অন্তরের শান্তি

মানুষের আত্মশক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়, অন্যের আক্রমণে তার প্রতিক্রিয়া বা স্বাভাবিক থাকার দক্ষতা দেখে। দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়ে নিজেদেরকে স্বাভাবিক রাখতে পারেন না। প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে নিজের অন্তরের শান্তি হারিয়ে ফেলেন। ফলে তিনি যা করেন, তাতে আর আগের মতো প্রাণ পাওয়া যায় না। তাছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিটি যদি হয়ে থাকেন কোন জনহিতৈষী, তবে তো কোন কথাই নেই। মহাত্মা গান্ধীর জীবনী এবং তার একটি প্রামাণ্যচিত্রে দেখেছি, প্রতিপক্ষের আক্রমণকে কীভাবে স্মিতহাস্যে অতিক্রম করে যেতেন। অন্যের যেকোন প্রকার আক্রমণকে যথাযথভাবে মোকাবেলা বা বিষয়টি থেকে নিজেকে ছাড়িযে নিতে না পারলে, নিজেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।

অন্তরের শান্তি না থাকলে, মানুষ যে নিজের কার্যকারীতা হারায় তার একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত পেলাম।একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, যার প্রতিটি কথায় শক্তি পাওয়া যেতো; যার প্রতিটি বক্তব্য আমাদের জন্য প্রণিধানযোগ্য, উদ্ধৃতিযোগ্য ছিলো – তার কথাগুলো আজ কত বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সবকিছুকে তিনি আর ইতিবাচক হিসেবে জনগণের সামনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন না। কারণ তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এখন আর সন্তুষ্ট নন।

সন্তুষ্ট থাকার পথে সবচেয়ে বড় বাধাটি হলো, অন্যের প্রতি রাগ বা অসন্তুষ্টি বা ঈর্ষা। নিজের স্ত্রী আর নিজের ভাইবোন থেকে শুরু করে বন্ধু বা সহকর্মী পর্যন্ত, প্রতিদিন কত মানুষের সাথে আমাদের পথ চলা! মানুষের জঙ্গলে বাস করে, মানুষকে এড়িয়ে চলতে চাই। “কুমিরের সাথে ঝগড়া করে জলে বাস করা যায় না” – প্রবাদটি আমরা বেশ ভালো বুঝি, কিন্তু মানুষের সাথে ঝগড়া করে অবলীলায় ‘স্থলে’ বাস করে চলেছি! পানিতে চলার জন্য সাঁতার শিখি, স্থলে চলার জন্য গাড়িতে ওঠি – মানুষের মধ্যে বাস করার জন্য আমরা কোন উপায় অবলম্বন করি না, তা কি হয়?

মনস্তাত্ত্বিক দার্শনিকেরা বলেন, সকল রোগই মন দিয়ে প্রবেশ করে, মনই হলো সকল রোগের উৎপত্তিস্থল। অশান্ত মস্তিষ্কে কখনও ভালো পরিকল্পনা আসে না। অন্তরে অস্থিরতা নিয়ে জীবনকে ভালো পথে পরিচালনা দেওয়া যায় না। চীনারা মার্শাল আর্টকে সুস্থ জীবনের উপায় হিসেবে দেখে। দেহ মন আত্মাকে তারা অন্তরের শান্তি বা inner peace দিয়ে একত্রিত করার চেষ্টা করে। একটি শান্ত মনই পারে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে। অনেকে বলেন সুস্থ দেহে সুস্থ মন, এটি ঠিক। কিন্তু সুস্থ মনে সুস্থ দেহ – প্রথমত এই কথাটিকে বিশ্বাস করতে হবে। মনের ভেতর কামনা লালসা জিঘাংসা আর পরশ্রীকাতরতা রেখে দিয়ে ব্যায়াম করলে আর ঔষুধ খেলে কোনই লাভ হয় না।

“যা হবার তা হবেই, যা হয়েছে তা হবারই কথা ছিলো – সৃষ্টিকর্তা তোমায় ধন্যবাদ।” আমার এক দূরবর্তী বন্ধুর দাদি একথাটি জপে তার জীবন শেষ করেছেন। সমগ্র জীবন দিয়ে তিনি দেখেছেন, যা হবার তা হবেই আর যা হয়েছে তা হবারই কথা ছিলো। তিনি সকল অবস্থায় সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলতেন না। বন্ধুর ওই দাদিটি একশো পাঁচ বছর বেঁচেছিলেন পৃথিবীর পূর্বপ্রান্তের একটি দেশে। মাঝে মাঝে ভাবি, প্রকৃতিতে দৃষ্টি দিলে কত চিহ্ন পাওয়া যায় একটি সিস্টেমের, কত প্রমাণ পাওয়া যায় একজন সিস্টেম এনালিস্টের, কত আকৃতি দেখা যায় একজন কারিগরের – তবু কেন কৃতজ্ঞ হয় না এই অন্তর! তবু কেন শান্ত হয় না দুরন্ত আত্মাটি?

Inner Peace জোর করে আনানো যায় না, এটি আসে অন্যের সাথে আমার সহাবস্থানের অভ্যাস থেকে। পার্শ্ববর্তি মানুষগুলোর সাথে, অথবা যাদের সাথে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ হয় – তাদের সাথে একটি স্বাস্থ্যসম্মত সম্পর্ক থেকেই আসে অন্তরের শান্তি। এর সাথে অর্থ বা শক্তির কোন সম্পর্ক নেই।

[ শান্তির সন্ধান করতে গিয়ে কিছু তথ্যকণা ]

৩ thoughts on “অন্তরের শান্তি

  1. দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিরা

    দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়ে নিজেদেরকে স্বাভাবিক রাখতে পারেন না।

    একেবারে বাস্তব কথা বলেছেন ভাই,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *