শাবিপ্রবি সঙ্কট : নেপথ্যে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা?

প্রিয় পাঠক, কিছুক্ষণ আগে শাবিপ্রবির জনৈক সাবেক শিক্ষার্থী আমার কাছে একটি ইমেইল পাঠিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান সঙ্কটের পেছনে দায়ী কয়েকজন ব্যক্তির পরিচয় উল্লেখ ও জাফর ইকবাল স্যারের সাথে তাদের শত্রুভাবাপন্ন মনোভাবের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানিয়েছেন, গুচ্ছ পদ্ধতি বাতিল বা কোটা পদ্ধতি প্রচলনের আন্দোলনের আড়ালে তারা মূলত জাফর ইকবাল স্যার ও ইয়াসমিন হক ম্যাডামকে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাই করে যাচ্ছেন। বিগত বছরগুলোতে নানা কারণে জাফর স্যারের সাথে তারা বিচ্ছিন্নভাবে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বর্তমানে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে স্যারকে অপসারণ করার জন্য মাঠে নেমেছেন। স্যারের বিরুদ্ধে স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করা ৩৭ ব্যক্তিই ঘটনার মূল কুশীলব। গত কয়েকদিন ধরে ঘটে যাওয়া পুরো ব্যাপারটি মূলত তাদের সমন্বিত পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন।
.

প্রেক্ষাপট:

কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় বর্তমান সঙ্কটের পেছনে ইন্ধনদাতা ব্যক্তিবর্গ স্যার ও ম্যাডামের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন।

## ২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরী এবং রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুসের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এর পরে মইনুদ্দিন আহমেদ জালালের (৩৭জন স্বাক্ষরকারীর অন্যতম) সাথে ম্যাডামের বিয়ে হয়। ইয়াসমীন ম্যাডাম নাজিয়া ম্যাডাম কে সব সময় আন্তরিকভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন নাজিয়া ম্যাডাম যেন তাঁর তিন মেয়ের কথা চিন্তা করেন। তাছাড়া ইউনুস স্যার ও নাজিয়া ম্যাডামের বিচ্ছেদ হলে তা ক্যাম্পাসে কেমন প্রতিক্রিয়া ফেলবে তাও নাজিয়া ম্যাডাম কে বোঝানো হয়। এদিকে নাজিয়া ম্যাডামের পেছনে আনুমানিক ১০ বছর লেগে থেকে শেষে তাকে বিয়ে করতে পারেন অ্যাডভোকেট মইনুদ্দিন আহমেদ জালাল। সুতরাং ইয়াসমিন ম্যাডামের উপর ওনার ব্যক্তিগত আক্রোশ আছে। এর জের ধরে বিয়ের পর থেকেই ইয়াসমিন ম্যাডামের সাথে নাজিয়া ম্যাডামের দূরত্ব বাড়তে থাকে — অথচ নাজিয়া ম্যাডাম শাবিপ্রবির প্রথম ব্যাচের এবং ইয়াসমিন ম্যাডামের ছাত্রী। জাফর স্যার ও ইয়াসমিন ম্যাডাম “আমাদের আপনজন” বলতে নাজিয়া ম্যাডামকে বুঝিয়েছেন।

## জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল আলি আহমদ সাহেব জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত। উনি সেদিন যেসব অভিযোগ এনেছিলেন জাফর স্যার এর বিরুদ্ধে, যেমন জাহানারা ইমাম হল নামকরন, ক্যাম্পাসে মূর্তি স্থাপন ইত্যাদি — এগুলো মূলত জামায়াতের ইস্যু।

## স্কলার্স হোমের প্রিন্সিপাল জুবায়ের সিদ্দিকি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক আশরাফ স্যারের মেয়েকে ভর্তি নিতে চান নি। জাফর স্যার তাঁকে বলেছিলেন, “শিক্ষা মৌলিক অধিকার, আপনি ভর্তি নিবেন না কেন?” পরে আশরাফ স্যার জুবায়ের সিদ্দিকির নামে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। এজন্য জুবায়ের সিদ্দিকি স্যারের উপর নাখোশ।
.

সঙ্কটের সূত্রপাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা:

## সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন চৌধুরী — দুজনেই অ্যাডভোকেট মইনুদ্দিন আহমেদ জালালের ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু। তাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বের জাফর ইকবাল স্যারের বিরোধিতার পেছনে অ্যাডভোকেট মইনুদ্দিন আহমেদ জালালের ইন্ধন থাকতে পারে।

## “আমি বাংলাদেশী না, সিলেটী“ বলা ভদ্রলোক লে. কর্ণেল (অব.) এম. আতাউর রহমান পীর ৩৭ জন স্বাক্ষরকারীর অন্যতম। তিনি মদনমোহন কলেজের প্রিন্সিপ্যাল থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে বহিষ্কৃত। তিনি বর্তমান মেয়রের নির্বাচনকালীন প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন।

## অ্যাডভোকেট জালাল নিজে ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। ওয়ার্কার্স পার্টির সিলেট সভাপতি ভদ্রলোকও অ্যাডভোকেট। গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতি বাতিলের কার্যক্রম এই সভাপতিকে দিয়ে শুরু করানো হয়েছিলো। জাফর স্যার তাঁর পদত্যাগপত্রেও উল্লেখ করেছেন যে তিনি বামপন্থীদের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, স্যার বামপন্থীদের বিরোধিতাকে পত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ স্যারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক (বর্তমানে লিয়েনে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য) সুশান্ত স্যার পলিট ব্যুরোর (ওয়ার্কার্স পার্টির নীতিনির্ধারণী কমিটি) সদস্য। সুশান্ত স্যার গতকাল জাফর স্যারকে ফোন করে জানিয়েছেন যে তিনি ব্যথিত ও বিব্রত।
.

চক্রান্ত সফল হলে যা হতে পারত:

শাবিপ্রবির উক্ত প্রাক্তন শিক্ষার্থী মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক বলতে আছেন হাতেগোণা ৫-৭ জন। এঁদের মধ্যে জাফর স্যার ও ইয়াসমীন ম্যাডাম সর্বাগ্রে উল্লেখ্য। শুধু তাই না, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল চেতনার অগ্রপথিকও মূলত তাঁরাই। তাঁদের সরিয়ে দিতে পারলে শাবিপ্রবিতে প্রগতিশীলতার ধারা অনেকাংশেই মূলোৎপাটিত হবে এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার ধারাটি বহুলাংশে শক্তিশালী হবে, যা অনেকেই গত কিছুদিন ধরে আশঙ্কা করছেন।

জাফর স্যার ও ইয়াসমীন ম্যাডাম প্রগতিশীলতার পাশাপাশি বিজ্ঞানের ছাত্রদের পড়াশোনা ও গবেষনার ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা রেখে আসছেন। বর্তমানে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী চর্চার প্রেরণার উৎস এই দু’জন মানুষ, এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এই দু’জন শাবিপ্রবি থেকে অকালে বিদায় নিলে খুব স্বাভাবিকভাবেই গবেষণাধর্মী কাযের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি সুনাম হারাবে।
.

একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন: উপরের কথাগুলো আমার সূত্র, প্রাক্তন সাস্টিয়ানের ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো একটি তত্ত্ব। এটি সত্য হলে উপরে বর্ণিত কুচক্রী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের ব্যক্তিগত আক্রোশের জের ধরে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা ও তার মাধ্যমে অগণিত শিক্ষার্থীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। তাই আমি দাবি জানাচ্ছি, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যম যেন পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

৯ thoughts on “শাবিপ্রবি সঙ্কট : নেপথ্যে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা?

  1. অনেক কিছু জানতে পারছি, পিয়াস
    অনেক কিছু জানতে পারছি, পিয়াস ভাই আপনার লেখাতে আগুন আছে, আগের লেখার সাথে আবার নতুন লেখা, আরো জানতে চাই সাস্ট নিয়ে, প্লিয আরো পোস্ট করুন

  2. আমি দাবি জানাচ্ছি, স্থানীয়

    আমি দাবি জানাচ্ছি, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যম যেন পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়

    সহমত আপনার সাথে।

  3. ধন্যবাদ আপনাকে গোপন সত্য
    ধন্যবাদ আপনাকে গোপন সত্য জানানোর জন্য॥ ৭১ এ টার্গেট ছিলেন বুদ্ধিজীবিরা এবারও তাই হচ্ছে॥

    1. ভাই, লেখাটা একটু কষ্ট করে
      ভাই, লেখাটা একটু কষ্ট করে শেয়ার করবেন। আমি নিজের পাবলিসিটি চাই না, আমি শুধু চাই ব্যাপারটা যেন মিডিয়ার নজরে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *