আমি বাবার এক ছেলে ছিলাম। যদি মারা যাই তবুও আমার দেশ চাই। …একজন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার।

প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছেন ?

উ: ঢাকায় যে আক্রমণ হইছিলো, সেইটার কথা বলতে পারমু না। কিন্তু ওই সময় তারা আমাদের এখানেও আক্রমণ চালাইলো। এইটা আমার চাক্ষুষ দেখা। আমাদের বাড়ির পাশে বিহারীরা চলে আসলো। তারপর এখানে খান সেনা আসতে শুরু করলো। আমাদের বাঙালিদের মাইর ধইর শুরু করলো। তারা বললো, আমাদের কথা শুনতে হবে, আমাদের কথা মতো চলতে হবে। আর বিহারীরা আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলো। বিহারীরা বললো, এইটা পাকিস্তান, পাকিস্তানই থাকবে। এ দেশে কোনো ভোটাভুটি হয় নাই। এ দেশে মুজিবুরের কোনো লোক নেই। আমরা যা করবো তাই হবে।


প্র: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ সম্পর্কে আপনি কি শুনেছেন ?

উ: ঢাকায় যে আক্রমণ হইছিলো, সেইটার কথা বলতে পারমু না। কিন্তু ওই সময় তারা আমাদের এখানেও আক্রমণ চালাইলো। এইটা আমার চাক্ষুষ দেখা। আমাদের বাড়ির পাশে বিহারীরা চলে আসলো। তারপর এখানে খান সেনা আসতে শুরু করলো। আমাদের বাঙালিদের মাইর ধইর শুরু করলো। তারা বললো, আমাদের কথা শুনতে হবে, আমাদের কথা মতো চলতে হবে। আর বিহারীরা আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিলো। বিহারীরা বললো, এইটা পাকিস্তান, পাকিস্তানই থাকবে। এ দেশে কোনো ভোটাভুটি হয় নাই। এ দেশে মুজিবুরের কোনো লোক নেই। আমরা যা করবো তাই হবে।

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছিলেন কি ?

উ: খান সেনারা যখন এখানে আক্রমণ করলো তখন ওদের দাবড় টাবড় খাইয়া পালাইয়া গেছি। বাড়িঘর ছেড়ে পালাই গেছি। সৈন্যরা আমাদের বাড়িঘরে লুটতরাজ করে সব কিছু নিয়া গেছে। এরপর আমি ভারতে যাইয়া মুক্তিযোদ্ধাত ভর্তি হলাম। আমি মনে করলাম, দেশের মা-বোনকে বাঁচাতে হবে এবং দেশকে মুক্ত করতে হবে খানদের হাত থেকে। আমি বাবার এক ছেলে ছিলাম। যদি মারা যাই তবুও আমার দেশ চাই। এদের বাঁচাতে আমি জীবন বিসর্জন দেওয়ার জন্য চলে গেলাম মুক্তিযোদ্ধাত। আমাদের এইখানকার এম. পি. ছিলেন ডা: ওয়াকিলউদ্দীন সাহেব। আওয়ামী লীগের এম. পি. ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে সার্টিফিকেট নিলাম আমি। তারপর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আমি ভর্তি হইয়া গেলাম। ট্রেনিং নিয়া আমরা সরাসরি চলে গেলাম হামজাপুর বর্ডার। ঐ সাইড দিয়ে খানপুর বর্ডার যেতাম। ওখান থেকেই আমরা খান সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম।

প্র: আর কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছেন ?

উ: আর যুদ্ধ করছি তরঙ্গপুরের সাইডে আর হামজাপুরের এই সাইডে। এখানে একটা বড় নদী আছে, ভারতের ভিতরে ঐ নদীটা। ঐ নদীতে নৌকা করে আরো সামনে যাইয়ে আমরা বিরলে ঢুকতাম। ওখানে খান সেনাদের সাথে আমাদের একদিন চরম সংঘর্ষ হয়। আমাদের কিছু ছেলে মারা যায় সেখানে। আমিও আক্রান্ত হইছিলাম। কিন্তু কোনো রকমে জীবন বাঁচাইছি।

প্র: যুদ্ধকালের স্মরণীয় কোনো ঘটনার কথা আপনার মনে পড়ে ?

উ: একদিন আমরা বিরল বর্ডারে গেছিলাম রাত ১২টার দিকে। ওখানে যাওয়ার পর ওখানকার কিছু রাজাকার আমাদের সম্পর্কে খান সেনাদের খবর দিছিলো। আমার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা জব্বার আছিলো। তার বাড়ি হচ্ছে মাধবপাড়া। আমরা হাতিয়ার নিয়ে ঢুকে গেছি স্কুলের ওখানে। আমরা তো জানি না যে হঠাৎ করে খানেরা এভাবে চলি আসি আক্রমণ করবে। খান সেনারা আসি আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করলো। তাদের আক্রমণে টিকতে না পারি স্কুলের ওখান থেকে ক্রলিং করে আমরা পালিয়ে আসলাম ভারতের ভিতরে। তার পরের দিন আমরা স্হানীয় একটা ছেলেকে লাগাইয়া দিলাম ঘটনাটা কি ভাবে ঘটলো তার খোঁজ নেওয়ার জন্য। আমাদের সঙ্গে আর্মির এক হাবিলদার সাহেব ছিলো। তার বাড়ি ছিলো ময়মনসিংহ। নাম কবির। তিনি সব সময় আমাদের গাইড করতেন। সেও আমাদের কইছে যেভাবে হোক এইটা পাত্তা লাগাইতে হবে। খোঁজ নিতে নিতে আমরা ঐ রাজাকারকে ধরছিলাম। তাক ধরে আমরা এইপারে নিয়ে আসলাম। হামজাপুর ক্যাম্পে নিয়ে আসার পরে ইন্ডিয়ান অফিসার আমাদের কাছ থাকি তাক নিয়ে নিলো। পরে তার কি হইছে আমরা বলতে পারবো না। আমি আর জানি না। এই ঘটনাটা খুব মনে পড়ে।

প্র: আপনার এলাকায় কখন পাকিস্তানিরা আক্রমণ করলো ?

উ: মনে হয় খান সেনারা ঢাকায় আক্রমণ করার ১০/১২ দিন যেতেই আমাদের এখানে আক্রমণটা শুরু করে। ওরা হঠাৎ করেই রাইফেলের গুলি ফুটাতে ফুটাতে চলে আসে। গাড়িত করে চলে আসে। আমাদের এখানে রাস্তা তখন পাকা ছিলো না। কাঁচা ছিলো। পাক সেনারা আসার পর আমরা গোরস্তানের পাশ দিয়া, ঈদগাও মাঠের সাইড দিয়া পালাইয়া গেলাম। যার যা ছিলো সবাই সব কিছু থুইয়া পালাইয়া গেলাম। এখানে বাচ্চু খান নামে এক প্রতাপশালী বিহারী ছিলো। তখন ওর অর্ডারে এই এলাকার সবকিছু চলতো। ওরা এসে আমাদের বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে সম্পূর্ণ জ্বালাই দিলো। আমরা দর থাইকা দেখি যে আমাদের বাড়িঘরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতেছে।

প্র: পাকিস্তানিরা আপনার এলাকায় আর কি কি করলো ?

উ: আমারই বাড়ির পাশে দুইটা বুড়া ছিলো, তারা পালাইতে পারে নাই। ওই দুইজনকে ওরা ধরে নিয়া গেছে। ওদেরকে ধরে নিয়া যাইয়া বেয়নেট দিয়া খোঁচাইয়া মাইরা ফেলছে। আরেকটা ছেলে ধরা পড়ছিলো এইখানের কলেজের পাশে। ছেলেটার নাম ছিলো নুরুল। তাক খানেরা ধরছিলো। পরে খান সেনারা আমার বাড়ির পাশের আরেক ভাইকে ধরছিলো। ওরা পালাইয়া যায় নাই। ওরা বাড়িতে ছিলো। নাম মোশাররফ। ওদের ধরি নিয়া গেছিলো। তারপর মাইরপিট করি হাত বাইন্দে চোখ তুলি নিছিলো ঐ কাঁঠাল গাছ তলায়। সেই কাঁঠাল গাছ এখনও আছে কলেজে।

প্র: আপনার পরিবারে কেউ শহীদ হয়েছে কি ?
উ: জ্বি না, আমার পরিবারে কেউ শহীদ হয় নাই।

প্র: আপনার এলাকায় কখন থেকে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয় ?

উ: আমার এলাকায় আহমদ নামে এক লোক ছিলো। আমি তাকে মামা করে ডাকি। সে বর্তমানে রিক্সা চালায় খাচ্ছে। একদিন ও আমাকে বললো যে, কি করা যায়, দেশের মধ্যে চরম অরাজকতা শুরু হয়ে গেছে। খান সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে হলে দেশ আজাদ করতে হবে আমাদের। তখন তার সাথে আমি ইন্ডিয়ায় গেলাম। এইটা এপ্রিল মাসের শেষে। তারপর ট্রেনিং নিলাম। আমরা ট্রেনিং নেওয়ার পরই মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়ে গেলো এই এলাকায়।

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কেমন ছিলো ?

উ: খুব ভালো ছিলো। অনেকে আমাদের বলতেন, তোমরা যাও, আমার ছেলেকেও পাঠাবো। আমার ভাতিজাকেও পাঠাবো। খান সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে হলে এদেরকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে হবে যে করেই হোক। রক্তের বিনিময়ে হলেও তাদের হাত থেকে আমাদের এ দেশকে মুক্ত করতে হবে।

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিলো ?

উ: আমার গ্রামের ভিতর রাজাকার ছিলো। রেল লাইনের পাশে কতকগুলো বিহারি ছিলো। তারা সব পাকিস্তানিদের দালাল ছিলো। আর ঐ যার নাম বললাম বাচ্চু খান, ঐ বেডায় ছিলো খুব ক্রিমিন্যাল। আর ছিলো নদীর ঐ পারে ফজলা রহমান চেয়ারম্যান। সে ছিলো রাজাকারের হেড। ফজলা চেয়ারম্যান এলাকার ভিতরে জ্বালাইয়া দিছে সবকিছু। রাজাকার সবার নাম আমার জানা নাই। রাজাকার বেশি ছিলো বিহারীরা। ওদের সঙ্গে তো আমাদের বাঙালিদের সমঙর্ক না থাকার মতোই ছিলো। সে জন্য ওদের নাম তেমন জানি না। যুদ্ধের সময় এখানে বিহারীদের দাপট খুব বেশি ছিলো।

প্র: বাঙালিদের মধ্যে ?

উ: বাঙালিদের মধ্যে এই এলাকায় রাজাকার কম ছিলো। বিহারীরাই এই অঞ্চলে বেশি দাপট দেখাইছে। বাঙালি দুই একজন ছিলো পিস কমিটি আর রাজাকারে। বাঙালিদের মধ্যে ছিলো ফজলা চেয়ারম্যান। ফজলা চেয়ারম্যান মানুষকে দাবড়াইয়া ধরতো। ধইরা নিয়া আইসা মাইরা ফেলাইতো।

প্র: এই সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরা হয়েছিলো কি ?
উ: এদের ধরা হয় নাই। এরা আত্মগোপন করেছিলো। কোথায় ছিলো জানি না। ধরা পড়ে নাই এরা।

প্র: যুদ্ধের শেষে ফিরে এসে আপনার এলাকার কি অবস্হা দেখলেন ? এলাকার স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ, ব্রিজ, বাড়িঘর- এগুলোর অবস্হা কেমন দেখলেন ?

উ: এখানে আইসা দেখি যে বাড়িঘর কিছু নাই। সব তো ওরা লুটতরাজ করি নিয়া গেছে। টিন টুন যা ছিলো সব নিয়া গেছে। শুধু আমার নয় প্রত্যেকের। গ্রাম ছাফ করে তারা সবকিছু নিয়া গেছে। লুট করার পর বাড়িঘরে আগুন দিছে। ঘরের মাটির দেওয়ালের মাটি শুধু এইখানে পাওয়া গেছে। স্কুল ভাঙা, স্কুলের টিন ফুটো, গুলি লাইগা ছিদ্র-ভিদ্র হয়ে গেছে। ব্রিজ কালভার্ট এইগুলাতো সব উড়ানো। ব্রিজ ওরাও ভাঙছে। আমাদের হাতেও আক্রান হইছে। ব্রিজ, কালভার্ট কার্যক্ষেত্রে আমাদেরও উড়াইয়া দিতে হইছে।

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন ?
উ: আমার অস্ত্র তো দিনাজপুরেই আমরা জমা দিয়া দিছি।

প্র: আপনি কত নম্বর সেক্টরে ছিলেন ?
উ: সেভেন সেক্টরে। আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান।

নাম : মুক্তিযোদ্ধা চান আলী, দিনাজপুর। ১৯৭১ সালে বয়স : ১৭
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আবদুল কাইয়ুম-১৯৯৬

৫ thoughts on “আমি বাবার এক ছেলে ছিলাম। যদি মারা যাই তবুও আমার দেশ চাই। …একজন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার।

  1. খুব খুব খুবই ভালো লাগলো~একজন
    :salute:
    খুব খুব খুবই ভালো লাগলো~একজন গণযোদ্ধার মুখে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথাগুলো জেনে…
    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া, ওনার বক্তব্য আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
    :ফুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *