আমার মৃত্যু চিন্তা

মৃত্যু এবং শূন্যতা কি এক জিনিস?
আমরা কি আমাদের জন্মের আগেও মৃত ছিলাম না?
জন্মের আগে মৃত্যু কি খুব অদ্ভুত শোনায়? আমার কাছে তো তা মনে হয় না। প্রশ্ন যখন আমার অস্তিত্ব নিয়ে, জন্মের আগেও আমি অস্তিতহীন, মৃত্যুর পরেও তাই। তাহলে আমি কি মৃত ছিলাম না? তাহলে কি আমরা মৃত্যুর পর আবার আমাদের অন্তহীন অসীম জীবনে ফিরে যাবো না?


মৃত্যু এবং শূন্যতা কি এক জিনিস?
আমরা কি আমাদের জন্মের আগেও মৃত ছিলাম না?
জন্মের আগে মৃত্যু কি খুব অদ্ভুত শোনায়? আমার কাছে তো তা মনে হয় না। প্রশ্ন যখন আমার অস্তিত্ব নিয়ে, জন্মের আগেও আমি অস্তিতহীন, মৃত্যুর পরেও তাই। তাহলে আমি কি মৃত ছিলাম না? তাহলে কি আমরা মৃত্যুর পর আবার আমাদের অন্তহীন অসীম জীবনে ফিরে যাবো না?

আমরা তো জন্মের আগের সময়কে মৃত্যু বলি না। আমরা তো বলি না এখন থেকে দশ বছর বা একশত বছর বাদে যে শিশুটি জন্মাবে সে এখন মৃত। আমরা তো বলি না যে আমার জীবনকাল সতেরো, তার আগে অসীম সময় আমি মৃত ছিলাম! মৃত্যু যখন শারীরিক অনুপস্থিতি, আমি তো তাহলে মৃতই ছিলাম। মৃত্যু যখন অস্তিত্বহীনতা, আমরা কি সকলেই অস্তিত্বহীন ছিলাম না?

সাধারণভাবে মনে হলেও মৃত্যু কখনোই শারীরিক অনুপস্থিতি না। আমার মৃত্যু হল আমার নিকটজনদের আমাকে ঘিরে স্মৃতির সমাপ্তি। তাহলে আমার জীবন হচ্ছে আমার স্মৃতির সমষ্টি। স্মৃতি নেই তো সে মানুষের মৃত্যু নেই। একজন পাগল, যে রাস্তায় ঘুমায়, কোনো হোটেলের সামনে বসে থাকে, প্রতিদিন পথচারীদের বিরক্ত করে, তার মৃত্যুতে “মৃত্যু” হয় কার? ঐ পাগল যে হোটেলের সামনে বসতো, তার কর্মচারীদের। যে রাস্তায় থাকতো ঐ রাস্তায় নিয়মিত চলাফেরা করা মানুষগুলোর। যে মরে গেলো তার তো কিছু যায় আসে না। তার আশেপাশের মানুষগুলো প্রতিনিয়ত তার মৃত্যু অনুভব করে। এভাবে মৃত্যু হতে থাকে আমাদের। স্মৃতির মৃত্যু মানেই আমাদের মৃত্যু। যখন আর কোনো স্মৃতি থাকে না, আমি থাকি না। আমরা থাকি না।

হঠাৎ যে ছেলেটা মরে গেলো এক্সিডেন্টে, অথবা যে মেয়েটা আত্মহত্যা করলো, তাদের মৃত্যুর শোক আমাদের অনেক বেশি কষ্ট দেয়। আমাদের অনেক বেশি অনুভূত হয়। কারন ঐ ছেলেকে ঘিরে, ঐ মেয়েকে ঘিরে আমাদের স্মৃতিগুলো জীবন্ত। তখনো তরতাজা। আশি বছরের বৃদ্ধ বাবার মৃত্যুতে আমরা কষ্ট পাই; আমাদের চেয়ে বেশি কষ্ট পান মা। আশি বছরের বাবার মৃত্যুতে আমাদের মনে পরে তিরিশ বছরের বাবার স্মৃতি । চল্লিশ বছরের বাবার স্মৃতি। কখনোই আশি বছরের বাবার স্মৃতি মনে পরে না। কারন আশি বছরের বাবার স্মৃতি আমরা মিস করি না। অনুভব করি না। কিন্তু মা করেন। এর কারন আশি বছরের বাবাকে ঘিরে আমাদের স্মৃতি নেই বললেই চলে। কিন্তু আশি বছরের বাবাকে ঘিরে মায়ের স্মৃতি তখনো জীবন্ত। তখনো তরতাজা।

অথবা আমাদের দশ বছরের সন্তান। আশি বছরের দাদাকে ঘিরে তার স্মৃতির পরিমাণ অতি নগণ্য। তার কাছে তার দাদার মৃত্যুর যন্ত্রণা অনেক কম। অথবা আমার সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান। তার কাছে আশি বছরের দাদার মৃত্যুই হয় নি। কারন আশি বছরের দাদাকে ঘিরে তার কোনো স্মৃতি নাই।

মৃত্যুকে আমরা কোনো এক অদ্ভূত কারনে অন্ধকারের সাথে তুলনা করি। জীবনকে আমরা বলি সীমাহীন অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আলো। আমি বুঝি না মৃত্যু মানে অন্ধকার কেনো। মৃত্যু মানে কেনো শূন্যতা। মৃত্যুতে কোনো সমাপ্তি না। মৃত্যুতে তো আমার কোনো পরিবর্তন হল না। একটি সক্ষম কার্যকর যন্ত্র বন্ধ হল মাত্র। “আমার প্রতিটি অণু পরমাণু যদি ঐভাবে পুনঃসজ্জিত করা হয়, আমি বেঁচে থাকবো। দশ বছর বয়সে আমার ডি এন এ সংগ্রহ করে যদি এখন থেকে পঞ্চাশ বছর পরে আমাকে সৃষ্টি করা হয়, তবে আমি ঐ দশ বছরের বালক হয়েই ‘জন্মাবো’। আমার স্মৃতি হবে ঐ দশ বছরের বালকের মতো।” —— এসব আমি মানি না। আমাদের শরীরে এবং শরীরের চারপাশে যে অসংখ্য অগনিত পরমাণু আছে; তার কোনো একটি অপরটির মতো না। প্রতিটি কণাই ইউনিক। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি উদ্ভিদ, প্রতিটি পদার্থই ইন্ডিভিজুয়াল। আমার সৃষ্টি সম্ভব কেবল আমাকে দিয়েই।

মৃত্যু আমার স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিনিয়ত আমার মৃত্যু হয়। প্রিয় মানুষ হারিয়ে গেলে আমার মৃত্যু হয়। প্রিয় খাবার শেষ হয়ে গেলে আমার মৃত্যু হয়। আমার সাথে স্মৃতির বাধনে জড়িত এরকম প্রতিটি জিনিসের অনুপস্থিতিতে আমার মৃত্যু হয়।

আমার কাছে মৃত্যু কোনো বিভীষিকা নয়। অথবা কোনো আনন্দের বার্তাও নয়। প্রথম চাকুরী পাওয়া অথবা প্রথম শেভ করার অনুভূতির মতোই একটা আনকোরা অনুভূতি। তবে আমার অনুপস্থিতি অন্যদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতাই বটে। এই নতুনের সাথে যখন অভ্যস্ত হবে সবাই, মৃত আমি আর অসীম আমির মাঝে ফারাক হবে শূন্য।

একটা কথা আমি চিরকাল বলি। শূন্যতা হল অসীমের বিপরীতক। মুদ্রার এপিঠ যদি শূন্য হয়, তবে মুদ্রার ওপিঠ হবে অসীম। আমাদের মহাবিশ্ব অসীম। আমাদের জীবন অসীম। আমাদের সময় অসীম। এই অসীম কি শূন্যতার বিপরীত নয়? সবকিছুই কি শূন্য ছিল না?

আমার কাছে মৃত্যুর রং আছে। কারো কাছে মৃত্যুর গন্ধ আছে। কেউ হয়তো দেখতে পায় মৃত্যুর রূপ। মৃত্যুর স্বাদ পায় অনেকে।
মৃত্যু কি অন্ধকার? কখনোই না।
মৃত্যু কি আলো? কখনোই না।
মৃত্যু হল রূপান্তর।
মৃত্যু হল স্মৃতির সমাপ্তি।
আমি কি মৃত? আমরা কি মৃত? হতে পারে।
আমি বেঁচে থাকি অন্যদের সময়ে……

১৩ thoughts on “আমার মৃত্যু চিন্তা

    1. আসলেই ভাল লাগছে আশা করি ভাল
      আসলেই ভাল লাগছে আশা করি ভাল আছেন …… লিখাটা যথেষ্ট প্যাঁচের আমার মত সহজ সরল মানুষের মাথায় প্যাঁচ ঢুকেনা ভাই …… :আমারকুনোদোষনাই:

  1. দুর্দান্ত ভাবনা অর্ফি…
    তোর

    দুর্দান্ত ভাবনা অর্ফি…
    তোর ভাবাভাবির যেন থাকে নিরন্তর!!
    আপাতত কোন সমালোচনায় গেলাম না…
    “প্রত্যাশা সবসময় সুস্থ সবল থাক,
    আর অবিরাম চলুক স্বাধীনতার ডাক..”

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :গোলাপ: :ফুল: :ফুল: :ফুল: :ফুল:

  2. সত্য বলতে কি তারিক ভাই, এই
    সত্য বলতে কি তারিক ভাই, এই লেখাটা আমার নিজের মধ্যেও অনেক কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। আউট অফ দ্য বক্স চিন্তা করা খুব কষ্টকর ব্যাপার

  3. মৃত্যু আমার স্বাভাবিক জীবন

    মৃত্যু আমার স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিনিয়ত আমার মৃত্যু হয়। প্রিয় মানুষ হারিয়ে গেলে আমার মৃত্যু হয়। প্রিয় খাবার শেষ হয়ে গেলে আমার মৃত্যু হয়। আমার সাথে স্মৃতির বাধনে জড়িত এরকম প্রতিটি জিনিসের অনুপস্থিতিতে আমার মৃত্যু হয়।

    :bow: :bow: :bow:

  4. একদম এভাবেই আমি অনেক বার
    একদম এভাবেই আমি অনেক বার ভেবেছি ! আমার প্রায় ই মনে হয় যে কেউ মরে গেলে আমরা কাঁদি শোক পালন করি ! কিন্তু সেই সময়ে মৃত ব্যক্তি কি কিছুই অনুভব করে না !

    আমরা ইহজগতের মানুষেরা যখন স্মৃতি কাতর হই সেই সময় সেই মৃত মানুষ টি কি কিছু অনুভব করে ! আমি প্রায় ই ভাবি !

    তুই লিখতে পারলি এটা নিয়ে খুব ভাল লাগ্ল !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *