পুরোনো গীটার

বছরখানেক আগে ট্রেন ইস্টিশন বাস ইস্টিশন সব যায়গায় একটা গান শোনা যাইতো। “আমার ঘরে আমি মেম্বার আমার বউ চেয়ারম্যান।” আর কোনো লাইন মনে নাই, কিন্তু এই লাইনটা অবিস্মরণীয়। কিছু গানের লাইন আছে একেবারে দিলের ভিতর হান্দাইয়া যায়। যেমন একবার কোনো এক বিকেলে পরী’দর্শনে গলির মুখে দাড়াইছি। পরী আর আসেনা, চলে আসছে এলাকার এক উঠতি রোমিও। তার ফোনে বাজতেছিলো সে এক অমর গান। “কি সুন্দর চেহারা, যেন কচি পেয়ারা” ..আহা! প্রেয়সীর চেহারার এরকম পুষ্টিকর বর্ণনা ভারাপদ রায়ও দিতে পারে নাই। যাই হোক হাসিনা তখন নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আর আমি কিনে ফেলছি নতুন ফুটবল। আমাদের সময়ে পিচ্চিদের নিয়ম ছিলো আছরের পর বের হবা, মাগরিবের সাথে সাথে ঘরে ঢুকে যাবা। বিকেলে পোলাপানের সাথে খেলতে যাই। খেলার মাঠে চলে স্বৈরতন্ত্র। আমার ফুটবলে আমি মেম্বার আমি চেয়ারম্যান। শুধু চেয়ারম্যান না, রেফারি ডিফেন্ডার স্ট্রাইকার সব কিছু আমি। সেই ক্লাস টু’তে থাকতেই বুঝে গেছি ‘বল যার মুল্লুক তার।’ আমাদের সাথে একটা ছেলে খেলতে আসতো। বাপ্পি। মোটাসোটা বেকুবটা একটু পর পর বলে উঠতো “হরিপদ একজন সাদামাটা ছোটখাটো লোক, আকাশ থেকে নেমে এলো একরাত্রে বড় বড় বড় বড় গোল গোল চোখ” …এই পোলাই আমার মাথার ভিতর অঞ্জনের পোকা ঢুকায়ে দিছে। সেই বাপ্পি অনেক আগেই পৃথিবীর পাঠ চুকিয়ে ফেলছে। শুধু থেকে গেছে অঞ্জনের গান।

সময়টা কিশোর মুসা আর রবিনদের। আমিও ততদিনে হাফপ্যান্ট ছেড়ে কিশোর হয়ে গেছি। মাঠে খেলতে আর ভাল্লাগে না। কিশোর মুসাদের সাথে সারাদিন নানান যায়গায় বেযায়গায় ঘুরে বেড়াই। আর আমার চল্লিশ জিবি হার্ডডিক্স ওয়ালা কম্পিউটারে বাজতে থাকে ‘বাড়ি ছেড়েছি ডিসেম্বর মাসে, পালাতে হয়নি দাদা তাড়িয়েছে।’ তখন পিউর ননসেন্স গুলাই বেশি ভাল্লাগতো। ডাক্তার বলছে ক্যালসিয়ামটা কম। খাদের ধারের রেলিংটা। ভেংচি কেটে দেখ। আর রঞ্জনাতো তখন জাতীয় সঙ্গীত।

ভার্সিটিতে উঠে রাতে গান শোনা শিখছি। এইটা কালবেলা। হাফ চকলেটের যায়গা দখল করে নিলো জেরমীর বেহালা। আর বুড়ো পুরোনো গীটার। নন্দীবাবুর জন্য মায়া হয়, ‘সংসারটার হাল ধরেছে বখাটে তার ছোট ছেলে।’ এক সময় মনে হলো আমাদের ফিউচার খুবই অপরিষ্কার, ভরসা পাচ্ছিনা কোনো। কাঞ্চনজঙ্ঘাটা বড় বেশি ভালো লাগে।

জয়িতা বেলা বোসদের প্রেমে পড়ছিলাম হয়তো। তবে আমার প্রথম প্রেম কালবেলার মাধবীলতা। মানুষ ইন্ডিয়ায় গেলে তাজমহল দেখে। ধর্মপ্রাণরা আজমীর যায়। আমি ঠিক করে ফেলছি, যদি কখনো যাই প্রথম যাবো জলপাইগুড়ি। আমার ধারণা চা বাগান, জঙ্গল কিংবা পাথুরে পাহাড়ি নদী কোনো কিছুই চিনতে আমার ভুল হবেনা। সব পরিচিত।

সময়টা অদ্ভুত। স্টিভ ওয়াহর আত্নজীবনী আউট অব মাই কমফোর্ট জোন পড়তে শুরু করি। মন বসেনা। কাজিনের কাছ থেকে অনেক আগে Argo ডকুমেন্টিরি মুভিটা নিছিলাম। যদিও বিতর্কিত। ১৯৭৯তে ইরানে ইসলামিক রেভ্যুলেশনের সময় আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে হামলা এবং পরবর্তী ঘটনা বিষয়ক। ঐটা দেখতে বসি। কিছুক্ষন টেনে টুনে দেখি, ভাল্লাগেনা। টিভি খুললেই শুধু মনে হয় সুদিন আসবে বলে ওরা আগুন জ্বালায়।

তিনটা জিনিস নাকি পৃথিবীর সবাই চিনে। কোক, যিশু আর পেলে। আমি সুমনকেও চিনি। বাংলা গানের ঈশ্বর। আরো একজন অবশ্য আছে, বব মার্লে। অঞ্জন ইশ্বর না, বন্ধু। গলায় অসাধারণ কোনো সুর নাই। আহামরি কোনো গান নাই। কিন্তু বন্ধুতো বন্ধুই। খুব টানে।

অনেক কিছু বদলে গেছে। বাপ্পির সাথে খেলার মাঠটা আর নাই। সেখানে এখন নতুন বিল্ডিং। সুন্দরী দুইটা মেয়ে আছে, নতুন আসছে। সুমন, চট্টোপাধ্যায় থেকে কবির হয়ে গেছে। গিলক্রিস্টও চলে গেলো। আমি আছি। এই বেশ ভালো আছি। বেঁচে আছি।

১৭ thoughts on “পুরোনো গীটার

  1. “তিনটা জিনিস নাকি পৃথিবীর
    “তিনটা জিনিস নাকি পৃথিবীর সবাই চিনে। কোক, যিশু আর পেলে। আমি সুমনকেও চিনি। বাংলা গানের ঈশ্বর। আরো একজন অবশ্য আছে, বব মার্লে। অঞ্জন ইশ্বর না, বন্ধু। গলায় অসাধারণ কোনো সুর নাই। আহামরি কোনো গান নাই। কিন্তু বন্ধুতো বন্ধুই। খুব টানে” অসাধারণ কটা লাইন।

    আমি নিজেও অঞ্জনের ফ্যান সেই ক্লাস ৭-৮ থেকে-ই। আপনার পোস্ট টা পরে খুব খুব ভালো লাগল. মনে পড়ল “মালার” কথা, বেলা বোস এর কথা।”বাপি আর মার” কথা, “জানলার” কথা, ছন্দার কথা।

    যারা অঞ্জন ভক্ত একমাত্র তারা – ই ব্যাপারটা বুঝতে পাড়বে। আসলে, অঞ্জন থেকে -ই যে গান কি … তা বুঝতে পারার শুরু।

  2. আমার জানলা দিয়ে আমার পৃথিবী।
    আমার জানলা দিয়ে আমার পৃথিবী। আসলে যারা অঞ্জন শোনে শুধুমাত্র তারাই বুঝবে অঞ্জন কী। অন্য কাউকে বলে বোঝাতে পারবেন না, কেন অঞ্জন শুনতে হবে কিংবা কেন অঞ্জন শুনেন। অঞ্জন সুরসম্রাট না, তার গান বিচারকদের রায়ে বড়জোর পাস নাম্বার পাবে। কিন্তু আমার ভালোলাগে এটাই শেষকথা।

  3. কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম পড়তে
    কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম পড়তে পড়তে… :মাথানষ্ট: :ভালাপাইছি: :দিবাস্বপ্ন: চমৎকার বললেও কম বলা হবে… :থাম্বসআপ: :ফুল: :গোলাপ: :বুখেআয়বাবুল:

  4. অঞ্জন ইশ্বর না, বন্ধু। গলায়

    অঞ্জন ইশ্বর না, বন্ধু। গলায় অসাধারণ কোনো সুর নাই। আহামরি কোনো গান নাই। কিন্তু বন্ধুতো বন্ধুই। খুব টানে।

    :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

    পুরো লেখাটাই অসাধারণ লাগল। :মুগ্ধৈছি: :বুখেআয়বাবুল: :গোলাপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *