একটি চিকেন গ্রিল ও অন্যান্য গল্প.

রেস্টোরেন্টের কৃত্রিম ঠান্ডা আবহাওয়ায় কিছুটা উত্তাপ এনে দিচ্ছে চিকেন গ্রিলের সুবাস ।তরুণ তরুণীরা টেবিল ঘিরে বসেছে ।সবার মুখে উচ্ছাস লেপ্টে আছে ।কেউ সেটা গোপন করার চেষ্টা করছেনা ।অদূরে ই একটা বাক্স টাইপের ঘেরা দেয়া জায়গায় বসে আছেন রেস্টোরেন্ট টির ম্যানেজার ।তার মুখে স্মিত হাসি ।টানা অবরোধের পর আজকে একদিনের ছুটি । ব্যবসা আজকে জমে উঠেছে । সপ্তাহব্যাপি প্রায় গৃহবন্দি মানুষ একটু নিরাপদ অবকাশ যাপনে ছুটে এসেছে তার খাবারের দোকানে । সপ্তাহব্যাপি মন্দা যদি আজকে কিছুটা ঘোচে ।



রেস্টোরেন্টের কৃত্রিম ঠান্ডা আবহাওয়ায় কিছুটা উত্তাপ এনে দিচ্ছে চিকেন গ্রিলের সুবাস ।তরুণ তরুণীরা টেবিল ঘিরে বসেছে ।সবার মুখে উচ্ছাস লেপ্টে আছে ।কেউ সেটা গোপন করার চেষ্টা করছেনা ।অদূরে ই একটা বাক্স টাইপের ঘেরা দেয়া জায়গায় বসে আছেন রেস্টোরেন্ট টির ম্যানেজার ।তার মুখে স্মিত হাসি ।টানা অবরোধের পর আজকে একদিনের ছুটি । ব্যবসা আজকে জমে উঠেছে । সপ্তাহব্যাপি প্রায় গৃহবন্দি মানুষ একটু নিরাপদ অবকাশ যাপনে ছুটে এসেছে তার খাবারের দোকানে । সপ্তাহব্যাপি মন্দা যদি আজকে কিছুটা ঘোচে ।

ম্যানেজারের খোপের অদূরেই একটা বোকা বাকশো মানে টিভি রাখা । ম্যানেজারি চাকরি বড়ই বিরক্তির । কাজ তেমন নেই ।কিন্তু হিসাবপত্র রাখা , রোবটের মতো শক্ত মুখ করে থাকতে হয় ।মাঝেমধ্যে ধমক ধামক দিয়ে কর্মচারিদের ও অপ্রিয় বনে যেতে হয় ।টিভি দেখে তাই কিছুটা অবসাদ ঘোচে । তরুণ তরুণীর দল উল্লসিত । টানা গৃহবন্দী থাকার পর তারা আজ অবশেষে বেরুতে পেরেছে । এতোদিন বেরুতে পারলেও একসাথে হতে পারেনি ।আজ অবশেষে একসাথে ।দলটিতে দুটি তরুণ তিনটি তরুণী ।তাই অসামন্জস্যরকম জৈবিক হিংসা কম প্রতিভাত হচ্ছে । তরুণ পিছু তরুণীর অনুপাত বেশী হওয়ায় তরুণীদের তরুণদের নজর কাড়ার চেষ্টা বেশি চোখে পড়ছে । পারস্পরিক কৌতুকে তারা হাসিতে ঢলে পড়ছে। মাঝেমধ্যে তরুণরা চিকেন গ্রিলের জন্য হাঁক ডাক দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে পরিস্থিতির নিয়ণ্ত্রণ তাদের হাতে ।ওয়েটার সশব্যাস্ত হয়ে হাত পা নেড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে ।

ম্যানেজার এদের ভাবভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করছিলেন ।নেই কাজ তো খই ভাজ নীতিতে মাঝে মধ্যে কাস্টমার
কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করতে থাকেন তিনি ।মাঝে মধ্যে হাত পা নেড়ে হাঁক ডাক করে তাড়া দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন
তিনি ও এই মহাযজ্ঞের সমান অংশীদ্বার ।আপাতত তার দৃষ্টি বোকা বাকশোতে নিবদ্ধ । সেখানে তিনি বুল ফাইটের ষাঁড়ের মত ঘাড়ের রগ ফুলিয়ে তর্ক করা তার্কিক দের টকশো দেখছেন । টকশোতে কিছু কি ওয়ার্ড বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে যেমন গনতান্ত্রিক পরিবেশ ,সমান সুযোগ ,লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ,আলোচনা , সাংবিধানিক
দায়বদ্ধতা ।অতি ব্যবহারে জীর্ণ শব্দ গুলো মনে তেমন রেখাপাত করে না আর ।তাও শুনতে হয় । দীর্ঘদিনের অভ্যেস । তরুণ তরুণীরা মাঝে মধ্যে বোকা বোকশোর দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকায় ।বিরক্ত হবার ভান করে । হয়তো আসলেই বিরক্ত হয় ।নিশ্চিত করে কিছু বলা যায়না । ম্যানেজার এই বিরক্তিটা উপভোগ করেন ।তিনি সাউন্ড আরো বাড়িয়ে দেন ।তরুণরা এই বাড়তি সাউন্ডে মনোক্ষুণ্ব হলেও ম্যানেজারকে কিছু বলেনা ,ওয়েটারকে খাবারে দেরি হবার উসিলায় ঝারি দিয়ে রাগ ঝারে ।

তারপর আবার তরুণীদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যাস্ত হয় ।দুই তরুণের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো তরুণটি এখানে বিদূষকের ভূমিকা পালন করছে । সে জানে পেশি দিয়ে হয়তো মনোযোগ আকর্ষণ সম্ভব নয় ,রসালাপ দিয়ে যদি কিছুটা সম্ভব হয় ।এই মুহুর্তে সে একটা অশ্লীল কৌতুক বলে তরুণীদের হাসানোর চেষ্টা করছে ।সে লক্ষ্য করেছে উচ্ছল তরুণীরা অশ্লীল কৌতুক পছন্দ করে । কৌতুকটা অনেকটা এরকম ,দুজন অপরিচিত তরুণ
তরুণী ট্রেনে পাশাপাশি বসেছে । তরুণীটির গলায় একটি ছোট্ট উড়োজাহাজ লাগানো লকেট । পার্শ্ববর্তী তরুণটি অনেকক্ষণ ধরে লকেটের দিকে তাকিয়ে আছে লক্ষ্য করে তরুণীটি স্মিত হাসি দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো “প্লেনের লকেট টা দেখছো বুঝি ?”
তরুণটি বলে উঠলো “না ,আমি দেখছি প্লেনের রানওয়েটা ”
শ্রোতা তরুণীরা স্বভাব বশত প্রথমে এই দ্বি অর্থবোধক কৌতুকটা ধরতে পারলোনা ।কিন্তু পরক্ষণেই কৃত্রিম লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে হি হি করে হেসে উঠলো । এদের মধ্যে একজন টিউবলাইট তরুণী তখনো কৌতুকটার অর্থ ধরতে পারেনি ।অন্য দুজন তাকে ফিস ফিস করে অর্থটা ধরিয়ে দিতে লাগলো । কৌতুক বর্ণনাকারী ছোটখাটো তরুণটি এদের পুলক দিতে পেরে আমোদ বোধ করলো বেশ।পার্শ্ববর্তী পেশিবহুল তরুণ টি কিছুটা ঈর্ষণ্বিত বিরক্ত হলো । সে বিরক্তি উগড়ে দিলো ওয়েটারকে খাবারের জন্য রাম ধমক দিয়ে তাগাদা দিয়ে । ওয়েটার কাজ দেখানোর জন্য দৌড়ালো রান্নাঘর ।

ম্যানেজার চ্যানেল ঘোরালেন । একটা চ্যানেলে ঘটাং করে বেজে উঠলো নিউজের কাঁটা ।ম্যানেজার সেখানে স্থির হলেন ।রুজ লাগানো আকর্ষণীয় সুন্দরী প্রেজেন্টার দেখে কিনা কে জানে ।হতে ও পারে নাও হতে পারে । এতোটা ফ্রয়েডীয় ভাবে ভাবলে চলেনা । নিউজ নামক পণ্য বোকা বাকশে প্রেজেন্ট হচ্ছে । প্রথমেই রাজনৈতিক সংকট
নিরসনে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের দূতিয়ালির খবর । রাষ্ট্রদূতটি চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ ঘাট প্রান্তর ।গণতন্ত্র রক্ষার সুমহান দায়িত্ব নিয়ে ।ম্যানেজার হঠাত্ অস্ফুট কন্ঠে গালি দিয়ে উঠলেন দালাল । পরক্ষণেই চারপাশ তাকিয়ে নিলেন কেউ শুনলো কিনা । যে পরিস্থিতি তাতে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়না । নিরবে খবর দেখাই উত্তম । দিতিয় খবর টা গতানুগতিক। ব্যবসায়ী নেতা দের আলোচনা হ্যান ত্যান। ত্রিতিয় খবরটা বিভত্স ।তবু নিজের অজান্তে ম্যানেজারের চোখটা চকচক করে আবার নিভে গেল । খুব বেশী ভয়াবহ দৃশ্য ।বার্ণ ইউনিট নিয়ে একটা রিপোর্ট ।ম্যানেজার নিজের অজান্তেই সাউন্ড অনেক বড় করে দিলো ।পার্শ্ববর্তী সব কাস্টমারদের চোখ আটকে গেল টিভিতে ।একটা লোক ।লোক না বলে ব্যান্ডেজের দলা বলাই ভালো ।কাতরাচ্ছে ।যদিও চ্যানেল ওয়ালারা দৃশ্যটা ঝাপসা করে দেয়ার যথেষ্ট চেষ্টা করেছে ।কিন্তু তারপর ও বেরিয়ে গেছে তার আগুনে পুড়ে ঝুলে যাওয়া ঠোঁট । লোকটা কাতরাচ্ছে আর ও মাগো বলে চেঁচাচ্ছে আর কাতরাচ্ছে । রেস্টোরেন্টের আধো আলো পরিবেশে দৃশ্যটাকে পরা বাস্তব মনে হতে থাকে ।ইতিমধ্যে তরুণ তরুণীদের টেবিলে চিকেন গ্রীল চলে এসেছে ।যদিও তাদের কারো চোখ সেখানে নেই ।সবার চোখ টিভিতে ।বিভত্সতাকে মানুষ ভয় পেলেও কেন জানি এর আকর্ষণ ও এড়াতে পারেনা ।হয়তো আদিম যুদ্ধবৃত্তি রয়ে যায় অন্তঃর্গত রক্তের ভেতরে ।তাই তো যুদ্ধের রিপোর্টে ও চ্যানেলদের টি আর পি না কমে বেড়ে যায় অনেকসময় । গোঙ্গানির দৃশ্যটা কিছুক্ষণ স্থির থেকে চলে যায় ।তারপর যথারীতি স্বজনদের সাক্ষাতকার । অনর্থক আহাজারি ।

শেষে রিপোর্টারের নাটকীয় বয়ান “সচেত মহলের রাজনীতিবিদদের কাছে প্রশ্ন আর কত কাল তাদের ঘৃণার আগুনে জ্বলবে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ?সুমন্ত শাহীন বাণ্ ইউনিট অমুক টেলিভশন । ” রিপোর্ট শেষ হয়ে যায় ।আবার সব সাভাবিক। হাফ ছেড়ে বাঁচে সবাই। চিকেন গ্রি চোখে পড়ে তরুণ তরুণীদের । আধো আলো আঁধারিতে স্বাভাবীক তরুণ দলটির মধ্যে একজন অস্বাভাবিক তরুণীর মনে হতে থাকে আগুনে ঝলসানো চিকেন
গ্রিল টা তার জায়গায় নেই । সে জায়গায় বসে আছে কিছুক্ষণ আগে দেখা ঠোঁট ঝুলে যাওয়া পোড়া মাংসের মানু টা ।অথবা ব্যান্ডেজের দলা পাঁকানো কাঠামো টা ।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে তরুণীটি বমি করে ফেলে হঠাৎ !

৮ thoughts on “একটি চিকেন গ্রিল ও অন্যান্য গল্প.

    1. পড়ার জন্য ধন্যবাদ । মোবাইল
      পড়ার জন্য ধন্যবাদ । 🙂 মোবাইল থেকে লিখিরে ভাই ।অনেক কষ্ট ।তাই এমন হয় ।
      কেমন লাগলো বললেন না যে ?

  1. আপনার লেখার স্টাইল খুবই ভাল
    আপনার লেখার স্টাইল খুবই ভাল লেগেছে……… সুন্দর করে আমাদের বাস্তবিক চিত্র তুলে ধরেছেন ।

    ব্লগে নিয়মিত হবেন এই আশাই রাখি 🙂

  2. পড়ার জন্য ধন্যবাদ ।
    ভালো

    পড়ার জন্য ধন্যবাদ ।
    ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগলো । 🙂
    নিয়মিত হব কিনা জানি না ।আমি আসলে বড়
    বেশি আইলসা ! হা হা । 😀

  3. আরেকটা জ্ঞ্যান ঝাড়ি।
    আরেকটা জ্ঞ্যান ঝাড়ি। :ভেংচি: অনেকেই দেখি এই ভুলটা করে। বাক্যের শেষে দাড়ি-কমার ব্যবহারে। বাক্যের শেষ শব্দের পর যতিচিহ্ন দেওয়ার ক্ষেত্রে শব্দের পরে স্পেস হয় না, স্পেস হয় যতিচিহ্নের পর। অনেকেই আগে-পরে দুই ক্ষেত্রেই স্পেস দেন, আবার অনেকেই উল্টোটা করেন। আগে স্পেস দেন, পরে দেন না। এই ব্যাপারটা লেখার সময় মাথায় রাখলে ভালো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *