ছোটবোনের লাশের বিনিময়ে পাওনা টাকার আশায় বাবু



সেদিন সাভারের বাবুকে নিয়ে ষ্ট্যাটাসটা পড়ে Fazlul Bari ভাই একটা নাম্বার দিয়ে যোগাযোগ করতে বল্লেন। প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক। উনাকে কিছুদিন আগে এক দুপুরে ফোন দিয়েছিলাম। উনার ফোন ওয়েটিং ছিলো পাক্কা দুই ঘন্টা। তারপর উনি কল ব্যাক করার পর আমার প্রয়োজনীয়তা জানালাম। তিনি বল্লেন, এ ব্যাপারে তিনি কোন সাহায্য করতে পারবে না কারন তিনি ফান্ডের দায়িত্বে নেই। আছেন পলা নামক একজন ভদ্রমহিলা। তিনি তার নাম্বার দিলেন। এর পরের দুদিন ধরে মোট ৮ বার ফোন দিয়েও পলা ম্যাডামকে পেলাম না। হয় তিনি অফিসের বাইরে, নাইলে মিটিংয়ে, নাহলে ফোন রিসিভ করেন না-কাজে ব্যস্ত। প্রথম দিন তাকে না পেয়ে ম্যাডামের ফোন নাম্বার চাইলাম। দেয়া যাবে না বল্ল। তাই আমার ফোন নাম্বার দিলাম। ম্যাডাম পরদিনও ফোন করলো না। তো শেষপর্যন্ত উনার পিএ কেই সব খুলে বললাম। সব শুনে মেয়েটি জানালো, তারা আর নতুন কোন ভিকটিমকে সাহায্য করবে না। লিষ্ট অনেক আগেই হয়ে গেছে, লিষ্টের বাইরে কাউকে আর সাহায্য করা হবে না। এবং তারা শুধুমাত্র ঐ ধরনের ভিকটিমকেই সাহায্য করছে, যারা গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে গেছে। মৃত কাউকে তারা সাহায্য করছে না।

যা হোক, বাবুর সাথে শেষপর্যন্ত আজ দেখা হলো। আমার ষ্ট্যাটাসটা সেদিন ছোট ভাইর বন্ধুর চোখেও পড়েছিলো। সে ইনবক্সে জানালো, রানা প্লাজার ঘটনার সময় তারা অফিস থেকে কিছু টাকা কালেকশন করেছিলো অনুদানের জন্য। পরবর্তীতে সেখানে নগদ টাকার প্রয়োজন না হওয়াতে সেই টাকাটা আর দেয়া হয়নি। ওটা মারিয়ার কাছেই আছে। সে এখন সেই টাকাটা বাবুকে দিতে চাচ্ছে।

বাবুর কপাল খারাপ। সরকারী ক্ষতিপূরনও পায়নি। প্রথম আলোর কোটি টাকার অনুদানও পাবে না। তো এখন এই টাকাটা পেলেই বা খারাপ কি? কিন্তু আমি নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম, বাবুর দাবী সত্যি কিনা। সে সত্যিই ভিকটিমের পরিবারের সদস্য কিনা। [কারন ঘটনার পর কয়েকটা লাশ নিয়ে কি পরিমান জোচ্চুরী হয়েছে সেটা আমরা এখন জানি] তাই তাকে আজ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমান নিয়ে আসতে বল্লাম। আমিও একটা পেপার রেডি রাখলাম অনুদান দেবার প্রমানপত্র হিসাবে। বলা যায় না, কখন কাজে লেগে যায়।

ছোটভাইর বন্ধু মহৎপ্রাণ মানুষ। শুধু অনুদান সংগ্রহ নয়, ঘটনার সময় সে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে রক্ত, ওষুধ ইত্যাদি দিয়েও সাহায্য করেছে। অথচ সে সময় নিজেই অসুস্থ ছিলো। তার স্বামী জানলে হয়তো তাকে আর এসব করতে দিতে রাজী হবেন না, এই আশঙ্কায় লুকিয়ে চুরিয়ে রানা প্লাজার ভিকটিমদের জন্য সাহায্য করে গেছে যতটা পেরেছন। তার অফিসের HR আপা, সে নিজে সাভারে গিয়ে খাবার আর পানি দিয়ে এসেছেন। উচ্চ রক্তচাপের কারনে রক্ত দিতে না পেরে বাচ্চাদের মতো ফুপিঁয়ে কেদেঁছেন। আর নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলেন কেন সে মানুষকে সাহায্য করতে পারছেন না। বুঝলাম, সমাজে এইচআর আপার মতো কিছু মানুষ আছেন, যারা শুধুমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করেন না। রক্তের ভেতর, শরীরের জিনের ভেতর মানব সেবার প্রবণতা না থাকলে তিনি এই কারনে কাদঁতে পারতেন না।

সে একই সাথে পড়াশোনা ও চাকুরী করে। হঠাৎ পরীক্ষা পড়ায় শেষ মূহুর্তে স্বশরীরে আসতে পারলো না। বাবু আর তার মাকে নিয়ে আমি ওদের বাসায় গেলাম। আন্টির আতিথেয়তার কোন তুলনা নেই। আমাদের দেখে মূহুর্তের ভেতরই ডাইনিং টেবিল ভরে ফেল্লেন খাবার দাবাড় দিয়ে। ফেরার সময় বাবুর মাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে স্বান্তনা দিলেন।

টাকার পরিমান অল্প। তবু বাবুর চোখে আশার আলো চিকচিক করছিলো। সে জানালো, ১৬ দিন পর তার বোনের লাশ পাওয়া গেছে। সিড়িঁর গোড়ায় তার ছোটবোনের লাশ পড়ে ছিলো। আমি ছবি দেখে ব্যথায় মুষড়ে পড়লাম। মাত্র ১৮ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে। পরীর মতো সুন্দরী। বাবুর মার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আচঁলে চোখ মুছছেন।

বাবু সরকারী ক্ষতিপূরণের আশায় বিভিন্ন জাগায় দৌড়াদৌড়ি করেও কোন ফল পান নি। এমনকি তার ডিএনএ পরীক্ষা বহু আগেই সম্পন্ন হয়েছে। আমি বল্লাম ধৈর্য্য ধরতে আর চেষ্টা চালিয়ে যেতে। ছোটবোনের লাশের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত টাকাটা পাওয়ার আশায় বাবুর পরিবারের দিন কাটছে এখন।

৮ thoughts on “ছোটবোনের লাশের বিনিময়ে পাওনা টাকার আশায় বাবু

  1. বুঝলাম, সমাজে এইচআর আপার মতো

    বুঝলাম, সমাজে এইচআর আপার মতো কিছু মানুষ আছেন, যারা শুধুমাত্র সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কাজ করেন না। রক্তের ভেতর, শরীরের জিনের ভেতর মানব সেবার প্রবণতা না থাকলে তিনি এই কারনে কাদঁতে পারতেন না।

    :salute: :salute:

    ছোটবোনের লাশের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত টাকাটা পাওয়ার আশায় বাবুর পরিবারের দিন কাটছে এখন।

    প্রলয় ভাই, মন খারাপ করে দিলেন; :মনখারাপ:
    তবে ভাল লিখেছেন। :থাম্বসআপ:

  2. মাত্র ১৮ বছরের ফুটফুটে একটা

    মাত্র ১৮ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়ে। পরীর মতো সুন্দরী। বাবুর মার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি আচঁলে চোখ মুছছেন।

    !!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *