প্রসঙ্গ ঢাবি ভর্তি পরীক্ষা ও অন্যান্য…

পরীক্ষা এবং ফলাফলঃ

গত কয়েকদিন ধরে ফেইসবুক ওয়ালে একটা বিষয় দেখতে দেখতে আর থাকতে পারলাম না। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ব্যাপক হারে কোশ্চেন ফাঁস এবং রেজাল্ট বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে তা সবাই জানে। এই বিদ্যাপীঠের একজন ছাত্র হয়ে আমি এমনিতেই খুব গর্ববোধ করি। কিন্তু যেই নিন্দনীয় ঘটনা ঘটল তাতে আমারই লজ্জা লাগে যখন ছোট ভাই/ বোনেরা বলে, ভাইয়া ঘোড়ার দৌড়ে গাঁধারাও দৌড়াবে কেন?


পরীক্ষা এবং ফলাফলঃ

গত কয়েকদিন ধরে ফেইসবুক ওয়ালে একটা বিষয় দেখতে দেখতে আর থাকতে পারলাম না। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ব্যাপক হারে কোশ্চেন ফাঁস এবং রেজাল্ট বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে তা সবাই জানে। এই বিদ্যাপীঠের একজন ছাত্র হয়ে আমি এমনিতেই খুব গর্ববোধ করি। কিন্তু যেই নিন্দনীয় ঘটনা ঘটল তাতে আমারই লজ্জা লাগে যখন ছোট ভাই/ বোনেরা বলে, ভাইয়া ঘোড়ার দৌড়ে গাঁধারাও দৌড়াবে কেন?

আমারও একই প্রশ্ন, কেন এমন হবে? আমার অতি পরিচিত কয়েকজন আছে যারা খুব ভালো পরীক্ষা দিয়েছিল, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট পায়নি। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক হত যদি দেখতাম তার নিজের ভুলের কারণে হয়নি। ব্যাপারটা তা হয়নি। একজনের দেখলাম, সে যতগুলো দাগিয়েছিল ততগুলো রেজাল্টে দেখায়নি।(ঢাবি ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টে কতগুলো দাগিয়েছে, কতগুলো ভুল, প্রত্যেক বিষয়ে মার্ক কত সব প্রদর্শন করে)। একজন মোটামুটি ভালো ছাত্র কতগুলো দাগিয়েছে সে এটার ব্যাপারে অবশ্যই বলতে পারবে। আমার এক ছোটবোন পরীক্ষা দিয়ে এসে বলেছিল, ফেইল আসবে, আমি ৪৫-৪৬ পাব। আমি অবাক হয়ে দেখছি সে ৪৫.৫ পেয়েছে। একই ঘটনা আমার নিজের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। আমি যত আইডিয়া করেছিলাম, তার খুব কাছাকাছি নম্বর পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার ঐ জুনিয়র খুব ভালো পরীক্ষা দিয়ে বলেছিল, সে কমপক্ষে ৮৫ মার্ক পাবে। রেজাল্ট দেখাল, সে ফেইল করেছে। একজনের দেখলাম, তার রেজাল্ট দেখাচ্ছে সে তিনটি বিষয়েই ১৭টি করে দাগিয়েছে এবং ৯টি করে ভুল। তুখোড় কিছু ছাত্র যারা তাদের রেজাল্টের ব্যাপারে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল, শুধুমাত্র ভুল রেজাল্ট দেখানোর কারণে তাদের ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকার। তাদের মনের অবস্থা চিন্তা করে আমারই খারাপ লাগছে।

এটি তো একটা ব্যাপার। আরেকটা হল, কোশ্চেন বাণিজ্য। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে যা জানা গেল তা হল, কয়েকভাবে এই কাজটি করা হয়েছে। প্রথমত, একটি চক্র এই ঘটনার সাথে জড়িত। যাদের ঢাবি ক্যাম্পাসে সিট পড়েছিল, কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে প্রায় ১০০টির মত(মোট ১২০টি প্রশ্ন থাকে পরীক্ষায়) প্রশ্ন তারা পেয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে যাদের সিট পড়েছিল তাদের সিস্টেম দুইটা। একটা নাম ‘হল সেটআপ’। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হলের কেন্দ্র প্রধানের সাথে যোগাযোগ করে উক্ত চক্র যেই কক্ষে কোশ্চেন খরিদকারিদের সিট পড়েছে, সেই কক্ষগুলোতে নিয়োজিত শিক্ষকদের হাত করে। পরীক্ষা শুরু হবার দশ মিনিট পর মোবাইলে ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে পরীক্ষার্থীর কাছে উত্তর আসতে থাকে। সে ফোন বের করে উত্তর দাগানো শুরু করে। আরেকটা হল ‘ডিভাইস মেথড’। এক্ষেত্রে ইএস বা এমএস ক্যালকুলেটরগুলোকে এমনভাবে একটি বিশেষ ডিভাইসে(সিম সংযোগ করে) রুপান্তর করা হয়, হলে নিয়োজিত শিক্ষক বুঝতেই পারবেন না, এটা ক্যালকুলেটর না। সেক্ষেত্রে, পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ পর ঐ ডিভাইসের স্ক্রিনে উত্তর আসতে শুরু করে। এই কাজ করতে গিয়ে এবার বেশ কিছু পরীক্ষার্থী ধরাও পড়েছে এবং তাদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, এই কাজের সাথে জড়িত এক পরীক্ষার্থীর ভিডিও জবানবন্দী গত সপ্তাহে ঢাবি বাৎসরিক সিনেট মিটিং-এ শ্রদ্ধেয় আরেফিন স্যার তুলে ধরলেও এবং শাহবাগ ও নিউমার্কেট থানায় ১৩টির মত মামলা হলেও কেন ক ইউনিটের পরীক্ষাটি বাতিল করা হল না??? একটা ছোট বাচ্চাও তো এতো কিছু জেনে এটাকে বিতর্কিত পরীক্ষা দাবি করে বসবে। এছারাও একটি বিশেষ নামধারী কোচিং-এর নামও গত বছর থেকে আসছে এর সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে।

তাহলে কি এর পেছনে রাজনৈতিক চাপ আছে? এমন কি হতে পারে না, যে সিনেট চেয়েছিল পরীক্ষা বাতিল করতে(যেহেতু ক ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট ৫ দিন পর প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যান্য ইউনিটের ক্ষেত্রে ৩৬ ঘণ্টা পরেই রেজাল্ট পাওয়া গিয়েছিল, তাই আমার এই ধারণা), কিন্তু সরকারি উপর মহল হয়ত থেকে বলা হল, রেজাল্ট প্রকাশ করতে। কারণ, পরীক্ষা বাতিল হলে তা ক্ষমতাসীনদের জন্য একটি ঋণাত্মক ব্যাপার হত, যা প্রতিপক্ষকে ইস্যু তৈরির সুযোগ করে দিত। এটা নাও হতে পারে, আমার ব্যাক্তিগত ধারণা থেকে বললাম। কিন্তু, কিছু একটা যে আছে তা তো নিশ্চিত।

এটা নিয়ে ‘সরব’-এ অনেক লেখালিখিও হয়েছে। ফিনিক্স আপুও বেশ কয়েকজনের কথা বলেছেন যারা তাদের কাঙ্ক্ষিত রেজাল্ট পায়নি ( ভুল রেজাল্ট দেখিয়েছে)।

উনারা অনেক চিন্তাভাবনা করে ফেইসবুকে একটা গ্রুপ খুলেছেন। এখানে যারা যারা ভিকটিম তারা জয়েন করছে এবং এর একটা সমাধানের চেষ্টা করছে। এমনিতেই ক ইউনিটের ভর্তি-বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করা যাবে। সেটাও আবার ৫০০ টাকার বিনিময়ে! (৫ ডিসেম্বরের মধ্যে)। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আইন মেনে কীভাবে ব্যাপারটার একটা সমাধান করা যায়, সেটাই এখানে চেষ্টা করা হচ্ছে। আমিও চাই, এর সুষ্ঠু সমাধান হোক। যেই শিক্ষার্থী বেশী পরিশ্রমে আগ্রহী, যার যোগ্যতা বেশি, যার যথেষ্ট রেজাল্ট আছে, ঢাবির অতি মূল্যবান একটা আসন তাঁর জন্যই। আমি নিজ পরিশ্রম দিয়ে এই পরিবারের সাথে যুক্ত হয়েছি, আমিই জানি এর মূল্য কতটা। শুধুমাত্র টাকা দিয়ে এই আসনগুলো কেনা অন্যায়। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং যাদের সাথে এই অন্যায় হয়েছে, তাদের কাছে আমি ঢাবির একজন শিক্ষার্থী হয়ে খুবই লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। যারা এসবের সাথে জড়িত প্রজন্ম তাদের ক্ষমা করবে না।

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নয়, আমি নিজে বলি ‘পশ্চিমের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। আমাদের এই গর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এহেন নোংরা ঘটনা যেন পরের বার থেকে না ঘটে এজন্য তো আমাদেরই সতর্ক হতে হবে তাই না? আর যারা এভাবে চান্স পাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, তোমাদের আসল চেহারা স্যারেরা কয়েকদিনেই টের পান। আর আমাদের বুঝতে সময় লাগে আরও কিছুদিন। একটা সেমিস্টার পাশ করতেই জান বের হয়ে যাবে ভায়া, বিশ্ববিদ্যালয় কঠিন জিনিস!

“প্রশ্ন ফাঁস” – এই চূড়ান্ত নোংরা ইস্যুটা নিয়ে এরই মাঝে অনেক কথা হয়ে গিয়েছে চারদিকে। এর মাধ্যমে এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে আমাদের “অসুস্থ নৈতিকতা” আমাদেরকে কতটা নীচে নামিয়েছে!

আপনারাই হয়ত দেখেছেন, পঞ্চম শ্রেণির সমাপনি পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত ফাঁস হয়েছে। যেই অভিভাবক সন্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন টাকায় কেনা প্রশ্ন, তিনি কি আদৌ একজন বাবা/মা? কীভাবে এই অন্ধকারের পথে তারা তাদের সন্তানকে এগিয়ে দিচ্ছেন আমার ছোট্ট মস্তিষ্ক তা বোঝে না। সেলিউকাস!

… এবং অন্যান্যঃ

এখন পর্যন্ত যা লিখেছি তারপর আর কিছুই লিখতে ইচ্ছে করছে না। দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আর কি বলব। আমার থেকে আপনারাই ভালো জানেন। একটা দেশের অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ হল পরিবহন ব্যবস্থা। এছারাও এটা খুবই জরুরী একটা ব্যবস্থা। একবিংশ শতাব্দীতে এসে, একটি রাজনৈতিক দল নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য এতো কিছু থাকতে পরিবহন ব্যবস্থাকে এভাবে ‘বাঁশ’ দিল কেন বুঝলাম না। আরে বাবা, বাসের ড্রাইভার হেল্পার কন্ডাক্টর এরা আপনাদের কি ক্ষতিটা করল? এদের পেটে লাত্থি মারার আগে কি একবারও মনে হয়নি এরা তো মানুষ, human being, মনুষ্য, আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষের রুজির সাথে এত বড় অন্যায় কীভাবে মানা যায়?

এটা ছাড়াও আরেকটা ব্যাপার হল, সব কিছুই এভাবে স্থবির করা মানে অর্থনীতিকে বস্তাচাপা দেওয়া। কারণ পরিবহনের সাথেই তো ব্যবসার ওতপ্রোত সম্পর্ক।

একটা অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে পারছে না, একটা ছাত্র বাড়ি গিয়ে ঢাকায় ফিরতে সাহস পাচ্ছে না, একটা ছাত্রী বাইরে বের হতে পারছে না। ধীরে ধীরে আমার মত মানুষগুলো হতাশার চরম সীমায় চলে যাচ্ছে।
এভাবে সবকিছু চলতে দেওয়া যায় না… চলতে দেওয়া যায় না…

৩ thoughts on “প্রসঙ্গ ঢাবি ভর্তি পরীক্ষা ও অন্যান্য…

  1. একটা অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার

    একটা অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে পারছে না, একটা ছাত্র বাড়ি গিয়ে ঢাকায় ফিরতে সাহস পাচ্ছে না, একটা ছাত্রী বাইরে বের হতে পারছে না। ধীরে ধীরে আমার মত মানুষগুলো হতাশার চরম সীমায় চলে যাচ্ছে।

    সহমত

  2. “একটা অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার
    “একটা অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার জন্য ঢাকায়
    আসতে পারছে না, একটা ছাত্র
    বাড়ি গিয়ে ঢাকায় ফিরতে সাহস পাচ্ছে না,
    একটা ছাত্রী বাইরে বের হতে পারছে না।
    ধীরে ধীরে আমার মত মানুষগুলো হতাশার
    চরম সীমায় চলে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *