বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার – প্রথম পর্ব


৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই ছোট্ট দেশটি পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিতে এক সাগর পরিমান রক্ত দিতে হয়েছিলো। এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভিতরে আজ যারা বসবাস করে তারা সবাই কিন্তু এই দেশটা চাইনি, ৭১’এ তারা এই দেশের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে ছিলো। তারা ছিলো স্বাধীনতাবিরোধী। আর সেই স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরা দেশব্যাপী চালিয়েছে গণহত্যা, গণ ধর্ষন, লুটপাট , মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে আগুন , হিন্দু বাড়িতে আগুন এবং মানবতাবিরোধী আরো অনেক কাজ। তারা ভেবেছিলো এসব করে দেশকে স্বাধীন হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবে, আর আমরা আজীবন অধিকারবঞ্চিত পরাধীন জাতি হয়েই থাকবো। কিন্তু মিথ্যার কাছে সত্যের জয় যে অনিবার্য তা হয়তো তারা জানতো না। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এই বাঙ্গালীরা যখন আন্দোলন সংগ্রামে নেমেছে তখনই তাদের বিজয় হয়েছে। প্রত্যেকটি বিজয় এমনি এমনি আসে নি, তার বিনিময়ে দিতে হয়েছে বুকের তাজা রক্ত, হারাতে হয়েছে অনেক সুর্য সন্তানদের। সেই সুর্যসন্তান্দের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে হলে অত্যন্ত তাদের খুনিদের বিচার করা দরকার। বিচার করা দরকার গণহত্যাকারীদের । যুদ্ধাপরাধের।

যুদ্ধাপরাধ মানবতাবিরোধী অপরাধ। যুদ্ধাপরাধীরা জাতির দেহে মারাত্মক ক্যান্সার। বিষবৃক্ষ। এরা কখনই পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে পারে না। পরাজয়ের প্রতিশোধ ষড়যন্ত্রে তারা ধারাবাহিকভাবে নানা অপরাধের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। স্বাধীনতা, গনতন্ত্র, শোষনমুক্তি, সাম্যবাদসহ প্রগতির অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে যারা বলপ্রয়োগ করে মানুষকে নির্যাতন করে, সশস্র হামলা চালিয়ে খুন জখম করে, অগ্নিসংযোগ, নারী নির্যাতন ও গণহত্যা চালায় তাঁরা স্বাধীনতার, সভ্যতা, ও মানবতার দুশমন। যুদ্ধাপরাধ ব্যক্তিগত পর্যায়ের লোভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, সম্পত্তি, স্বার্থজনিত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। একটি সাধারণ ক্রিমিনাল ফৌজদারী অপরাধ এক বা একাদিক ব্যক্তি, পরিবার বা ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীকে শারীরিক-মানসিক বা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ একটি জাতি, জনগোষ্ঠী, মানবসভ্যতাকে হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করায়। সঙ্গত কারনেই ব্যক্তি পর্যায়ের সাধারণ অপরাধের শাস্তি, অপরাধ নিয়ন্ত্রন ও সতর্কতাবৃদ্ধি আক্রান্তদের স্বস্তি যোগায়। আর যুদ্ধাপরাধের শাস্তি উক্ত বিষয়ের পাশাপাশি শাস্তি, প্রগতি, সাম্য ও সভ্যতা রক্ষা, তার অগ্রযাত্রার রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টিকে দেখা দরকার।

যুদ্ধাপরাধ কি?
যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে কোন যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত চলাকালীন সময়ে কোন ব্যক্তি কর্তৃক বেসরকারী জনগনের বিরুদ্ধে সংগঠিত, সমর্থিত নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়িত অপরাধ কর্মকান্ডসমূহ। আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে যুদ্ধ কালিন সংঘাতের সময় বেসরকারী জনগনকে খুন, লুন্ঠন, ধর্ষণ, কারাগারে অন্তরীন ব্যক্তিকে হত্যা, নগর, বন্দর, হাসপাতাল কোন ধরনের সামরিক উস্কানি ছাড়াই ধ্বংস প্রভৃতি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনে অনুচ্ছেদে যুদ্ধাপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যে, “ইচ্ছাকৃত হত্যা, অত্যাচার অথবা অমানবিক আচরণ যেমন ইচ্ছাকৃত ভাবে শারীরিক আঘাত, আইনবিরোধী ভাবে কাউকে বন্দী করা অথবা জোরপূর্বক কোন ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর কাজে নিয়োজিত করা অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে মানবাধিকার লংঘন করা, কোন রকম কারণ দর্শানো ছাড়াই এবং অবৈধভাবে কারো সম্পদের বৃহৎ ক্ষতি সাধন অথবা অপব্যবহার করা ”

যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে কঠিন কাজ হচ্ছে প্রামাণ্য তথ্যচিত্র সংগ্রহ করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তথ্যের উৎস হতে পারে প্রত্যক্ষদর্শী, সে সময়কার দেশী বিদেশী সাংবাদিক, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বিশেষ বুলেটিন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আর্কাইভে সংরক্ষিত তথ্য, কূটনীতিকসহ বিভিন্ন মহল। অন্য আর দশটা সাধারণ মামলার মতো এই মামলার বিচার করলে বিচার কার্যক্রমে কোন ফল পাওয়া যাবে না। আর অপরাধীদের বিরুদ্ধে তথ্যচিত্র পাওয়া না গেলে কার্যকর বিচার হবে না, তা কেবল শো করা হবে। আর তদন্ত কার্যক্রম খুব সহজ কোন কাজ নয়। আর প্রায় চার দশক পর কোন ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম সঙ্গত কারণেই আরও জটিল। গোটা বিচার প্রক্রিয়া নির্ভর করবে প্রামাণ্য তথ্যচিত্র কিভাবে উপস্থাপন করা হলো এবং এই তথ্যচিত্রের সত্যতা কতটুকু। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আইনী লড়াই যুক্তি তর্কে টিকতে হলে সেভাবেই তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি মামলায় অভিযোগ না তুলে ভিন্ন ভিন্ন মামলায় অভিযোগ আনতে হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন তদন্ত কার্যক্রম চালাতে হয়। আমাদের ট্রাইব্যুনালে তদন্ত কর্মকর্তাগন এই বিষয়ে সফল ভাবে বিচারের তদন্ত করেছে। যার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের অনেক নির্মম কাহিনী উঠে এসেছে।

যুদ্ধাপরাধী কারা?
জমায়াত ইসলাম, নেজামে ইসলাম,মুসলীম লিগ এবং এদের নিয়ন্ত্রিত রাজাকার, আল বদর, আল সামশ, শান্তি কমিটি। এরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বিচারে হত্যা, গণধর্ষন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি সংগঠিত করেছিলো। এই রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর প্রধান নেতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঘাতক গোলাম আযম। আর মতিউর রহমান নিজামিকে আলবদর বাহিনী গঠিত হয়েছিল। আলবদর সম্পর্কে ১৪ সেপ্টেম্বর ৭১ জামায়াতের পত্রিকা ‘দৈনিক সংরাম’ লেখা হয়েছিল, “আলবদর একটি নাম! একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা! যেখানে ততাকথিত মুক্তিবাহিনী, আলবদর সেখানেই। যেখানে দুষ্কৃতিকারী (মুক্তিযুদ্ধা) আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতিকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল” অথচ ইসলামের ইতিহাসে আলবদর মানে ছিল ধর্মের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে অংশগ্রহণকারী এক বাহিনী। আর আমরা দেখি নিজামির নেতৃত্বে ৭১ আলবদর বাহিনীর কাজ ছিলো খুন, ধর্ষন, লুটপাটে অংশ নেয়া।

একজন পাকিস্তানি আর্মি অফিসারের ভাষ্য; সরকার ইতিমধ্যে পরিকল্পনামাফিক ৩৫,০০০ এর মধ্যে ২২,০০০ রাজাকার নিয়োজিত করেছে । [নিউ ইয়র্ক টাইমস, জুলাই ৩০, ১৯৭১]

এক নজরে :৭১ –এ স্বাধীনতা বিরোধী চক্র

সাধারণ আর্মি – ৮০,০০০
র‍্যাঞ্জার এবং মিলিশিয়া – ২৪,০০০
সিভিলিয়ান ফোর্স – ২৪,০০০
রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামস – ৫০,০০০ (প্রায়)

স্থানীয় সহযোগী

শান্তি কমিটি
স্থাপিত : এপ্রিল ১৯৭১
আহ্বায়ক – খাজা খায়রুদ্দিন
ব্যবস্থাপক – গোলাম আযম, এ.কিউ.এম. শফিকুল ইসলাম, মওলানা সৈয়দ মাসুম

রাজাকার
স্থাপিত : মে ১৯৭১ (খুলনা)
ঘোষিত : জুন ১৯৭১
আহ্বায়ক : এ.কে.এম. ইউসূফ
পরিচালক : এ.এস.এম জহিরুল হক

আল-বদর, আল-শামস
ইসলামিক ছাত্র সংঘের(বর্তমানে ছাত্র শিবির) সদস্যবৃন্দদের সমন্বয়ে, পাক বাহিনী সাথে জড়িত জামায়াত ইসলামীর খুনী দল- হিটলারের এস.এস. (SS of Hitler ) অনুরূপ । বর্তমান যুদ্ধাপরাধের মামলায় বিচারাধীন নিজামি, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আজহার তৎকালীন ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন।

যুদ্ধাপরাধীর ক্যটাগরি?
যুদ্ধাপরাধের সাথে যারা যুক্ত অর্থাৎ (খুন, ধর্ষন, লুটপাট) সবাই একি কাজে যুক্ত ছিলেন না। কেউ নেতৃত্ব দিয়েছেন আবার কেউ বা সরাসরি ঐ কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনটি ক্যটাগরিতে এদের ভাগ করা যায়। যেমনঃ
এক. রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী; শীর্ষ স্থানীয় যুদ্ধাপরাধী।
দুই. পরের স্তরের সহযোগী; যাদের নেতৃত্বে রাজাকার-আলবদর-শান্তি কমটি গঠিত হয়েছিল।
তিন. মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকারী; যারা হত্যা-লুট-ধর্ষনের সাথে যুক্ত।

আমরা একটা লালসবুজের পতাকা পেয়েছি, একটি সোনার দেশ পেয়েছি। আর হারিয়েছি কত সোনার ছেলেদেরকে। সেই সোনার ছেলেদের হত্যাকারীদের বিচারের দাবী করা ৪০ বছর না ৪০০ বছর পরও প্রাসঙ্গিক। আজ তাদের বিচার চলছে। আমরা আশাবাদী সকল অপরাধীর বিচার শেষ হবে। আমার এই লেখার অনেক কিছুই হয়তো সবার জানা। তবুও প্রশ্ন করবেন তাহলে কেন লিখলেন? আগে আমরা ডাইরি লিখতাম তা হয়তো এখন আর লিখা হয় না, তাই আমার নিজের সংরক্ষনের জন্য হলেও এসব স্মৃতিবিজড়িত কাহিনী না লিখলেই নয়। তাই আমার এই সিরিজ। আমি এই সিরিজে নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ ১৯৭২, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩, সাধারণ ক্ষমা নিয়ে বিতর্ক এবং বর্তমান যেই দুই ট্রাইব্যুনালের মাধম্যে বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-২ । সে সম্পর্কে কিছু কথা এখানে লিপিবদ্ধ করবো।

চলবে….

তথ্যসুত্রঃ
১। http://www.bangladesh-71.info/index.php?option=com_content&view=article&id=89:2010-01-21-10-54-29&catid=40:2010-06-21-21-25-11&Itemid=57
২। উইকিপিডিয়া
৩। ব্লগ

৮ thoughts on “বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার – প্রথম পর্ব

  1. এতদিন ধরে লিখালিখি করি এখনো
    এতদিন ধরে লিখালিখি করি এখনো ছবি এ্যাড করতে পারিনা :কানতেছি: কেউ কি বলবেন ছবি এ্যাড করার সহজ উপায় কোনটা তারে একখান :ভালুবাশি: দিমু আর এ সংজ্ঞাটা জানা ছিলোনা

    “ইচ্ছাকৃত হত্যা, অত্যাচার অথবা অমানবিক আচরণ যেমন ইচ্ছাকৃত ভাবে শারীরিক আঘাত, আইনবিরোধী ভাবে কাউকে বন্দী করা অথবা জোরপূর্বক কোন ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর কাজে নিয়োজিত করা অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে মানবাধিকার লংঘন করা, কোন রকম কারণ দর্শানো ছাড়াই এবং অবৈধভাবে কারো সম্পদের বৃহৎ ক্ষতি সাধন অথবা অপব্যবহার করা ” –

    ধন্যবাদ ……

  2. চমৎকার একটা কাজ শুরু করেছেন
    চমৎকার একটা কাজ শুরু করেছেন ভাই… :মাথানষ্ট: :মাথানষ্ট: চালিয়ে যান… :থাম্বসআপ: অনেক কিছু জানতে পারছি… :বুখেআয়বাবুল: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :গোলাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *