মাগো, তোমাদের স্থান চিলেকোঠায় নয়, তোমরা আছো ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে…

প্রথমেই সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটা শুরু করছি। গতকাল কালের খেয়াতে মুক্তি যুদ্ধকালীন একটা ঘটনা পড়েছিলাম; যেটা পড়ে আমি নিজেই কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কিভাবে আমি আমার মনের ভাষাটা প্রকাশ করবো সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তারপর মায়ের ডাক শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করি। যাহোক, আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো ঘটনাটা ব্লগে প্রকাশ করি। তাই দেরি না করে ঘটনাটার সারসংক্ষেপটা দিয়ে দিলামঃ-

প্রথমেই সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটা শুরু করছি। গতকাল কালের খেয়াতে মুক্তি যুদ্ধকালীন একটা ঘটনা পড়েছিলাম; যেটা পড়ে আমি নিজেই কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কিভাবে আমি আমার মনের ভাষাটা প্রকাশ করবো সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে পানি ঝরছিল। তারপর মায়ের ডাক শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করি। যাহোক, আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো ঘটনাটা ব্লগে প্রকাশ করি। তাই দেরি না করে ঘটনাটার সারসংক্ষেপটা দিয়ে দিলামঃ-
একটা লোক, নাম-ফকিরুদ্দিন। বেশ বড় একটা বাড়িতে চার মেয়ে নিয়ে থাকতো। স্ত্রী মারা যাবার পর তিনিই মেয়েদের বাবা এবং মায়ের দায়িত্ব একসাথে পালন করছিলো। তার চার মেয়ের নাম ছিল- রেহানা, সাবিনা, আবিদা আর রাইজু। মেয়ে চারটি দেখতে খুব সুন্দর ছিল। বড় মেয়েটির বয়স ছিল ১৭ আর সবচেয়ে ছোটটার ছিল ১০। লোকটা তাঁর মেয়েদের খুবই ভালোবাসতো;আর এটাই তো স্বাভাবিক। তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পরপরই একদল হানাদার রাজাকারদের সহায়তায় ঐ লোকটির বাড়িতে হানা দেয়। লোকটি কোন উপায়ন্তর না দেখে মেয়ে চারটিকে বাড়ির চিলেকোঠায় লুকিয়ে রেখে তারপর ঘরের দরজা খুলে দেয়। ঘরে আর কাউকে না দেখে পাকি জারজরা লোকটিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় আর মেয়েগুলো সেই চিলেকোঠাতেই রয়ে যায়। এরপর পুরো নয় মাস লোকটিকে একটা ক্যাম্পে রেখে পাকি হারামিরা নির্যাতন করে। যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা ওনাকে আধমরা অবস্থায় উদ্ধার করে। একটু জ্ঞান হলে লোকটা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় গ্রামে ফিরে আসে। এসে দেখে যে তার বাড়িটা তালাবদ্ধ। উনি ভাবে যে উনার মেয়েরা বুঝি কোথাও চলে গেছে।তারপরও কেন যেন লোকটা ঘরের তালাটা ভেঙে সেই চিলেকোঠায় গেলেন। গিয়ে যেটা দেখলেন সেটা আসলে… উনি দেখলেন তার চারটা মেয়েই আছে এবং একসাথেই। কি ভালো হতো তাই না,মেয়েগুলো যদি তাকে আবারো আগের মতো করে তাকে বাবা ডাকতো!!!
কিন্তু তাঁর একটা মেয়েও বেঁচে ছিল না। পাছে রাজাকাররা তাদের পাকিদের জারজদের হাতে তুলে দেয় সেই ভয়ে মেয়েগুলো চুপ করে ছিল পুরো ৯টি মাস। আর এমনি ভাবে চুপ করে থাকতে থাকতে এক সময় তাঁরা পারি জমায় না ফেরার দেশে। তাঁদের বাবা যখন তাদের দেখতে পায় তখন তাদের শরীরের হাড়গুলো শুধু অবশিষ্ট ছিল। আর হাড়ের সাথে সামান্য মাংস লেগে ছিল।
যতটা সহজে আমি বিষয়টা বর্ণনা করছি একটা বাবার কাছে এটা মোটেই এতোটা সহজ ছিল না।তাইতো লোকটা আজ পর্যন্ত পাগলের মতই বেঁচে আছে। সে ভাবে তার মেয়েরা বেঁচে আছে। তাঁরা রাতের বেলা চিলেকোঠা থেকে নেমে তাঁর সঙ্গে কথা বলে। তার সাথে দেখা করে।
ঘটনাটা পড়ার পর কাল সারারাত ঘুমাতে পারিনি। বার বার সেই চিলেকোঠার কথা মনে হয়েছে। তার সাথে মনে হয়েছে সেই চারটি সরল শুভ্র চেহারা। কেন যেন মনে হচ্ছিলো তারা আমার খুব কাছের। খুব অস্থির লাগছিলো তাই লাইটটা জ্বালিয়ে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসলাম। তারপর হঠাৎ আমার চোখটা কালকের পত্রিকাটার দিকে পরলো। সেখানে কসাই কাদেরের বড় একটা ছবি দেয়া। সেটা দেখে খুবই ঘৃনা লাগলো, একেবারে মনটা কেমন যেন বিতৃষ্ণায় ভরে গেলো। সব রাজাকারদের নোংরা কর্মকাণ্ডগুলোর কথা ভেবে মনটা ভীষণভাবে বিষিয়ে গেলো। আর ঠিক তখনই মনে হতে লাগলো ঐসব মাসদের কথা যারা এই রাজাকারদের ” রাজবন্দী” বলে সম্বোধন করে বলে যে -তারা ক্ষমতায় গেলে সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দেবে। যারা এই রাজাকারদের দোসরদের সাথে আঁতাত করে ক্ষমতায় যেতে চায়। যারা এই রাজাকারদের রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। যারা রাজাকারদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণদের নষ্ট ছেলে-পেলে বলে। যারা কিনা আমাদের এই দেশে অস্তিত্বটাকে মন থেকে কখনোই স্বীকার করে নি আর এখনো করে না।
একটা বিষয় ভেবেও খুব খারাপ লাগলো যে।এতো কিছু দেখার বা শোনার পরও একদল মানুষ আছে যারা এই দেশটাকে পুরো আফগানিস্থান বা তালেবান বানানোর চেষ্টা করছে। আর এরাই মূলত রাজাকারদের আসল দোসর। আরেকদল মানুষ আছে যারা এদের নিরব সমর্থক। প্রতি ৫ বছর পর পর এরা এদের মূল্যবান ভোট দিয়ে ঐ রাজাকারদের দোসরদের ক্ষমতায় আনাবার চেষ্টা করে আর বিগত ২ টার্মে এটা ঘটেছেও। কিন্তু এই লোকগুলো বোধহয় একবারও ভেবে দেখে না যাদের তারা সমর্থন করছে তারা তাদের জন্য বা এই দেশের জন্য কতোটুকু করেছে! আর যতোটুকুই করুকনা কেন তার চেয়ে বেশি দেশের ক্ষতিই করেছে এই রাজাকারের দোসররা। যেটা বিগত কয়েকটা দিন লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। তারপরেও এরা কেমন করে যে এদের সমর্থন করে সেটা আমার বোধগম্য নয়।
যাহোক, এদের কথা লিখতে গেলে অনেক কথাই লেখা যাবে তবে সেদিকে আর যেতে চাচ্ছি না। তাই সেই চারজন মায়ের কথাতেই ফিরে যাচ্ছি। আসলে এদের মা ছাড়া অন্যকিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই মা বলেই সম্বোধন করছি। তাঁদের বাবা যা-ই বলুক না কেন, আমার কাছে মনে হয় এরা কোন চিলেকোঠায় আটকে থাকতে পারে না।তাঁদের স্থান শুধুমাত্র আমাদের হৃদয়ে। তাই সবশেষে তাঁদের সম্পর্কে একটা কথাই বলতে চাই- মাগো, তোমাদের স্থান চিলেকোঠায় না, তোমাদের স্থান ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে…।

১৩ thoughts on “মাগো, তোমাদের স্থান চিলেকোঠায় নয়, তোমরা আছো ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে…

  1. এখন তো শুধু রাজবন্দি হিসাবে
    এখন তো শুধু রাজবন্দি হিসাবে উল্লেখ করেছে………

    …….এরা ক্ষমতায় গেলে আবারও রাজাকারদের মন্ত্রী বানাবে শিউর থাকেন। :ক্ষেপছি:

  2. ঘটনাটি সত্যি বেদনাদায়ক হয়ত
    ঘটনাটি সত্যি বেদনাদায়ক হয়ত কসাইয়ের ফাঁসিতে সেই মায়েদের আত্না কিছুটা হলেও শান্তি পেয়েছে ………

  3. হানাদার আর তাদের সহযোগীরা কত
    হানাদার আর তাদের সহযোগীরা কত নির্মম ছিল, তা কখনো সম্পূর্ণ অনুভব করা যাবে না। আর প্রকৃতির বিচার কতটা স্বচ্ছ হয় তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *