পুড়ে ছাই হওয়া মানুষগুলোর ভবিষৎত গল্প!

[ডিসক্লেইমারঃ ইহা নিতান্তই একটি কাল্পনিক ঘটনা। বাস্তবে যেহেতু ইহা কখনো হইবে না, সেহেতু মনে মনে কল্পনা করিয়া লেখক খানিকটা মানসিক তৃপ্তি পাইবার চেষ্টা করিয়াছেন।]

ভবিৎষতের কোন এক সময়। স্থানঃ ঢাকা।


[ডিসক্লেইমারঃ ইহা নিতান্তই একটি কাল্পনিক ঘটনা। বাস্তবে যেহেতু ইহা কখনো হইবে না, সেহেতু মনে মনে কল্পনা করিয়া লেখক খানিকটা মানসিক তৃপ্তি পাইবার চেষ্টা করিয়াছেন।]

ভবিৎষতের কোন এক সময়। স্থানঃ ঢাকা।

প্রতি ৫ বছর পর পর সরকার বদল হবার সময়টুকুকে সাধারনত ক্রান্তিলগ্ন হিসাবে ধরা হয়। দেশে এখন ক্রান্তিলগ্ন চলছে। বিরোধীদল অবরোধ দিয়েছে। মানুষজন সেই অবরোধের বিন্দুমাত্রও তোয়াক্কা না করে অফিস আদালতে যাচ্ছে। জনজীবন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হলো, ঢাকাবাসী এখন আগের চাইতে অনেক বেশী সাহসী, অকুতোভয় আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদের দেশপ্রেম এবং ভ্রাতৃত্ববোধ অতুলনীয়। বিপদ অথবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা চোখের পলকে একজোট হয়ে রুখে দাড়াতেঁ পারে। মূহুর্তেই ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় বিপদ আর অন্যায়ের মেরুদন্ড।

অনেক দিন আগে, রাতের বেলা চলন্ত যানবাহনের উপর পেট্রোল বোমা মেরে বিরোধীদলের ভাড়া করা পিকেটাররা দুই/তিন ডজন মানুষ জ্যান্ত মেরে ফেলতো। মেরেই পালাতো, কে করেছে সেটা নিশ্চিতভাবে ধরা যেতো না, বিরোধীদল যথারীতি সরকারের উপর দোষ চাপাতো। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার, এর পর কোথাও কোন প্রতিবাদ হতো না। না সরকারের পক্ষ থেকে, না জনগনের পক্ষ থেকে। মানুষজন চাপা ভয় নিয়ে বাসায় বসে থাকতো। যারা বাইরে থাকতো, তারা পড়িমরি করে বাসায় এসে খিলঁ আটকে বসে থাকতো। আর আগুনে পোড়া মানুষগুলো গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি হতো আর এর পরের দুয়েক সপ্তাহ ধরে একজন একজন করে পোড়াক্ষতে ধুকেঁ ধুকেঁ মারা পড়তো। এর ভেতর শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ, কিশোর – সব বয়সের মানুষ ছিলো। এই ইতিহাস এখন দেশের তরুণ প্রজন্ম অবাক হয়ে বাপ চাচাদের মুখে শোনে। আর মনে মনে ভাবে, মানুষ এতটা পিশাচ কিভাবে হতে পারতো? আর যখন শুনে তাদের বাপ-দাদারা এর বিরুদ্ধে কিছুই করেনি, শুধু পত্রিকায় কয়েকটা ছবি ছেপেই দায়িত্ব শেষ করেছে, তখণ তারা ভ্রু কুচঁকে ভাবতে বসতো, মানুষ এতটা অথর্ব, ভিতু আর বোকা হয়ে থাকতো কি করে?

গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ হত্যা শেষবার যখন ঢাকার রাজপথে হয়েছিলো, তখন হঠাৎ করেই মানুষ রুখে দাড়ালোঁ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিলো মনে হয়, নাহলে ঢাকা শহরের শান্তিপ্রিয় মানুষেরা এমনি এমনি রুখে দাড়ানোঁর মানুষ নয়। দেয়ালে পিঠ আটকে না যাওয়া পর্যন্ত তারা ধৈর্য্য ধরে সমস্ত অন্যায় অত্যাচার মুখ বুজে সয়। তাদের ধৈর্য্য এবং কষ্ট সইবার ক্ষমতা ছিলো অপরিসীম।

কয়েক দশক আগে যখন শেষবার একটা সিএনজি পোড়ানো হলো, তখন সবার আগে রুখে দাঁড়িয়েছিলো সিএনজি ড্রাইভারটা। মরমু যখন তোগো লইয়াই মরমু – এই কথা বলতে বলতে পেট্রোলবোমা ছোড়াঁ ছেলেটাকে দৌড়ে গিয়ে ধরে জাপটে ধরে তাকে বুকের সাথে। তার নিজের সারা শরীরে তখন দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। মাত্র কয়েক মিনিটের ভেতর প্রকাশ্য দিবালোকে দুজনেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

এরপর একটা অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটলো। আগে এমন ঘটনায় মানুষ দৌড়ে যে যার মতো করে সরে পড়তো। এখন উল্টোটা করে। সবাই ছুটে আসে। কেউ পিকেটারগুলোকে ধাওয়া করে গিয়ে খুজেঁ খুজেঁ আনে, কেউ আগুন নেভানোর চেষ্টা করে, কেউ একজন গিয়ে এম্বলেন্স আর ফায়ার বিগ্রেড নিয়ে আসে। সবাই চাদাঁ তুলে দেশের সবচেয়ে উন্নত হাসপাতালে আহত লোকটাকে ভর্তি করায়। পিকেটারগুলোকে কয়েক দিন কোথাও আটকে রাখা হয়। তারপর আহত লোকটা সুস্থ হবার পর তার সামনে ঐ পিকেটারগুলোকে একটা পরিত্যাক্ত বাস বা সিএনজিতে ঢোকানো হয়। তারপর সেখানে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সবার চোখের সামনে তারা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। [দেশের সব পত্রিকা পরদিন ছবিসহ সেই ঘটনা প্রকাশ করে।]

এরপর দুইটা বিশাল দল হাতে লাঠিসোঠা আর পেট্রোল নিয়ে মিছিল করতে বের হয়। একটা মিছিল যায় বিরোধীদলে কার্যালয় আর বাসভবনে। আরেকটা দল যায় প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। সেখানে গিয়ে তারা ভাংচুর করে, আসবাবপত্রে আগুন লাগায়। প্রধানমন্ত্রীর অপরাধ, পিকেটারদের বিরুদ্ধে সে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

দুটি মিছিলেই এত বিপুল সংখ্যক লোক সমাগম হয় যে, পুলিশ, বিডিআর বা আর্মি কেউই তাদের আটকাতে সাহস পায় না। এমনকি, ঐ মিছিলে আইনশৃখ্ঙলা বাহিনীর সদস্য বা তাদের আত্নীয় স্বজন থাকেন বলে তারা কেউ ঐ মিছিলের উপর কোনপ্রকার লাঠি চার্জও করে না, গুলি করা বা টিয়ার গ্যাস ছোড়া তো বহু দূরের কথা। তাছাড়া, মিছিলের লোকজন মুটামুটি শান্তিপ্রিয়। তারা গিয়ে ভাংচুর আর আগুন ধরিয়ে চুপচাপ চলে আসে। কোনরকম অরাজকতা বা লুটপাটের চেষ্টা করে না।

এই রকম ঘটনা প্রথম দুয়েকটা ঘটানোর পর আগুন লাগানোর ঘটনা প্রায় শূন্যতে চলে আসে। অবরোধ দেয়া হলেও পিকেটাররা ভয়ে রাস্তায় নামে না। কারন তাদের চোখের সামনেই তাদের ভাই/বন্ধুদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে। বিরোধীদল আগে প্রতি গাড়ি পোড়ানো বাবদ ৫ হাজার টাকা দিতো। এখন তাদেরকে ৫০ হাজার টাকা করেও অফার করে বলে শোনা গেছে। কিন্তু তারা তাতেও রাজী হয় না।

ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগ যখন নিজেদের ঘাড়ে এসে পড়া শুরু করলো, তখন দেশের মন্ত্রীসভা এবং বিরোধী দলের সাংসদরা মিলে তড়িঘড়ি করে আলাদা একটি আইন পাশ করলো। নতুন আইন অনুযায়ী, নিরীহ লোকেদের গায়ে এবং/অথবা যানবাহনে আগুন লাগানোর ঘটনা প্রমানিত হলে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যারা জড়িত, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জনসমক্ষে তাদের ফাসিঁ কার্যকর করা হয়। আপিল বা জামিনের কোনই সুযোগ রাখা হয়নি।
ধরা পড়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে যায়, ইন্টারোগোশেন করে তাদের আস্তানা খুজেঁ বের করা হয়। এসব ঘটনায় অবধারিতভাবেই বিরোধীদল জড়িত থাকে, তবু পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার জন্য এ্যারেষ্ট করা থেকে শুরু করে ইন্টারগোশেন করা, জড়িতদের এরেষ্ট করা ও ফাসিঁ দেয়া পর্যন্ত পুরো ঘটনাটি টিভির প্রতিটি চ্যানেলে লাইভ দেখানো হয়। প্রতিটি ঘটনাতেই পিকেটাররা বিরোধীদলের কথা স্বীকার করেছে, বিরোধীদলের কোন নেতা তাদের এ কাজে লাগিয়েছে তার নাম ঠিকানাও বলে দিয়েছে। দেশের মানুষ পুরো প্রসেসটা টিভিতে সরাসরি দেখতে পায় তাই কেউ এই ঘটনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না।
র‌্যাব আর ডিবি পুলিশ গিয়ে ঐ নেতার বাড়িতে হানা দেয়। নেতাকে না পাওয়া গেলে তার সহায় সম্পত্তি ক্রোক করে সরকারী কোষাগারে জমা করা হয়। এরপর সরকারী তহবিল থেকে আগুনে পুড়ে যাওয়া ব্যাক্তিগুলোকে পরবর্তী ছয়মাস ধরে আর্থিক, শারিরীক, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা দেয়া হয়। আগুনে পুড়ে মারা গেলে মৃত ব্যাক্তির ওয়ারিশগনকে বিপুল পরিমান নগদ অর্থ ও জায়গা জমি বা আবাসস্থল দেয়া হয়। তবে বেশীরভাগই ঐ টাকা দিয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। তাদের আশংকা, বিরোধীদর ক্ষমতায় গেলে তাদের উপর প্রতিশোধ নেবে। যদিও এখন পর্যন্ত এমন ঘটনা মাত্র একবার ঘটেছিলো। সেই সময় পুলিশ আর ক্রেন দিয়ে ক্ষতিপূরন প্রাপ্ত লোকটিকে ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টাকালে এলাকার লোকজনের ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে সরকারী বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর আর কখন আসেনি।

মাঝে কিছু মানবাধিকার সংগঠন কিছুদিন উচ্চবাচ্চ্য করেছিলো, তাদের মতে, প্রকাশ্যে ফাসিঁ দেয়া মানবাধিকারের লংঘন। টিভিতে লাইভ দেখানোও মানবাধিকারের লংঘন। ইন্টারগোশনে নিমর্ম পদ্ধতি ব্যবহার করা মানবাধিকারের লংঘন। সরকারের কিছু করতে হয়নি, তাদেরকে ঠান্ডা করে দিয়েছিলো দেশের জনগনরাই। যেসব মানবাধিকার সংগঠনগুলো এমন কথা বলেছিলো, তাদের অফিসে গিয়ে ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগ করে অফিসের পুরুষ বসদের ধরে এনে প্রকাশ্যে লাঞ্চিত করা হয়েছিলো। শহরের মাঝখানে গিয়ে তাদের জামা কাপড় ছিড়েঁ সারা গায়ে লাল রং দিয়ে লেখা হয়েছিলো – ”যখন পিকেটারদের দেয়া আগুনে রাজপথের একজন মানুষ জ্যান্ত পুড়ে মারা যেতো, তখন কোথায় ছিলো আপনাদের মানবাধিকার লংঘনের বুলি?” এরপর তারা পুরো সাইজ হয়ে গেলো। এ্যামনেষ্টী ইন্টারন্যাশনাল আর রেডক্রসও কথা বলতে চেয়েছিলো, কিন্তু এই ঘটনার পর তারাও চুপ মেরে যায়। আর এদেশে আসেনি।

অনেক বছর পর, কিছুদিন আগে শাহবাগের মোড়ে দুজন পিকেটার একটা বাসে পেট্রোলবোমা ছুড়েঁ মারে। মানুষজন প্রথমে অবাক হয়ে যায় পিকেটারের আসম্পর্ধা দেখে। দুয়েক দশক আগে হলে পাবলিক
সব দৌড়ে পালাতো। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই।

এরপর যথারীতি, তারা দৌড়ে গিয়ে দুজনকে ধরে ফেলে। তাদের গায়ে পেট্রোলের গন্ধ শুকেঁ সহজেই ঘটনার সাথে তাদের সম্পৃক্ততা অনুমান করা যায়। পুলিশ এসে যথারীতি ধরে নিয়ে গেলো, পেছনে পেছনে গেলো একাগাদা সাংবাদিক। আগামী দুদিনের ঘটনা তারা লাইভ দেখাবে। মানুষজন অনেকদিন পর আবার একটা ফাসিঁ দেখতে পাবে। মানুষজনকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার অপরাধে ৪৮ ঘন্টার মাথায় ফাসিঁ!

৪ thoughts on “পুড়ে ছাই হওয়া মানুষগুলোর ভবিষৎত গল্প!

  1. দুয়েক দশক আগে হলে পাবলিক
    সব

    দুয়েক দশক আগে হলে পাবলিক
    সব দৌড়ে পালাতো। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই।

    দেখে অব্যস্থ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *