অবহেলায় গার্মেন্টস শ্রমিকরা

রানা প্লাজা দূর্ঘটনার পর CNN একটা তথ্য দিখিয়েছিল। সেখানে দেখানো হয়েছিল আমেরিকাতে তৈরী একটা ডিনিম শার্টের মজুরি পড়ে $7.47 যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০০ টাকা অন্যদিকে বাংলাদেশে তৈরী শার্টটির মজুরি পড়ে $.22 যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮ টাকা। মজুরির এই তুলনামূলক চিত্র দেখলেই বুঝা যায় আমরা উন্নত বিশ্বের প্রফিট টেররিজমের স্বীকার।… অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্যার বাংলাদেশের মজুরি কাঠামোকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে ২০০৬ সালে দেখিয়েছিলেন বাংলাদেশে উৎপাদিত একটি গার্মেন্টস পণ্য ইউরোপে বা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০০ ডলার বিক্রি হলে কারখানার মালিক পান ১৫-২০ ডলার, উক্ত রাষ্ট্র ২৫-৩০ ডলার এবং বেদেশি কোম্পানি ৫০-৬০ ডলার পেয়ে থাকে। উৎপাদনকারী শ্রমিকের ভাগে পড়ে মাত্র এক আদ ডলার। অর্থাৎ পণ্য রপ্তানি বাড়লে লাভবান হয় মালিকরা, শ্রমিকদের অবস্থার পরিবর্তন হয় না।

ন্যূনতম মজুরি?…
২০১০ থেকে ১২ সালের মধ্যে গঠিত বিভিন্ন ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে নির্মাণশিল্প ও কাঠের কাজ করেন এমন শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি ৯,৮৮২ টাকা। ট্যানারি শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি ৯,৩০০ টাকা। তেল মিলের শ্রমিকের মজুরি সর্বনিম্ন ৭,৪২০ টাকা। ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহনে ৬,৩০০ টাকা, রি-রোলিং মিলে ৬,১০০ টাকা, কোল্ড স্টোরেজে ৬,৫০ টাকা, গ্লাস অ্যান্ড সিলিকেটস কারখানায় ৫,৩০০ টাকা, ধান ভাঙানোর চাতালে আধা দক্ষ শ্রমিকের মজুরিও এখন ৭,১৪০ টাকা। সল্ট (লবণ) ক্রাশিং শিল্পে মজুরি ঘণ্টায় ২৬৫ টাকা। এবং গত ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রয়াত্ব ব্যঙ্কের সর্বনিন্ম বেতন পিওনদের ১২৫০০ টাকা ধরা হয়েছে …..কিন্তু পোশাকশিল্পে মজুরি হচ্ছে মাত্র তিন হাজার টাকা। (এখন ৫৩০০ টাকা করার কথা)….১৯৭৮ সালে এদের মজুরি ছিল ৪৫০ টাকা, ২০০৬-এর আগে পর্যন্ত ছিল ৯৩০ টাকা, ২০০৬-এ হয় ১৬৬২ টাকা এবং ২০১০ সাল থেকে ৩০০০ টাকা তা এখনো মজুরি বহাল রয়েছে।…১৯৭৮ সালে দুটি কারখানা ১২০০০ ডলার পণ্য রপ্তানি করে যে শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ তা ৫৮০০ কারখানায় ২১০০,০০,০০,০০০ ডলার পণ্য রপ্তানি করে। বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে ২৬টি দেশের মধ্যে (চিনের পরেই) দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও পোশাক শ্রমিকদের মজুরিতে পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্থানে পড়ে রয়েছে।

…গার্মেন্টস শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলনের পর মজুরি বোর্ড ৫৩০০ টাকা করার কথা বলেছে, দাবী ছিল নুন্যতম মজুরি ৮০০০ টাকা,
নিম্নতম মজুরি বোর্ড শ্রমিকদের জন্য মূল মজুরি ৩০০০ টাকা ধরেছে।
বাড়িভাড়া ধরেছে ১২০০,
চিকিত্সাভাতা ধরেছে ২৫০,
যাতায়াত ভাড়া ধরেছে ২০০ এবং
খাদ্যভাতা ধরেছে ৬৫০ টাকা ।….টোটাল = ৫৩০০ ।

//বাংলাদেশের এই শিল্প থেকেই দেশের ৭৮ ভাগ রপ্তানি আয় হয়।//…

দেশের বাইরে??
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পোশাকশ্রমিকের মজুরিও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। যদিও এদের মধ্যে চীন ছাড়া সব দেশ থেকেই বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে আছে। আমেরিকার ওয়ার্কার রাইটস কনসোর্টিয়ামের ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে ২০১১ সালভিত্তিক বিভিন্ন দেশের পোশাকশ্রমিকের মাসিক মজুরির হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকের মজুরি দেখানো হয়েছে ৫২ মার্কিন ডলার। আর বিশ্বের ১ নম্বর রপ্তানিকারক দেশ চীনের মজুরি ২২৩ ডলার। এ ছাড়া কম্বোডিয়া ও ভারতে ৭০ ডলার, ইন্দোনেশিয়াতে ১১৪ ডলার, ভিয়েতনামে ১০৯ ডলার, ফিলিপাইনে ১৭৫ ডলার, থাইল্যান্ডে ২২১ ডলার মজুরি পান পোশাকশ্রমিকেরা। …বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক সরকার শ্রমিকের জন্য খুবই সস্তায় আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধাও দিয়ে থাকে। এই দেশটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ।

//আইএলওর প্রতিবেদন..”বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ অন্যতম নিকৃষ্ট”….আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই অভিমত তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ: উন্নততর আর্থসামাজিক পরিণতির জন্য উন্নততর কাজের পরিবেশ চাই’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেভায় আইএলওর প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম নিকৃষ্ট।//…এই রকম অসংখ্য প্রতিবেদন দিলেও বাংলাদেশের সরকার, মালিকদের গায়ে লাগবে না, তাদের লক্ষ একটাই , মুনাফা-মুনাফা-মুনাফা। …আইএলও ১০০ ডলারের নিছে বেতন যেই যেই দেশের তার একটি তথ্য দিয়েছে তার মধ্যেও বাংলাদেশ সবার নিছে, (১. বাংলাদেশ ২. ভারত ৩. শ্রীলঙ্কা ৪. ভিয়েতনাম ৫. পাকিস্তান ৬. কম্বোডিয়া )!

শেষ কথা…
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা আছে …কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুন ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার এবং যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার।…রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।…এখন প্রশ্ন হল যুক্তিসঙ্গত মজুরি নির্ধারন হবে কিভাবে?? ৪ জনের একটি শ্রমিক পরিবার চলতে ন্যূনতম মাসে কত টাকা লাগে?? মজুরী কত হলে আমাদের দেশে তা হবে ন্যূনতম মজুরী?? গবেষণা করে তার হিসাব দিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, সেখানে দেখিয়েছিল ৪ জনের পরিবারে খাওয়া খরচ, বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, কাপড় চোপর ও অন্যান্য…সর্বমোট ১৮০০০ টাকার মত আসে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী চাকরি ধরলে ন্যূনতম মজুরী ৮০০০ টাকা ছাড়া চলেই না। তাই শ্রমিকদের নুন্যতম মজুরি ৮০০০ টাকা যৌক্তিক, এটা মেনে নিতে হবে… এই দেশ বাঁচাতে হলে, এই শিল্প বাঁচাতে হলে, আমাদের অর্থনিতি বাঁচাতে হলে।

নুন্যতম মজুরি ৮০০০ টাকা করা হোক, নুন্যতম মজুরি নিয়ে মালিকদের তালবাহানা চলবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *