মেয়াদোত্তীর্ণ

 photo Meyadottirno_zpsb5f0d1ab.jpg

ডাকটা শুনেই থমকে দাঁড়ালাম আমি- দাদুর কন্ঠ যে ! এবং পিছু ফিরে তাকালাম সংগে সংগে- হ্যাঁ, দাদুই, আমার প্রতিবেশী সম্পর্কীয় দাদু বাজে দূর্গাপুর হাইস্কুলের প্রাক্তন বাংলা শিক্ষক জনাব সিদ্দিক আলী, বিএ অনার্স। বার্ধক্যের চামড়ায় মোড়া মুখটা বাড়িয়ে দাদু চেয়ে আছেন আমার দিকে- করুণ চোখ, ঝাপসা দৃষ্টি।

 photo Meyadottirno_zpsb5f0d1ab.jpg

ডাকটা শুনেই থমকে দাঁড়ালাম আমি- দাদুর কন্ঠ যে ! এবং পিছু ফিরে তাকালাম সংগে সংগে- হ্যাঁ, দাদুই, আমার প্রতিবেশী সম্পর্কীয় দাদু বাজে দূর্গাপুর হাইস্কুলের প্রাক্তন বাংলা শিক্ষক জনাব সিদ্দিক আলী, বিএ অনার্স। বার্ধক্যের চামড়ায় মোড়া মুখটা বাড়িয়ে দাদু চেয়ে আছেন আমার দিকে- করুণ চোখ, ঝাপসা দৃষ্টি।
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি, নির্বিকার।
নির্বিকার আমায় দেখে দাদু কেমন নিরাশ হয়ে এলেন। ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘না রে ভাই, তুই যা। চোখে ভালো দেখি নে- সব ঝাপসা। ভাবলাম তুই নিয়ন বোধহয়, তাই ডাকলাম। যা। আমায় মাফ করে দিস্।’
কিন্তু দাদুর সে ঝাপসা দৃষ্টি একটুও ভুল করে নি- আমি নিয়ন। দাদুর সেই নিয়নই- ধীর-মানুষের পথপ্রদর্শক।
দাদু একবার কথায় কথায় হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর নামটা কে রেখেছিলো রে ?’
বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠেই আমি বললাম, ‘তা’ তো জানি নে দাদু।’
দাদু বোধহয় একটু অসন্তুষ্ট হলেন। বললেন, ‘এ কেমন কথা ! তোর নামটা কে রাখলো, কেনো রাখলো- তা’ তুই জানবি নে ? অদ্ভুত তো !’
আমি কিছু বলতে পারলাম না- কেমন একটা অপরাধবোধ কাজ করতে থাকলো ভেতরে। যে নামটা নিয়ে ছোটো থেকে এই বড়ো হলাম, সবার নিকট পরিচিত হলাম, সেই নামটা কে দিয়েছিলো, নামটা ধরে কে প্রথম ডেকেছিলো- এটা জানবার কোনো কৌতুহল আমার হলো না এতোদিন ? এটা অপরাধ বৈ কী ? গুরুতর অপরাধ।
‘নিয়ন আলো চিনিস্ তুই ?’
লজ্জা পাওয়া কণ্ঠে আমি বললাম, ‘না।’
দাদু বললেন, ‘‘নিয়ন আলো হচ্ছে- সোডিয়াম বাতি।’
‘সোডিয়াম বাতি ?’
‘হ্যাঁ, সোডিয়াম বাতি। শহরের ব্যস্ত মানুষের পথপ্রদর্শক। এই বাতি শহরের রাস্তায় রাস্তায় বিদ্যুতের খাম্বায় খাম্বায় লাগানো থাকে। প্রতিদিন সন্ধে নামার সাথে সাথে বাতিগুলো জ্বালানো হয়। শহরের ব্যস্ত মানুষেরা এই আলোয় পথ চিনে ঘরে ফেরে।’
‘ও আচ্ছা।’
‘কিন্তু তোর কাজকর্মের সাথে তোর নামটা ঠিক যায় না। আমি প্রায়ই দেখি তুই তোর বয়সী কারো সাথে মিশিস নে। তুই মিশিস আমার মতো বুড়োদের সাথে, এবং তাদের বিভিন্ন কাজ করে দিস- রাস্তা পার করে দিস, হাত ধরে বাড়ি পৌঁছে দিস। আর বুড়োরা হচ্ছে পিছিয়ে পড়া মানুষ, ধীর-মানুষ। তুই হচ্ছিস্- ধীর-মানুষের পথপ্রদর্শক।’

সেই ধীর-মানুষের পথপ্রদর্শক আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো দাদুর কাছে। কানেও একটু কম শোনেন দাদু, তাই কন্ঠটা উঁচু করতে হলো তাকে- ‘আস্সালামু আলাইকুম, দাদু।’
‘ওয়ালাইকুম-।’ দাদু শুধু এইটুকু জবাব দিয়ে তাঁর সব ক্ষণের কাঁপন লাগা কন্ঠে বললেন, ‘কে ? নিয়ন ?’
‘হ্যাঁ দাদু- নিয়ন। আমি নিয়ন।’
‘এদিকে আয়।’ যে বেঞ্চটাতে দাদু বসা, সেটাতে নিজের পাশে একটু জায়গা দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘আমার কাছে- এই এখানে একটু বোস্।’
আমি বসলাম। এবং জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদু, শরীর কেমন এখন ?’
‘ভালো।’ কথাটা বলে এক মুহূর্তও থামলেন না দাদু, পরপরই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তাঁর কন্ঠ থেকে- ‘হাহ্ দাদু, আর ভালো ! আমাদের, এই আমার মতো বুড়োদের কি আর আর ভালো থাকতে আছে দাদু ?’
কিছু আর বলতে পারলাম না আমি, মনটা খারাপ হয়ে এলো হঠাৎ। কেমন চুপ করে গেলাম আমি তখনই, এবং সেভাবেই বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর দাদুই কথা বললেন প্রথম- ‘দাদু !’
‘বলো দাদু। কি বলছো ?’
প্রার্থনার স্বরে দাদু বললেন, ‘আমায় একটু বাড়ি দিয়ে আয় তো।’
আমি কিছু বললাম না আর- দাদুকে জব্দ করে ধরলাম, বেঞ্চ থেকে উঠোলাম, বাঁ’ হাতে তাঁর লাঠিটা ধরিয়ে দিয়ে অন্য হাতটা গলায় পেঁচিয়ে নিলাম আমার ভালো করে। এবারেও প্রথম কথা বললেন দাদু- ‘নিয়ন !’
‘বলো দাদু।’
‘আমার মতো বুড়োদের আর কখনো সালাম দিবি নে।’
আমি অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, ‘কেনো দাদু ?’
‘ভালো-মন্দও জিজ্ঞেস করবি নে।’
‘কেনো ?’ আবার অবাক হলাম আমি।
‘কারণ-’ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে দাদুর কথায় এবার মন যোগ করলাম আমি- ‘আমাদের এক পা এখন ক্ববরে। আমাদের পা আছে, আমরা চলতে পারি নে। হাত আছে, কিন্তু নেড়েচেড়ে কাজ করতে পারি নে। গাল আছে, অথচ দাঁত নেই, খাদ্যটাও ঠিক মতো চিবোতে পারি নে। কান আছে, তবু কম শুনি। চোখ থাকতেও দেখি না দেখার মতো- ঝাপসা। বড়ো অক্ষম রে দাদু- আমরা বড়ো অচল। আমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয় না রে- হতে নেই।’
একটু থামলেন। তারপর নিজের কথাতেই প্রবোধ খুঁজলেন দাদু। বললেন, ‘এটাই দুনিয়ার নিয়ম।’
হঠাৎ, আমার গলাটা ছেড়ে দিলেন দাদু। পরপরই ধপ্ করে বসে পড়লেন তিনি- সেই বেঞ্চে, সেই স্থানে।
আমি অসম্ভব অবাক হয়ে গেলাম- ‘দাদু !’
দাদু কিছুই বললেন না, মাথাটা নিচু করে নিলেন শুধু।
‘বাড়ি যাবে না দাদু ?’
‘না রে দাদু,’ নিচ করা মুখেই দাদু বললেন, ‘আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না। ওরা একটুও আমায় সহ্য করতে পারে না। আমি সব দিক থেকে অক্ষম। মাঝেমধ্যে মনে হয়- আত্মহত্যা করি। কিন্তু …।’
দাদুর অস্বচ্ছল পরিবারে দাদুর তিনটে মেয়ে, অবিবাহিতা; একটা ছেলে, ছেলের বউ-বাচ্চা; আর দাদুর দ্বিতীয় পক্ষের জোয়ান বউ। আমি জানি, পরিবারের কেউই তাঁকে সহ্য করতে পারে না- তাঁর বউটা, হাতে যা পায়, নিয়ে তেড়ে আসে মারতে, প্রায়ই; মেয়েগুলো অকথ্য গালিগালাজ করে, কারণে, অকারণে; ইত্যাদি ইত্যাদি।
দাদু বসবার পর সেভাবেই আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। হঠাৎ নিচে চোখ চলে গেলো আমার- দাদুর নিচু করা চোখ থেকে টপ্ টপ্ করে ঝরে পড়ছে জল, ভিঁজে যাচ্ছে তাঁর পায়ের কাছের মাটি, …।


কাঁধে বইপত্র ভর্তি ব্যাগ, বুকপকেটে কলম, হাতে টিফিনবক্স- স্কুলে যাচ্ছি আমি। রাস্তার মোড়টা পেরিয়ে সামনে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলাম আমি- সিদ্দিক দাদুর বাড়ি গিজ্ গিজ্ করা মানুষ, চাপা আর্তনাদ। আমি দ্রুত এগোলাম সেদিকে।
ভিড় ঠেলে ঢুকে গেলাম একদম ভিতরে এবং সংগে সংগে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি হতবাক হয়ে- নিথর দেহে পড়ে আছেন দাদুর বউ, রক্তাক্ত তাঁর পুরো মাথা। মাথার পাশেই আধখানা ইট, সেটাও রক্তমাখা। এসবেরই মাঝে, অনেকের কথার মধ্য থেকে আমি শুনতে পেলাম, কেউ একজন বললো, ‘ইটটা মাথার এমন জায়গায় লেগেছে, যে, এক ঘায়ে শেষ। কী এমন দোষ করেছিলো- শুধু একটু বেফাঁস গালিগালাজই যা, এর জন্যে একেবারে শেষ করে দিতে হবে ?’
‘বুড়োটা নাকি চলতে-ফিরতে পারে না !’ আর একজন কেউ বললো। সংগে সংগে আরো একজন বললো, ‘চলতে-ফিরতে পারে না আবার ! খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বুড়োকে- খুন করে পালিয়েছে বুড়ো।’

পরিশিষ্ট
পরদিন ভোরে দাদুকে খুঁজে পাওয়া গেলো- আমাদের পুকুরে সিঁড়ির গোড়ায় ভেসে উঠেছিলো দাদুর মৃত শরীর।

 photo d01955b0f32eb6d6de0ad2fde0bce3003_zps2951deb7.jpg
মেয়াদোত্তীর্ণ । সুপণ শাহরিয়ার
মিস্ত্রীপাড়া, খুলনা

৫ thoughts on “মেয়াদোত্তীর্ণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *