আমাদের হিরো- সঞ্জীব’দা

সারাদিন একবারও মনে হয়নি, দিনের শেষে এসে আরিফ’দার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে মনে পড়ল- আজ ১৯ তারিখ, নভেম্বর। সিডরের বছরে সঞ্জীবদা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। প্রকৃতি তার সন্তানের এই চলে যাওয়া হয়ত মন থেকে মেনে নেয়নি, তাই কেদেছিল অঝোরে। সেই তান্ডবে হারিয়ে গিয়েছিল আরো কত প্রাণ।



সারাদিন একবারও মনে হয়নি, দিনের শেষে এসে আরিফ’দার ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে মনে পড়ল- আজ ১৯ তারিখ, নভেম্বর। সিডরের বছরে সঞ্জীবদা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। প্রকৃতি তার সন্তানের এই চলে যাওয়া হয়ত মন থেকে মেনে নেয়নি, তাই কেদেছিল অঝোরে। সেই তান্ডবে হারিয়ে গিয়েছিল আরো কত প্রাণ।

সঞ্জীব চৌধুরী- আমাদের সঞ্জীবদা। গায়ক সঞ্জীব, সাংবাদিক সঞ্জীব-নায়ক সঞ্জীব; নায়কই তো- আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি তো তারই হাতে।আর তার প্রবল ব্যক্তিত্ব আমার কিশোর বয়সে তাকে নায়কের থেকে কম কিছু ভাবতে শেখায়নি! স্কুলে যখন পড়ি, তখন প্রতি শুক্রবার বিকেলে চলে যেতাম ভোরের কাগজ অফিসে।সেখান থেকে বড় আপু, ভাইয়াদের সাথে পাশের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে। কেবল ক্লাস এইটে পড়ি। তাই পাঠক ফোরামের ক্ষুদ্রতম সদস্য হিসেবে সঞ্জীবদা আর অন্যান্যদের আদরে বাদর হতে সময় লাগেনি বেশি। আর এই সব আড্ডায় সব সময় বোনাস হিসেবে থাকতো সঞ্জীবদার গান।
এরপর কলেজ জীবনে আর ওমুখো হইনি। এইচ এস সি পরীক্ষার পর আবার লেখালেখির পোকাটা মাথায় ঢুকল। সমকাল তখনো বের হয়নি। তাদের অফিস ছিলো বসুন্ধরা সিটির পাশে।সেখান থেকে আবার অফিস শিফট হলো তেজগাঁওয়ে।সেই তেজগাঁওয়ে আবার একদিন দেখা হলো সঞ্জীবদার সাথে। কথায় কথায় জানা হলো তিনি এখন যায়যায়দিন দৈনিকের ফিচার এডিটর। কন্ট্রিবউট করতে চাইলে যেতে পারি।
সমকালে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা (এখন অবশ্য কোন তিক্ততা নেই, সেখানে আমার অনেক বন্ধু কাজ করে) নিয়ে হাজির হলাম সঞ্জীবদার কাছে। কাচে ঘেরা বাড়ি, বাইরে থেকে প্রেসের কাজ দেখা যায়। দোতলায় চে ক্যাফে, হিচকক হল সব দেখে আমি মুগ্ধ। কাজ করলে এখানেই করতে হবে টাইপের মনোভাব নিয়ে হাজির হলাম দাদা’র সামনে। প্রথমেই বেমক্কা প্রশ্ন করে বসলেন- ‘তোমার লেখায় কী এখনো বাচ্চা বাচ্চা ভাব রয়ে গেছে?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই অ্যাসাইনমেন্ট ধরিয়ে দিলেন- “বিকেলে বিয়াম অডিটোরিয়ামে শাওনের ‘না মানুষি বনে’ অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন- কাভার করো”। পরদিন লেখাটা নিয়ে গেলাম- ছোট-খাট দু’একটি জিনিস শুধরে দিয়ে বললেন- ‘অফিসে নিয়মিত এসো, তোমার করার মতো অনেক কাজ রয়েছে’। গ্রিন সিগন্যাল-পেয়ে গেলাম দাদার।
আমার সাংবাদিকতার প্রথম বছরেই গুরু হিসেবে পেয়ে গেলাম সঞ্জীব’দা কে। এর আগে সমকালে লেখতাম কেবল স্কুল আর কলেজ ম্যাগাজিনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে। এরপর সঞ্জীব’দা আমাদের (আমি ছাড়াও অনেক নতুন নতুন প্রদায়ক ছিল সেখানে) ফিচার লেখার ব্যাকরণ, আর ব্যাকরণ ভাঙার খেলা শেখালেন- কাজের মধ্য দিয়েই। আমাকে জুড়ে দিলেন তাঁর অন্যতম প্রিয় একজন মানুষের সাথে- বিনোদন বিভাগে- কামরুজ্জামান কামুর সাথে।
দাদার কাছ থেকে দীক্ষা নেই, আর দুপুরে চে ক্যাফেতে আড্ডা দেই। সেই আড্ডায় কে থাকতো না- ব্রাত্য রাইসু (তখনকার সাহিত্য ম্যাগাজিনের দায়িত্বে ছিলেন), কামু ভাই, মুসা ইব্রাহিম (এভারেস্টজয়ী- তখন শিক্ষাপাতার দায়িত্বে), রকিবুল হক রকি (কার্টুনিস্ট, এখন অ্যাডকমে বসে বিজ্ঞাপনের আইডিয়া দেন রবি-কে), অনিক খান (টিন পাতার দায়িত্বে), অমি রহমান পিয়াল (স্পোর্টসে)- আরও কত মানুষ।
সন্ধ্যার পর থেকেই দাদা খামখেয়ালি। প্রায়ই আমাদের নিয়ে সদলবলে যেতেন সাকুরায়। দাদার পান করার অভ্যেস ছিল। আমাদেরও। আর প্রায়ই ফিরতাম একসাথে- দাদার বাসা ছিল মিরপুর মাজার রোড, আমার টোলারবাগ। রাত ১২টায় ফাঁকা রাস্তায় রিক্সায় দু’জন। পুলিশের সাথে কত স্মৃতি (সেটা তোলা থাক অন্য সময়ের জন্য)।ঢাকার রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হতো দাদার কন্ঠ- ভরা্ট।ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো দাদার গানগুলো- কখনো ‘গাড়ি চলে না’, আবার কখনো ‘চোখটা এত পোড়ায় কেন’ এরকম কত গান যে শুনেছি আনপ্লাগড!- অ্যালবামে তার ছিটে ফোটাও পাইনি।
এরপর যায়যায়দিনে ঝড়, চাকরি নেই, তাই ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়লো, আমিও পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম।কালে ভদ্রে দেখা হতো, কোন অনুষ্ঠানে বা শাহবাগে। সিডরের সময় খবর পেয়ে গিয়েছিলাম- আল হেলাল হাসপাতালে- দেখতে পাইনি। তারপর খবর এলো, দাদা নেই।
দাদা, আপনি হয়তো জানেন না, এখনো প্রতিটি লেখার আগে একবার ভেবে নেই, দাদা থাকলে লেখাটা কীভাবে এডিট করতেন, কোন ভুলটা শুধরে দিতেন। সেভাবেই এখনো লেখার চেষ্টা করি।কর্পোরেটের এই কলিযুগে এটুকুই আমার গুরুদক্ষিণা।একটা কথা দাদা প্রায়ই বলতেন- ‘সততা থেকে ভাল লেখা আসে- নিজের প্রতি সৎ থাকলে ভালো লেখা অবশ্যই তোমার কলম থেকে বেরোবে!’
দাদা- আমি আপনার যোগ্য শিষ্য নই, নইলে কী আর এভাবে আপনার এই প্রয়াণের দিনকে ভুলে যাই। যে কর্পোরেট কালচারকে আপনি দু’চোখে দেখতে পারতেন না, সেই কর্পোরেটের গোলামি করতে হচ্ছে এখন- কলম দিয়ে। দাদা- পারলে ক্ষমা করুন। আমার সকল ভাল লেখার পেছনে যে আপনারই হাত- তা ভুলি কী করে।

৯ thoughts on “আমাদের হিরো- সঞ্জীব’দা

  1. স্মৃতিচারন পড়ে কষ্টে বুকটা
    স্মৃতিচারন পড়ে কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে :ভাঙামন: :কানতেছি: … সত্যিই, আমরা খুব অমূল্য এক রতনকে হারিয়ে ফেললাম :মাথাঠুকি: :মাথাঠুকি: … সঞ্জীবদার প্রতি ও রইল ভালোবাশায় সিক্ত বেদনাবিধুর শ্রদ্ধাঞ্জলি :bow: :bow: :bow: … ভালো থাকুন, হে কান্নার জাদুকর… :মনখারাপ: :মনখারাপ: :মনখারাপ: :ভাঙামন:

    1. দাদাই কিন্তু বাংলাদেশে প্রথম
      দাদাই কিন্তু বাংলাদেশে প্রথম ফিচার সাংবাদিকতা শুরু করেন। আমাদের লেখার প্যাটার্নটাও কিন্তু দাদার ।বাংলাদেশে ফিচার সাংবাদিকতা না এলে ব্লগ তৈরি হতো কী না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে!

  2. শ্রদ্ধাবনত হওয়া ছাড়া এখন কিই
    শ্রদ্ধাবনত হওয়া ছাড়া এখন কিই বা করার আছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে এদেশে ভালো ভালো মেধাবী মানুষগুলো খুব দ্রুতই আমাদের ছেঁড়ে চলে যান।

  3. দলছুট একবার একটা আউটডোর
    দলছুট একবার একটা আউটডোর কনসার্ট করলো গুলশান ওয়ান্ডারল্যান্ডে। সেখানে গিয়ে দেখি সঞ্জীবদা তার চিরাচরিত জিনস আর টি শার্ট পড়ে একটা টুলের উপর এক কোনায় বসে আছেন। মাথা জুড়ে ঝাকড়াঁ কোকড়াঁ চুল। সাহস করে কাছে গিয়ে বল্লাম, আপনার ’সবুজ যখন’ গানটা আমার খুব প্রিয়। আমাকে ইনট্রোটা শুধু বাজিয়ে শুনাবেন? সঞ্জীবদা হাসলেন। মুচকি হাসলে তার হাসিটা ঘন গোফেঁর আড়ালে খানিকটা ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু চেহারার এখানে ওখানে ভাজঁ দেখে বেশ বোঝা যায় যে তিনি হাসছেন। শুধু ইনট্রো না, উপস্থিত সবাইকে সে সবুজ যখন গানটা গেয়ে শোনালেন। গানের শেষ বিরতির ফাকেঁ আমার পিঠে গিটার ঝোলানো দেখে জিগেস করলেন, গিটার বাজাও? আমি প্রচন্ড লজ্জা পেয়ে মাথা ঝাকাঁলাম। তিনি বল্লেন, এই গানটা তুলেছো গিটারে? আমি প্রচন্ড লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়লাম। এরপর তিনি একটা ব্যাগের ভেতর থেকে একটা কাগজ বের করে বল্লেন- ”এখানে ওটার নোট লেখা আছে। বাইরে থেকে ফটোকপি করে এটা আমাকে দিয়ে যাও।” আমি প্রচন্ড অবাক হলাম, এত অবাক হয়েছিলাম যে খুশী হতেও ভুলে গিয়েছিলাম। সঞ্জীবদা নিজের হাতে তার গানের নোট আমাকে দিচ্ছেন!!!

    সঞ্জীবদা, দেখতে দেখতে ছয় ছয়টা বছর হয়ে গেলো। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। কারন আপনি বেচেঁ ছিলেন…বেচেঁ থাকবেন আমার মতো আপনার লাখো ভক্তের হৃদয়পুরে।

    আমার হৃদয়পুরে সঞ্জীবদা…!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *