রাতের শেষে রাত

পিছনে ঝুলানো ব্যাগের দিকে আর একবার তাকাল নিলু। নিলু নামটা কেমন যেন মেয়েলি লাগে। ওর নাম নিলয়।ছোট করে, আদর করে মা নিলু ডাকে। নাম নিয়ে ভাবার সময় নিলুর নেই। নিলুর চিন্তা পিছনে ঝুলানো ব্যাগটা ভরা নিয়ে।ব্যাগটা একটা চিনির। তবে ব্যাগে এখন চিনি নেই। আছে কিছু কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল,কিছু টিনের কৌটা। নিলুর কাজই এটা। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এই ব্যাগ ভর্তি করা, আর সন্ধ্যায় তা বিক্রি করা, কেজি দরে। যা পাবে তা দিয়ে চাল আর সবজি কিনে ঘরে যাবে। ঘর না ঠিক, বস্তি একটা, রাস্তার পাশে পলিথিন ব্যাগ দিয়ে কোনমতে ঝুপড়ি রকম বানিয়ে থাকে। টোকাই নিলু। ব্যাগ নিয়ে ঘুরে ঘুরে রাস্তার পাশের ময়লা আবর্জনা লাঠি দিয়ে ,হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে মোটা কাগজ, বোতল, লোহা , টিনের কৌটা এসব তুলে পিছনের ব্যাগে রাখে।আজকের দিনটা মনে হয় খারাপ যাবে। বেশি ভাল জিনিস পত্র পাচ্ছে না।এর মধ্যে খুব ক্ষুধাও লেগে গেছে। মাথার উপর সূর্যটাকে মনে হচ্ছে আজ একটু বেশিই রোদ দিচ্ছে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।হাঁটার মাঝেই কোন এক সময় একটা খাবার হোটেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।লোকজন যাচ্ছে, খাচ্ছে, বের হয় আসছে। হোটেলের সামনে গিয়ে দাড়াতেই ভিতর থেকে মালিক চিৎকার করে বলল, ঐ পিচ্চি, ঐ। যা এখান দেখে।
পাশের পরিচিত কাউকে বলছে, এই টোকাই গুলা দুনিয়ার বদ। চোর সবগুলান। চোরের মত ঘুরব, কিছু পাইলেই ব্যাগে ভইরা দৌড়।
নিলু, হোটেলের খাবারের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকজন খাচ্ছে। কেউ মুরগীর রান দিয়ে, কেউ মাছ দিয়ে, কেউ গরু খাসি,কেউ ডিম,টাকা বাঁচানোর জন্য কোন ছাত্র মতন কেউ খাচ্ছে শুধু ভাজি ডাল দিয়ে।ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে খাবার থাকলে, তা খেতে না পারার মত কষ্ট খুব কমই আছে। পেটের ভিতরের ক্ষুধাটা মনে হয় আরও বেড়ে গেছে খাবার দেখে।হোটেলের মালিক আবার ধমক দিল। লোক পাঠিয়েছে তাড়াবার জন্য। কোনমতে দৌড়ে পালাল, নিলু। কেমন কুকুরের মত জীবন নিলুর, ভাবতেই কেমন লাগছে।দৌড়ে হোটেলের পিছন দিকটায় চলে গেল। এখানে ওর মত অনেক ক্ষুধার্ত জীব আছে, তবে সেগুলো মানুষ না, কুকুর।হোটেলের উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে হাড় গুলো বের করে তা খাচ্ছে।নিলুর মাথায় কি যেন চিন্তা আসল।কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে এই উচ্ছিষ্ট খাবার হাত দিয়ে খাবলাতে লাগল। কাজটা নিলু অনেক ভাল পারে, টোকাই যে নিলু, ময়লা থেকে ভাল জিনিস গুলো বের করতে পারে। অনেক খোঁজাখুজির পর দুই টুকরা মাংস পেল।একটা ছোট আর একটা ভালই বড়। প্যান্টের পকেট থেকে পলিব্যাগটা বের করে তাতে নিল মাংস টুকরা দুটো। কিছু দূরেই একটা পানির ট্যাপ, তা থেকে মাংস গুলো ধুয়ে আবার প্যান্টের পকেটে রেখে দিল।তাড়াতাড়ি করে কাঁধের ব্যাগ নিয়ে ভাংগারির দোকানে যাচ্ছে, কাঁধের জিনিসগুলো বিক্রি করতে। আজও সেই কম টাকা। তবুও চালের টাকা হয়ে যাবে, তরকারী আজ কিনতে হবে না।

চাল নিয়ে ঘরে ঢুকল নিলু। পলিথিন দিয়ে বানানো ঝুপড়ি ঘরে।ঘরে নিলুর সাথে মা থাকে, ছোট বোন থাকে। মা বিছনায় শুয়ে আছে, শরীর বড় খারাপ। বেশ কয়েক মাস ধরে। ছোট বোনটা একটা ছোট পাখা দিয়ে মাকে বাতাস করছে। ছোট হাতে পাখাটা অনেক ভারী লাগছে। পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে। তাই দুই হাতে পাখাটা ধরে মাকে বাতাস করছে।নিলু বড় ভাই, অনেক বড় ছোট বোন রিমুর থেকে। ২ বছরের বড়। সাত বছর বয়স নিলুর, অনেক বড় আসলেই। তাইতো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে, টোকাই ব্যাগে করে ঘুরে বেড়ায়। ময়লা আবর্জনা খাবলে ভাল জিনিস বের করে, কত বড় দায়িত্বের কাজ। লোকের ধমক শুনে, চোর অপবাদ শুনে, পুলিশের দৌড়ানি খেয়েও সংসারের জন্য উপার্জন করে নিয়ে আসে। মানুষের থেকে দয়া না পেয়ে, কুকুরের সাথে প্রতিযোগিতা করে খাবার নিয়ে আসে।
নিলুকে দেখেই রিমু বলে উঠল, মা মা, ভাইয়া আসছে।ভাইয়া তুমি এসে পড়ছ?

এই ভাইয়া ডাক অনেক আস্থার ডাক, অনেক আশার ডাক। জানে ভাইয়া আসছে মানে খাবার নিয়ে আসছে। এই বয়সের বাচ্চা মেয়ে, খেলনা পাবার, ছোট চুলের ফিতা পাবার ইচ্ছা হতেই পারে। কিন্তু রিমুর তা হয় না, খেতে পেলেই খুশি রিমু।
মা মুখ ঘুরিয়ে দেখলেন বড় ছেলে কাজ করে আসছে।মা জানেন তিনি বেশিদিন বাঁচবেন না। এতো অসুস্থ শরীর নিয়ে কেউ বাঁচে না।নিলু কোথা থেকে যেন ওষুধ নিয়ে আসে কয়েকদিন পর পর, তাতে কাজ হবে না।
নিলু ভাত চড়িয়ে দিল।মাংস টুকরা ২ টা একটু তেল আর মরিচ দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিল। ছোট বোনটা কখন যেন এসে পাশে বসেছে। ভাইকে বলল, ভাইয়া আজকে মাংস খাব?
– হ্যাঁ।

ছোট মুখটার অনেকটা হাসিতে ভরে উঠেছে। দৌড়ে মাকে বলল, মা মা আজকে মাংস খাব।

রান্না শেষ। মা আর বোনকে নিয়ে খেতে বসেছে নিলু। ভাত দিয়ে প্লেটে এক টুকরা মাংস মাকে তুলে দিল, আর একটা বোনকে। অনেক দিন পর ভাল কিছু দিয়ে খাওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন শাক আর কতদিন ভাল লাগে? এতদিন পর ভাল খাবার পেয়ে মা মেয়ে দুজনেই গপাগপ করে খেয়ে নিল। পেট ভরে অনেক দিন পর খেল। নিলুকে মা জিজ্ঞেস করল, আর মাংস নাই রে? আর একটু পেলে আর কয়টা ভাত খাইতাম।

নিলুর মুখটা ছোট হয়ে গেল। মাকে বলল, না মা। আর নাই।
ছোট বোনটার দিকে তাকাল নিলু। ওরও মনে হয় পেট ভরে নি।খালি প্লেট নিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।তবে আর যে নেই মাংস সে উত্তর পেয়ে গেছে, তাই আর কিছু বলল না।

মা গিয়ে শুয়ে পড়ল, আর মেয়ে আবার পাখা নিয়ে বাতাস শুরু করেছে। নিলু বসে, পাতিলের নিচের ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। ক্ষুধাটা বড় বেশিই লেগেছে।মা বোনের দিকে তাকিয়ে ভাবল, আর এক টুকরা মাংস থাকলে ভালই হত। নিজেরটা দিয়ে দিত মা আর বোনকে। পেট ভরে খেত।কতদিন ভাল কিছু খায় না।

রাত নেমে এসেছে।ঐ অট্টালিকার রঙ চটে এসি রুমেও আর এই পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরেও। মা আর রিমু ঘুমাচ্ছে।নিলু তাকিয়ে দেখছে। একটু পর পর মশা তাড়াচ্ছে। ও যে সংসারের ভার নিয়েছে, ওর অনেক দায়িত্ব।
রাত শেষ দিন আসে, হয়ত আসে। ঐ অট্টালিকার মানুষগুলোর আসে। নিলুদের দিন আসে না। রাত শেষে রাতই আসে। রাত বড় জ্বালাময়। চাঁদের আলো যত স্নিগ্ধই হোক, কোন কাজে আসে না, শুধু আবেগ অনুভূতি বাড়াতে পারে। নিলুদের আবেগ অনুভুতিতে কাজ হয় না। এদের দরকার ব্যাগ ভরে, রাতটাকে দিন বানানো।

– রিয়াদুল ইসলাম ( শেষ রাতের আঁধার )

৩ thoughts on “রাতের শেষে রাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *