নিশ্ছিদ্র অন্ধকার

গৃহবধূ সালেহা ফাঁদে আটাকে পড়া অসহায় বন্য পশুর মত চেয়ারম্যানের পোলা কাদেরের শক্ত হাতের আবেষ্টনী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়ে যায় শুধু, সুতীক্ষ্ণ তীরের মত কোন চিৎকার তার মুখ ফুড়ে বের হয়ে আসে না। চিৎকার করলেই কি সে রেহাই পাবে? ফাঁদে আটকা পড়া হরিণ কি চিৎকার করে নিস্তার পায়! বরঞ্চ লোকজন এগিয়ে এসে খুশিতে হাততালি দিয়ে ওঠে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে মজা দেখে।

গৃহবধূ সালেহা ফাঁদে আটাকে পড়া অসহায় বন্য পশুর মত চেয়ারম্যানের পোলা কাদেরের শক্ত হাতের আবেষ্টনী থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়ে যায় শুধু, সুতীক্ষ্ণ তীরের মত কোন চিৎকার তার মুখ ফুড়ে বের হয়ে আসে না। চিৎকার করলেই কি সে রেহাই পাবে? ফাঁদে আটকা পড়া হরিণ কি চিৎকার করে নিস্তার পায়! বরঞ্চ লোকজন এগিয়ে এসে খুশিতে হাততালি দিয়ে ওঠে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে মজা দেখে।

বরঞ্চ তার চেঁচামেচির শব্দ শুনে আশে-পাশের মানুষ জড়ো হয়ে তাকে এই জন্তুটির হাতে সঁপে দিয়ে- তার নামে নানা ধরনের কুৎসা রটাতে রটাতে চলে যাবেঃ “তলে তলে এত কিছু, মুখ দেইকা তো কোন কিছু বোঝনের উপায় নাই। ভাব-সাব দেইখ্যা মনে অয় কত সতীসাধ্বী- আবার মাগীর ঢং দেখ, ডাকাডাকি কইরা লোক জমাইছে। আরে ঢং না ঢং না, বোঝস না তো তোরা, রাইতে রাইতে দেহা কইরা আর তৃষ্ণা মিটতাছে না, কাদেরের ঘরে যাবার চায়, হারা দিন-রাইত ভইরা সোহাগ পাবার চায়। চেয়ারম্যান বাড়ির বউ অওনের শখ জন্মাইছে মাগীর! ঝাটা মারি অমন মেয়ানোকের মুখে”।
যে মানুষগুলোকে সে তার এই বিপদের মুহূর্তে ডাকতে চাইছে তারাই তার উপর দোষের সমস্ত বোঝা চাপিয়ে, নানা ধরনের রসালো কাহিনীর সূত্রপাত ঘটাবে। বছরের পর বছর ধরে সেই কাহিনী এই এলাকা ও তার বাবার বাড়ির এলাকার মানুষজনের মুখে মুখে ঘুরতে থাকবেঃ মাগী আগের থাইকাই খারাপ আছিল, দেহস না মাগীর শরীলডা- সাত গাঙ্গের পানি না খাইলে কি এত তেল জমে! জামাই তো কত বছর ধইরা বিদেশ, এত দিন কি মাগী একা একা থাকছে, মনে করস? মাগী যে কতজনের নগেই হুইছে তার কি আর কুন হিসাব আছে।

তার মা ঘরের মেঝেতে বসে হাহাকার করে কাঁদতে থাকবে। লজ্জায়-অপমানে তার বাবা ঘর থেকে বের হতে পারবেনা। গ্রামের বড় উঠানে সালিশ বসবেঃ সালিশের এককোনায় চোরের মত দাঁড়িয়ে থাকা তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে গ্রামের মাতাব্বরেরা বলতে থাকবেঃ “তোমার মাইয়ার জন্য আমরা গ্রামের বাইরে মুখ দেহাইতে পারিনা, আগে আমাগো গ্রামের কত মান-ইজ্জ্বত আছিল, তোমার নষ্টা মাইয়ার কারনে সব শেষ হইয়া গেল। আমরা গ্রামের দশ-জনে মিলে তোমাগো আটক রাখলাম। তোমরা গ্রামের কোন মানুষের সাথে মিশতে পারবা না, সমাজের কোন কাজে যোগ দিবার পারবা না, সমাজের কেউ তোমাগো কুরবানির মাংশ খাব না।” সালিশের অন্যান্য লোকজন চিৎকার করে উঠে প্রতিবাদ জানিয়ে বলবে, “না আমরা এই বিচার মানি না। খালি আটক রাখলেই চলব না, বাড়ি ঘর ভাইঙ্গা গ্রাম থিকা জন্মের মত বাইর কইরা দেওন লাগবো।”

এই ঘটনার অনেক বছর কেটে গেলে, তার সাত বছরের ছোট বোনটি যখন বিয়ের যোগ্য হয়ে উঠবে তখন তার বিয়ে হবে না। “অর বড় বুইনডা আছিল খারাপ, আর ও কি বালা অইবো, পথম হাল যেন দিয়া যায়, পরেও হালও অইদিক দিয়াই যায়।”

সৌদি-আরব থেকে তার স্বামী কালকেই রেজিষ্ট্রি করে তালাক নামা পাঠিয়ে দেবে।
তার ছেলেটার জন্ম পরিচয় নিয়ে সকলে সন্দিহান হয়ে উঠবেঃ “দেক, দেক, পোলাডার চেহারার দিকে চাইয়া দেক, রফিকের নাগাল এট্টুও দেহা যায় না। জামাই থাকে বিদেশ, কুন থিকা জাইরা পেট বানাইছাল কব কেরা। তোমাগো পোলাপানরে কইল ঐ জাইরা পেটের পোলার নগে মিশবার দিও না”।

লাভ হবে শুধু কাদেরের। তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শকুনের মত তার শরীরটাকে দিন-রাত ধরে খুবলে খাবে যতদিন পর্যন্ত না তার তিয়াস মেটে। তারপর অন্য একটি নতুন শরীর ভালো লেগে গেলে এক লাত্থিতে বাড়ির বাইরে বের করে দিবে।

এসব ভাবনা কোত্থেকে কোত্থেকে দৌড়ে এসে তার মাথার মধ্যে জড়ো হয়ে উদ্বাহু নৃত্য শুরু করে তার ভেতর থেকে জেগে উঠা বিদ্রোহ এতক্ষনে মাথার ভেতরে নৃত্যরত এসব ভাবনার পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। বদলে একটি ভয় ধোঁয়ার মত কুন্ডলী পাকিয়ে উপরের দিকে উঠে সালেহার শরীরটাকে নিস্তেজ করে ফেলে। চারপাশের ঝাপসা অন্ধকার ধীরে ধীরে বিশাল এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ভেতর হারিয়ে যেতে থাকে। বিস্ফোরিত চোখে রাতের আধারকেও আর দেখতে পায় না সালেহা।

৮ thoughts on “নিশ্ছিদ্র অন্ধকার

  1. ধর্ষিত হতে থাকা গৃহবধূটির
    ধর্ষিত হতে থাকা গৃহবধূটির দুঃস্বপ্নে বাস্তবতার প্রতিফলন। আমাদের সমাজের বাস্তবতার নিশ্ছিদ্র অন্ধকার এতই ঘন যে দুঃস্বপ্নও পারেনা তাকে ছাড়িয়ে গিয়ে আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে। লেখতে গিয়ে আমার কল্পনাও তাই একে অতিক্রম করে গিয়ে নতুন কিছু আনতে অক্ষম হয়ে উঠে। ভিন্ন কিছুর স্বাদ দেয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা- আমি অপারগ।

  2. এর অবসান কবে হবে? আদৌ কি হবে?
    এর অবসান কবে হবে? আদৌ কি হবে? মানুষের জীনগত কিছু বৈশিষ্ট আছে যেগুলো বোধ হয় সংশোধন অযোগ্য। :মাথাঠুকি:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *