আবার যুদ্ধে যাব

একটা সুন্দর যুগের সুচনা হয়েছিল, যে যুগ একটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছিল। মানুষের আয় বেড়েছিল, বিদেশে জনশক্তি রপ্তানী উত্তরোত্তর বাড়ছিল যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছিল রেমিটেন্স প্রবাহ; গার্মেন্টস রপ্তানীতে বিশ্বের একনম্বর রপ্তানীকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান ছিল সময়ের ব্যাপার। বিদ্যুত উৎপাদন দশ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছিল। রিজার্ভ দাড়িয়েছিল সতেরো বিলিয়ন ডলার। জিডিপি ছিল ছয়ের উপর। পার কেপিটা ইনকাম ১০৫০ ডলার। ত্রিশ লাখ টন খাদ্যশষ্য ঘাটতির বাংলাদেশ হয়েছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ণ। ঢাকায় চালু হয়েছিল বাংলাদেশের বৃহত পানগাও নৌ টার্মিনাল যেখানে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য আমদানী রপ্তানী হয়েছিল সহজতর। সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির কারণে বঙ্গপোসাগরে তেল ও সমুদ্রসম্পদ আহরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা; প্রবেশ করেছিলাম ডিজিটাল যুগে। ভারতে সাথে অমীমাংসিত সীমান্ত চুক্তি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। বিশ্বের প্রতিটি অর্থনৈতিক জরীপকারী প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের চিত্র।

আমাদের সমৃদ্ধি আমাদের দিয়েছিল স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আর তাই সম্পন্ন হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। বাংগালীর ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় হত্যাকান্ড, নারী ধর্ষণকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রায় সম্পুর্ণ হয়েছিল এই সরকারের আমলে। এই বিচারে বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাড়িয়েছিল অনেক দেশ, যারা একসময় আমাদের মিসকিন আর তলাহীন ঝুড়ি হিসেবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতো আর তাদের আজ্ঞাবহ হিসেবে আমাদের দেখতো। আরেক দেশ ছিল পাকিস্থান, যাদের ভাষায় বাংগালীরা হচ্ছে কালো, বেঁটে আর দুর্বল জাতি আর তারা হচ্ছে ফর্সা, লম্বা আর শক্তিশালী; তারা ভাবতো আমাদের শাষণ করা তাদের জন্মগত অধিকার।

রিক্সায় ব্যাটারী লাগিয়ে রাস্তার মাঝে চালালে যেমনটা মোটর যানের ভাল লাগেনা, ভাবে একটু চাপিয়ে দিই, তেমনটাই আমাদের অর্থনীতিতে ব্যাটারী সংযোজন অনেকের ভাল লাগেনি। তাতে কিছু যেত আসতো না, কিন্ত আমাদেরই দেশে জন্ম গ্রহণকারী কিছু মুর্খ অর্বাচীনকে তারা নিয়োগ করেছিল আমাদের গার্মেন্টসে আগুন দিয়ে ধবংশ করার জন্য। পদ্মা সেতু নির্মিত হলে আমাদের জিডিপি আট শতাংশে পৌছে যেত; দুর্নীতির কথা বলে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিল বিশ্বব্যাঙ্ক, অথচ পদ্মা সেতুতে তাদের কোন অর্থায়ন তখনো পর্যন্ত শুরুই হয়নি। কানাডার তদন্তে ততকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর নামই আসেনি অথচ তারপরেও বিশ্বব্যাংক এগিয়ে আসেনি পুনঃঅর্থায়নে। ডঃ ইউনুসকে গ্রামীন ব্যাংকে ফিরিয়ে আনতে মার্কিন নির্দেশ প্রতিপালনে অস্বীকার করায় এই শাস্তি দেয়া হয়েছে, এই কথা এখন পরিষ্কার।

এত কিছুর পরেও কোন কিছুতেই বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখা যাচ্ছিলনা। তাই সর্বশেষ অস্ত্রের প্রয়োগ হল, সে অস্ত্র হল রাজনৈতিক অস্থিরতা। নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির তথাকথিত আপোষহীনতা এক গুঢ় রাজনৈতিক চক্রান্তের ফসল। এর সাথে কোনক্রমেই জনগনের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন জড়িত নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে বিএনপি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয় দেখতে চাচ্ছে। এই বিরোধের সুচনা থেকেই বিএনপি কোন সুচিন্তিত ফরমুলা নিয়ে এগিয়ে আসে নি। তাড়াহুড়া করে তারা একবার এক অবাস্তব ফরমুলা দেয়, যে ফরমুলায় সাবেক দুই তত্তাবধায়ক সরকারের পাচজন করে মোট দশ সদস্য বিশিষ্ট তত্তাবধায়ক সরকারের প্রস্তাব দেয় যাদের বেশীরভাগই হয় মৃত্যুবরণ করেছে, নয়তো বার্ধক্যজনিত কারণে দায়িত্বপালনে অস্বীকার করেছে। এর বাইরে তাদের আর কোন ফরমুলা ছিল না। শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে তারা সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে একটা মেসেজ পাঠাতে চায়, আর তা হল, আওয়ামী লীগ শেষ, এখন তোমরা আমাদের হয়ে কাজ কর; একই সাথে তারা সারা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী আর সঙ্খ্যালঘূদের উপর হামলা চালাবে, যার অগ্রপথিক থাকবে ৭১ এর ঘাতক জামাত শিবিরীয় পিশাচের সন্তানেরা। সুতারাং নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হল তা নিয়ে বিএনপি-জামাতের মাথাব্যাথা নেই, তাদের মুল চাওয়া আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদায় করা যাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আর সাধারণ জনতা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, আর প্রশাষণ বিএনপি-জামাতের পক্ষে ঝুকে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক সরকারের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিন-তিনবার দেশ শাষণকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অবশ্যই চাইছে আবার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসতে এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত শেখ হাসিনা এ কথা ভাল করেই জানেন যে পর্দার অন্তরালে আমেরিকা-বিশ্বব্যাঙ্ক আর মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থনপুষ্ট একটা চক্র তত্তাবধায়কের শুন্যতার সময় শাষণ ক্ষমতা দখলের জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছে। শেখ হাসিনার কাছে ফরমুলা এক যদি হয় ক্ষমতায় যাওয়া, তবে ফরমুলা দুই হল ক্ষমতায় না এলেও যেন রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে কোন অপশক্তি ক্ষমতায় না আসে এবং গণতান্ত্রিক ধারা যেন অব্যাহত থাকে। সে ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে থেকে মন্ত্রী নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠণ করতে চান বা চেয়েছিলেন, এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় দিতে চেয়েছিলেন বিএনপিকে। এক ধরণের টক শোওয়ালার বলছেন সকল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতএব বিএনপিকে পঞ্চাশটা মন্ত্রীত্ব দিলেও কোন ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরী হবেনা। এই বক্তব্য হাস্যকর, কারণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের কর্মকর্তারা যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কথা শুনবেন না, তখন তা মিডিয়ার জন্য অবশ্যই একটা বড় খবর হয়ে আসবে, এবং গণতান্ত্রিক সমাজে মিডিয়াই সবচাইতে বড় চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স হিসেবে কাজ করে।

গত কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় জামাত-শিবির সোশাল মিডিয়া, লিফলেট এবং অনেক মসজিদের ইমাম-মুয়াযযিনের মাধ্যমে হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসুচী নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়েছিল। গ্রামে-গঞ্জে তারা এই কথাটা ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, মতিঝিলে হেফাজতের কর্মসুচীতে হাজার হাজার মুসলমানকে গুলী করে মেরে ফেলা হয়েছে। এর প্রভাব সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পড়েছিল। কিন্ত গত তিন মাসে আওয়ামী লীগ আবার ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে, তারা প্রমান করতে পেরেছে যে জামাত শিবিরের এই প্রচারণা সর্বৈব মিথ্যা। অধিকার নামে একটি তথাকথিত মানবাধিকার সঙ্ঘঠন যারা মুলত জামাতের প্রচারণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছিল তাদের কাছে যখন তথাকথিত নিহত হেফাজত কর্মীদের তালিকা চাওয়া হয় তখন তা দিতে তারা স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থ হয়। গত তিন মাসে আওয়ামি লীগ তার সুচিত সাফল্যগাথা জনসমক্ষে ব্যপকভাবে প্রচার করে, যে কারণে সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে দেখা যায় যে, আওয়ামী লীগ এগিয়ে আছে। এই কারণে বিএনপি ভাল করেই বুঝতে পেরেছে যে, শেখ হাসিনার অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা অনেক বেশী। তাই প্রশাষণকে এই মেসেজ দেয়া জরুরী যে, শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছে, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী-সমর্থকদের এই ধারণা দিতে হবে যে, তোমরা প্রাণ নিয়ে ঘরে বসে থাক, এবং নিজেদের কর্মী সমর্থকদের উজ্জীবিত করা যে, আমরা ক্ষমতায় আসছি।

আওয়ামী লীগকে অপছন্দ করে কিন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় যারা তারাও অস্বীকার করতে পারবেনা যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একমাত্র শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের পক্ষেই করা সম্ভব, আর কারো পক্ষেই নয়। তারা এও ভাল করেই জানেন যে, বিএনপি তার জোটগত আন্দোলন, বক্তিতা-বিবৃতির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেছে, সুতরাং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল হবে; সবাই এও জানে বিচারের রায় যাই হোক, কাদের মোল্লা, নিজামী আর সাকা চৌধুরীরা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, সুতরাং বিচারের স্বচ্ছতার কথা বলে বিএনপি তার যুদ্ধপরাধীদের পক্ষে অবস্থানকে ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করছে।

শুরুতে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের উন্নয়নের একটা খতিয়ান দিয়ে বলেছিলাম বিশ্বসভায় আমরা যে সম্মানের আসনে আসীন হয়েছিলাম তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের হাত ধরে আপামর জনসাধারণের কঠোর পরিশ্রমে এসেছে আর আবাধ নির্বাচনের নামে জামাত-শিবিরের হত্যা সন্ত্রাস বাংলাদেশ বিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্র । মুক্তিযোদ্ধা জনতা যুদ্ধ শেষ হয়েছে মনে করলেও, জামাত-শিবিরের যুদ্ধ কিন্ত এখনও চলছে। বাংলাদেশের লাখো মানুষকে হত্যা, লাখো নারীকে ধর্ষঙ্কারীদের যারা সমর্থন করে তাদের প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন করারা অধিকারই নেই। সাধারণ মানুষের গায়ে গান পাওডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে তাঁদের পরিশ্রমের স্বদেশকে ধ্বংস হতে দেখবেন নাকি সব বিচার বিশ্লেষণ করে আবার মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বেন, এই সিদ্ধান্ত অসঙ্ঘঠিত জনতার।

১৪ thoughts on “আবার যুদ্ধে যাব

  1. অনেক ভাল একটা লিখা যদিও আমরা
    অনেক ভাল একটা লিখা যদিও আমরা সচরাচর এই কথা গুলো বলে থাকি …… শিরোনামটা দেখে মনে করলাম আমার কবিতা কপি করছেন কারণ একি নামে আমার একটা কবিতা দেওয়া আছে আর আপনার আথে গলা মিলিয়ে বলতে পারি…………

    আবার আমরা যুদ্ধে যাবো আজ করেছি পণ,
    শক্ত হাতে লড়ে যাবো আসুক মহামরণ :থাম্বসআপ:

    1. আপনার কবিতাটা পড়ার ইচ্ছা
      আপনার কবিতাটা পড়ার ইচ্ছা রইলো। আপনার কবিতার শিরোনাম চৌদ্দ কোটি বাংগালীর রক্তে লেখা নাম. ধন্যবাদ

      1. কবিতাটা দেওয়া আছে আমার প্রিয়
        কবিতাটা দেওয়া আছে আমার প্রিয় তালিকায় গেলে পাবেন পড়ার অনুরোধ থাকলো …… :বুখেআয়বাবুল:

    1. আসলে কখন কোন পোষ্টটা দেই মনে
      আসলে কখন কোন পোষ্টটা দেই মনে রাখতে পারিনা তায় সবগুলোকেয় প্রিয়তে নিয়ে রাখি রাজু দা ……… 😀

      1. এভাবে প্রিয়তে নিতে নিতে আপনি
        এভাবে প্রিয়তে নিতে নিতে আপনি একদিন বিশ্বপ্রিয়াতে পরিনত হবেন।সেই দিনে আমি আপনাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানাবো। :গোলাপ: 😀

  2. হেফাজতের অপপ্রচারের জবাব
    হেফাজতের অপপ্রচারের জবাব আওয়ামীলীগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে,
    আমরা যারা অনলাইনে, সংবাদপত্রে নিয়িমিত নজর রাখি, তারা হয়তো জানি আসলে কত মানুষ মতিঝিলে মারা গেছে।
    কিন্তু গ্রামের মানুষের কথা শুনলে মাথাই নষ্ট হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *