উইনএম্প ও আমার ছেলেবেলার কম্পু কথণ!

১৯৯৭ সালের শেষের দিকে ক্লাস সেভেনে থাকতে আমার হাউস টিউটরের কম্পিউটারে আমার প্রথম হাতে খড়ি হয়। প্রতিদিন সকালে তিনি বাসায় এসে আমাকে ও ছোটভাইকে পড়াতেন। কিন্তু প্রতিদিন বিকালে আমি আবার তার বাসায় যেতাম। বাসা থেকে বলে যেতাম, স্যারের কাছে পড়তে যাচ্ছি, অংক বুঝছি না। বা ইংলিশ গ্রামার পড়তে। কিন্তু স্যারের বাসায় যাবার প্রধান এবং একমাত্র কারন ছিলো তার কম্পিউটারে বসে বসে ডিএক্স বল



১৯৯৭ সালের শেষের দিকে ক্লাস সেভেনে থাকতে আমার হাউস টিউটরের কম্পিউটারে আমার প্রথম হাতে খড়ি হয়। প্রতিদিন সকালে তিনি বাসায় এসে আমাকে ও ছোটভাইকে পড়াতেন। কিন্তু প্রতিদিন বিকালে আমি আবার তার বাসায় যেতাম। বাসা থেকে বলে যেতাম, স্যারের কাছে পড়তে যাচ্ছি, অংক বুঝছি না। বা ইংলিশ গ্রামার পড়তে। কিন্তু স্যারের বাসায় যাবার প্রধান এবং একমাত্র কারন ছিলো তার কম্পিউটারে বসে বসে ডিএক্স বল আর ভার্চুয়াল কপ খেলা। সে সময় কম্পিউটার আমার কাছে ছিলো একটা জ্বলজ্যান্ত বিস্ময়। আমি আক্ষরিক অর্থেই সারাক্ষন একটা কম্পিউটারকে নিজের করে কাছে পাবার স্বপ্নে বুদ হয়ে থাকতাম।

আব্বু জানতে পেরে বল্লেন, ক্লাসে তোমার রোল নম্বর এক থেকে পাচেঁর ভেতর আনতে পারলে কম্পিউটার কিনে দিবো। আমি এই সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। ধানমন্ডি গভঃ বয়েজ হাই স্কুলে আমার বেশীরভাগ সহপাঠীরা ছিলো বাঘা বাঘা ছাত্র। তাদের কাছে আমি ছিলাম নিতান্তই নস্যি। সুতরাং তাদেরকে টেক্কা দিয়ে রোল নাম্বার ২০ এর ঘর থেকে এক লাফে ৫ এর ঘরে আনা ছিলো আমার জন্য প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। কিন্তু কম্পিউটার কেনার তীব্র আকাঙ্খায় সেই অসম্ভব কাজটাই কিভাবে কিভাবে যেন করে ফেল্লাম।

আমি খুব একটা খারাপ ছাত্র ছিলাম না, বাংলা, ইংলিশ বা বিজ্ঞান – কোনটাই আমার কাছে কোন বিষয় ছিলো না। শুধু অংকটাই ছিলো আমার জাতশক্র। অংকে টেনে টুনে পাশ করার কারনেই প্রতি বছর রোল নম্বর পিছিয়ে যেতো। আমি তাই অংকের পেছনে আদাজল খেয়ে লাগলাম। টার্গেট ছিলো ৬০-৭০ পাওয়া। কিন্তু দেখা গেলো এইটের বার্ষিক পরীক্ষায় অংকে পেলাম ৯২। জানতে পারলাম, পুরো স্কুলে এইটের সবগুলো সেকশন মিলিয়ে এটা ছিলো ২য় সর্বোচ্চ নম্বর। আমি নিজেই হতভম্ব! পরের বছর নাইনে আমার রোল নাম্বার হলো ৩। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে ঐ কম্পিউটারওয়ালা স্যারের অবদান ছিলো অনস্বীকার্য। পরীক্ষার সময় সে দিনে পাচঁবার বাসায় এসে পড়িয়েছেন, এমনও রেকর্ড আছে।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম কম্পিউটার আন্তর্জাতিক মেলা হয় এখনকার আইডিবি ভবনে। মেলা থেকে হাত ভর্তি করে লিফলেট নিয়ে বাসায় আসতাম আর রাতে পড়ার টেবিলে বসে চোখ বড় বড় করে লিফলেটে ছাপানো কম্পিউটারের ছবি দেখতাম। স্কুলের আইডি দেখিয়ে ফ্রি ঢোকা যেতো তাই প্রায় প্রতিদিনই যেতাম স্কুল ছুটির পর। রীতিমতো চোখ ধাধাঁনো ছিলো সেই মেলা।

ক্লাস নাইনে থাকাকালীন, ঐ মেলা থেকে যখন আমার জীবনের প্রথম কম্পিউটারটি কেনা হয়, তখন সেটার কনফিগারেশন ছিলো এখনকার একটা স্মার্ট ফোনের সমান বা তার চাইতেও কম। মনিটর ছিলো সিআরটি, ১৭ ইঞ্চি, ব্রান্ড ছিলো ভিউসনিক। মনিটরের ডানপাশের কোনায় তিনটা তিন রংয়ের কাকাতুয়া বসে থাকতো। ভিউসনিকের লোগো। প্রসেসর ছিলো ১ গিগাহার্জের কম। র‌্যাম ছিলো ২৫৬ মেগা বাইট। হার্ডডিস্ক ছিলো ২০ গিগাবাইট। [এখনো মনে আছে, কেনার পর আমি ভাবতাম, খাইছে ২০ গিগা! এত জায়গা দিয়ে কি করবো? এটা দিয়ে তো আমার আজীবন পার হয়ে যাবে!] এজিপি ছিলো ১৬ না যেন ৩২ এমবি। সাথে একটা ৮এক্স ভিসিডি রম ড্রাইভ ছিলো। ও হ্যাঁ, একটা ছোট ফ্লপি ড্রাইভও ছিলো।

আমার তো মাটিতে পা পড়ে না গর্বে! কারন আমাদের পাড়ায় তখন কম্পিউটার ছিলো এক কি দুটো। আমাদেরটা ছিলো ২য় অথবা ৩য়। দামটাও এখনো মনে আছে, চল্লিশ হাজার টাকা। সে সময় এই অংকটা ছিলো সেইরকম বিশাল!

মেলা থেকে ক্যাননের একটা প্রিন্টার আর এক বাক্স ফ্লপি ড্রাইভ কেনা হলো। [সাউন্ডবক্স কেনা হয়নি কারন আব্বুর জাপান থেকে কেনা সনির ডেকসেটের সাউন্ড সিস্টেম দিয়ে প্রথম বছরটা চালানো হয়েছিলো।] পুরো দিনটাকে স্বপ্নের মতো মনেহচ্ছিলো। আব্বু ছোটভাইকে কিনে দিলেন একটা ২৫৬ মেগাবাইটের নীল রংয়ের ছোট টুইনমস পেন ড্রাইভ। দাম নিয়েছিলো দেড় হাজার টাকা।

বাসায় এনে স্যারকে খবর দিলাম। উদ্দেশ্য, স্যারকে দিয়ে ওএস ইনসটল দেয়া। স্যার তখন এ্যাপটেকে কম্পিউটার শেখেন। [সে সময় ইয়াং ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটা কমন ট্রেন্ড ছিলো এ্যাপটেক থেকে কম্পিউটার শেখা। সে সময় ইন্ডিয়ান এই কোম্পানিটা দেদারদে টাকা কামিয়েছে কম্পিউটার ট্রেনিং দিয়ে। এখনো এইটা দেশে আছে নাকি?]

অনেক ঝক্কি ঝামেলা করে ইউন্ডোজ ৯৮ সেটাপ করার পরে আমার আর ছোটভাইর খুশী দেখে কে! তখন মাদার বোর্ডের ড্রাইভারের সিডির সাথে হরেক রকম আব জাব সফটওয়্যার দেয়া থাকতো। খুশীর চোটে সেগুলোর সবটাই ইনসটল করা হলো। এর ভেতর ছিলো দুটো মিডিয়া প্লেয়ার। একটা জেট অডিও। আরেকটা ইউনএম্প।

আমার ছোটবেলায় শোনা গানগুলোর প্রায় সবটা শুনেছি উইনএম্প দিয়ে। জেট অডিও দিয়ে মূলতঃ ভিডিও দেখতাম। ভিডিও দেখার আরেকটা সফটওয়্যার ছিলো, পাওয়ার ডিভিডি। এই তিনটা সফটওয়্যারও এখন বিলুপ্ত প্রায়। কেউ আর তেমন একটা ইউজ করে না। নতুন প্রজন্ম তো মনেহয় এগুলার নামও জানে না, ইউজ করা তো দূরের কথা। একটা সময় আমিও ইউজ করা বাদ দিলাম। আস্তে আস্তে ভুলেই গেলাম উইনএম্প, জেট অডিও আর পাওয়ার ডিভিডির কথা।

গত ১৫ টা বছর ধরে ক্রমাগতিআপডেট করতে থাকা উইনএম্প গতকাল শুনলাম আগামী মাসের ২০ তারিখ থেকে নালসফট কোম্পানি অফিসিয়াল ঘোষনা দিয়েছে উইনএম্প বন্ধ করার। পাবলিক ইউজ না করলে কি আর করবে? ডেভোলপারদের তো আর বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেয়া যায় না। যাইহাক, আমি তাড়াহুড়ো করে ওদের লেটেষ্ট ভার্সনটা নামালাম। ইনসটল দেবার পরে উইনএম্পের ক্লাসিক স্কিনটা সিলেক্ট করতেই হুড়মুড় করে কিশোর বয়সের স্মৃতিগুলো মনে পড়তে লাগলো। ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ স্মৃতিপ্রবণ মানুষ, সুখ স্মৃতি-দুখ স্মৃতি, উভয় স্মৃতিই আমাকে কাতর করে। আমি উইনএম্পের স্মৃতিতে কাতর হলাম।

ইউজ করি না আর না করি, ভাবছি পাওয়ার ডিভিডি, জেট অডিও, উইনএম্প, ডিএক্স বল, ভার্চুয়াল কপ, মটোরেসার – এইসব স্মৃতিবহুল এপ্লিকেশনগুলোকে আমি আজীবন সযতনে রেখে দেবার চেষ্টা করো। আমার ছেলে মেয়েদের দেখাবো। বুড়ো হয়ে গেলে নাতিপুতিদের দেখাবো।

বিদায় উইনএম্প।

৬ thoughts on “উইনএম্প ও আমার ছেলেবেলার কম্পু কথণ!

  1. উইনএম্প হয়ত নিজেও জানে না তার
    উইনএম্প হয়ত নিজেও জানে না তার বিরহে কাতর এক প্রেমিক তাকে নিয়ে রীতিমতো একটা শোকগাথা রচনা করে ফেলছে। কোন সফটওয়্যার নিয়ে এটাই বোধ হয় পৃথিবীর প্রথম শোকগাথা। তবে লেখাটা পড়ে সত্যিই নস্টালজিক হয়ে গেলাম। আমার জীবনের প্রথম কম্পু ইউজের কথা মনে পড়ে গেলো। সেটা ছিল আমার এক বন্ধুর। সে এইচএসসিতে বোর্ডে দ্বিতীয় হওয়ায় প্রথম আলোর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একটা কম্পিউটার পেয়েছিল। সারাদিন আমরা সুযোগ পেলেই সেটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। ডিএক্স বল কি এখন কেউ খেলে? জানিনা… কতো ঘণ্টা যে পার করেছি ওই জিনিসের পেছনে… :দীর্ঘশ্বাস:

    1. আতিক ভাই, আমি বড়ই টেকিকানা
      আতিক ভাই, আমি বড়ই টেকিকানা একটা মানুষ। টেকনোলজির কিছুই বুঝি না। কিন্তু টেকনোলজির জন্য আমার কাছে একটা জিনিস আছে। সেটা হচ্ছে বুক ভরা ভালোবাসা। 🙂

  2. ১৯৯৬ সালে বড় ভাই তাঁর এক
    ১৯৯৬ সালে বড় ভাই তাঁর এক ফ্রেন্ডসহ একটা কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার দিলো। সেই থেকে শুরু। অবিশ্বাস হলেও সত্য তাঁর সেন্টারের চারটার মধ্যে সব চাইতে ভালো কম্পিউটার (একটাই মাত্র রঙিন মনিটর) হার্ড ডিস্ক ছিল ২.৩ জিবি। এবং র‍্যাম ০৪ এমবি করে চারটা অর্থাৎ ১৬ এমবি। আর সবচেয়ে নিম্নমানের যেটা ছিল সেটার হার্ড ডিস্ক ছিল ২১০ মেগাবাইট। হ্যাঁ ঠিকই ২১০ মেগাবাইট। একমাত্র উইন্ডোজ ৯৫ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। অফিস ছিল তাও শুধু ওয়ার্ড আর এক্সেল। এটার র‍্যাম ছিল ৪ এম্বি। বাকীগুলাতে উইন্ডোজ চলতো না। ডস দিয়ে চালাতে হতো। আর গেম ছিল প্যারানয়েড আর র‍্যাপটর। পরে আসতে আসতে ৬.৪ হার্ড ডিস্ক নিলো, পরে আবার ৯ জিবি। আর আমি নিজে যখন নিলাম দুই হাজার সালে তখন হার্ড ডিস্ক ছিল ১৩ জিবি। র‍্যাম ১২৮। সর্ব শেষ যে ল্যাপটপটা নিছি (পাইছি) সেটার হার্ড ডিস্ক ৮০০ জিবি।

    1. আমি সর্বশেষ যে ল্যাপি নিয়েছি
      আমি সর্বশেষ যে ল্যাপি নিয়েছি সেটার ইন্টারনাল হার্ডডিস্ক ১ টেরা। আমি আরেকটা ১ টেরা (এক্সটারনাল) কিনেছি মুভি আর ফটো রাখার জন্য। আমার হার্ডিস্ক কেনার বাতিক আছে। প্রায় প্রতি বছরই কিনি। আমার সবগুলো হার্ডডিস্ক মিলিয়ে সর্বমোট স্পেসের পরিমান প্রায় ১০ টেরাবাইট হবে। 🙂

      ভালো কথা, এপটেক কি এখনো আছে নাকি বাংলাদেশে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *