স্মৃতি ’৭১

৭১ এর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়। আমাদের বাড়ি যশোরের চিনাটোলা বাজার থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে। বাজারের কাছে হলেও এলাকায় ঘোর জঙ্গল। দুই-তিন ঘর বাড়ির পর বিশাল জঙ্গল। কালো মুখো হনুমানেরা ঝাঁক বেধে বাস করে। কিন্তু যুদ্ধ লাগার পর থেকে কোথায় যেন পালিয়ে গেছে।


৭১ এর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়। আমাদের বাড়ি যশোরের চিনাটোলা বাজার থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে। বাজারের কাছে হলেও এলাকায় ঘোর জঙ্গল। দুই-তিন ঘর বাড়ির পর বিশাল জঙ্গল। কালো মুখো হনুমানেরা ঝাঁক বেধে বাস করে। কিন্তু যুদ্ধ লাগার পর থেকে কোথায় যেন পালিয়ে গেছে।

একদিন দুপুর বেলা হঠাৎ আওয়াজ। বাড়িতে রান্না চলছিল দুপুরের, পুস্কিনি থেকে স্নান সেরে বাড়িতে এসেছি মাত্র। আমারা ভাবলাম মিলিটারি চলে এসেছে। তাড়াতাড়ি সব কিছু ফেলে বাড়ির লোক মিলে পালালাম বাগানের মাঝে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি আসলে মিলিটারি না যশোরের দূর গ্রামের নমশূদ্ররা দলবেঁধে সীমান্ত পার হয়ে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। সাথে গরু, ছাগল, বস্তায়, ট্রাঙ্ক, পোটলায় যা পারছে সব কিছু নিয়ে যাচ্ছে। ওদের দেখে বুঝলাম আমাদের আর বেশীদিন থাকা যাবে না।

সেইদিন বিকালে সাইকেল নিয়ে আমি, আমার দাদা আর শিবু নামে আরেক প্রতিবেশি বেড় হলাম। উদ্দেশ্য আমরা আগে গিয়ে সীমান্তের রাস্তা দেখে আসব তারপর মা-বাবা সবাই কে পার করব। সাইকেলে তিন জন, রাস্তায় মানুষ কম। গ্রামের রাস্তা ধরে কাঁচা রাস্তা ধরে যাচ্ছি। আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য দশ মাইল দূরে সীমান্তের কাছে আমাদের এক আত্মীয় বাড়ি দোবরা গ্রামে। ওখান থেকে সীমান্ত কাছে আর বেশি পল্লী এলাকা। ওপারের যাওয়ার নিরাপদ রাস্তার খোঁজ পেতে সুবিধা হবে। সেখানে পৌছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমাদের কাছে টাকা পয়সা আর সোনার গহনা আছে। সেখানে গিয়ে শুনি গ্রামের কিছু মানুষ নাকি অন্যের টাকা পয়সা লুট করে নিচ্ছে। জেনে আমারা আর দেরি করলাম না। আবার বেড়িয়ে পড়লাম। ঘোর গ্রাম কোন মানুষ জন নাই, ভরা পূর্ণিমা, কাঁচা রাস্তা, ঝিঝি পোকা আর শিলায়ের ডাক, আমাদের সাইকেলের প্যাডলের শব্দ ছাড়া কোন শব্দ নাই। প্রতি মুহূর্তে ভীতি এই বুঝি ডাকাতের হাতে পড়ি। আত্মীয়ের পরামর্ষ নিয়ে আনুমানিক দশ মাইল এর মত সাইকেল চালিয়ে এলাম সোনাই নদীর তীরে। ওপারেই ভারত।

সাথে ঘড়ি না থাকায় রাত ঠিক কত হবে সঠিক ধারণা করতে পারলাম না। মনে হয় এগারটার মত হবে। ভরা জ্যোৎস্নায় সব কিছু পরিস্কার দেখা যাচ্ছে, একদম সুনশান, বাতাসের শব্দ ছাড়া কোন আওয়াজ নাই। দাদার ডান পায়ে সমস্যা ছিল, হাঁটতে কষ্ট হত। পারে একটা ভাঙ্গা জায়গায় সাইকেল গুলো লুকিয়ে বললাম দাঁড়িয়ে না থেকে নিচু হয়ে বসো। তুমি থাকো দেখি আমারা কোন নৌকা পাই কিনা। আমি আর শিবু খুঁজতে খুঁজতে দেখি এক জায়গায় বনের মাঝে একটি নৌকায় টিম টিম করে আলো জ্বলছে। একজন মানুষ দেখে বুঝলাম বাগদী সম্প্রদায়ের। আমরা বলি ভাই আমাদের পার করে দাও কিন্তু আমাদের ভাষা সে বোঝে না। ওরা সাধারণত গ্রামের বাইরে বাস করে। সবার সাথে সংস্পর্শ কম হয়। ঠিক ভাবে কিছুতেই বুঝাতে পারছি না আমাদের কথা। হঠাৎ শুনি দাদার চিৎকার। রাতের বেলা অনেক দূর থেকেও শোনা যায়। হায়, ডাকাত পড়ল নাকি দৌড়ে গেলাম। দেখি না, এক নৌকা যাচ্ছিল ওনাকে পার করে দিতে বলেছে।মাঝি রাজী হওয়ায় আমাদের ডাকাডাকি করছিলেন। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

(আমার এক আত্মীয়ের ঘটনা তার মুখ থেকে শোনা)

১১ thoughts on “স্মৃতি ’৭১

  1. এমন স্মৃতির পাঠক কম… ভাবতেই
    এমন স্মৃতির পাঠক কম… ভাবতেই কষ্ট হয়!!
    কিরণ ভাই ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য!! :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:

    1. পাঠক হয়ত আছে, আমি সেভাবে
      পাঠক হয়ত আছে, আমি সেভাবে টানতে পারিনি। স্মৃতি কথা শুনতে আমার ভাল লাগে মনে হয় তার সাথে আমিও ভ্রমন করছি সেখানে। তাই ভাবলাম অন্যদেরও জানাই। আর ৭১ তো সেই সময় প্রত্যেকের জীবনেই কোন না কোন ভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। এর আগের লেখায় আমার এক মামার গল্প লিখেছিলাম সেখানেও ৭১ এর একটা ভুমিকা ছিল। পড়ার জন্য ধন্যবাদ তারিক ভাই।

  2. যখন অনেক ছোট ছিলাম, তখন রমজান
    যখন অনেক ছোট ছিলাম, তখন রমজান মাসে সাহরী খাওয়ার সময় আমি ঊঠে যেতাম। রোজা রাখার কোন সুযোগ ছিল না। একদমই ছোট ছিলাম। কিন্তু উঠতাম আম্মা আব্বার খাওয়ার পড়ে ওনাদের সাথে শুয়ে ফজরের আযান পর্যন্ত একাত্তরের গল্প শোনার জন্য। আমাদের বাসাটা শহরের মূল সড়কের সাথেই লাগা। তো ২৫ মার্চ কালো রাতে যখন পাক বাহিনী ক্যান্টমেন্ট থেকে ফায়ার করতে করতে রাস্তায় নেমে এসেছে, তখন সারা আকাশে নাকি আলোর ঝলকানি। আর এই জীবন মরন সমস্যার সময় আমার বড় ভাই যার বয়স তখন পাঁচ, জেদ ধরলো সে রসগোল্লা খাবে!!! 😀 😀

    আমাদের বাসা দুই বার জ্বালিয়ে দিয়েছিল রাজাকাররা। আগস্টের দিকে একবার কেউ একজন এসে খবর দিয়ে গেলো শহরের অন্যতম প্রধান বধ্যভূমি জাফরগঞ্জ ব্রীজের নিচে নাকি আমার বাবার লাশ দেখে এসেছে!! এমন অনেক অনেক টূকরা টুকরা কথা, গল্প বার বার শুনতাম আর শিহরিত হতাম। আর একটা আফসোস সেই তখন থেকেই যে, কেন জন্মটা ২০-২৫ বছর আগে হইলো না। মুক্তিযুদ্ধ করার সুযোগ নিশ্চয় আমাদের আর আসবে না কোন দিনও। ……………………… ভালো লিখছেন ভাই। অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *