গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ায় তালাক………

একাত্তরে বাবা তালাক দিয়েছিল মাকে।আর ২০১৩- তে এসে সেই মায়ের মেয়েকে তালাক দিয়েছে মেয়ের জামাই।মা গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেয়ায় মেয়েকে তালাক দেয় তার স্বামী।


একাত্তরে বাবা তালাক দিয়েছিল মাকে।আর ২০১৩- তে এসে সেই মায়ের মেয়েকে তালাক দিয়েছে মেয়ের জামাই।মা গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেয়ায় মেয়েকে তালাক দেয় তার স্বামী।

১৯৭১ সালের একদিন বগুড়া থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি সিরাজগঞ্জে এসে পৌঁছায়। শহরে নির্বিচারে ঘরবাড়ি পোড়াতে থাকে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকাররা। রাহেলা বেগম ও তার স্বামী বেলগাতি গ্রামের এক হিন্দুবাড়িতে আশ্রয় নেন। ওই বাড়িতে তারা ছাড়াও আরো তিন নারী একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। ঘরে ঢুকে পড়ে হানাদাররা। নারীদের ওপর চালায় অকথ্য নির্যাতন। স্বামীর সামনেই রাহেলার ওপর চলে এ নির্যাতন। এ ঘটনার পর রাহেলা বেগমকে তালাক দেন তার স্বামী।

এত বছর পরও অভিমানে বীরাঙ্গনা রাহেলা বেগম স্বামীর নামটিও বলতে চাননি। শুধু জানান, পাঁচ বছর পর আবার বিয়ে হয় তার। দ্বিতীয় স্বামী মারা গেছেন বছর সাতেক আগে। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলেটি পড়ালেখা করেছেন স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। তবে বীরাঙ্গনা মায়ের ছেলে হওয়ায় কোথাও চাকরি হয়নি তার। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও নাম ওঠেনি এই বীরাঙ্গনার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে রাহেলাকে ‘দলকানা’ ইতিহাসবিদরা সযত্নে বাদ দিয়েছেন।

চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকার শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-এর আন্দোলন শুরু হলে রাহেলা বেগমকে আনা হয়েছিল সেখানে। গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্যও দিয়েছিলেন এই বীরাঙ্গনা। বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলেও তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল। তবে গণমাধ্যমে তার ওপর একাত্তরের নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলার কারণে ঘটে যায় আরেক বিপর্যয়। সমাজপতিদের কাছে প্রায় বিস্মৃত ‘খারাপ মেয়ে’ আখ্যাটি আবার তার গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়।

শুধু তা-ই নয়, গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার পর রাহেলার মেয়ে চম্পাকে তার স্বামী মিলন তিন সন্তানসহ তালাক দেন। চম্পা এখন বীরাঙ্গনা মায়ের অভাবের সংসারে এসে উঠেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, রাহেলা থাকেন সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া বাসস্ট্যান্ডের পাশে পুকুরপাড় বস্তিতে। এ বস্তির জায়গা সরকার অধিগ্রহণ করেছে। অধিগ্রহণের চিঠিও জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়েছে বস্তিবাসীকে। যেকোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারেন বীরাঙ্গনা রাহেলা।

সিরাজগঞ্জে বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেন সখিনা হোসেন ও নারী মুক্তিযোদ্ধা আমেনা বেগম। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে ৩৫ জন বীরাঙ্গনাকে বের করেন এই দুই নারী। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সিরাজগঞ্জে আসেন। বঙ্গবন্ধু ওই ৩৫ জন বীরাঙ্গনাকে সঙ্গে নিয়ে এক মঞ্চে ওঠেন। সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনাদের ‘মা’ বলে ডাকেন। সেদিনকার সেই সম্মান ছাড়া বীরাঙ্গনাদের স্মৃতিতে আনন্দ-সুখের আর কোনো স্মৃতি নেই।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে পুনর্বাসন কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ৩৫ জন বীরাঙ্গনার মধ্যে এরই মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর সবার যেমন জানাজা অথবা সৎকার হয়, এ বীরাঙ্গনাদের ক্ষেত্রে তাও হয়নি। সমাজপতিরা এখনো বীরাঙ্গনাদের দেখে ‘খারাপ মেয়ে’ হিসেবে।

সারা দেশের বীরাঙ্গনাদের মতো সিরাজগঞ্জের রাহেলা বেগমও মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাননি। বঙ্গবন্ধু যতই বীরাঙ্গনাদের ‘মা’ ডেকে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন, তাতে কি আর বর্তমান আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মন গলে! এমন মন্তব্য সচেতন মানুষের। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি দাবিদার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারেরও বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়ার ব্যাপারে কোনো তৎপরতা না থাকায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদগুলো পড়েছে বেকায়দায়।

সিরাজগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গাজী সোহরাব আলী বলেন, ‘আমরা মৌখিকভাবে জানিয়েছি বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য; কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি।’

৩৫ জন বীরাঙ্গনাকে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনার কাজ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আমেনা বেগম। এখনো সুখে-দুঃখে জীবিত বীরাঙ্গনাদের সঙ্গেই আছেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। হাল ছাড়েননি বীরাঙ্গনাদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ওঠানোর ব্যাপারে। সরকারের বিভিন্ন স্থানে দরখাস্ত করছেন তিনি।

আমেনা বেগম জানান, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠলে স্থায়ী একটা ভাতা পেতেন বীরাঙ্গনারা। তাদের সন্তানরাও মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুফল পেত।

http://primenews.com.bd/bangla/details/47469

১৪ thoughts on “গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ায় তালাক………

  1. মানুষের ঘরে জন্ম নিলে, জ্বীনে
    মানুষের ঘরে জন্ম নিলে, জ্বীনে মানুষের বৈশিষ্ট্য থাকলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হবার জন্য প্রয়জোন মানবিকতা। বিচার বিশ্লেষণ করবার ক্ষমতা।

    এই বদ টা তারই উদাহরণ…

  2. হায়, যে দেশকে স্বাধীন করার
    হায়, যে দেশকে স্বাধীন করার জন্য এতো আত্মত্যাগ সেই দেশের একজন বীরাঙ্গনা সম্মান তো পায়ই না উলটো অপমানিত হন।
    বুকের যন্ত্রণা থেকে যে নারী যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বলল সে আজ ঘর ছাড়া ।
    যাদের হাতে দায়িত্ব ছিল জাতিকে শিক্ষা দেওয়ার জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করার, বিবেককে শানিত করার তাঁদের তো ১৪ ডিসেম্বরই ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই ধ্বংসের ফল আজও আমরা পাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *