” ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা “


একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ : পুরান ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গনে ইডেন কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ছবি : অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম

নজরুল তার নারী কবিতায় লিখেছিলেন,

“ বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”
( “সাম্যবাদী” , ১৩৩২ বঙ্গাব্দে ১লা পৌষ ‘লাঙ্গল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়)

অর্থাৎ যুগে যুগে যত বিপ্লব ঘটেছে তাতে নারীর সমান ভূমিকা ছিল । কখনও প্রেরণা যুগিয়েছে বিজয়ের কখনও সরাসরি হাতে তুলে নিয়েছে হাতিয়ার । সেবা দিয়ে যত্ন দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে কখনও জীবন বাজী রেখেছে ।
৫২ , বাঙালির ইতিহাসে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর । মুখের বুলি বাঁচাবার প্রচেষ্টায় জীবন উৎসর্গ করার সাহস শুধু বাঙালির আছে , বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখেছিল । তাই “ ২১শে ফেব্রুয়ারি” আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সম্মান, শুধু বাঙালিরই প্রাপ্য ।

ভাষা আন্দোলন এর সাথে সম্পৃক্তদের নামের তালিকা এলেই রফিক , সালাম , জব্বার এর নাম আসে। অথচ এই আন্দোলনে নারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা অনেকেই জানে না । তখনকার রক্ষণশীল সমাজে নারীদের বাড়ির বাইরে বের হাওয়াই যেখানে অপরাধ বলে বিবেচ্য হত, সেখানে নারীরা ভাষার জন্য পুরুষের সঙ্গী হয়ে লঢ়াই করেছে যা সত্যিই অসাধারণ।

ভাষার দাবীতে নারীরা জীবন বাজী রেখে পুরুষের সাথে কণ্ঠ্যে কণ্ঠ মিলিয়ে মিছিল করেছে । স্লোগান দিয়েছে । রাত জেগে পোস্টার লিখেছে । ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন তাদের মধ্যে ডা. হালিমা খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, রওশন আরা রেণু, সুফিয়া আহমেদ, তৈফুরা , সুফিয়া খান, ড. শরীফা খাতুন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

ড. সুফিয়া আহমদের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায় ,
১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।’ এই পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সভা, হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল ইত্যাদি কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টায় ছিল গণপরিষদের অধিবেশন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে গণপরিষদের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচিও ছিল। ছাত্রসমাজের এমন কর্মসূচিতে বিচলিত বোধ করে সরকার। তখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমীন। তাঁর সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করে।
২১ তারিখ সকাল থেকে ছাত্রছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জমায়েত হয়। কারণ, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাঁরা।

ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ড. সুফিয়া আহমদ স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, তাঁর ওপর দায়িত্ব পড়েছিল আনন্দময়ী ও বাংলাবাজার স্কুলের মেয়েদের জড়ো করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় নিয়ে আসার। তিনি কাজটি করেছিলেন। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ছেলেরা দশজন করে এবং মেয়েরা চারজন করে বের হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড পার হয়ে এগিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রথমে ছাত্রদের দুটি দল মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তোলে। তৃতীয় দল নিয়ে বের হয় মেয়েরা। কিছুদূর যাওয়ার পর শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়। তিনি সামান্য আহত হয়েছিলেন।

ড. হালিমা খাতুন ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদেরই একজন। তাঁর স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়, সক্রিয় অংশগ্রহণের চিত্র। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেন, ১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ছিল তাঁদের। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল মুসলিম গার্লস স্কুল এবং বাংলাবাজার গার্লস স্কুল থেকে মেয়েদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় আসা। ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর দল ছিল মেয়েদের প্রথম দল। পুলিশ পথ আটকালে তাঁরা পুলিশের রাইফেল ঠেলে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যান। পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ারগ্যাস ছোড়ে। তাঁরা বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে আসেন এবং গণপরিষদ ভবনের দিকে এগোতে থাকেন। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি তাঁরা। শুরু হয় পুলিশের গুলিবর্ষণ।
রওশন আরা বাচ্চু সেদিনের স্মৃতিচারণায় বলেছেন, তিনি দেখতে পান, ছাত্রদের দুটো দল পুলিশের ব্যারিকেড টপকে চলে যায়। এর পরই তিনি অন্যদের নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তাঁকে সামনে পেয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের আঘাত এসে পড়ে তাঁর ওপরে। তিনি পুলিশের এলোপাথাড়ি লাঠিপেটায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। গুলিবর্ষণ শুরু হলে রাস্তার পাশের একটি পুরনো রিকশার গ্যারেজে লুকিয়ে থাকেন। অনেকক্ষণ সেখানে থেকে সন্ধ্যায় ছাত্রী হোস্টেলে ফিরে যান।
একুশের প্রথম শহীদ ছিলেন রফিকউদ্দীন। তাঁর মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। ঘটনার পরপরই এই ঐতিহাসিক দৃশ্যের ছবি তোলেন আমানুল হক কাজী ইদ্রিস এবং মেডিকেল ছাত্রী হালিমা খাতুনের সহযোগিতায়। সেদিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের সেবা দিতে গিয়ে ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন হাসপাতালের সেবিকা মেয়েরা। প্রতিরোধের জায়গাটি এভাবে তাদের সহযোগিতা, সমর্থনে দীপ্ত হয়ে উঠেছিল।
১৯৬০ সালে আসাম ভাষা আইন পাস হয়। এই আইনে অসমীয়া ভাষাকে আসামের রাজ্য ভাষা করা হয়। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেল স্টেশনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন এগারো জন। একজনের লাশ গুম করার জন্য পুলিশ পাশের পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের কর্মীরা সেই লাশ খুঁজে বের করে। এই আন্দোলনের পর আসাম সরকার ভাষা আইন সংশোধন করে এবং বরাক উপত্যকার জন্য সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা বহাল থাকে।
১৯ মে বরাক উপত্যকার শহীদ দিবস। যে এগারো জন শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন নারী। তাঁর নাম কমলা ভট্টাচার্য।

ঢাকার বাইরে যে নারীদের ভূমিকার কথা জানা যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য “মমতাজ বেগম” । সময়টা ২২ শে ফেব্রুয়ারি , ভাষা আন্দোলনের মিছিলে ছাত্রদের উপর পুলিশের বর্বর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নারায়ণগঞ্জ এর মর্গান হাইস্কুলের ৩০০ ছাত্রী নিয়ে মিছিল করেছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম। যা পরবর্তীতে ‘ইভনিং টাইমস’ নামে সংবাদ পত্রের শিরোনাম হয় ।

ইতিহাস এর পাতা থেকে অনেক নারীর ভূমিকা হারিয়ে গেছে । আমার এক বন্ধুর নানু “রাজিয়া বেগম” এর কাছে শুনেছিলাম তিনি ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এসেছিলেন । বাবার কড়া শাসন উপেক্ষা করে ভাষা সৈনিকদের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন । হাত খরচের টাকা দিতেন পোস্টারে জন্য ।

এমন অনেক নারী সৈনিক ছিলেন যাদের কথা আমরা জানি না । কিন্তু এসব অকুতোভয় নারীদের প্রতি রয়েছে প্রত্যেক বাঙালির স্বশ্রদ্ধ সালাম । তারা বেঁচে থাকবেন বাঙালির হৃদয়ে ।

সুত্রঃ কালের কণ্ঠ , ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস. ঢাকা: সেলিনা হোসেন, ব্লগ , কালি ও কলম , মোস্তাফিজুর রহমান এর “২১ ও আমাদের চেতনা” । দৈনিক আজাদ, ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।

১৩ thoughts on “” ভাষা আন্দোলনে নারীর ভূমিকা “

  1. অসাধারণ। সময় উপযোগী পোস্ট।
    অসাধারণ। সময় উপযোগী পোস্ট। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এগুলো দেখাতে হবে। এরা অনেকেই এসব ইতিহাস জানে না। অবশ্য তাদের দোষ দেখি না কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিকৃতমানসিকতার জন্য তারা এসব ইতিহাস জানে না।

    1. আপসোসের বিষয় কি জানেন? যে
      আপসোসের বিষয় কি জানেন? যে কাজটি করা উচিত ছিল সরকারের, সেটা করতে হচ্ছে আমাদের। এসব ইতিহাস আমাদের প্রজন্মকে গেলানোর দায়িত্ব সরকার না নিয়ে পুঁথিগত বিদ্যার সার্টিফিকেট নিতে উৎসাহিত করা হয়। আমাদের ইতিহাস বইগুলোতে তথ্যের তথ্যের দৈন্যতার জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই দায়ী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *