নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া


আজ ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবস। নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার ১৩৩ জন্ম ও ৮১তম মৃত্যুবার্ষিকী। নারীকে শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের পথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাজধানী ও বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান রংপুরের পায়রাবন্দে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান আজ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে। দিবসের প্রধান আয়োজন রোকেয়া পদক প্রদান করা হবে নগরীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। প্রধনমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (ডিসেম্বর ৯, ১৮৮০- ডিসেম্বর ৯, ১৯৩২)

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন খ্যাতিমান বাঙালি সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তাঁকে বাঙ্গালী নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে গণ্য করা হয়। রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে। তাঁর পিতা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের সম্ভ্রান্ত ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকেয়ার দুই বোন করিমুননেসা ও হুমায়রা, আর তিন ভাই যাদের একজন শৈশবে মারা যায়। বেগম রোকেয়ার জন্মলগ্নে মুসলমান সমাজ ছিল নানাবিধ কুসংস্কারে আকন্ঠ নিমজ্জিত । বেগম রোকেয়ার পরিবারে পর্দা প্রথার এতই কড়াকড়ি ছিল যে, আত্মীয় পুরুষ তো দূরের কথা বহিরাগত মহিলাদের সামনেও সাবের পরিবারের মেয়েদের পর্দা করতে হতো । নারী শিক্ষার সুযোগ বলতে ছিল শুধুমাত্র কোরান তেলাওয়াত শিক্ষা ও উর্দু শিক্ষা । বাংলা বর্ণ পরিচয় ছিল নিষিদ্ধ । স্কুল কলেজের আঙিনায় পা বাড়ানোর সৌভাগ্য বেগম রোকেয়ার হয়নি ।

বেগম রোকেয়ার বড় ভাই ইবরাহীম সাবের ১৮৮৫ সালে বি,এ পাশ করেন । তিনি একজন প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন । তিনিই বোন রোকেয়া ও করিমুন্নেসাকে বাবার অগোচরে মোমের আলোয় বর্ণ পরিচয় থেকে শুরু করে লেখাপড়া শেখান । প্রিয় পাঠক একবার চিন্তা করুন বাবার অজান্তে চুপিসারে ছোট রোকেয়ার জন্য বর্ণ পরিচয় শেখা কি পরিমাণ কঠিন কাজ ছিল । সম্ভবতঃ এ থেকেই মুসলমান নারী সমাজকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখার মত অযৌক্তিক ও নির্মম সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়ার মনে জন্ম নেয় প্রচন্ড বিদ্রোহ । ১৮৯৬ সালে ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যজিষ্ট্রেট খান বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় । বিপত্নীক এবং উর্দুভাষী সাখাওয়াত হোসেন আর একজন প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন । তিনি বেগম রোকেয়ার বাংলা ও ইংরেজী শিক্ষার প্রতি অকুন্ঠ সমর্থন, লেখালেখিতে উৎসাহ, একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সঞ্চয় ও নারী শিক্ষার প্রসারে সবধরনের সহযোগীতা প্রদান করেন । বেগম রোকেয়া ১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ বাংলা গল্প লিখে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেন । ১৯০৫ সালে বেগম রোকেয়া ইংরেজীতে Sultana’s Dream লেখা শেষ করেন । সাখাওয়াত হোসেন লেখাটি পরে প্রচন্ড অভিভূত হন এবং লেখাটি প্রকাশের জন্য রোকেয়াকে উৎসাহিত করেন । ১৯০৮ সালে Sultana’s Dream বই আকারে প্রকাশ হয় । পরবর্তীতে বইটি বাংলায় প্রকাশিত হয় । দুঃখের বিষয় বিয়ের মাত্র তের বছর পরে ১৯০৯ সালে বেগম রোকেয়ার স্বামী ইন্তেকাল করেন । তিনি এতে অবদমিত না হয়ে ‘নারী শিক্ষার প্রসার ছাড়া নারীসমাজের মুক্তি নাই এবং সমাজের কোনও আশা নাই’ এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী থেকে সমাজের প্রবল বাধা উপেক্ষা করে নিগৃহীত নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন চালিয়ে যান । সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পাঁচ মাস পরে তিনি ভাগলপুরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । এই স্কুলটি ১৯১১ সালে কলকাতায় স্থানান্তরিত হয় । বর্তমানে স্কুলটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার পরিচালিত ।

যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে বঙ্গের মহিলা কবি গ্রন্থে লিখেছেন,
“বঙ্গের মহিলা কবিদের মধ্যে মিসেস আর,এস, হোসায়েনের নাম স্মরণীয়। বাঙ্গালাদেশের মুসলমান-নারী-প্রগতির ইতিহাস-লেখক এই নামটিকে কখনো ভুলিতে পারিবেন না। রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। গভীর রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে চুপি চুপি বিছানা ছাড়িয়া বালিকা মোমবাতির আলোকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে ইংরাজী ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করিতেন। পদে পদে গঞ্জনা সহিয়াও এভাবে দিনের পর দিন তাঁহার শিক্ষার দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। কতখানি আগ্রহ ও একাগ্রতা থাকিলে মানুষ শিক্ষার জন্য এরূপ কঠোর সাধনা করিতে পারে তাহা ভাবিবার বিষয়।”

স্কুল প্রতিষ্ঠা ছাড়াও নিগৃহীত নারীসমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে গতিশীল করার জন্য বেগম রোকেয়া ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ নামক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন । পাশাপাশি সমাজের অনাচারের বিরুদ্ধে তার ক্ষুরধার শক্তিশালী লেখনী চালিয়ে যান । বেগম রোকেয়া কেবলমাত্র নারী শিক্ষা ও নারী জাগরণের ‘অগ্রদূত’ই ছিলেন না তার সামগ্রিক চিন্তা চেতনা ছিল আন্তর্জাতিকমানের । তার সাহিত্য সম্ভারের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুলতানার স্বপ্ন, অবরোধবাসিনী, মতিচূর ও পদ্মরাগ । এছাড়া তিনি অসংখ্য রচনা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ।

বেগম রোকেয়া জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার প্রতিষ্ঠিত স্কুল, সংগঠন এবং সাহিত্য সাধনা নিয়ে সময় অতিবাহিত করেন । ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া ইন্তেকাল করেন । বেগম রোকেয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাংলাদেশে এই দিনটি রোকেয়া দিবস হিসাবে উদযাপিত হয় ।


“Sultana’s Dream” by Rokheya Shekhawat Hossein (1880 – 1932)
প্রকাশিত হয়েছে ভারতের পেঙ্গুইনি পাবলিকেশন্স থেকে ২০০৫ সালে। এছাড়াও বেগম রোকেয়ার পদ্মরাগসহ বেশ কিছু লিখা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। যেখানে এই মহীয়সী নারীকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচে প্রভাবশালী নারীবাদী নারী দার্শনিক হিসেবে গন্য করা হয়েছে।

যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এই মহীয়সী নারী হয়ে থাকবেন নারী গণজাগরণের অগ্রদূত। মহামতি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ স্যালুট অফুরন্ত।। তাঁর কাজের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন আজীবন।

১৩ thoughts on “নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া

  1. নারী জাগরনের অগ্রদূত মহামতি
    নারী জাগরনের অগ্রদূত মহামতি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ :bow: :bow: :bow: :bow: :salute: :salute: :salute: :salute:

  2. হাইপেশিয়া কেমন আছেন? অনেকদিন
    হাইপেশিয়া কেমন আছেন? অনেকদিন পর।

    আর একজন অগ্রদূতকে স্যালুট…………………………।। :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

    1. ধন্যবাদ।। ভালই। আপনাদের কি
      ধন্যবাদ।। ভালই। আপনাদের কি খবর? অনেক দিন পর কারণ কসাই কাদেরের কল্লা নেয়ার উল্লাসে মাততে এসেছি প্রিয় ইস্টিশনে…

  3. আপনাকে ও বেগম রোকেয়াকে
    :bow: :bow: আপনাকে ও বেগম রোকেয়াকে :bow: তাকে তার নারী শিক্ষার জন্য এই গুরুত্ব পূর্ণ অবদানের জন্য আপনাকে এই কষ্ট সাধ্য কাজ করবার জন্য।

  4. নারী জাগরণের অগ্রপথিক এই
    নারী জাগরণের অগ্রপথিক এই মহিয়সী নারীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা….. :স্যালুট: :স্যালুট: :স্যালুট: :স্যালুট:

  5. খুবই সময়োপযুগী লিখা। ছবিগুলোও
    খুবই সময়োপযুগী লিখা। ছবিগুলোও অসাধারণ। কিন্তু আপনি পোস্ট টি প্রকাশ করার আগে আরেকটু পড়ে নিতে পারতেন। বিয়ের খবর দুইবার চলে আসছে আর দুটা ছবি দেখা যাচ্ছে না। আপলোডে সমস্যা হলে বাদ দিয়ে দেন…

    মহামতি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ স্যালুট অফুরন্ত :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

  6. সবাইকে পড়ার জন্যে ধন্যবাদ…
    সবাইকে পড়ার জন্যে ধন্যবাদ… :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ:

    নারী জাগরণের অগ্রপথিক এই মহিয়সী নারী মহামতি বেগম রোকেয়ার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা…. :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

Leave a Reply to খাজা বাবা Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *