অসুস্থ!

বাসটা প্রেসক্লাবে এসে থামল। ইয়াসিন সাহেব কপাল থেকে ঘাম মুছলেন। বাসটা মানুষে গিজগিজ করছে। ভাপসা গরমটা অসহ্য ঠেকে তার কাছে। নভেম্বর পেরিয়ে যাচ্ছে। এখনও শীত পড়ার কোন নামগন্ধ নেই।

ছোটবেলায় প্রবাদ পড়েছিলেন – উনো বর্ষায় দুনো শীত। অর্থাৎ, যেবার বৃষ্টি কম হয় সেবার দ্বিগুণ শীত পড়ে। এবার বর্ষা উনো হয়নি বরং দুনো হয়েছে। তাহলে শীত কি এবার উনো হবে? হতে পারে। হলেই বরং ভাল। অনিক একটা জ্যাকেটের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। অবশ্য লাগার যৌক্তিক কারণও আছে। তিন বছর আগে একটা সোয়াটার কিনে দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেটা একাধারে ছোট, পুরনো এবং ছেড়া। ছেলেটা মাত্র কলেজে উঠেছে। মাত্র কলেজে ওঠা ছেলেদের আত্মসম্মানবোধ খুব প্রবল হয়।



বাসটা প্রেসক্লাবে এসে থামল। ইয়াসিন সাহেব কপাল থেকে ঘাম মুছলেন। বাসটা মানুষে গিজগিজ করছে। ভাপসা গরমটা অসহ্য ঠেকে তার কাছে। নভেম্বর পেরিয়ে যাচ্ছে। এখনও শীত পড়ার কোন নামগন্ধ নেই।

ছোটবেলায় প্রবাদ পড়েছিলেন – উনো বর্ষায় দুনো শীত। অর্থাৎ, যেবার বৃষ্টি কম হয় সেবার দ্বিগুণ শীত পড়ে। এবার বর্ষা উনো হয়নি বরং দুনো হয়েছে। তাহলে শীত কি এবার উনো হবে? হতে পারে। হলেই বরং ভাল। অনিক একটা জ্যাকেটের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। অবশ্য লাগার যৌক্তিক কারণও আছে। তিন বছর আগে একটা সোয়াটার কিনে দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেটা একাধারে ছোট, পুরনো এবং ছেড়া। ছেলেটা মাত্র কলেজে উঠেছে। মাত্র কলেজে ওঠা ছেলেদের আত্মসম্মানবোধ খুব প্রবল হয়। অনিকেরও তাই। তিনি প্রথমে ‘টাকা নেই হাতে’ ঘরানার বাহানা, তার পরে হালকা ধাঁচের কিছু ধমক এবং শেষে আরেকটু শীত পড়লেই কিনে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়ার বিনিময়ে নিষ্কৃতি পেয়েছেন।

তবে আদৌ কিনে দিতে পারবেন কি’না, তা তিনি নিজেও জানেন না। চাকরীর বয়স শেষ হয়েছে, আট মাস হল। এখনও পেনশনের টাকাটা তুলতে পারেন নি। আজও সে কাজেই মতিঝিল গিয়েছিলেন। হয় নি। ঘুরে মরাটাই সার হয়েছে। এই পেনশনের টাকাটার জন্য আনিকার বিয়েটা আটকে আছে। ত্রিশ হাজার টাকা চাইছে ফাইল ছোটাতে। কোথা থেকে দেবেন তিনি জানেন না। আদৌ দিতে পারবেন কি’না তাও জানেন না। তাই পেনশনের টাকাটাও তোলা হচ্ছে না। আজ এর কাছে থেকে ওর কাছ থেকে হাত পেতে বিশ হাজার টাকা এনেছিলেন। ওরা নেয় নি। বলেছে একবারে পুরোটা দিতে। নইলে বিশ হাজার টাকার মুড়ি কিনে খেনে। হাতে টাকা নেই বলে, তিনি পাত্রপক্ষকে পাকা কথা দিতে পারছেন না। এ কথা ও কথা বলে ঝুলিয়ে রাখছেন। পাত্রপক্ষ বিরক্ত হচ্ছে, স্পষ্ট বোঝা যায়। কিন্তু, তিনি নিরুপায়।

বাসটা আবার সামনে এগোতে শুরু করে। ইয়াসিন সাহেব খানিকটা পেছনে হেলে পড়েন। পিছে দাড়িয়ে থাকা তরুণীর সাথে ধাক্কা লেগে গেল। তিনি লজ্জিতভাবে হাসার চেষ্টা করলেন। তরুণী বিড়বিড় করতে করতে বিরক্তিভরা মুখ অন্যদিকে সরিয়ে নিলো। কী বলেছে বিড়বিড় করে? বুড়ো? অসভ্য? লম্পট? কিংবা এজাতীয় কিছু? হতে পারে। ইয়াসিন সাহেব আবার সামনের দিকে তাকালেন। খানিকটা সামনে এগিয়ে আসার চেষ্টা করতে করতে আবার একবার কপালের ঘাম মুছলেন।

বাস কদম ফোয়ারাকে পেছনে ফেলার সাথে সাথেই একটা ছোটখাটো মিছিল দেখা গেল। আটদশ জনের মিছিল। সামনে একটা কাপড়ের ব্যানার ধরে রেখে হাঁটা আর দৌড়ের মাঝামাঝি কিছু করছে। একজন স্লোগান দিচ্ছে – জ্বালোরে জ্বালো আগুন জ্বালো। অন্যেরা উত্তর দিচ্ছে – আগুন জ্বালো আগুন জ্বালো। আবার বলছে – জালিমের কালো হাত… উত্তর আসছে – ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও।

ইয়াসিন সাহেব হঠাৎ করেই মনের বেখেয়ালে চলে যান চুয়াল্লিশ বছর পেছনে। তখন তিনি আঠারো বছরের সদ্য তরুণ। নাকের নিচে গোঁফের রেখা গজাতে শুরু করেছে। মাগরিবের আজানের পর বাসায় ফিরলে বাবার লাঠি হাতে বাসার সামনে দাড়িয়ে থাকার পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। আমিনুদ্দির চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়ার সময় বাড়তে শুরু করেছে। তার চেয়েও বেশি বাড়তে শুরু করেছে মিটিং মিছিলে যাওয়ার পরিমাণ।

আসলাম ভাই পাড়ায় ক্লাব খুলেছেন তখন – “বিপ্লবী তরুণ সংঘ”; সিক্রেট অর্গানাইজেশন। সিক্রেট না বলে ওপেন সিক্রেট বলাই ভাল। আসলাম ভাই মিনাকে, শফিক টিনাকে, মিনা তার মা’কে আর টিনা তার ভাইকে, মিনার মা পাড়ার মহিলাদের আড্ডায়, টিনার ভাই ক্রিকেট খেলতে খেলতে “বিপ্লবী তরুণ সংঘ” এর সব কথা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। তবু, তার সদস্যরা গর্ব করে বলত, তারা দেশের জন্য কাজ করে। তিনি ফিরে যান ঠিক সেই সময়টায়।

তখন একেকটা মিছিল কত বড় হত? আচ্ছা, তার কি কোন শেষ থাকত? ধুর! সমুদ্রের আবার কোন শেষ হয় না’কি? প্রতিটা গলি থেকে একেকটা করে নদী বেরিয়ে রাজপথের সমুদ্রে পড়ত। সেখান থেকেও স্লোগান উঠত, “আইয়ুব শাহী, মোনেম শাহী – ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক”; “আইয়ুব মোনেম ভাই ভাই – এক দড়িতে ফাঁসি চাই”; “শহীদের রক্ত – বৃথা যেতে দেব না।” তিনি বুকের মাঝে আজও তেজটা অনুভব করতে পারেন।

বাসের জানালা দিয়ে পাশের মিছিল থেকে স্লোগান ভেসে আসতে থাকে, “জালিমের দুই হাত – ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও।” হ্যাঁ! এই স্লোগানটা তো তারাও দিতেন। আচ্ছা, এখনকার সরকার কি আইয়ুবের থেকেও বেশি স্বৈরাচারী? তার এ নিয়ে মাথা ঘামানোর ইচ্ছে হয় না। তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন। রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাবে তরুণরা। চায়ের কাপে ঝড় তুলবে। রাজপথ উত্তাল করবে। ওসব ওদেরই কাজ। তিনি যখন তরুণ ছিলেন তিনিও করেছেন।

সেদিন আসাদের শার্টটাকে সামনে রেখে যখন দিগন্ত বিস্তৃত মিছিল হচ্ছিল – সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। তিনি আবার মিছিলটার দিকে তাকালেন। দশজন হবে? গুনতে ইচ্ছে করছে না। যদি না হয়! যে লোকটা ঊনসত্তর পার করে এসেছে – একটা মিছিলে দশটা লোক না হতে দেখা, তার জন্যে কষ্টের। এরাও স্লোগান দিচ্ছে, “শহীদের রক্ত – বৃথা যেতে দেব না।” এদের কেউ কি মরেছে এ ক’দিনে? তিনি সেই খবরও রাখেন নি। রাখার কোন ইচ্ছেও নেই ভাল মত। যে মানুষটা এক বছরে ত্রিশ লাখ মানুষের মরে যাবার খবর পেয়েছে, তার কাছে দু’চার-দশটা মানুষের মরে যাবার খবর গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।

কদম ফোয়ারাকে বেশ খানিকটা পেছনে ফেলে, বাসটা এগোতে থাকে। মিছিলটা এখন বেশ পেছনে। হঠাৎ করেই ইয়াসিন সাহেবের কাছে দু’চার-দশটা লাশের মৃত্যুর একটা অন্যরকম গুরুত্ব ফুটে ওঠে। দু’টো মৃত্যুর মাঝেই তিনি একটা সাদৃশ্য পান। তখন মানুষ মারা গিয়েছিল গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে। এখনও মানুষ মারা যায় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে। এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে কি গণতন্ত্র এতটাই অধরা?

পেছনে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটা সামনে এগোবার চেষ্টা করে। সম্ভবত শাহবাগে নামবে। তিনি এক পাশে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। খুব একটা পেরে ওঠেন না। বাসটা মানুষে গিজগিজ করছে। মেয়েটা একটা বিরক্তির দৃষ্টি দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

হঠাৎ তিনি এখনকার লাশগুলোর সাথে ঊনসত্তরের লাশগুলোর একটা পার্থক্য খুঁজে পান। তখনকার মানুষগুলো মরেছিল স্বৈরাচারীদের হাতে। আর এখন মানুষ মরছে গণতন্ত্রকামীদের হাতে। তখন একটা আসাদ কিংবা একজন জহুরুল হকের লাশ পুরো দেশকে আন্দোলিত করেছে। পৃথিবীতে আসাদই সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি, যে মরে গিয়ে একটা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। আর এখনকার লাশের কথা শুনলে মানুষ আন্দোলনকারীদের মুখেই থুথু ছেটায়। আজ বেয়াল্লিশ বছর পরে আন্দোলন কত অদ্ভুত হয়ে গেছে।

বাসটা শাহবাগ মোড়ে থামে। আরও খানিকটা ধাক্কাধাক্কি চলে। ইয়াসিন সাহেব আরেকবার কপালের ঘাম মোছেন। টিএসসির দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তার হঠাৎ ইচ্ছে করে বাস থেকে নেমে গিয়ে ছবির হাঁটে চলে যেতে। কতদিন ছবির হাঁটে আড্ডা দেয়া হয় না! আবার মনে মনে নিজে নিজেই হেসে ওঠেন। ছবির হাঁটে আড্ডা দেবার বয়স কি আর তার আছে? যৌবনের সাথে সেটাকেও পেছনে ফেলে এসেছেন। আবার মনে হয়, ধুর! আড্ডাই দিতে হবে এমন কোন কথা আছে না’কি? না হয় বসে এক কাপ চা’ই খেলেন। ছবির হাঁটে কোন বুড়ো আড্ডা দিতে পারবে না এমন তো কোন কথা নেই।

তিনি বাসের গেটের দিকে পা বাড়ান।

হঠাৎই একটা তীব্র শব্দ শুনতে পান। বাসের মধ্যে একটা শোরগোল শুরু হয়। সবাই হুটোপুটি করে বাস থেকে নামার চেষ্টা করে। আগুন আগুন বলে একটা হল্লা শোনা যায়। কী ছুড়েছে ওরা? পেট্রোল বোমা? এত সব না ভেবে তিনি বাস থেকে নামার চেষ্টা করেন। পারেন না। ভিড় বড্ড বেশি।

হঠাৎই খেয়াল করেন, তার হাতের ব্যাগটা নেই তার সাথে। তার মাথা ঘুরে ওঠে। ব্যাগের মধ্যে আছে, বিশ হাজার টাকা। ওটা পুড়ে গেলে, ছেলে মেয়ে নিয়ে তিনি পথে বসবেন।

একবার পেছনে ফেরেন। বাসটার পেছন দিকে আগুন ধরানো হয়েছে। সামনে এখনও সেভাবে আগুন লাগে নি। আবার পেছন দিকে পা বাড়ান। “আরে করেন কী!” বলে কিছু কোলাহল শোনা যায়। সেদিকে তিনি ভ্রুক্ষেপ করেন না।

ব্যাগটা চোখে পড়ে না। কেউ কি নিয়ে গেছে? কিন্তু, এর মধ্যে কেই বা কোন ব্যাগের দিকে খেয়াল করবে? হঠাৎ চোখ পড়ে ব্যাগটার দিকে। পায়ের ধাক্কায় পেছনে চলে গেছে। “আল্লাহ রহম করো” বলে তিনি লাফিয়ে পড়েন ব্যাগটার ওপর। তখনই তার ডান পাশের সিটটায় আগুন ধরে যায়। সেখান থেকে তার ডান হাতে। ব্যাগটা দিয়ে ডান হাতে দু’টো বাড়ি দেন। সেখানের আগুন নিভে যায়। কিন্তু, আবার ঘাড়ের কাছে আগুন ধরে যায়। কোথাও ‘মা…’ বলে একটা আর্তনাদ শোনা যায়। তার মনে হয়, শব্দগুলো যেন দিগন্ত থেকে ভেসে আসছে। তারও হঠাৎ করে, তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। এই দেশটাই তো তার মা।ততক্ষণে ইয়াসিন সাহেবের পুরো শরীরে আগুন ধরে গেছে। তিনি বুঝতে পারছেন তিনি মারা যাচ্ছেন। সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে ফুটন্ত তেলের মাঝে ফেলে দিয়েছে।

জীবনে শেষ বারের মত তিনি বলার চেষ্টা করলেন – “জয় বাংলা।” শব্দ দু’টো কেমন যেন অসুস্থ শোনাল!

৭ thoughts on “অসুস্থ!

  1. আপনার ভাষার ব্যবহার আর বাক্য
    আপনার ভাষার ব্যবহার আর বাক্য গঠন অসাধারণ। এই গল্পে ছোটখাটো কিছু অসঙ্গতি থাকলেও সেটা তুচ্ছ হয়ে গেছে লেখার মানের কাছে।

  2. অনেক ভালো
    অনেক ভালো লিখেছেন।

    ——————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————————
    যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিয়োজিত, সেই ইসলাম ধর্মের লোক। তা-সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন।

    যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্ব অ-শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিয়োজিত, সেই অ-ইসলাম ধর্মের লোক। তা-সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। সেরু পাগলার বাণী।।

    সত্য সহায়। গুরুজী।।

  3. আমি আপনার গল্পের একজন বড়
    আমি আপনার গল্পের একজন বড় ভক্ত। তবে এই গল্পটা কেন জানি খুব একটা ভাল লাগে নি। মনে হয়েছে দায়সারা গোছের একটা গল্প লিখলেন। আপনার লেখনীর ভক্ত বলেই সমালোচনাটুকু করলাম। আশা করি কিছু মনে করেন নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *