ইতিহাসের পাতায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড…………



বুদ্ধিজীবী অর্থ লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পি, কন্ঠশিল্পি, সকল পর্যায়ের শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারী, চলচ্চিত্র ও নাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সমাজসেবী ও সংস্কৃতিসেবী।

বাংলা একাডেমী কতৃক প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষ গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীদের কে ঠিক এভাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।

১৯৪৭ সালে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে গঠিত হয় পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র।এই রাষ্ট্র মূলত দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা ভূখন্ড নিয়ে গঠিত হয়েছিল।এর একটি ছিল পূর্ব-পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশ আর অন্যটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তান।এই দুটি ভূখন্ডের ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র মূলত পরিচালিত হত পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা।পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙ্গালী বা পূর্বপাকিস্তানিদের সাথে বৈষম্যমূলক আচারন শুরু করে।এর পরিপেক্ষিতে তারা বাঙ্গালীদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানা শুরু করে।তারা জোর করে বাঙ্গালীদের উপর চাপিয়ে দেয় উর্দ ভাষা এবং চেষ্টা করে প্রাণের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নেবার।

এরই ফলশ্রুতিতে বাঙালিদের মনে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে এবং বাঙালিরা এই অবিচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করে।এসব আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীরা।এরাই বাঙ্গালীদের সামাজিক ও সংস্কৃতিকভাবে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।এরাই বাঙ্গালীদের আন্দোলন সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

ফলে শুরু থেকেই বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।এবং পাকিস্তানিরা যুদ্ধের শুরু থেকেই এ সকল বুদ্ধিজীবীদের চিহ্নিত করে হত্যাকান্ড শুরু করে।

এ প্রসঙ্গেশহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে যে যুক্তিটি দেয়া হয়েছে তা প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিযুক্ত :

এটা অবধারিত হয়, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, জাগিয়ে রাখেন তাদের রচনাবলির মাধ্যমে, সাংবাদিকদের কলমের মাধ্যমে, গানের সুরে, শিক্ষালয়ে পাঠদানে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রাজনীতি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সান্নিধ্যে এসে। একটি জাতিকে নিবীর্য করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবী শূন্য করে দেয়া। ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অতর্কিতে, তারপর ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বর ১০ তারিখ হতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রুতগতিতে।

২৫ মার্চরাতে অপারেশন সার্চলাইটেরপরিকল্পনার সাথে একসাথেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানী সেনারা অপারেশন চলাকালীন সময়ে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরঅনেক শিক্ষককে ২৫শে মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়।তবে, পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র কয়েকদিন আগে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা-সামরিক বাহিনী আল-বদর এবং আল-শামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এই সব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়।ধারণা করা হয় পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি।কারণ স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন থেকে তার স্বহস্তে লিখিত ডায়েরী পাওয়া যায় যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়।
এছাড়া আলবদরদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন বলে তার ডায়েরীতে একটি নোট পাওয়া যায়।
এছাড়া তার ডায়েরীতে হেইট ও ডুসপিক নামে দুজন আমেরিকাননাগরিকের কথা পাওয়া যায়। এদের নামের পাশে ইউএসএ এবং ডিজিআইএস লেখা ছিল।এর মধ্যে হেইট ১৯৫৩ সাল থেকে সামরিক গোয়েন্দাবাহিনীতেযুক্ত ছিল এবং ডুসপিক ছিল সিআইএএজেন্ট।এ কারণে সন্দেহ করা হয়ে থাকে, পুরো ঘটনার পরিকল্পনায় সিআইএ’র ভূমিকা ছিলো।

ডিসেম্বরের ৪ তারিখ হতে ঢাকায় নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ হতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নেয়া হতে থাকে। মূলত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার মূল অংশ বাস্তবায়ন হয়। অধ্যাপক, সাংবাদিক, শিল্পী, প্রকৌশলী, লেখক-সহ চিহ্নিত বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরেরা জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। সেদিন প্রায় ২০০ জনের মত বুদ্ধিজীবীদের তাদের বাসা হতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখে কাপড় বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর,নাখালপাড়া,রাজারবাগসহ অন্যান্য আরো অনেক স্থানে অবস্থিত নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের উপর বিভৎস নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে রায়েরবাজারএবং মিরপুর বধ্যভূমিতে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়।
পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পক্ষে এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর তাকে তালিকা প্রস্তুতিতে সহযোগীতা ও হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নের পেছনে ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীকর্তৃক গঠিত কুখ্যাত আল বদরবাহিনী।বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান ঘাতক ছিলেন বদর বাহিনীরচৌধুরী মঈনুদ্দীন(অপারেশন ইন-চার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান(প্রধান জল্লাদ)।১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের নাখালপাড়ার বাড়ি থেকে তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরী উদ্ধার করা হয়, যার দুটি পৃষ্ঠায় প্রায় ২০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়েতাদের কোয়ার্টার নম্বরসহ লেখা ছিল। তার গাড়ির ড্রাইভার মফিজুদ্দিনের দেয়া সাক্ষ্য অনুযায়ী রায়ের বাজারের বিল ও মিরপুরের শিয়ালবাড়ি বদ্ধভূমি হতে বেশ কয়েকজন বুদ্ধজীবীর গলিত লাশ পাওয়া যায় যাদের সে নিজ হাতে গুলি করে মেরেছিল।আর চৌধুরী মঈনুদ্দীন ৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি অবজারভার ভবন হতে বুদ্ধিজীবীদের নাম ঠিকানা রাও ফরমান আলী ও ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমেদকে পৌঁছে দিতেন।
এভাবেই বুদ্ধিজীবীদের পুরো হত্যাকান্ড টি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সংঘটিত হয়েছিল।
বাঙ্গালী জাতি হারিয়েছিল সূর্যসন্তানদের।যাদের জন্য আজ আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।
……….আজ ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।শ্রদ্ধাভরেস্মরণ করছি সেসব সূর্যসন্তানদের।

২৩ thoughts on “ইতিহাসের পাতায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড…………

  1. আপনার লেখাটা যদি কোন
    আপনার লেখাটা যদি কোন দুঃস্বপ্ন হতো তাহলে খুব ভালো হত। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই সব ঘটনাগুলো সত্যি।লেখাটা খুব ভালো হইছে।

    আজ ১৪ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।শ্রদ্ধাভরেস্মরণ করছি সেসব সূর্যসন্তানদের।

  2. ব্যাপার নাহ্ খুব তাড়াতাড়ি
    ব্যাপার নাহ্ খুব তাড়াতাড়ি ওদের আরামের দিন শেষ হবে।

    ……কৃতকর্মের শাস্তি তো ভোগ করতেই হবে। :ক্ষেপছি:

    1. এই আশা এতো তাড়াতাড়ি করতে পারি
      এই আশা এতো তাড়াতাড়ি করতে পারি না, কারন তাদের কাছে নাকি সরাসরি ট্রাইব্যুনাল থেকে কোন চিঠি পাঠনো হয় না।

  3. আমাদের সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের
    আমাদের সেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আমি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে স্মরণ করছি । পোস্টটি লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ।

  4. বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল
    বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল দুই ঘাতককে দেশে এনে অতিসত্ত্বর ঝুলানোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আবেদন জানাচ্ছি। শেখ হাসিনা ছাড়া এই কাজ আর কেউ করবে না বলেই দাবী একটু বেশী।

    1. শেখ হাসিনা ছাড়া এই কাজ আর কেউ

      শেখ হাসিনা ছাড়া এই কাজ আর কেউ করবে না বলেই দাবী একটু বেশী –

      সহমত আতিক ভাই… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    1. অদিতি আপুনি আমরা আসলে অধম
      অদিতি আপুনি আমরা আসলে অধম কিংবা অভাগা নই………

      …….আমরা আসলে অলস আমাদের জাগতে একটু দেরি হয়…….আমাদের প্রতিবাদ গড়ে তুলতে একটু দেরি হয়।

      তবে End of the day আমরা ঠিকই জেগে উঠি।

  5. যতদিন খা..কির পোলা মাইনুদ্দিন
    যতদিন খা..কির পোলা মাইনুদ্দিন আর আস্রাফুজ্জামান যতক্ষণ সদর্পে লন্ডনে আছে, ততক্ষন শান্তি পাচ্ছি না। অবিলম্বে যেভাবেই হোক তাদের দেশে এনে ঝুলিয়ে দিতে হবে… :জলদিকর: :জলদিকর:

    1. ডন দা……….. কিন্তু
      ডন দা……….. কিন্তু চুতিয়াশীল, পশুঅধিকারের রক্ষিতা ব্রিটেন তো বলছে তারা কোন মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামিকে ফিরিয়ে দেবার পক্ষপাতি নই…… :ক্ষেপছি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *