার্টিস,ভি,আর,সি ও এন,এম এবং আরও ভারতীয় ২০ জন প্রশিক্ষক তারা হলেনন লেঃ দাস,ভি,এস,এম,লেঃভি,পি,কফিল,ভি,আর,সি,। প্রশিক্ষকদের মধ্যে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাব-মেরিনার ছাড়াও আরো ছিলেন ভারতীয় নৌ-বাহিনীর,লিডিং সি,মান কে,সিং,এম,ভি,সি,লিডিং সি,মান মিঃ গুপ্ত,এন,এম, এল সিং,এন,এম, মারাঠি নানা বুজ এবং সমীর কুমার দাশসহ আরো কয়েকজন।

ট্রেনিং এর দুটো অংশ ছিল। সবাইকে প্রয়োজনীয় স্থলযুদ্ধ যেমনঃ- গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, স্টেনগান রিভলবার চালানো, আন-আর্মড কমব্যাট(খালি হাতে যুদ্ধ) ইত্যাদি শিখতে হতো। আর জলযুদ্ধের ট্রেনিঙের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের সাতার যেমনঃ- বুকে ৫-৬কেজি ওজনের পাথর বেধে সাতার, চিৎ সাতার, কোন মতে পানির উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেক্ষন সাতার, পানিতে সাতরিয়ে এবং ডুব সাতার দিয়ে লিমপেট মাইন ব্যবহার, স্রোতের প্রতিকূলে সাতার, জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেয়া হত তীব্র খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। শীত-বর্ষায় একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করতে হয় সব যোদ্ধাকে। প্রায় টানা তিন’মাস ট্রেনিং (যেখানে কোন সশস্র বাহিনীতে এই ট্রাইনিং নিতে গেলে প্রায় দুই বছর সময় লাগত) এর পর আগস্টের প্রথম সাপ্তাহে তাদের ট্রেনিং শেষ হয়।

যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের শেষদিকে এসে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজানো হতে থাকে। একই সাথে একই সময়ে দুই সমুদ্র বন্দর ও দুই নদী বন্দরে আক্রমণ চালানোর জন্য চার সেক্টরের পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচকে চার স্থানে আক্রমণের উদ্দেশ্যে মোট চারটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। ৬০ জনের ২টি দল এবং ২০ জনের আরো ২টি দল। চারটি দলের চারজন লিডার ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। টিম লিডারদের অপারেশন পরিচালনার জন্য শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল বিশেষ গোপনীয় পদ্ধতি যা টিমের অন্যান্য সদস্যদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল[। টিম কমান্ডারদের বলা হয়েছিল যে, দুটি বাংলা গানকে সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গান দুটি প্রচার করা হবে কলকাতা আকাশবানীর পক্ষ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে সকাল ৬টা থেকে ৬:৩০ মিনিট অথবা রাত ১০:৩০ মিনিট থেকে রাত ১১টায়। এই ফ্রিকোয়েন্সির নাম ও গান দুইটি শুধু টিমের কমান্ডারই জানতো। গানদুটি অথবা তাদের সঙ্কেত হলোঃ- ১ ‘। আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শশুর বাড়ি, আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া শিশু সংগীত। এটি হবে প্রথম সঙ্কেত, এর অর্থ হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২য় গান প্রচার হবে। এর মধ্যে আক্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। ‘২.’আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, বদলে চাইনি প্রতিদান পংকজ মল্লিকের গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত। এটি ২য় এবং চূড়ান্ত সঙ্কেত, অর্থাৎ সুস্পষ্ট নির্দেশ যে ঐ রাতে যে ভাবেই হোক আক্রমণ করতেই হবে।


প্রায় ৬ কেজি ওজনের লিমপেট পেটে বাঁধা


ভারতের পশ্চিম ত্রিপুরায় অবস্থিত মেলাঘর।


পলাশীর লোকেশন


সামনে লিমপেট ও অন্যান্য সরঞ্জামদি নিয়ে যোদ্ধারা।


১৯৭১ এর ৫ই অক্টোবর জাতিসঙ্ঘে ভাষণদানকালে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা মাহমুদ আলী ও ১২ই অক্টোবর পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাঙলায় তাদের পরিবহণ বিপর্যস্ততা ও জাহাজ ধ্বংসের সুতীব্র পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হন, যা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুবিশাল বিজয়।


মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডোদের আক্রমনের পুর্ব মুহুর্তের একটি দৃশ্যের ছবি। প্রত্যেকের বুকে মাইন বাঁধা। ছবিটি চাদপুর এলাকায় তোলা।


১৫ আগস্ট ১৯৭১। আরও ৫ টি জাহাজের সঙ্গে নৌ কমান্ডোরা মংলা বন্দরে মার্কিন জাহাজ S S lightning ডুবিয়ে দেয়।


বাংলালিংকের অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে জাগরণী সিরিজের প্রতিকি অ্যাড

তথ্যসুত্রঃ
১।গুগোল,
২।ইউটিউব,
৩।লক্ষ প্রানের বিনিময়ে-রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম,
৪মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডো-মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি।

১০ thoughts on “অপারেশন জ্যাকপট- মুক্তিযুদ্ধের নৌ কমান্ডোদের দুঃসাহসিক অভিজানের গল্প

  1. আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে
    আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যাপক তথ্য সমৃদ্ধ একটি গৌরবগাঁথা। এমন একটি পোষ্ট নতুন প্রজন্মকে দিতে পারে দৃপ্ত চেতনা। ধন্যবাদ পোষ্ট এবং সংশ্লিষ্ট ছবির জন্য।

  2. মুক্তিযুদ্ধের এমন গৌরবগাঁথা
    মুক্তিযুদ্ধের এমন গৌরবগাঁথা ইতিহাস নিয়ে যত বেশী লিখা হবে ততই নতুন প্রজন্ম একাত্তর সম্পর্কে জানতে পারবে।। ভাল লাগল আপনার পোস্টটি!! :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ফুল: :ফুল: :প্রণাম: :প্রণাম: :প্রণাম:

    আর অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে করা বিজ্ঞাপনটি আমার বড় ভাইয়ের (তাওহীদ মিল্টন...)
    কপি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *