লাল কাঁকড়ার সৈকতে

(ইন্ট্রো: ম্যালাদিন পর একটু সময় পাইলাম লেখার। তাই লিখতে বইলাম…… অখাদ্যটা আপাতত গিলেন, পরে আমার রেগুলার পক্ষী আইবোনে…. কাল পরশু থেইক্যা)



(ইন্ট্রো: ম্যালাদিন পর একটু সময় পাইলাম লেখার। তাই লিখতে বইলাম…… অখাদ্যটা আপাতত গিলেন, পরে আমার রেগুলার পক্ষী আইবোনে…. কাল পরশু থেইক্যা)




ভোরের সূর্য যখন আকাশে লাল রঙের প্রলেপ দিতে ব্যস্ত, তখন আমাদের স্পিডবোট প্রাচীন পালঙ্কী ছেড়ে মহেশখালী দ্বীপের পথে। পাখিদের ঘুম কেবল ভাঙতে শুরু করেছে- এদিকে ওদিকে উড়তে ব্যস্ত কিছু পাখির দল। আধ ঘন্টার মধ্যেই মহেশখালীর জেটিতে গিয়ে নোঙর ফেলল আমাদের স্পিডবোট। কিন্তু আর দশজন পর্যটকদের মতন মহেশখালী গন্তব্য ছিলো না আমাদের। আমাদের গন্তব্য সোনাদিয়ার দ্বীপ। যেখানে প্যারাবন আর পাখির মিতালী। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ যেখানে বাংলার চরণে আদরের পরশ বুলিয়ে যায়, লাল কাঁকড়ারা খেলা করে নির্ভয়ে।

মহেশখালীর দ্বীপে জেটিতেই আমাদের স্বাগত জানালো বিভিন্ন ধরণের গাংচিল, পানকৌড়ি আর বকের দল। আর পাকা জেটির দু’ধারে প্যারাবন। সাদা আর কালো বাইন, কেওড়া, হারগোজা, নুনিয়ার জঙ্গল। অসম্ভব সুন্দর এই জেটি ধরে এগিয়ে চলল ইজি বাইক বা টমটম। শহুরে এই বাহন এখন মহেশখালীর অন্যতম বাহন। প্রথমেই এক দফা থামতে হলো কুতুবজুম এলাকায়। স্থানীয় গ্রাম ডাক্তার শামসু মিয়া আর কাঁকড়া ব্যবসায়ী রহিম মিয়ার আতিথেয়তায় দুপুরের খাবার ছিলো অসাধারণ। কাঁকড়া, চিংড়ি, নাম না জানা সামুদ্রিক মাছের নানা রকমের পদ মিলিয়ে ঝাল করে রান্না করা খাবারগুলোর স্বাদ মনে থাকবে আরো অনেকদিন।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে গন্তব্য পূব পাড়া। কুতুবজুম থেকে আবারো টমটমে করে ঘটিভাঙা ব্রিজ। ঘটিভাঙা ব্রিজ থেকে হাঁটা পথ- পূব পাড়া পর্যন্ত। সোনাদিয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার এই পথে সাধারণত এক ঘন্টা সময় প্রয়োজন। কিন্তু পথে বিভিন্ন ধরণের পাখি দেখতে থাকায় সময় লাগলো প্রায় দু’ঘন্টা। আর সময় লাগবেই বা না কেন? কারণ এই ভ্রমণ তো নিছক প্রকৃতি দর্শনের জন্য। নইলে কে যায়- শত মানুষের বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে এই সোনাদিয়ার দ্বীপে।
পথে ডাহুক, পানকৌড়ি, আর কিছু জিরিয়ার দেখা পেলাম। আর ছিল দু’পাশ ঘেঁষে কখনো খাল আর কখনো প্যারাবন। বেশ খানিকক্ষণ পর প্যারাবন আর খালের নামগন্ধও নেই, বিস্তীর্ণ ফাঁকা জমি। এসবের কোনটায় এখন লবণের চাষ হয়, আবার কোনটায় ধান। তবে এই জমিগুলো একসময় ভরে ছিলো বাইন, কেওড়া, হারগোজা গাছে। মানুষের লোভের বলি এখন এই জমিগুলো। সোনাদিয়ার জমি সরকারি খাস জমি হলেও দখলদারের অভাব নেই। ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে এর গুরুত্ব থাকলেও এলাকাবাসীর কাছে গাছের নিচের মাটিটাই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্ধকার নেমে এলে সোনাদিয়ার পূব পাড়ায় পৌঁছলাম আমরা। অন্ধকার হলেও শুক্লপক্ষের প্রায় গোল চাঁদ আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। রাতে সে পাড়াতেই থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হলো আমাদের। ঘরের একখানা রুম দখল করে ফেললাম আমরা। মাছ ছাড়া আর কিছু সহজলভ্য নয়। তাই রাতের খাওয়ায় নাম না জানা ছোট ছোট পাঁচমিশালী মাছের তরকারির সাথে ভাত। রাতে সাগরপাড়ে আড্ডা জমল স্থানীয়দের সাথে। বাংলা আর আরাকানি ভাষা মিলিয়ে আঞ্চলিক ভাষার পুরোটা না বুঝলেও তাদের আন্তরিকতাটুকু তাতে ঢাকা পড়েনি।

পরদিন সকালে নাস্তার সাথে লবনের লাল চা মুখে তুলেই ছুটলাম দ্বীপের পশ্চিম পাড়ায়। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করে আছে দ্বীপের একমাত্র সরাইখানার মালিক- গিয়াস। পরিবেশ ও বিভিন্ন প্রাণী রক্ষার বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের সাথে জড়িত সে। পুরো সোনাদিয়ায় তার বাড়িতেই কেবল টাকার বিনিময়ে আশ্রয় আর খাবার মেলে। একই সাথে দ্বীপে বেড়াতে আসা মানুষের গাইড হিসেবেও ইতোমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে। তার আশ্রয়ে ব্যাগ আর অন্য সবকিছু রেখে ছুটলাম বেলাকের দিয়ায়। সৈকত ধরে প্রায় একঘন্টার হাঁটা পথ। হাঁটতে হাঁটতে একসময় দ্বীপের একদম পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছে গেলাম। এখানেই দেখা মিলল পাখির ঝাঁকের। জোয়ারের পানির জন্য তখন তাদের অখন্ড অবসর। আবার যখন ভাটার টানে পানি নেমে যাবে- তখন পাখিরা নেমে যাবে কাদায়- খাবার খুঁজে বেড়াবে সেখানে।

অন্তত হাজার তিনেক পাখির দেখা মিলল এখানে। এই দলের মাঝেই ঘাপটি মেরে বসে আছে আমাদের আকাঙ্খিত পাখিটি- চামচঠুঁটো বাটান বড়জোর ৪-৫টি। পুরো বিশ্বে মহাবিপন্ন এই পাখির সংখ্যা ৫০০’র নিচে। শীতে রাশিয়ার দূর প্রান্ত থেকে শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমাদের দেশের উপকূলে আশ্রয় নেয় এরা। সৈকত পাখির দলে ভিড়ে থাকা এই পাখি খুঁজে দেখতে হলে যে জিনিসটির প্রয়োজন, সেটির অভাব বোধ করলাম এবার- বাইনোকুলারটা ভুলে বাসায় ফেলে আসার মাশুল গুণতে হলো। আর কাছে যাওয়াও সম্ভব নয়- তাহলে এই হাজার তিনেক পাখির দল ঘাবড়ে যেতে পারে। তাই দূর থেকেই দেখতে হলো পাখিগুলোকে। অনেকটা সময় পাখির সাথে কাটানোর পর ফিরতে শুরু করলাম। ফেরার পথে কাঁদা পানিতে থাকা মাডস্কিপার অনেকটা পথ সঙ্গ দিলো আমাদের। আর বালুর সৈকতে সঙ্গ দিলো লাল কাঁকড়ার দল। প্রথমবার যখন কক্সবাজার আসি, তখন লাল কাঁকড়ার দল ছিল নিয়মিত দৃশ্য। সৈকতে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত গতিবিধি তাদের অনেকটা গায়েবই করে ফেলেছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে।

ফিরতে ফিরতে বিকেল। সন্ধ্যায় টুপ করে সূর্যটা পানিতে ডুবে যেতেই উঠে এলো পূর্ণিমার চাঁদ। সোনাদিয়ার বালিয়াড়িতে স্থানীয় গীতিকবির গান- সমুদ্রের শব্দ সব মিলে মিশে এক হতে লাগলো। পরদিন সকালে উঠেই বিদায় দিলাম সোনাদিয়াকে। দিনের একমাত্র ট্রলার দিয়ে ফেরত এলাম মহেশখালী। পরদিন হরতাল অবরোধে আক্রান্ত জনশূন্য কক্সবাজারে কাটিয়ে আবারো মহেশখালী। সেখানে তাজিয়াকাটায় আবারো বেশ কিছু পাখির দর্শন পেলাম। তবে দিন দিন কমে আসছে এই সংখ্যা। এর জন্য দায়ী মানুষেরাই। অবাধে পাখি শিকার, লবনের চাষের জন্য প্যারাবন উজাড় এর মূল কারণ। তবে চামচঠুঁটো বাটান পাখি রক্ষার প্রকল্প এলাকায় পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশ সচেতনতা সৃষ্টি করেছে।

সোনাদিয়া দ্বীপে যা যা করবেন না:
কুমারী এই সৈকতে ক্যাম্পফায়ার করবেন না- এতে করে সৈকতে ডিম পাড়তে আসা সামুদ্রিক কচ্ছপের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাখি দেখার সময় বড় দল না থাকাই ভালো। দল হতে পারে একজন থেকে সাতজন পর্যন্ত। তবুও সাবধানতা প্রয়োজন – হৈচৈ করা বা পাখির ভালো ছবির জন্য পাখিকে উড়িয়ে দেওয়া, বা পাখিকে ভয় দেখানো যাবে না। আর অবশ্যই আপনার খাওয়া চিপসের প্যাকেট, চকোলেটের খোসা, প্লাস্টিক, পলিথিন সৈকতে ফেলবেন না। আর অবশ্যই স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করে চলতে হবে।

সোনাদিয়া দ্বীপে যেতে হলে:
কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাট বা কস্তুরী ঘাট থেকে সবসময় স্পিডবোট চলাচল করে। ভাড়া ৭৫ টাকা। ঘটিভাঙা থেকে জোয়ারের সময় ট্রলার ছেড়ে যায় সোনাদিয়ার পশ্চিম পাড়ার দিকে- ভাড়া জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। দিনে গিয়ে দিনে ফেরত আসা একটু কষ্টসাধ্য। এজন্য হাঁটাপথ রয়েছে। আর রাতে থাকার জন্য গ্রামবাসীর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা বা গিয়াসের সরাই আদর্শ। অল্প টাকায় সেখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ফোন: ০১৮১২২২৪৪১২।

১৬ thoughts on “লাল কাঁকড়ার সৈকতে

  1. দারুণ লাগলো। এখনই ছুটে যেতে
    দারুণ লাগলো। এখনই ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। আপনার পোস্ট মিস করছিলাম। আশা করি আবার নিয়মিত পক্ষী দর্শন হবে ইস্টিশনের যাত্রীদের। পোস্টের ছবিগুলো অসাধারণ হয়েছে। সবচে ভালো লাগে জীব বৈচিত্রের প্রতি আপনার অকৃত্রিম ভালোবাসা। :bow:

    1. বোবা এই প্রাণীগুলো নিজের
      বোবা এই প্রাণীগুলো নিজের অধিকারের কথা তো আর জ্বালাও পোড়াও করে বলতে পারে না, তাই কিছু মানুষকে তো এই স্বেচ্ছাশ্রমটা দিতেই হবে!

  2. এতদিন ছিলেন কই মিয়া? আপনার
    এতদিন ছিলেন কই মিয়া? :ক্ষেপছি: আপনার ভ্রমণ কাহিনীগুলো মিস করছিলাম। এইবার ডুব না দিয়া আরও কিছু লেখা ছাড়েন। লেখা অতি সুখাদ্য হইসে। :বুখেআয়বাবুল:

  3. দারুণ লিখেছেন। যেন পাখপাখালির
    দারুণ লিখেছেন। যেন পাখপাখালির জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম…

    বাই দ্য ওয়ে, আর্কিওপ্টেরিক্স মানে কী?

  4. কারো লেখা পড়েও তার সাথে
    কারো লেখা পড়েও তার সাথে বেড়িয়ে আসা যায় আপনার লেখা তার প্রমাণ। কাহিল লাগলেও আপনার সবগুলো ট্যুরের বর্ণনার সঙ্গী হতে চাই।

  5. ভাই অসাধারণ লাগলো সত্যি
    ভাই অসাধারণ লাগলো সত্যি সেইরকম ভাল লাগলো আর ধন্যবাদ মোবাইল নংটা দেয়ার জন্য সংরক্ষণ করে রাখলাম প্রয়োজনে কাজে দিবে …… :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *