অগণতান্ত্রিক পথে গণতন্ত্র আসতে পারেনা

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ভবিষ্যতের জন্য আতঙ্কজনক। অগণতান্ত্রিক পথে আর যাই হোক গণতন্ত্র হয় না। শক্তি প্রয়োগ করে, চাপিয়ে দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। নির্দেশ দিয়ে, ভয়-ভীতি দেখিয়েও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার কোন নজির আছে বলে মনে হয় না। সামরিক স্বৈর-শাসকরা শক্তি প্রয়োগ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মিষ্টি মধুর কথা বলে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনই প্রতিষ্ঠা করেছেন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ভবিষ্যতের জন্য আতঙ্কজনক। অগণতান্ত্রিক পথে আর যাই হোক গণতন্ত্র হয় না। শক্তি প্রয়োগ করে, চাপিয়ে দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। নির্দেশ দিয়ে, ভয়-ভীতি দেখিয়েও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার কোন নজির আছে বলে মনে হয় না। সামরিক স্বৈর-শাসকরা শক্তি প্রয়োগ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মিষ্টি মধুর কথা বলে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনই প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরণের ঘটনা বারবার ঘটেছে, ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে মৌলিক গণতন্ত্র সৃষ্টি করে শুধু গণতন্ত্রকে হত্যাই করেননি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্টান গুলোকে সামরিকায়ন করেছিলেন। আইয়ুব খান ইয়াহিয়া খানের পদাঙ্ক, এ ভূখন্ডের পরবর্তি সামরিক শাসকরাও তা অনুসরণ অনুকরণ করতে দেখা গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান নির্বাচন ব্যবস্থাকে ম্যানিপুলেট করে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে গেছেন। লে. জে. এরশাদ জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করে আবারও দেশীয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে গণমানুষের গ্রহণ যোগ্য করতে পারেননি। নির্বাচনী ফলাফল পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে পরিবর্তন করার ঘটনাও এ স্বৈরশাসকের সময়ে ঘটেছে। অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকরা পৃথিবীর কোন দেশেই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসনে দুর্নিতি, জঙ্গীবাদ সহ নানা ধরণের অগণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশ ও এর ব্যতিক্রম নয়।
আজ হতে বিয়াল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা কিভাবে চলবে তা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ দেশের মানুষ এক সাগর রক্ত দিয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতির জীবনের সর্বশ্রেষ্ট অর্জন মুক্তির সনদ জাতীয় সংবিধানে প্রতিফলনের মধ্যেই- তা কাঁটাছেড়া শুরু হয়ে যায়। আর সামরিক স্বৈরশাসকরা শাসনতন্ত্রকে ব্যবচ্ছেদ করে সংবিধানের মৌলিক চরিত্রই বদলে ফেলে। সামরিক স্বৈরশাসকদের সহযোগীতায় যুদ্ধাপরাধীরা শুধু রাজনীতি করার সুযোগ পায়নি, ক্ষমতায় ও ফিরে এসেছিল। এ পথ ধরে ইসলামি জঙ্গিবাদ সমর্থক অগণতান্ত্রিক অপশক্তি রাষ্ট্র ব্যবস্থার সর্বত্র স্থান করে নেওয়ার সুযোগ পায়। এ পথেই আবার ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। এছাড়াও ২০০৭-০৮ এ দুই বছর ড. ইয়াজ উদ্দিন, ফখরুদ্দিন ও মইনউদ্দিন এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দেশের শিশু গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়। ২০০৯সালে এর পূণঃ উদ্ধার ও গণতন্ত্রের চর্চা পূরণায় শুরু হয়। যা বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে। এ চিত্রও গণতন্ত্রের জন্য পুরোপুরি মানানসই নয়। এ প্রক্রিয়াধীন ধারাকে উন্নততর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রশস্ত অনুকুল পরিবেশের চর্চা প্রয়োজন।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতকে প্রধান্য দিয়ে কাজ করাই হচ্ছে গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত। গণতন্ত্র প্রতিষ্টার জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ সবার আগে প্রয়োজন। মানবিক আদর্শ সমূহের মধ্যে গণতন্ত্রই পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রভাবশালী। বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যেও গণতন্ত্রের প্রভাব আকাশচুম্বী। দেশবাসী গণতন্ত্রকে তাদের রাজনৈতিক জীবনের জন্য প্রধান আদর্শরূপে গ্রহণ করেছে। এ গণতন্ত্রকে অর্জনের জন্য গত শতাব্দীর বেশির ভাগ সময় লড়াই সংগ্রাম করেছে। সে লড়াই সংগ্রাম যেমন গৌরবের তেমনি সাফল্য ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। গণতন্ত্রে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও রক্ত ঝরিয়েছেন। গণতন্ত্রকে জনগণের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। তারা গণতন্ত্রকে বাংলাদেশে সাফল্যমন্ডিত করতে চান। গণতন্ত্র স্থবির নয় বরং ক্রীয়াশীল এবং সৃষ্টিশীল আদর্শ। গণতন্ত্রের বিকাশ সাধন জনগণকে যেমন করতে হয় তেমনি রাজনৈতিক দল সমূহকেও করতে হয়; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল সমূহ গণতন্ত্রের বিকাশ সাধন যর্থাথ ভাবে বাস্তবে দৃষ্টিনন্দন করতে আজও পারেননি। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের মধ্যে গণতন্ত্র সর্ম্পকিত আলাপ-আলোচনা, উপলব্ধি, বিকাশ, মানব এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রয়োগের কোনপ্রকার সুস্থ চিন্তাচর্চা আদো দেখা যায় না। যেকোন রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্টা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রথমত গণতান্ত্রিক হতে হবে। প্রতিটি দলের গণতন্ত্র চর্চা থাকতে হবে। এবং কোন ব্যক্তিকে কেন্দ্র না করে গণতান্ত্রিক ভাবে নেতা নির্বাচন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্রের আশা করা দুরাশা মাত্র।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে রাজনীতি করতে গিয়ে যদি ধরে নেই গত দুই দশকে কত শত তরুণের শক্তি, মেধা, আয়ু ক্ষয় হয়েছে তার কোন সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তারা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতি করতে এসেছিল বড় আশা নিয়ে, হারিয়ে গেছে নিরাশ হয়ে, উপরন্তু গণ মানুষের নেতা রূপে আবির্ভূত হতে পারেনি। জনগণও গণতন্ত্রের দেখা পায়নি। জনগণের অভাব, অভিযোগ, কষ্ট, কান্না, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, অস্বাভাবিক মৃত্যু, ধনী-গরীবের বৈষম্য, সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, পুঁজিপতিদের লোটপাট, গরীব মেহনতী মানুষের উপর নিপীড়ন, নির্যাতন, শোষন দেখে গণতন্ত্র চর্চার কথা বেমালুম ভুলে যওয়ার কথা নয়। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রকে সাফল্যমন্ডিত করতে চাইলে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে গণতন্ত্রের অনুশীলন একান্ত আবশ্যক। গণতন্ত্রকে জানতে, বুঝতে ও আলোচনা-সমালোচনা, মতামত গঠন এবং বিকাশ সাধনে প্রক্রিয়াধীন রাখতে হবে। পাশাপাশি বাস্তব জীবনে গণতন্ত্রের যথাযথ প্রয়োগীক সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; তবেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের সুফল অর্জিত হতে পারে। গণতন্ত্র কেবলমাত্র ভোটাভুটিকে বুঝানো হয়। যা মুটেও পূর্নাঙ্গ নয়; গণতন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক সংস্কৃতি তথা জনগণের সামগ্রিক জীবন পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে উন্নত পরিবর্তনের মাধ্যমে অবাধ মুক্ত পরিবেশে জনগণকে প্রতিস্থাপন করার সার্বিক কর্ম নীতি, কর্মসূচী ও কর্ম কৌশল নিধারণের নামই গণতন্ত্র।
জনগণ মুক্তির পথ খুঁজে। বারংবার রাজনীতিকদের দ্বারা প্রতারিত হলেও নিরাশ না হয়ে সুযোগ বুঝে দিগুণ উৎসাহে সংগ্রাম করে আশায় বুক বাঁধে। তারা ১৯৫২-৫৪ থেকে সচেতন হতে শুরু করে, মুসলিম লীগকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে উৎখাত করে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তারা কথা বলতে শিখেছে, হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠেছে। “গণতান্ত্রিক বিকল্পের” অন্বেষা উন্নয়নশীল দেশে মুক্তি আন্দোলন এবং শিল্পোন্নত পূঁজিবাদী দেশ সমূহের শ্রমজীবি মানুষের আন্দোলনের মধ্যে সহযোগীতার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
প্রচলিত সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর ইঙ্গ-মার্কিন প্রভাবিত লুটেরা গোষ্ঠীর গণতন্ত্রের পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ অভাবী নির্যাতিত, শোষিত, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের মধ্যে পরস্পরের সম্মিলিত প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আমরা আশা করি গণতন্ত্র সম্পর্কে ভবিষ্যতে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা সহ মতামতের ভিত্তিতে বাঙালির উন্নত জীবন ও পরিবেশ নির্মিত হবে। স্বাধীনতা লব্দ দেশগুলির সার্বিক মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, রাজনৈতিক গণতন্ত্র। রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সুষ্টুরূপ হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্র। এ পথ ধরেই এগুতে হবে।

৩ thoughts on “অগণতান্ত্রিক পথে গণতন্ত্র আসতে পারেনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *