উল্কা বৃষ্টি স্নাত সুর সন্ধ্যা

২০০০ সাল বা তারও আগের ঘটনা।তখন আমি গ্রামের একটা স্কুলে পড়ি। হেমন্তের সন্ধায়, নতুন ফসল এসেছে নবান্নর প্রস্তুতি চলছে। সামনেই পরীক্ষা কিন্তু আমাদের টানত উঠানে ছড়িয়ে দেওয়া ক্ষড় গুলো। এর উপর কখনো বসে আবার শুয়েও, দাদা দাদীর কাছ থেকে শোনতাম রুপ কথার গল্প। লোডশেডিং হলে আর পায় কে? দৌড়ে চলে যেতাম দাদার কাছে (আমার বাবার চাচা)। কখনো কখনো যখন দিদার কোলে মাথা রেখে খোলা আকাশের দিকে তাকাতাম। চাঁদহীন আকাশে মেলা বসত অগনিত তারায়। তখনো বাতাসে এতটা দূষণ ছিল না। তারা দেখতে দেখতে হঠাত্ মনে হত একটা তারা যেন ছুটে চলেছে অন্যটার দিকে। অথবা সহশাই একটা তারা নিভে গেল। আর প্রশ্ন করলেই উত্তর আসত এরা যাযাবর তারা। আবার গল্পও একটা থাকত এর পেছনে। যাই হোক এই ছুটে চলা আলোটাযে তারা নয় তা প্রথম জেনেছি এক কাকার কাছ থেকে। জেনেছি এই যাযাবর তারাটার নাম উল্কা। এখন বলি রুপকথার সেই গল্পটি। আমাদের অঞ্চলেয় পরিচিত গল্পটা অনেকটা এই রকমঃ এরা হল দল থেকে বিতারিত তারা। নিজের দল থেকে তাদের বের করে দেয়। অন্য কোন দলে জায়গা পাওয়ার জন্য শূণ্যে ঘুরতে থাকে, কিন্তু কেউই
তাকে তাদের দলে গ্রহণ করে না। দুঃখে নিংসঙ্গতায় একসময় তারাটা ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।

কিছু দিন আগে লিওনিদ উল্কা বৃষ্টির ব্যপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে যে ফোন নম্বরটা দেওয়া হয় সেটাতে একটা কলে আমাকে সারা দিতে হয়েছিল। একটা স্কুল ছাত্রীর সাথে কথা বলে এ
গল্পটা মনেপড়ে গেল সেটাও একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা। সে গল্পে যাওয়ার আগে উল্কা সম্পর্কে সঠিক বৈজ্ঞানীক তথ্য উপস্থাপন করে নেওয়া জরুরী।
উল্কা হল নিংসঙ্গ মহাজাগতিক বস্তু। এরা এতটাই ছোট হয় যে এদের গ্রহাণুও বলা চলে না। মহাশূণ্যের শূণ্যতার মধ্যে চলতে চলতে এক সময় হয়ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চলে আসে। আর পৃথিবীর মহাকর্ষণ বল তাকে আকর্ষণ করে পৃথিবির দিকে নিয়ে আসে। প্রচন্ড গতিতে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের পর বায়ুকণার সাথে উল্কাটার সংঘর্ষে বস্তুটাতে আগুন জ্বলে উঠে আর তখনই আমরা তাকে দেখতে পাই। আর রাতের আকাশে অসংখ্য তারা ভিরে আরো একটি ছোট আলোক বিন্দুকেও তারার মতই দেখায়। উল্কা পাতের দৃশ্য প্রায় সারাবছরই ঘটে। কিন্তু বছরের বিশেষ বিশেষ দিন গুলোতে এই ধরনের উল্কার পরিমান বেড়ে যায়। তখন তাকে উল্কা বৃষ্টি বা উল্কা ঝড় বলে। ঘন্টায় ১৫ বা তারও বেশি উল্কা পাতের ঘটনাকে উল্কা বৃষ্টি বলে।
আমাদের এই সৌর পরিবারে সূর্ষ্য দেবের সাথে আছে গ্রহ-উপগ্রহ, বামন গ্রহ এবং অসংখ গ্রহানু। এই পরিবারে আরো একটি সদস্য আছে যাকে আমরা ধুমকেতু বলি। উপগ্রহ গুলো ব্যতীত অন্যরা কেপলারের গ্রহগতি সূত্র গুলো মেনে সূর্যকে একটা ফোকাসে রেখে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে। কিন্তু ধুমকেতু গুলোর কক্ষপথ অস্বাভাবিক ধরনের উৎন্দ্রীক। এতটাই উৎন্দ্রীক যে, সূর্য্য থেকে এর নিকট দূরত্ব পৃথিবীর চেয়েও কম আবার সর্বাধিক দূরত্ব হতে পারে সৌরজগতের সর্ব শেষ বিন্দু পর্যন্ত বিস্তৃত। কক্ষপথের এমন উৎন্দ্রীকতার জন্য এদের গতিবেগও অত্যন্ত বেশি। এই প্রচন্ড গতির সাথে হয়ত তার সাথে ছুটেচলা বস্তু গুলো তাল রাখতে পারে না। ফলে এর সাথে থাকা ধূলিপাথর গুলো তার মহাকর্ষীয় বলের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে এর কক্ষ পথেই অবস্থান নেয় আর মুল ধুমকেতুটাকে অনুসরণ করে। বছরের একটা নির্দিষ্ট তারিখে পৃথিবী এই ধুমকেতুর কক্ষপথ অতিক্রম করে। এই কক্ষপথ গুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধুমকেতুটির ফেলে যাওয়া ধূলি পাথর পৃথিবীর আকর্ষণের কারনে পৃথিবির দিকে ছুটে আসে। এর গতি হয় প্রচণ্ড ধরনের। বায়ু মণ্ডলে প্রবেশের পর বায়ুকণার ঘর্ষণে বস্তুটাতে আগুন জ্বলে উঠলে আমরা ঘটনা টা দেখতে পাই। এই সময়টাতে উল্কাবৃষ্টির মত ঘটনার স্বাক্ষী আমরা হতে পারি। এ সময় ঘন্টায় গড়ে প্রায় ১৬ থেকে ১০০টার মত হতে পারে। তবে কখনো বা ৩০০অতিক্রম করতে পারে। তবে ভয় পাবার কিছুই নেই। এর অকৃতি এতটাই ছোট যে বায়ু মণ্ডলেই বস্তুটা পুড়ে নিংশেষ বা ছাই হয়ে যায়। তো, সে দিন ঐ স্কুল ছাত্রীটা প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা ভাইয়া তাহলে কি ছাই ছিটিয়ে বায়ুমন্ডল অন্ধকার হয়ে যাবে না? আসলে এই ছাই পৃথিবীর আকাশকে অন্ধকার করে দেবার জন্য যথেষ্ঠ না।
এবার আমরা লিউনিদের গল্পে যাবঃ প্রতি বছরের ১৬থেকে ১৮ নভেম্বর পৃথিবী 55P/TEMPLE-TUTTLE নামের উল্কাটির কক্ষপথ অতিক্রম করে। আর এই তিন রাত উল্কা বৃষ্টির আলোক ধারায় ভেসে ছিল পৃথিবীর বায়ুমন্ডল। যদি এর নাম দোওয়া হয় মহাজাগতিক দেওয়ালি তাহলেও বলতে পারেন শুধু পটকার শব্দটা পাওয়া যাবেনা এই আর কি? বিজ্ঞান সংগঠন ডিসকাশন প্রজেক্ট বাংলাদেশে বিজ্ঞানকে সর্বস্তরের মানুষের নিকট সহজ সরল ভাবে উপস্থাপনের জন্য কাজ করছে। বিভিন্য মহাজাগতিক ঘটনা গুলোকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি থেকে দেখার জন্যই নভেম্বর ১৬ তারিখ শনিবার ৫নং ঘাট নারায়ণগঞ্জ একটা পর্যবেক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করেছিল সাথে ছিল নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট। অনুষ্ঠানটি উত্সর্গ করা হয় বাঙ্গালী বিজ্ঞানী ডঃ জামাল নজরুল ইসলামকে।

সন্ধ্যা থেকেই ডিসকাসন প্রজেক্ট এর কর্মীদের পরিবেশনায় উল্কা বিষয়ক ডকুমেন্টরী প্রদর্শণী ও সাথে বিজ্ঞান বক্তৃতা। বক্তৃতা করেন বিজ্ঞান বক্তা ও বিজ্ঞান লেখক আসিফ। আর একই সাথে নারায়ণগঞ্জের শিল্পীদের পরিবেশনায় সংগীতানুষ্ঠান।

ভরা পূর্ণীমায় উপস্থিত দর্শকরা উল্কাপতন দেখতে না পারলেও টেলিস্কোপে চাদ ও নদীতে চাদের আলোর খেলা ঠিকই উপভোগ করেছিল।

৩ thoughts on “উল্কা বৃষ্টি স্নাত সুর সন্ধ্যা

  1. অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদেরকে,
    অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদেরকে, অনুষ্ঠানটি বাঙ্গালী বিজ্ঞানী ডঃ জামাল নজরুল ইসলামকে উত্সর্গ করার জন্য।

    1. আমাদের দেশের জনগন জামাল নজরুল
      আমাদের দেশের জনগন জামাল নজরুল ইসলামকে চেনে না, চিনে হকিংকে! ডঃ কুদরতই খুদাকে চিনে না চিনে হাইয়ান কে। ইবনে সিনার নাম যতজন শুনেছে ততটা বোধহয় জগদীস চন্দ্রবসুকেও শোনে নাই। ইদানিং কালে হিগস পার্টিকল নিয়া ব্যপক গবেষণার করানে হয়ত সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে চিনে। আমরা চার্লস ডারউইন সম্পর্কে যতটা শুনেছি ততটা দ্বিজেন শর্মার নাম শুনি নাই। কারন এদেরকে দিয়ে মোটিভেশন দেওয়া যায় কিন্তু ব্যবসা করা যায় না।
      আমরা ব্যবসা চাইনাই তাই মোটিভের দিকে গিয়েছি।
      আপনাকেও ধন্যবাদ

      1. আপনার কথার সাথে আমি
        আপনার কথার সাথে আমি একমত।
        আমরা নিজের ঘরের রমনিকে চিনিনা, কিন্তু বিদেশি কারো নাম শুনলে আমরা উপরে পরি চেনার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *