গল্প – মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট !

উৎসর্গ – আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের


উৎসর্গ – আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের


পায়ের নখ কাঁটা দরকার । বাড়তি নখের জন্য সু পড়া যাচ্ছে না । গুহা মানবদের মতো নখ বেড়ে উঠায় মোজো পায়ে গলাতেই কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকছে ।
– মা নেইলকাটার কোথায় ?
– তোর বাবার ড্রয়ারে দেখ তো , কাল রাতে ওইখানে দেখেছিলাম । মা রান্না ঘর থেকে জবাব দেন ।

নেইলকাঁটার বাবার ড্রয়ারেই পাওয়া গেল । বাবার ঘুম না ভাঙিয়ে খুব ধীরে ধীরে নেইলকাঁটার নিয়ে চলে আসতে চাইলেও সম্ভব হল না ।
–খোকা !
ইশশ , শব্দ হয়ে গেছে ! বাবার তীব্র ইনসমনিয়া । তিনি সারা রাত জেগে থাকেন । হয়তো বই পড়েন , লেখালেখি করেন ,গুনগুন গান ধরেন অথবা একদম চুপচাপ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন । ভোরের দিকে বিছানায় যান । একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠেন । এমনটাই হয়ে আসচ্ছে দীর্ঘদিন । শব্দ করে আজ বাবার সকাল সকাল ঘুমটা ভেঙ্গে দিলাম ।

–আপনার ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম বাবা ! আমি নতমুখে বললাম
–আরে না রে ! চোখ কি আর এখন এতো সহজেই জোড়া লাগে যে ঘুম ভাঙবে । শীতের মিষ্টি রোদটা জানালা গলে বেশ কিছুক্ষন যাবত গালে এসে পড়ছে । রোদটা গালে পুষে রাখছি । ভালো লাগছে , জানিস !
–বারান্দায় বসবেন ?
বাবা উজ্জ্বল মুখে বলে উঠলেন – সেই সাথে এককাপ গরমাগরম চা ! আহা ! হুইল চেয়ারটা দে তো খোকা ।

আলমারির সাথে ঠেস দিয়ে রাখা হুইল চেয়ারটা বিছানার কাছে নিয়ে আসলাম । বাবা আমার দু কাঁধে ভঁর দিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসলেন । নিজেই চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বারান্দায় গেলেন । আমি যাচ্ছি বাবার পিছন পিছন ।

বাবা মোটেও চান না তাঁর হুইল চেয়ার পিছন থেকে অন্য কেউ ঠেলে নিয়ে যাক । সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসচ্ছি । দীর্ঘদিন পোষ্ট অফিস মাস্টার হিসেবে চাকুরী করেছেন । কিন্তু কক্ষনো শুনিনি কাউকে বলেছেন – “ আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও । “
দু পা হারাবার পর নিজের হুইল চেয়ারের চাকা তিনি নিজেই ঘুরিয়ে পথ চলেছেন । সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর । ক্লান্তিহীন । কিন্তু আজ লক্ষ্য করলাম শোবার ঘর থেকে বারান্দা এইটুকু পথ চলতেই বাবা বড্ড হাপিয়ে গেলেন ।

–আমাদের মাস্টারনী কি চলে গেল ? ডান চোখে সরু করে অল্প কৌতুকের আদলে বাবা কথাটি বললেন ।
আমি হেসে জবাব দিলাম ।
– মা রান্নাঘরে । আজ উনার বেশ তাড়াহুড়ো । স্কুলে আজ থেকে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে । এক্সাম হলে মা’র ডিউটি পড়েছে ।
–গেল ! তাহলে তো আর চা’য়ের কথা মাস্টারনীর কানে তোলা যাবে না । ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করে দিবেন ।

এখনো বাবার চোখে মুখে কৌতুক । বাবাকে আমি কখনো কৌতুক মেশানো ভঙ্গি ছাড়া মা প্রসঙ্গে কথা বলতে দেখিনি ।
বাবা মিটিমিটি হাসচ্ছেন । মিষ্টি রোদটাও এখন বাবার কোলে । রোদটাও মিটিমিটি হাসচ্ছে ! একটা ক্যামেরা যদি থাকতো ছবি তুলে রাখতাম ! কি সুন্দর লাগছে বাবাকে ।

আমি রান্নাঘরের চৌকাঠে দাড়াতেই মা কপট বিরক্তিতে আমার হাতে চায়ের চাপ তুলে দিলেন ।
–তাড়াতাড়ি যা ! উনাকে দিয়ে আয় । তোদের গলার আওয়াজ শুনেই বুঝেছি সে উঠে পড়েছে । এখন এক কাপ চা না পেলে তো চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিবে ! খুব যন্ত্রণা দেয় বুড়োটা ।
আমি চায়ের কাপ হাতে নিলাম । গত ছাব্বিশ বছরে আমি এই দুই তুমুল প্রেমময়ী নরনারীর তীব্র ভালোবাসা বুঝতে শিখে গিয়েছি । এবং বিস্মিত হয়েছি বাবা মা’র পরস্পরের প্রতি ভালবাসতে পারার ক্ষমতা দেখে ।

বাবার হাতে চায়ের তুলে তুলে দিয়ে আমি রুমে আসলাম । ১১ টায় আমার ইন্টার্ভিউ । একটু আগেভাগেই অফিসে পৌছাতে চাই । দেরীতে রওনা দেয়ার কারনে এরআগে বেশ কয়েকটা ইন্টার্ভিউ মিস হয়েছে । এখন থেকে আর দেরী নয় ।

পায়ের নখ দ্রুত কেটে বাথরুমে ঢুকে গেলাম । গোসল দিলাম । বের হয়ে ফিটফাট বাবু সাজলাম । চাকুরীর ইন্টার্ভিউ অনেকটা কন্যা দেখার মতো । চাকুরী প্রত্যাশী মানুষটি এখানে কন্যা আর চাকুরীদাতা খুঁতখুঁতে পাত্রের মা , বোন অথবা বড় খালা ! এ এক কঠিন পরিস্থিতি ! ছেলে মেয়ে প্রায় সবাইকে এই ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় । তারপরও কেন যেনো সমাজ থেকে কন্যা দেখা প্রথা বিলোপ হয় না ! চাকুরীর ক্ষেত্রে না । মেয়েদের ক্ষেত্রেও না ।

এজুকেশন সার্টিফিকেট ফাইলটা অভ্যাসমতো দেখে নিলাম । যদিও জানি দেখার কিছু নেই । এই পর্যন্ত বহুবার ঠিক এইভাবেই ফিটফাট বাবু সেজে ফাইল চেক করেছি । কাগজপত্র যার যেখানে থাকার সেখানেই আছে কিন্তু চাকুরী নামের সোনার হরিণ আজ পর্যন্ত হাতে ধরা দেয়নি । তাই বলে ইন্টার্ভিউ দেয়া বন্ধ থাকছে না । দিয়ে যাচ্ছি । একদিন হয়তো পেয়ে যাবো সেই অমূল্য রতন ।

সব গোছগাছ করে যখন রুম থেকে বের হয়ে আসলাম শুনি বাবা গুনগুন করে গান গাইছে । মা ইতিমধ্যে চুপিচুপি দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন । আমি মা’র পাশে দাড়াতেই আমার কাঁধে মা মাথা রাখলো । আমরা মুগ্ধ হয়ে বাবার গান শুনছি –

“ আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা // কারোর দানে পাওয়া নয়

চমৎকার ভরাট গলায় গান করেন বাবা ! বিয়াল্লিশ বছর আগে একুশ বছরের টগবগে এই তরুণ স্টেনগান হাতে দেশ স্বাধীন করেছিল । আর কণ্ঠে ছিল গান । যেদিন ভোরে বাবা তার দুটো পা হারায় তারআগের মধ্যরাতেও তিনি তাঁর সঙ্গীদের শুনিয়েছিলেন – “ মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি // মোরা একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি “
স্মৃতির সিন্ধুক থেকে বহুবার আমাকে সেদিনগুলোর গল্প তিনি শুনিয়েছেন ।

গুনগুন গান শেষ হবার পর আমি বাবার কাছে এগিয়ে গেলাম ।
–বাবা , আমি বের হচ্ছি
–কোথায় যাচ্ছিস রে ?
–একটা ইন্টার্ভিউ আছে বাবা !
ঘাড় ঈষৎ বাঁকা করে বাবা আমায় দেখতে দেখতে বললেন–চাকুরীর বাজারটা বড় কঠিন হয়ে যাচ্ছে তাই না খোকা , খুব অবাক লাগে এতো ভালো রেজাল্ট নিয়েও চাকুরীর হচ্ছে না দেশে ! চাকুরী গুলো পায় তবে কারা ।
মা বাবার দিকে আজকের পত্রিকা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল
–যারা চাকুরিদাতাদের পকেট ভরে দিতে পারে , মামা চাচার ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারে অথবা সঠিক সময়ে সার্টিফিকেট ব্যবহার করতে পারে চাকুরী তাদের হয় ।

সার্টিফিকেটের কথা শুনে বাবা হাসতে লাগলেন । এইটা বাবার প্রতি মায়ের খুব কমন একটা অভিযোগ । তিনি প্রায়শই বলেন আজও বললেন
–আমাদের তো মামা চাচা দাপট নেই কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে সার্টিফিকেট তোমার আছে সেটা তো তুমি কোন দিন আমাদের ব্যাবহার করতে দিলে না ।
বাবা পত্রিকা এক হাত হতে অন্য হাতে নিলেন । উনার মুখ কিছুটা অন্যমনস্ক । কিছু ভেবে বলবার আগে বাবার এমনটা হয়

— রেখা , তুমি ভুল বললে । আমার সার্টিফিকেট ব্যাবহার হয়নি কথাটা ঠিক নয় । এইতো স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে এটাই তো আমার সার্টিফিকেটের সর্বোত্তম ব্যাবহার !

মা গলায় খানিকটা ক্লান্তির , খানিকটা অভিমানী গলায় বললেন
–আমাদের স্কুলের ফিজিক্সে নতুন জয়েন করা এনায়েত হায়দার তাঁর বাবার মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় দিব্যি চাকুরী পেয়ে ফেললো । দেশে একটি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট থাকা কতো সুযোগ সুবিধার অথচ তোমার ছেলেকে তুমি মুক্তিযোদ্ধা কোঠা কোনদিন ব্যাবহার করতে দাওনি । স্কুলে না , কলেজে না ভার্সিটিতে না । এখন চাকুরিতেও না !

বাবা রকিং চেয়ারে হেলান দিলেন । লম্বা একটা বাতাস বুকে টেনে নিলেন ।
–রেখা , আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে , আমার একুশ বছর যেদিন হল , মা সেদিন রাতে মুরগীর ঝোল রান্না করেছিলেন আমার জন্য । গঞ্জে যাবার আগে আমি কথা দিয়েছিলাম রাতে এসে ভাত খাবো । মাকে দেয়া সেই কথা রাখা হয়নি । গঞ্জ থেকেই দল বেধে রফিক ওস্তাদ নেতৃত্বে দেমাগ্রী প্রশিক্ষণ সেন্টারের উদ্দ্যোশে রওনা দিয়েছিলাম । তখন আমার মাথায় কেবল একটা কথা বেজে যাচ্ছিল
“ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। । জয় বাঙলা “ ।

সেদিন কোন সার্টিফিকেটের লোভ ঐ ঘর পালানো ২১ বছরের তরুনের ছিল না । বিজয়ের মাত্র কয়েকদিন আগে ভোরে রাজশাহী আপারেশনে হটাৎ গোলার একটি আঘাত আমার পা দুটো উড়িয়ে নেয় । জানো পা হারানোর মুহূর্তেও আমার আফসোস হয়নি কেন যুদ্ধে আসলাম । মুক্তিযুদ্ধে তো আমাদের কোন কিছু পাবার বা হারাবার ছিল না । ছিল শুধু একটা আত্নবিশ্বাস । এই দেশ মুক্ত করবো । ব্যাস , এইতো !

মা কিছুটা মরিয়া হয়েই যেন বললেন
–কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তোমার অধিকার আছে দেশের প্রতি । এই দেশেরও কিছুটা হলেও দায়িত্ব আছে তোমার প্রতি ! এইটা কি অস্বীকার করতে পারবে ?

— অধিকার ! দায়িত্ব ! বাবা মাথা ডান পাশে একটু বাঁকা করে মা’র দিকে তাকালেন ।

–যুদ্ধ তো আমি একা করিনি । আমার মতো লাখো বাঙলার সন্তান জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে এসেছে । বলতে পারবে রেখা , কতোজন মুক্তিযোদ্ধা আজ তাদের অধিকার আদায় করতে পেরেছে ? রাষ্ট্র কতোজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি কর্তব্য পালন করেছে ?

আমি আর মা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলাম । গ্রিলে একটি চড়ুই বসেছে । মিহি স্বরে ডেকে যাচ্ছে অনবরত । বাবা বলে যাচ্ছেন উনার দীর্ঘদিনের জমানো আক্ষেপ ।

–জানি কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না । কেউ বলতে পারবে না কেন জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী-কন্যার পতিতালয়ে বসবাস করতে হয় । কেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রোস্তম আলীকে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় ! মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুল ছালামকে একটি সার্টিফিকেটের জন্য কেন আজও অপেক্ষা হয় ! কেন ? কেউ বলতে পারবে না অথচ দেখো সেইদিনের সুবিধাভোগী নরপশু রাজাকার, আলবদরবাহিনী আজ বাঙলার পতাকা উড়িয়ে বাঙলা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ! তুমি তাহলে আমায় কোন অধিকারের কথা বলছ রেখা ! কোথায় অধিকার , কোথায় দায়িত্ববোধ ?

বাবার চোখ ভিজে যাচ্ছে । যুদ্ধের কথা যতবার বাবার মুখে এসেছে বাবা গর্ব করে মুক্তিযুদ্ধোকালীন বিভিন্ন অপারেশনের কথা আমাদের বলেছেন কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সম্মাণের বিপরীতে রাজাকারদের প্রসঙ্গ আসলে প্রতিবার বাবা অঝোরে কাঁদেন ! হয়তো এই কান্না হতাশার ! প্রাপ্য সম্মান না পাবার । হয়তো সুদীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছরেও বাংলাদেশ অ-স্বীকারকারী সমস্ত রাজাকারের সর্বোচ্চ বিচার দেখতে না পারার আক্ষেপে বাবার এ কান্না ।

আমি বাবার কাঁধ জড়িয়ে ধরলাম । আমার হাতে বাবার ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝড়ে পড়ছে । অশ্রুফোঁটায় এতো উত্তাপ কেন ? যেন মনে হচ্ছে আমার হাত পুড়ে যাবে বাবার প্রতিটি অশ্রু বিন্ধুতে ।

–খোকা , হয়তো তোর মনে হতে পারে কেন আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রীয় সুবিধা আদায় করছি না !

আমি জোরে জোরে মাথা নেড়ে না বলতে চাইলাম কিন্তু আমাকে বাবা কিছু বলার সুযোগ না দিলেন না । বাবা আপন মনে বলে যাচ্ছেন । মনের সব কথা যেন তাঁর চালানো ৭১ র বুলেটের মতো বেড়িয়ে আসচ্ছে ।

–সত্যি কথা বলতে আমি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটের অধিকার ভোগ করতে পারি না রে খোকা ! যখন দেখি রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীন দেশে নতুন দল গঠন করে ; টিভি খুললে যখন দেখি আমাদের বোন অঞ্জলিকে ধর্ষণের জন্য উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া কিম্বা মাধব চন্দ্র বিশ্বাসের হত্যাকারী সেই চিহ্নিত রাজাকার আজ ধর্মের কথা প্রচার করে । যখন নিজ কানে শুনি নতুন চন্দ্র সিংহের হত্যাকারীর রাষ্ট্রক্ষমতার বসে হাসছে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয় রে ! মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেটটা যেন আমার দিকে কুটুক্তি ছুড়ে দেয় । আমায় নিয়ে তামাশা করে । এ অভিশাপ মেনে নিতে পারি না রে !

আমি হাঁটু মুড়ে বসে বাবার কোলে মাথা রাখলাম পড়লাম । মা বাবার ডান হাত জড়িয়ে ধরে বসে আছে । মধ্যবিত্ত ছাপোষা এক বাঙ্গালী পরিবার কাঁদছে । তারা লোকলজ্জার ভয় ভুলে চিৎকার করে কাঁদছে !

বহুক্ষন কেউ আর কোন কথা বলেনি । চুপচাপ আমরা বসে ছিলাম টিনশেডের সেই বারান্দায় । পাশেই বকুলের গন্ধ আমাদের চারপাশ মমতার মায়া বুলিয়ে দিচ্ছিল ।
–খোকা তোর দেরী হয়ে যাচ্ছে আর মাস্টারনী তো মনে হয় আবার হাত ধরে ঘুমিয়েই পড়লো ! বাবা ভেজা চোখে মুচকি মুচকি হেঁসে কথা বলে উঠলো ।
মা আদুরে মুখ ভেংচি কেটে বাবার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো । আমি বাবাকে বললাম – বাবা আসি , দোয়া করবেন !
–খোকা ! শুধু একটি কথাই মনে রাখিস কক্ষনো বিশ্বাস হারানো যাবে না । কক্ষনো না । এই বিশ্বাসের জোরেই একাত্তুরে আমাদের বিজয় হয়েছিল । বিশ্বাস রাখ , তোদেরও বিজয় হবেই হবে ।

আমি বাবার হাতে চুমু খেলাম । মা বাবার হাতে বাসার চাবি গুজে দিতে গেলে বাবা দুষ্টুমি ভঁরা চোখে করে ফিসফিস করে করে মাকে কি যেন বলছে । হয়তো বাবার পছন্দের রোমান্টিক কোন গানের দুটি লাইন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীকে শুনাচ্ছেন ! মা খিল খিল করে হাসচ্ছে । এই দুই প্রেমযুগলকে সময় দিতে ফাইল হাতে আমি বাইরে বেড়িয়ে এলাম । রাস্তায় নেমে সিনা টানটান করে দাঁড়ালাম ।

যতদিন পর্যন্ত দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ধারাবাহিকতা আমাদের শরীররে বইবে ততদিন এই দেশের সকল সন্তানদের গর্বের সাথে সিনা টান টান করে রাখতে হবে । তাদের মাথা সর্বদা থাকবে উঁচুতে ।

২৬ thoughts on “গল্প – মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট !

  1. স্ট্রেইট কাট লেখা। লেখাটা পড়ে
    স্ট্রেইট কাট লেখা। লেখাটা পড়ে লজ্জায় মাথা নত হয়ে গেলো আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থ সম্মান দিতে পারিনি এই কথা ভেবে।

    1. মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু তেমন
      মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু তেমন বিশাল কিছু আশা করে না । তারা চায় প্রাপ্য সম্মান । আমরা মনে হয় না তাদের যথার্থ সম্মান দিতে পেরেছি । এই দুঃখবোধ মাঝে মাঝেই কাজ করে ।

      ধন্যবাদ আতিক ভাই । বিজয়ের শুভেচ্ছা :গোলাপ:

  2. লেখাটা অনেক ভাল তবে আপনার
    লেখাটা অনেক ভাল তবে আপনার লেখা আরও ভাল হয় ভাই.।

    🙁 তবুও ভাল লেগেছে। আসলে আপনার কাছ থেকে আশাটা একটু বেশি

    1. মূলত কিছু ব্যাক্তিগত অনুভূতি
      মূলত কিছু ব্যাক্তিগত অনুভূতি গল্পের আদলে তুলে ধরতে চেয়েছি ।

      ধন্যবাদ জয় । পরবর্তীতে অবশ্যই আরেকটু ভালো কিছু দেয়ার চেষ্টা থাকবে । :ফুল:

      কেমন আছেন । শুভ বিকাল

  3. কতোজন মুক্তিযোদ্ধা আজ তাদের

    কতোজন মুক্তিযোদ্ধা আজ তাদের অধিকার আদায় করতে পেরেছে ? রাষ্ট্র কতোজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি কর্তব্য পালন করেছে ? –

    এর চেয়ে নির্মম সত্য আর কি হতে পারে! এর চেয়ে বেশি বিশ্বাসঘাতকতা আর কি হতে পারে!
    এই লজ্জা কোথায় রাখি !!!!

    1. ঠিক তাই । কিন্তু অদ্ভুত বিষয়
      ঠিক তাই । কিন্তু অদ্ভুত বিষয় , আমরা তাদের জন্য কিছু করবো , এই ভাবনা ভাবতেই ৪২ বছর কেটে গেছে । অনেকে বৃদ্ধ অবস্থায় মারা যাচ্ছেন । অথচ আমরা এখনো ভেবেই যাচ্ছি , কিছু করা উচিৎ ।

      তবে এই নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন , তারাই মোড় ঘুরিয়ে দিবে । 🙂

      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ অবাস্তব স্বপ্নচারী :ফুল:

  4. খুব গুরুত্বপূর্ণ টপিক নিয়ে
    খুব গুরুত্বপূর্ণ টপিক নিয়ে সুন্দর আর মর্মস্পর্শী গল্প লিখেছেন। ভালো লাগলো। তবে গল্পের মুক্তিযোদ্ধা বাবার এই কথাগুলো শুনে মনে হল যে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভেতরে যে আগুন ছিল সেটা দেশ স্বাধীন হবার পর কোন কারণে চিমসে গেছে আর রাজাকারদের সাহস বেড়ে গেছে। নিজেকে ৪২ বছর ধরে কেউ যদি ছোট ভাবতে পারে তাহলে সে মুক্তিযুদ্ধে গেল কিভাবে? অদ্ভুত না ব্যাপারটা?

    “যখন দেখি রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীন দেশে নতুন দল গঠন করে ; টিভি খুললে যখন দেখি আমাদের বোন অঞ্জলিকে ধর্ষণের জন্য উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া কিম্বা মাধব চন্দ্র বিশ্বাসের হত্যাকারী সেই চিহ্নিত রাজাকার আজ ধর্মের কথা প্রচার করে । যখন নিজ কানে শুনি নতুন চন্দ্র সিংহের হত্যাকারীর রাষ্ট্রক্ষমতার বসে হাসছে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয় রে !”

    :থাম্বসআপ:

    1. চিমছে গেছে , কারণ আমরা চিমছে
      চিমছে গেছে , কারণ আমরা চিমছে দিয়েছি । আমরা যুদ্ধে দুই পা হারানো একজন মুক্তিযোদ্ধাকে একটা সার্টিফিকেট হাতে ধরিয়ে তার নিজের রাস্তা নিজেকে মাপতে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছি । সে সেই সার্টিফিকেট নিয়ে মরে গেল , পচে , গেল , গলে গেল সেটা নিয়ে আমরা ভাবিত নই ।
      বিপরীত দিকে যারা বাংলাদেশকেই অস্বীকার করেছে , যারা আমার আপনার আমাদের জন্মকে স্বাধীন দেশে স্বীকার করতে চাইনি , তারা ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দেশ শুষে বেড়াচ্ছে ।
      এরপর ও আর কি আশা করতে পারি একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে । মুক্তিযোদ্ধা বলে কি বাংলাদেশের সব ভার তার ? আর আমরা কেবল তাদের লাঞ্চিত করে রাজাকার তোষণে বেস্ত ই থাকবো । স্বাধীন দেশে আরাম ভগ করা এই আমাদের কি দেশের প্রতি কোন দায় নি ?

      মূলত এই কথাটাই গল্পের মুক্তিযোদ্ধার অনুভূতি । 🙂

      ধন্যবাদ নাভিদ কায়সার রায়ান , আপনার সুন্দর মতামতের জন্য একটি প্রাণবন্ত আলোচনার সুযোগ হল :ফুল:

      বিজয়ের শুভেচ্ছা

  5. সিফাত ভাই,আপনার গল্প বলার
    সিফাত ভাই,আপনার গল্প বলার ক্ষমতায় বরাবরের মতো এবারো মুগ্ধ হলাম।যা বলতে চেয়েছেন তা নিপুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এরকম অসাধারন গল্প আরো চাই।অশেষ শুভকামনা। ♥♥♥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *