মুভি রিভিউঃ Dead Poets Society


নটরডেম কলেজের অরিয়েন্টেশনের দিন কলেজের প্রিন্সিপাল ফাদার বেঞ্জামিন ডি কস্তা আমাদের অন্তরে গেঁথে দিলেন ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য এই কলেজের সেই তিনটি শব্দ যা আজো আমি ভুলতে পারিনি – Diligite Lumen Sapientiae অর্থাৎ জ্ঞানের আলোকে ভালোবাসো। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে নটরডেম কলেজ সম্পর্কে অনেক মিথ শুনেছি। যেমন এখানে একবার ভর্তি হতে পারলেই হল ভালো রেজাল্ট নাকি আপনাআপনিই এসে যায়। তারপর এখানে নাকি যেনতেন ছাত্র ভর্তি হতে পারে না। ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলেও অত্যান্ত সূক্ষ্ম বাছাই প্রক্রিয়ায় একমাত্র তাদেরকেই এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়া হয় যাদের ভেতরে অন্যরকম কিছু একটা আছে।
এই মিথগুলো আমার ভেতরে পাকাপাকি ভাবে বিশ্বাসে রূপান্তরিত হল যখন দেখলাম আমার আশেপাশে সব বোর্ড স্ট্যান্ডরা ভাবলেশহীন মুখে বসে আছে। ওদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল যেন বোর্ড স্ট্যান্ড কোন ব্যাপারই না। আর একেকজন শিক্ষক যেন একেকটা জ্ঞানের জাহাজ। এতো সুন্দরভাবে প্রতিটা বিষয় তারা আমাদের সামনে উপস্থাপন করছিলেন যে মনেই হচ্ছিল না এখানে পড়ালেখা করতে এসেছি।

যাই হোক, এতকিছু দেখে আমার মাথায় একটা দুর্দান্ত চিন্তা খেলে গেল। আচ্ছা, আমি তো তেমন কোন ভালো ছাত্র না, তাছাড়া ভর্তি পরীক্ষাতেও তেমন একটা ভালো করতে পারিনি। তাহলে এরা আমাকে এখানে ভর্তি করলো কেন? চিন্তার বিষয়। খুবই চিন্তার বিষয়!

অনেক ভেবেচিন্তে আমি আবিষ্কার করলাম আমার ভেতরে নিশ্চয়ই “কিছু” একটা আছে। এই “কিছু একটা” যে কি সেটা সম্পর্কে সেসময় ধারনা করতে না পারলেও নটরডেম সম্পর্কে আমার আগাধ বিশ্বাস ছিল। আমার বিশ্বাস ছিল যে ওরা আমার মধ্যে সেই “কিছু একটা” খুঁজে পেয়েছিল বলেই এই ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য কলেজে আমাকে ভর্তি করেছিল।
আহ! কি সব স্বপ্নের মতো দিন ছিল সেসব! নটরডেমে নিজের ভেতরের আগুনের দেখা না পেলেও Dead Poet Society দেখতে গিয়ে আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল।

যেমনটা বলেছিলাম, Dead Poet Society-র গল্পটা শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য Weldon একাডেমীর অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে। প্রিন্সিপাল নোলান একটি গুরুগম্ভীর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে “Tradition. Honor. Discipline. Excellence” – এই চারটি আদর্শের ওপর ভর করে এই বিদ্যাপীঠ ও তার প্রাক্তন ছাত্ররা সফল হয়েছেন। অরিয়েন্টেশনের শেষে তিনি সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এই একাডেমীতে আগত নতুন শিক্ষক মিঃ কিটসের সাথে। এ বছর থেকে তিনি Weldon একাডেমীর ছাত্রদের সাহিত্য পড়াবেন।
ক্লাসের শুরুতেই দেখা গেল মিঃ কিটসের পড়ানোর ঢং এই একাডেমীর অন্য শিক্ষকদের বিরক্তিকর আর গতানুগতিক ধারা থেকে একদম আলাদা। কবিতা পড়ার বদলে তিনি চেষ্টা করলেন তার ছাত্রদের মধ্যে কবিতার অনুভব ছড়িয়ে দিতে – আর শেখালেন “Carpe Diem”। ব্যাতিক্রমি এই শিক্ষকের প্রতিটি কথা ছাত্ররা গোগ্রাসে গিলতে লাগলো।
কারপে ডিয়েম, meaning Seize the day অর্থাৎ জীবনে কে কিভাবে সফল হবে সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা না করে কিভাবে আজকের এই দিনটাকে উপভোগ করা যায়। )

এর মধ্যেই কৌতূহলী এক ছাত্র আবিষ্কার করলো যে মিঃ কিটস একসময় এখানেই অধ্যয়ন করেছেন। স্কুলের অ্যানুয়াল বুক থেকে তারা জানতে পারল মিঃ কিটস শুধু ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রই ছিলেন না, এসময় ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন, মৃত কবিদের সংঘ নামে একটা দল তৈরি করেছিলেন, এমনকি এই অ্যানুয়াল বুকের সম্পাদকও তিনিই। অ্যানুয়াল বুক তার সম্পর্কে বলা আছে – “This man most likely to do anything!” অর্থাৎ, বদমাইশিতেওও তিনি কম ছিলেন না।

সেদিন বিকেলে তারা মিঃ কিটসকে জেঁকে ধরল বিস্তারিত জানার জন্য। উৎসাহী ছাত্রদের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে মৃত কবিদের সংঘ প্রসঙ্গে তিনি জানালেন যে জীবনের সবটুকু আনন্দ রস আস্বাদন করাই ছিল এই দলের সদস্যদের আসল কাজ। আর কিভাবে তারা সেটা করতেন? প্রতিদিন রাতের আঁধারে একাডেমীর গেট কিপারের দৃষ্টি এড়িয়ে তারা বাইরে বেড়িয়ে আসতেন। তারপর চলে জেতেন গভীর জঙ্গলে। সেখানে এক গুহার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে শুরু হতো কবিতা পড়া।

অত্যান্ত রোম্যান্টিক এই আইডিয়া ওদের সবার ভালো লেগে যায়। আর এই বয়সটাই এমন যে যেকোন অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেলেই নেশা লেগে যায়। ওদের যেন আর তর সইছিল না। সেদিনই মৃত কবিদের আত্মাকে জাগাতে গভীর রাতে বের হয়ে আসে কয়কজন তরুণ। মৃত কবিদের সংঘ নতুন করে প্রান ফিরে পায়। আর এর সদস্যরা ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে বাস্তবতা থেকে দূরে প্রেমময়, উচ্ছল আর স্বপ্নময় এক জগতে।

অবশ্য তাদের ভুল ভাঙতে দেরি হয় না। বাস্তবতার রূঢ় আঘাতে ভেঙ্গে পড়তে থাকে তাদের বর্ণিল পৃথিবী। কিন্তু অন্তরাত্মার কথা যারা শুনতে শিখেছে তারা কি এতো সহজেই হেরে যাবে?
রবিন ইউলিয়ামস আমার প্রিয় একজন অভিনেতা। মূলত তার অভিনয় দেখার জন্যই এই সিনেমাটা দেখতে বসেছিলাম। কিন্তু সিনেমাটার গল্পটা আমাকে এতোই স্পর্শ করে গেছে যে আজকে অফিসেই যেতে পারিনি। হা হা হা।

আরও জানতেঃ Dead Poets Society In IMDB

২২ thoughts on “মুভি রিভিউঃ Dead Poets Society

    1. ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো।
      ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো। এটা আসলে সেই অর্থে রিভিউ না। সিনেমা দেখার পর আমার রিএকশন বলা যেতে পারে।

  1. মুভিটা এখনও দেখে উঠতে পারলাম
    মুভিটা এখনও দেখে উঠতে পারলাম না… :দেখুমনা: কালকেই বসব আশা করি… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    নাভিদ ভাই, আপনি মুভি নিয়ে লেখেন না কেন? আপনার কাছ থেকে এরকম চমৎকার রিভিউ আরও চাই… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :মাথানষ্ট: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :অপেক্ষায়আছি: আর কতকাল পর আসলেন ইষ্টিশনে… :মানেকি: ভুলেই গেছিলেন নাকি আমাদের??!! :মাথাঠুকি:

    1. এটা এখনো দেখেন নাই? হা হা হা।
      এটা এখনো দেখেন নাই? হা হা হা। আফসোস ম্যান! কালকে দেখবেন কেন? বন্ধু বান্ধবদের ডাক দিয়ে, সন্ধ্যার পরই বসে পড়েন! সময়টা খুব ভালো কাটবে! আমি শুরু করে আর থামতে পারিনি।
      মুভি রিভিউ লেখি না কেন? এই আপনাদের জন্যই লেখি না। আপনাদের রিভিউ পড়ে পড়ে সবার রুচি উন্নত হয়ে গেছে। আমি তো ভেবেছিলাম আমারটা পড়ে দু চারটা গালি ও খেতে হতে পারে। সেই ভয়ে এই রিভিউটাও হয়তো দিতাম না! কিন্তু লিখে ফেলেছি বলে আর পোষ্ট না করে থাকতে পারলাম না।
      অনেক দিন পরে আসলাম ঠিকই, কিন্তু মাঝে মাঝে উকি দিয়ে গেছি। চাকরি নিয়ে অনেক প্রেশারে আছি। আসলে এইসব চাকরি বাকরি করে পোষাবে না। লেখালেখি, বা সিনেমা দেখা ইত্যাদি ক্রিয়েটিভ কাজের জন্য পিস অফ মাইন্ড দরকার। যে ক্যাটাগরির চাকরি করি, তাতে আর যে কিছুই পাওয়া যাক, মনের শান্তি পাওয়া যাবে না।
      ভালো আছেন তাহলে?

      1. একটু পরে দেখতে বসতেছি…
        একটু পরে দেখতে বসতেছি… লাস্ট দুই মাস নতুন কোন মুভি দেখতে পারিনি। :কানতেছি: আজকে মুভি দেখার প্ল্যান ছিল, আপনার রিমাইন্ডারখান চোখে পড়ে গেল… :থাম্বসআপ: দেখে জানাচ্ছি… :বুখেআয়বাবুল:

  2. আমি দেখমু কেউ আমারে ছবিটা দেন
    আমি দেখমু কেউ আমারে ছবিটা দেন :'( :'(

    নাভিদ ভাই ভাল আছেন?? বহুত দিন পর ইস্টিশনে। ভেবেছিলাম বিদেশ পাচার হয়েই গিয়েছেন বুঝি।

    1. ভাল আছি ভাইয়া। এখনো বিদেশে
      ভাল আছি ভাইয়া। এখনো বিদেশে পাচার হতে পারিনি।
      আর মুভি ডাউন লোড করার জন্য টরেন্ট ব্যাবহার করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *