বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়ছোঁয়া ছবি “পিতা”….

এটা সেই শব্দ যে শব্দের সাথে মিশে আছে মমতা মেশানো অসীম দায়ীত্ববোধ।”পিতা”চলচ্চিত্রটি একজন পিতার,যার সামনে তার পিতার বিপন্ন জীবন,তার সন্তানদের রক্ষায় তুমুল প্রতিরোধ! আরেক পিতার লড়াই তার অনাগত সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাবার।তাকে মুক্ত স্বাধীন মাটিতে ভুমিষ্ট করার।



এটা সেই শব্দ যে শব্দের সাথে মিশে আছে মমতা মেশানো অসীম দায়ীত্ববোধ।”পিতা”চলচ্চিত্রটি একজন পিতার,যার সামনে তার পিতার বিপন্ন জীবন,তার সন্তানদের রক্ষায় তুমুল প্রতিরোধ! আরেক পিতার লড়াই তার অনাগত সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাবার।তাকে মুক্ত স্বাধীন মাটিতে ভুমিষ্ট করার।
এভাবেই সব লড়াই সব প্রতিবাদ সব প্রতিরোধ মিলে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ কয়েকজন পিতার পিতৃত্ববোধ মিলে মিশে এক হয়ে যায় সে লড়াইয়ে।
★★★
ছবির নামঃ “পিতা”
পরিচালকঃ মাসুদ আখন্দ
প্রযোজকঃ ইম্প্রেস টেলিফিল্ম
জেনারঃ ড্রামাটিক একশন
চিত্রনাট্যঃ মাসুদ আখন্দ
শ্রেষ্ঠাংশেঃ বন্যা মীর্যা,শায়না আমিন,উপমা,শামীমা নাজনীন,কল্যান কোরাইয়া,জয়ন্ত চট্রোপাধ্যায়,মইন দুররানি,আঞ্জুমান আরা বকুল,
রফিকুল ইসলাম,এহসানুর রহমান,জুয়েল রানা,নিয়াজ মোর্শেদ,আজিজুর রহমান আখন্দ,চঞ্চল রহমান,প্রমুখ।
মুক্তির তারিখঃ ১৪ ডিসেম্বর ২০১২
★★★
কাহিনীচিত্রঃ
“প্রযুক্তিবঞ্চিত প্রত্যন্ত একটি গ্রামের
মুক্তিযুদ্ধকালীন গল্প নিয়ে নির্মিত এ ছবি,
যে গ্রামে রেডিও মাত্র একটি। গ্রামের মানুষ
ঐক্যবদ্ধ। গ্রামে যখন বন্য শুয়োর ঢুকে পড়ে, তখন
গ্রামবাসী একসাথে বল্লমহাতে শুয়োর তাড়ায়।
গ্রামের এক কামার ও তার পরিবারকে ঘিরেই মূল
গল্পটি আবর্তিত হয়। কামারের তিন ছেলে, এক
মেয়ে; স্ত্রী মারা গেছেন। অতি সংগ্রামে জীবন
কাটে। ওদিকে আরেক প্রতিবাদী যুবক কল্যাণ।
তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। হিন্দু
কিশোরী বিধবা উপমা, চঞ্চল নারী, সামাজিক
প্রতিবন্ধকতাকে ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাওয়া এক
নারী; যে ভালোবাসতে চায়, উষ্ণতা চায়; কিন্তু
কথিত সমাজ তাকে বেঁধে রাখে অকটোপাসের
মতো।

হঠাত্ অতর্কিতে হানা দেয় পাকবাহিনী, লণ্ডভণ্ড
হয়ে যায় গ্রাম, ওলটপালট হয়ে যায় মানুষের
জীবন। যার যা কিছু আছে, তাই
নিয়ে একপর্যায়ে জেগে ওঠে মানুষ, ভস্মীভূত
ফিনিক্সপাখির মতো। পরাভূত হয় পাকসেনারা,
পরাভূত হয় পাকিস্তান, পরাভূত হয় দানবিক শক্তি,
জয়ী হয় বাংলাদেশ, অগ্নিঘেরা সীমানার মধ্য
দিয়ে।
ছবিটি প্রতীকী দৃশ্যে পরিপূর্ণ। মনোযোগ
দিয়ে দেখলে ছবিটির কিছু দৃশ্য ও সংলাপ গভীর
চিন্তার উদ্রেক ঘটাবে। কামারের
দোকানে গিয়ে রামদার অর্ডার দেয়
রাজাকারেরা, কামারের বানানো রামদাই
তারা আবার কামারের পুত্রের গলায় ঠেকায়;
এটি বাংলাদেশের
প্রতি পাকিস্তানি নিপীড়নের প্রতীক, বঙ্গবন্ধুও
তার সাতই মার্চের ভাষণে বলেছিলেন আমাদের
টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়ে বহিঃশত্রু
মোকাবেলা করার কথা থাকলেও
হত্যা করা হচ্ছে আমাদেরকেই।
হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামটিতে সংখ্যালঘু মুসলিম
কামারটি শৈশব থেকেই ধুতি পরতেন।
মৌলবাদী রাজাকারেরা তা নিয়ে আপত্তি
তোলায় কামারটি উদাসকণ্ঠে ধুতি ধরে বলেন,
কাপড়েরও আবার ধর্ম? এই আপাত নিরীহ
দৃশ্যটি দিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির মুখে এক
চপেটাঘাত দিয়েছেন পরিচালক।
বিয়ের পরপরই বিধবা-হওয়া হিন্দু কিশোরীটির
আপাদমস্তক কামনার ঝড়, নিষিদ্ধ সে কামনার
কথা সে পারে কইতে, না পারে সইতে।
সে প্রেমে পড়ে মুসলিম কামারের, আন্তঃধর্ম
বিয়ে কেন হয় না এ নিয়েও সে প্রশ্ন তোলে।
গোটা ছবিতেই এ চরিত্রটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন
ধর্মান্ধ সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক
প্রতিবাদী স্তম্ভ। তীব্র কাম-কামনা অবদমিত
রেখে উপমার গাওয়া গানটিও হয়েছে দেখার
মতো।

ছবির শুরুতে গ্রামবাসীর শুয়োর তাড়াবার দৃশ্য
যে পাকিস্তানি সৈন্য তাড়াবার প্রতীক, তা আর
বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না।
ছবিটির নাম কেন ‘পিতা’, তা ছবিটি দেখলেই
খোলাসা হয়ে যাবে। কল্যাণের পিতাকে আর
কল্যাণকে ধরে নিয়ে পাকসেনারা। কল্যাণের
সামনেই তার পিতাকে তারা খতনা করতে উদ্যত
হয়। কল্যাণ হাতবাঁধা অবস্থাতেই
বাধা দিতে যায়, তার ওপর নেমে আসে নির্মম
অত্যাচারের খড়্গ। ওদিকে অদূরেই কল্যাণের
স্ত্রী প্রসব করে বসে একটি পুত্রসন্তান। কল্যাণের
পিতা বাঁচাতে পারেন না কল্যাণকে, কল্যাণও
পিতা হয় মৃত্যুর সামান্য পরেই। পিতৃত্বের
অমানবিক টানাপোড়েনের এই
দৃশ্যটি কতটা হৃদয়গ্রাহী হয়েছে —
তা ছবিটি না দেখলে বোঝা যাবে না।
সেরেফ তীর-ধনুকহাতে কামার
পিতাটি নেমে পড়েন কন্যাকে পাকসেনাদের
হাত থেকে বাঁচাতে। বেশ কিছু
সেনাকে কৌশলে হত্যা করে তিনি কন্যাটিকে
উদ্ধার করতে পারলেও কামারের একটি পুত্র
মারা যায়, যে পুত্রটি লেখাপড়া করে বড়
হতে চেয়েছিল; আমরা এই পুত্রের
হত্যাকাণ্ডটিকে চৌদ্দই ডিসেম্বরের
বুদ্ধিজীবীহত্যাকাণ্ডের সাথে এক
সমান্তরালে দেখতে পারি প্রতীকী হিশেবে।
ছবির শেষদৃশ্যে বাংলাদেশের জ্বলন্ত
মানচিত্রের মধ্য দিয়ে পিতা কামারের মৃত
পুত্রকোলে হেঁটে আসার দৃশ্যটি গোটা ছবিটিরই
যেন সারবস্তু, দৃশ্যটি যে কারোরই চোখে জল
আনবে।
ছবিটিতে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাসুদ
আখন্দ নিজেই। তার অভিনয় অনবদ্য তো হয়েছেই;
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শামিমা নাজনিন,
মারিয়া ফারিহ্ উপমা, কল্যাণ কোরাইয়া,
শায়না আমিন থেকে শুরু করে বাকিদের অভিনয়ও
প্রশংসার দাবিদার।
পরিচালক ছবিতে একাধিক চমক রেখেছেন।
পাকসেনার চরিত্রে তিনি অভিনয় করিয়েছেন
কাশ্মীরের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মডেল
মইনকে দিয়ে। পাকসেনার চরিত্রে এখন পর্যন্ত যত
ছবিতে যতজনকে দেখেছি, তাদের মধ্যে মইনকেই
সবচাইতে স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশ্বাসযোগ্য
মনে হয়েছে, গায়ের রঙ এবং চেহারাসহ
সবকিছুতেই সে পাকিস্তানি।
এই ছবিতেই প্রথম প্লেব্যাক করেছেন প্রখ্যাত
ওয়াহিদবংশের প্রথাবিরোধী গায়িকা সায়ান
ওয়াহিদ। আরো গেয়েছেন সব্যসাচী দুই
শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী আর মেহের আফরোজ শাওন।
তাদের গাওয়া গানটিও হয়েছে সুশ্রাব্য।
মোদ্দাকথা গোটা ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের
প্রতি আবেগ ও ভালোবাসার এক বিশুদ্ধ
বহিঃপ্রকাশ। এই ঘৃণ্য বাণিজ্যিকতার যুগে তরুণ
নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি বানানোর
সাহস করেন না, করলেও প্রযোজকদের
সহায়তা পান না, কিন্তু দৃঢ়প্রত্যয়ী মাসুদ আখন্দ
সেই সাহস দেখিয়েছেন।
গতকাল এই ছবি নির্মাণের ভেতরের গল্প
নিয়ে এবং পরবর্তী ছবির পরিকল্পনা নিয়ে মাসুদ
ভাই ও আমার অতিদীর্ঘ আলাপ হয়েছে।
আমি জানি,
ছবিটি বানাতে গিয়ে কী সংগ্রামটাই
না তাকে করতে হয়েছে! প্রথম বইটি একজন
লেখকের কাছে যেমন প্রথম সন্তানসম, প্রথম
ছবিটিও একজন পরিচালকের কাছে প্রথম
সন্তানসম। প্রথম সন্তানটির মুখ দেখে মাসুদ
ভাইয়ের চোখেমুখে আবেগের যে বহিঃপ্রকাশ
আমি দেখেছি, তা বর্ণনা করা অসম্ভব,
তা অনির্বচনীয়! ‘পিতা’ ছবিটি তিনি উত্সর্গ
করেছেন নিজেরই প্রয়াত পিতাকে।
একটি কথা না বলে পারছি না — দুজন জ্যেষ্ঠ
অভিনেতা ছাড়া ছবিটির আর
কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী কোনো টাকা
নেননি!

মুক্তিযুদ্ধের ছবি, বাংলার ছবি, ভালোবাসার
ছবি, মাসুদ আখন্দের ছবি ‘পিতা’ যুগ যুগ
ধরে বেঁচে থাকুক বাংলাদেশের দর্শকহৃদয়ে…।

সুত্রঃ ফেসবুক,ওয়েবসাইট,বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম।
কার্টেসীঃ আখতারুজ্জামান আজাদ।

১৪ thoughts on “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের হৃদয়ছোঁয়া ছবি “পিতা”….

  1. ছবিটা দেখা হয়নি। সংগ্রহে আছে।
    ছবিটা দেখা হয়নি। সংগ্রহে আছে। দেখে ফেলব।
    আপনি সম্ভবত মোবাইল থেকে পোস্ট দেন, তাই পোস্টের কিছু অংশের লাইন কবিতার মতো হয়ে যাচ্ছে ইদানিং। পোস্ট দেওয়ার সময় লক্ষ্য রাখলে ভালো হয়। পড়তে বেগ পেতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *