ভার্সিটির ডাল (ডাইল নয়) : ৩য় পর্ব – মাওলানা ভাসানী হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ভর্তি পরীক্ষার আগে, ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সময় এবং ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর waiting list এ থাকার সুবাদে বেশ কয়েক মাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাওলানা ভাসানী হলে থাকার ভাগ্য (সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য জানি না) হয়েছিল। থাকতাম এলাকার বড় ভাই খোকন ভাই এর রুমে। তিনি থাকতেন ২৩৪ নম্বর রুমে যেটি ছাত্রদলের মার্কামারা রুম ছিল। রুমের ভিতর বিভিন্ন নায়িকাদের পোস্টার শোভা পেত। কি হলিউড কি বলিউড সব নায়িকাদেরই উপস্থিতি ছিল। কেবল বাংলা সিনামার নায়িকাদের উপস্থিতি ছিল না। এর কারন কি হতে পারে তা গবেষণা করেও বের করতে পারি নি। সম্ভবত আমরা দেশীয় পণ্যে আকৃষ্ট হতে পছন্দ করি না। ওই যে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না ওই জাতীয় আর কি। Human psychology আসলেও গবেষণার দাবি রাখে।

ক্যাম্পাসে র‍্যাগ দেওয়ার রেওয়াজ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হয়েছিল তা আমার জানা নেই। অনেকেই বলেন জাহাঙ্গীরনগরে আবার অনেকেই বলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সঠিক তথ্যটা কেউ জানালে উপকৃত হব। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাগ বেশ বিখ্যাত ছিল। এই র‍্যাগ দেওয়া হয় সাধারনত ১ম বর্ষের ক্লাশ শুরু হবার ঠিক পরপরই। ডাল বিষয়ক যেই কাহিনী আপনাদের এখন শোনাব তার সাথে এই র‍্যাগের কিছুটা সম্পর্ক আছে।

ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টে waiting list এ ছিলাম। যেহেতু ক্লাশ শুরু হবার পরেও অনেকে medical বা buet এ সুযোগ পেয়ে চলে যেত তাই waiting list থেকে ভর্তি হবার সম্ভাবনা থাকত। ক্লাশ শুরু হয়ে গেলে waiting list এর অনেকেই চান্স পাবার আশা ছেড়ে দিয়ে চলে যেত। তাই লিস্ট এর অনেক পেছনের জনও চান্স পেয়ে যেত। সেই ধান্দায় ক্যাম্পাসে থেকে গিয়েছিলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াতে ১ম বর্ষেই সিট পাওয়া যাওয়ার কারণে ভর্তির পরেই সবাই হলে উঠে যেত।

ভর্তি পরিক্ষার আগে থেকেই হলে ছিলাম। তাই হলের বেশিরভাগ ছাত্রই ভুলে গিয়েছিল যে আমি আসলে আবাসিক ছাত্র নই। আর খোকন ভাই এর রুমে ছিলাম তাই অন্যরা কেউ নতুন হিসাবে জ্বালাতন করত না। তিনি আমাকে তার ছোট ভাই হিসাবে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যেদিনের ঘটনা সেদিন রাতে খাবার পর রুমে বসে আছি। পাশের বিছানায় আসাদ ভাই বসে ছিলেন। হঠাৎ করেই তার ফোন বেজে উঠল। কার সাথে যেন কথা বললেন। তারপর তাড়াহুড়া করে রুম ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিলেন। কি মনে করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার সাথে চল। একটা মুরগি ধরা পরসে। দেরি করলে মজা মিস হয়ে যাবে। কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না কিন্তু বড় ভাই বলছেন তাই আমিও ঝটপট তৈরি হয়ে নিলাম।

আমরা দুইজন মিলে তিন তলার একটা রুমে ঢুকলাম (রুম নাম্বার এই মুহরতে মনে পড়ছে না)। ঢুকে দেখি তিনজন সিনিওর ভাই এর সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। চেহারা এবং ভাবভঙ্গি দেখেই বুঝলাম 1st year এবং নতুন হলে উঠেছে। এও বুঝলাম এই হচ্ছে সেই মুরগি। এটাও বোঝার বাকি থাকল না যে এই মুরগিকে এখন ছিলা হবে মানে র‍্যাগ দেওয়া হবে। বেচারার জন্য খারাপ লাগছিল কারন আমিও তো নতুন। কিন্তু চুপচাপ দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।

বিভিন্ন ভাবে ছেলেটাকে সাইজ করা হল। ডালের অংশটুকুতে আসি। কথোপকথন নিম্নরুপঃ

বড় ভাইঃ “এই মুরগি, তোর মাথার চুল এত নোংরা কেন? শ্যাম্পু করিস না?”

ছেলেটা (কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে)ঃ “ভাই করি তো কিন্তু আজ করা হয় নাই।“

বড় ভাইঃ “কেন করা হয় নাই?”

ছেলেটা (অপরাধী মুখ করে)ঃ “আজ ঠাণ্ডা পরসে বেশি, তাই গোসলই করি নাই।“

বড় ভাইঃ “খুব খারাপ, আমদের হলে থাকবি আর রেগুলার গোসল করবি না তা হয় না (প্রসঙ্গত তিনি নিজেও সাতদিনে একদিন গোসল করেন)”।

ছেলেটা (কাঁচুমাচু মুখ করে)ঃ “আর হবে না ভাই।“

বড় ভাই- “ঠিক আছে, কিন্তু তোর চুল থেকে গন্ধ বের হচ্ছে। এখনই তোর চুলে শ্যাম্পু করতে হবে।“

ছেলেটা (অল্পের উপর দিয়ে বেঁচে গেছে এইরকম ভাব করে)ঃ “জী ভাই, এখনই করছি।”

বড় ভাই- “আরে দাঁড়া, অস্থির হচ্ছিস কেন? এই রুমেই তোর চুলে শ্যাম্পু করতে হবে। আর আমাদের হলের পানি দিয়ে শ্যাম্পু করলে তোর চুলের ময়লা পরিষ্কার হবে না। হলের ডাল দিয়ে তোর চুল শ্যাম্পু করতে হবে। ওই পিন্টু (হলের ডাইনিং বয়), ছোট গামলা দিয়ে এক গামলা ডাল নিয়ে আয় তো।“

বলাই বাহুল্য, বেচারাকে এই ডাল দিয়েই সেই রাতে চুল শ্যাম্পু করতে হয়েছিল। ডালের এই চমৎকার ব্যবহার প্রথম দেখলাম। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা এই নিয়ে গবেষণা করতে পারেন। তাহলে চুলের চিকিৎসায় যুগান্তকারী আবিষ্কার যেমন হবে, তেমনি ভার্সিটির ডালের উপর ছাত্রছাত্রীদের বিতৃষ্ণা ভালবাসায় রূপ নিবে। বলা যায় না, এর জন্য হয়ত নোবেল প্রাইজ ও পাওয়া যেতে পারে।

পাদটীকাঃ ধোলাই পর্ব শেষ হবার পর বড় ভাইরা সেই ছেলেকে ভাল করে খাইয়েছিলেন এবং এটাও বুঝিয়েছিলেন যে এটা ছিল শুধুই র‍্যাগ, শুধুই ফান। এবং পরবর্তীতে তাদের সম্পর্কও ছিল অনেক চমৎকার। আমি অবশ্য চমৎকার সম্পর্ক তৈরি করার জন্য এমন sacrifice করতে মোটেই রাজি নই।

১ম পর্ব – শাহ্‌ আমানত হল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

২য় পর্ব – শহীদ শামসুজ্জোহা হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১১ thoughts on “ভার্সিটির ডাল (ডাইল নয়) : ৩য় পর্ব – মাওলানা ভাসানী হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  1. পুরান দিনের কথা মনে পইড়া গেলো
    পুরান দিনের কথা মনে পইড়া গেলো শঙ্খচিলের ডানা ভাই… :ভালাপাইছি: :ভালাপাইছি: :চশমুদ্দিন: :নৃত্য: :থাম্বসআপ: :বুখেআয়বাবুল:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *